শান্ত আলো আর গড়িয়ে আসা স্তব্ধতা

অনিন্দিতা গুপ্ত রায় ও তপতী বাগচী



মুক্তি

একটা দৃশ্য ভুলে যেতে ঠিক কতদিন?
স্পর্শ লেগে থাকা
যে দৃশ্যের ভেতর দিয়ে এক ধূধূ হাইওয়ে
বহুদূর অবধি অস্বীকার লেখা, অহং ও অন্ধকার
আটপৌরে ভঙ্গীমায় এক আধটা জন্মদাগ খুঁজে পেতে
সারাটা জীবন নতজানু হওয়া থেকে
মুক্তিপত্র লিখে দিলাম
আজীবন নিজেকেই বন্ধক রেখে




কথা

কান্নার অতীত কিছু স্মৃতিভার
খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে দেখতে নেই
তুলে আনতে নেই লবণ ও মাটি
বিকেলের একটু আগে
স্তিমিত জলের পাশে বর্ণালি ফিরে আসে
পোকামাকড়েরা তার ঘ্রান পায়, রঙ পায়, ডানা পায়
ওরা জানে পুড়ে যাওয়া
আর আমি শুনি ঠোঁটের শব্দ
ফিরে আসছে
সেই গল্প নিয়ে যা
বিচ্ছেদের কথা বলবেনা বলেই
আজো শেষ হয়নি

উপকথা

লাল আর সাদা
ভেজাভাব থেকে ঈষৎ অবিন্যাস
বৃষ্টি পেরিয়ে ঘর, ভিতরদালান, দোলনা সিঁড়ির
উঠে যাওয়া নেমে আসা
স্থির থেমে থাকা শরীরবিতান
ফ্রেম থেকে সোজাসুজি আলতো গোলাপি
এরকম একটা ক্যানভাসে গলে পড়ছে গালের বিন্দুটি
মানচিত্র ফুঁড়ে অজস্র অক্ষ ও দ্রাঘিমায়
ঝঞ্ঝাপ্রবনতার দিকেই বারবার গড়িয়ে
এত ভাসমান করে তোলে নিজেকে
যেন সামান্য ফুঁ দিলে উড়ে চলে যাবে
অসমাপ্ত লেখাগুলোর বিরতিচহ্নে

রূপকথা

শ্বাসমূল বিস্তারিত বাতাসের ফুসফুসে
ফুঁ এর উল্টোদিকে নেমে যাওয়া নদী
স্থাপত্য টপকে স্পষ্ট পাথুরে আড়াল, ডানাবিষয়ক লিপি
স্বীকারোক্তির জন্যও যতটা যোগ্য হতে হয়
তার ছিটেফোঁটা শুষে শূন্যগর্ভ মেঘ ক্রমশ বেগুনি
হা হা বৃষ্টির দিকে মুখ তুলে
নিরুপায় উঠে যাওয়া বালির মিনার
আর তাকে পেঁচিয়ে ওঠা সরীসৃপ
ভারসাম্য বজায়ের নামে টলমল
খোলস কুড়িয়ে যাকে ঘরে ফিরে টাঙিয়ে রেখেছ
ধূলো, শুধু ধূলোর স্পর্শ লেগে আছে
আলোর মুখোশে

ট্রাপিজ

সীমানা পেরনোর কথা বুঝেও বোবা হয়ে আছি
কেননা একদিন নিজের নাম থেকে আদ্যক্ষর তুলে এনে
অতিক্রমের কথা লিখেছি, লিখেছি সহ্যবিন্দু
একটা একটা করে সুতো সরিয়ে পৌঁছে গেছি পিউপা অবধি
অথচ রূপান্তরের সিঁড়িগুলো দৃশ্যমানতার বাইরে
আর সেখানেই স্তব্ধ বসে আছে খোঁড়া বিদূষক
কান্না ও কাজলে মাখামাখি


