পাখিজন্ম

আয়শা ঝর্না ও পূজা নন্দী



১.
শোন ঝাউপাতা, এই আমাকে উড়িয়ে
বাড়িয়ে যেখানে এনেছো সেখানে একা
নৈ:শব্দের সাথে, পাখিদের সাথে, খুব
আমার আলাপ জমেছে, বিলাপ করি
পাখিসম জীবনের জন্য।
পালকে রক্তের ধারা নিয়ে,
উড়ে চলা শ্যামাপাখি বলে--
কী হবে তোমার এমন জীবন দিয়ে?
যেখানে সময় থেমে আছে
অপরূপ খিলানের কারুকাজ নিয়ে।
তারচেয়ে চলো পাখিজন্ম নাও।
২.
গাছের খোড়লে ছিল পাখি
শুধু মুহুর্তটা আটকে আছে যে চোখে!
গাছকে শুধাই ’পাখি কই?’
গাছ বলে,ওর আছে উড়বার স্বাধীনতা,
ডানায় বাতাসের গন্ধ মেখে
আসবে সে ফিরে হয়তোবা!
’তোমার হয়না দু:খ তার জন্য?
গাছকে বলি, সে, নিরুত্তর।’
ওর সবুজ পাতার ডালগুলোয়
তখনো রয়েছে টুনটুনি বুলবুলি
যদিও তার কাঠ ঠোকরাকে
মনে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে।
৩.
তুমি গাছটিকে দেখে বলো,
তোমার ক্ষতের চিহ্নগুলি কই?
গাছ তখন নীরব,
তার ভেতরে ঘুঘুর বাসা।
তার খোড়লে সময় দেয়
কুড়ালের ঘা, যা হাপরের মত
বাড়ি মেরেই চলে,
একটা সময়, তুলে
দিলাম তোমার হাতে,
তুলে রেখো তুমি অন্যজন্মে।
৪.
সময়ের গায়ে ঢেউ এসে পড়ে
সমুদ্র গর্জনে গর্জনে ঢেউকে ডাকে।
সময় তবে সে সীমাহীন-
অনন্তকাল থেকে যে বাতাস, সময়,
সমুদ্রের ভেতরের পাখি,
পাখির চোখে আছড়ে পড়ে ঢেউ
ডানায় চলার ক্লান্তি।
পাখি, তুমি মানুষজন্ম নিও না,
আরজন্মে তুমি পাখি হও
সমুদ্র হও, মানুষজন্ম নিওনা।
৫.
আহা রাঙা আলোময় সোনালী বিকেল
বৃষ্টিভেজা, তোমাকে দেখছি-
ভিনদেশী গান করো, যেন কোন
সূদুরের বন্দি তুমি, অপূর্ব খিলান
আর ঝাড়বাতি মহলের রূপ সুর!
আমার আত্মাকে তাড়া করে
অজানা আতঙ্ক, দু:খবোধ।
জীবনের ওপার থেকে,
বাতাস আমাকে যেন নিয়ে
এসেছে অনান্মী দু:খ-জ¦রাময়
এক লাল নীল সবুজ গাছের নীচে-
সেখানে মানুষ স্বপ্ন দেখে।
ঐদিকটায় টিলার ধারে,
নীলজল, নুড়িপাথর, ক্রন্দন, কী যে
ভয়াবহ বিষাদময় আত্মার ক্ষয়!




এভাবে কত বৃষ্টি ভেজা রাত জ্বলে গেছে মনের ভিতর, বন্দিনী বলে কত মনে হওয়ার ভেতর ভেতর জ্বর এসেছে, কখনো ছুঁয়ে গেছে এক রক্তাক্ত শরীর...

" পালকে রক্তের ধারা নিয়ে, উড়ে চলা শ্যামাপাখি বলে-- কী হবে তোমার এমন জীবন দিয়ে? "

সত্যিই তো, কী হবে এমন জীবন দিয়ে? কখোনো ওই প্রান্তে পৌছেও হয়ত এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না, হয়ত ভাবতে চাইব সময় থেমে আছে আর ডানা পরজন্মের আশায় থেকে থেকে কেবলই বলে উঠবে, একটু আকারে ফেলে আমিও নিরাকার হতে চাই তোমারই মতন...

এভাবে হয় না, এভাবে ভাবতে পারি না। তুমি আঘাত দেবে বলেই তো তোমায় জায়গা দিই অথবা অাঘাত পাব বলেই তুমি আঘাত করো - ' জখম দিয়া হ্যায় এ্যায়সা ভুল না পাউ তুঝে '। প্রতিটি আঘাত নতুন হয়, ঘাত প্রতিঘাতে গাছের কঠিন ধারন করে মন, না আঘাতেও তার কথা মনে আসে, বেশী করে মনে আসে...

আর তাকে রেখে ঢেকে রাখতে গিয়ে দেখি সেগুলো কেমন ঢুকে যায় শরীরের ভেতর; যেন শামুক তার শক্ত খোলোসের আবরণে ঢুকিয়ে নিচ্ছে তার প্রিয় নরম শরীরটিকে.. হঠাৎ ই দাঁড়িয়ে পড়ি এ দৃশ্যের সামনে, যতদূর চোখ কেবলই সবুজ, সামনে বিস্তার পেছনে ফাঁক..হাতড়ে যাই সারারাত, অন্ধের মত। এভাবে বুঝি খুঁজে পাওয়া যায়? আহা! রক্তে ক্ষত মিশে যাওয়ার যে বিনম্র স্বাদ সেকি শুধু একার পাওয়া..

অবেলায় ঘুম ভাঙলে শ্যামা পাখিটিকে মনে আসে, মনে পড়ে তার ছোঁয়ায় এক্কা দোক্কা হওয়ার কথা। ঝর্ণার শব্দ কেমন মাথা পেতে দেয় তার সামনে... পরদেশী পাখিও বোধহয় সেই অচেনা মানুষের আশা পুষে রেখেছে তার ডানায়। বাঁশির শব্দে এখানে মহিরুহ পতনের ধ্বনি ওঠে, বসে বসে দেখি তার ওপর ছায়ারা কেমন পাক খেয়ে যায়...

চারিদিকে যখন ঢেউ ক্রমশ সরে সরে যাচ্ছে তখন গভীর সমুদ্রের নিস্তব্ধ আকন্ঠ গ্রাস করে নেয়, একাকী রেখার ছাপ মিশে যেতে দেখি মোহনায়, কখনো নদী পার করে তারাই আবার ফিরে আসে... বিন্দুরা মিশে যেতে থাকে ফেনায় আর আমাদের কথারা পরে থাকে তলদেশ জুড়ে..

মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় হয়, যে ভয় কখোনো পায়ের তলা থেকে শিরা উপশিরা হয়ে তিরতির করে উঠে যায় মাথায় অথবা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্রে- তথাকথিত জটিল কেবল হাতড়ে যাই চারিদিকে