“একটা দৃশ্য ভুলে যেতে ঠিক কতদিন ?” (মুক্তি)
কোনো এক শোকের বাড়ি।মৃতদেহ কাঁধে শববাহী দল চলে গেছে নদীর দিকে।বসার ঘরে মৃদু জটলা।এঘরে ওঘরে কান্না ফোঁপানী আর সান্ত্বনার গতানুগতিক।এসবের থেকে একেবারে পৃথক,বয়স্কা মহিলা রান্নাঘরে কল খুলে মৃদু জলের ধারায় ধুয়ে মেজে চকচকে করে তুলছিলেন তাঁর সিঁদুরের কৌটোটি…সমস্ত লাল রং জলে ধুয়ে চলে যাচ্ছিল বাইরে…
একাত্তরের এক সন্ধ্যায় উদ্বাস্তু শিবির থেকে এক বয়স্ক দম্পতি তাঁদের বালিকা নাতনীটিকে নিয়ে আমাদের উঠোনে এসে নতমুখে দাঁড়ালেন।কোনো আদর আপ্যায়নই তাদের বিধ্বস্ত অপরাধী মুখে হাসি ফোটাতে পারলনা।আমরা ভাই বোনেরা পরপর প্রণাম সেরে দাঁড়িয়ে।মা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের থালার সামনে বসিয়ে দিতেই…বাচ্চা মেয়েটির প্রথমে হেঁচকি…তারপর চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে ওঠা…
মাস্ক সরিয়ে লাজুক হাসল দেবিকাদি,যেন নতুনবৌ…নতুন দাঁত ওঠা শিশুর হাসির মত পবিত্র সেই হাসি। –কেমন লাগছে রে আমাকে ? শীর্ণ রোগক্লান্ত চোয়াল ঠেলে ওঠা মুখ।আমি নিজেকে গোপন করতে বললাম –একেবার অন্যরকম।–ভালো লাগছেনা? –তুমি তো আগেই ভাল ছিলে।–আসলে কি বলতো ? সেই ছোট্টবেলা থেকে আমার শখ ছিল গজদাঁতের।আয়নায় দাঁড়িয়ে কত দিন ভেবেছি, ইস যাদের গজদাঁত আছে তাদের কি মজা !পুরো মাড়িটা কাটিয়ে কসমেটিক সার্জারি করাতে যখন হলই তখন মনের ইচ্ছেটা বলে ফেললাম সার্জেনকে…বলল একটু ঝামেলা আছে কিন্তু…মানে একবারে হয়তো হবেনা।বললাম-যতবারে হয় হোক। আপনি করে দিন। আর যেক’টা দিন হাসবো…একটু অন্য রকম হাসতে ইচ্ছে হচ্ছে…
কে জানে হয়তো এক জীবনের আয়ুও নিঃশেষ হয়ে যায় দৃশ্যের স্পর্শ মুছতে মুছতে।নিস্তারহীন এক একটি দৃশ্যের কাছে সারাটা জীবন বাঁধা পরে থাকে।প্রাত্যহিক যাপনচক্রের থেকে ছিটকে ওঠা সেইসব মুহূর্ত অমোচনীয় উল্কি হয়ে নিঃশব্দে রয়ে যায় হৃদয়ের ভেতরের চামড়ায়।
অনিন্দিতা তোমার মুহূর্তসন্ধানী চোখ সেইসব নীল নকশা মমতাভরে তুলে রেখেছে।হয়তো তোমারও যাপন থেকে।তোমার আয়নার কৌণিক প্রতিফলনে ধুয়ে গেছে তাদের যাবতীয় পূর্বপরিচয়।নতুনজন্মে র বিধাতা এবার তুমি।তোমার ‘অহং ও অন্ধকার’ এ কোনো উগ্রতা নেই,প্রবল চাপ নেই কোনো।তোমার নির্মোহী বিষণ্ণ দু’চোখ নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে শধু এক আধটা জন্মদাগের অণ্বেষণ জারি রাখে।


“সেই গল্প…যা …আজো শেষ হয়নি” (কথা)
কোনো গল্পই শেষ হয়না অনিন্দিতা,যখন সময় শুরু হয়েছে কাহিনীর শুরু তখন থেকেই।সে কখনো স্মৃতিভার, কখনো কান্না কখনো অতীত।গল্পেরা নীরবে বয়ন করে জীবন,সময়।এক একটা মানুষ মানে লাখো লাখো গল্পের সুতো।নকশা তুলে তুলে তারা চলে অপরিচিত পৃথিবীর দিকে।কখনো কখনো অস্পর্শ বিস্মৃত অবশ গল্পেরা অস্তিত্বের তলদেশে পড়ে থাকে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নিস্পৃহতায়।তুমি জানো অনিন্দিতা তাদের ঘুম ভাঙাতে নেই।আব্রু তুলে দেখতে নেই তাদের অশুভ অসুখী মুখ।বরঞ্চ যে বর্ণালি পতঙ্গজন্ম সার্থক করতে ভরে দেয় রং, ঘ্রাণ, পরিয়ে দেয় ডানা,তার কাছে দু’দন্ড বসা ভাল।বসা ভাল সেই শব্দছায়ায় যা তোমায় বিচ্ছেদ বলবেনা কখনো।গল্পের প্রবহমানতায় কোনো বিচ্ছেদ নেইও আসলে।সে টা-না থেকে যাবে তোমার পাশে পাশেই…শীতল বিরান একাকীত্বের অন্ধকারে নড়ে উঠবে তার ঠোঁট…নেমে আসবে সেই আখ্যানমালা যা তার উষ্ণ আঙুল বাড়িয়ে দেবে তোমার দিকে…

ঝঞ্ঝাপ্রবণতার দিকেই… (উপকথা)
তুমি উপকাথা লিখেছ আনিন্দিতা,রূপকথাও। কথারা নিজস্ব দায়িত্বপালনে তৎপর।এই বিকিরণপ্রবণ কথামালা তাদের স্বজীবনের গন্ডীতে কিন্তু বাঁধা পড়লনা।কিছু কুয়াশা সৃষ্টি করল,কিছু মায়া জড়ানো মৃদু আলো আর তাতে নামিয়ে আনল ইচ্ছমত পরী।সেই পরীদের অরা ঘিরেও গুনগুন উড়ছে উপকথারা।এই পৌনঃপুনিক দোষে আক্রান্ত উঠে যাওয়া নেমে আসা দোলনাশরীর।আলতো গোলাপিরা , গাল হোক বা ক্যানভাস, গলে তো পড়বেই।
অসমাপ্ত কবিতার বিরতিচিহ্নে কোল পেতে সেই তো তুমিই বসে আছো অনিন্দিতা।নিজের অস্তিত্বকে বারবার ঝঞ্ঝার দিকে টেনে নিয়ে যাবারই প্রবণতা তোমার।অস্তিত্বের এই বিস্ময়কর বিপন্নতা বয়ান করা ছাড়া কবিতার আর কাজ কি বলো? এর জন্য তার কাছে আসে শব্দ।আলো তুলে আনে নিজেদের বুকের ভেতর থেকে।তবুতো কবির শুন্যতাবোধ যায়না।দুটি শব্দের মাঝে,দুটি পংক্তির মাঝের নো ম্যানস্ ল্যান্ডে হা হা শূন্যতা দেখতে পায় সে।ভরে দিতে দিতে চলে যায় কবির জীবন-রহস্যে,অনুভবে,অন্ তর্দৃষ্টিতে।তুমি যে কোন শব্দের কপালে কোন আঙুল ছুঁইয়ে দেবে,কোথায় আঁধার কোথায় জ্যোৎস্না,কোন গান সেই শব্দটি গেয়ে উঠবে…তুমিই কি জানো তার সম্পূর্ণ হরোস্কোপ !তোমার মুঠো থেকে খসে যাবার পর আমার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে তার ইচ্ছেবদল তোমায় আবারও বিস্মিত করে রাখবে।

ভারসাম্য বজায়ের নামে টলমল…(রূপকথা)
নাকি ভারসাম্য রাখতেই টলমল,অথবা টলমলে ভাব দেখিয়ে আসলে ভারসাম্য রক্ষা…স্বীকারোক্তির এই ব্যক্তিগত রানওয়েটুকুর প্রয়োজন হতেই পারে উড়ান ভরবার জন্য।তারপরেই তো মেঘেদের দেশ।আর তুমি সেখানে স্বচ্ছন্দ।নয়তো কিভাবে শ্বাসমূল বিস্তারিত হল বাতাসের ফুসফুসে!তোমার ধুলিবসন আসলে তোমারই ধাবমানতার আলো।নিরুপায় উঠে যাওয়া বালির মিনারের গায়ে যে কারুকাজ তার স্থাপত্য টপকে যেতে আমি পারিনা অনিন্দিতা।তাই টুপি খুলে এককোণে দাঁড়িয়ে থাকি- খোলশ মুখোশ পরচুলা যাই হোক সে তো আলোর !

…স্তব্ধ বসে আছে খোঁড়া বিদূষক/কান্না ও কাজলে মাখামাখি (ট্রাপিজ)
‘বোবা হয়ে আছি…’ এ কথাও সীমানা পেরোয় আসলে।কেননা ‘ যো জানে সো কহে নেহী/যো কহে সো জানে নেহী’।শব্দের শরীর অতিক্রম করে আত্মার ধর্মে চলে যাওয়ার রহস্যগুণ কবিতারই থাকে একমাত্র।রূপান্তরের সিঁড়িগুলো দৃশ্যমানতার পরপারে থেকেই অনুভবে বিভা ছড়ায়।এই লাবণ্য আনন্দবিভব আমাদের।খোঁড়া বিদূষক তাই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে মথিত আবেগে।দু’চোখ ভরা কান্নায় তার দেখার প্রসাধন ধুয়ে যায়।
অনিন্দিতা, সে তো আমি ! বোকা বনে যাওয়া মতিচ্ছন্ন ক্লাউন…তাঁবুর জীবন ছেড়ে তোমার কবিতার ভেতরদালানে ঢুকতেই পারেনি যে।এক আকাশ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায় ভিজছে।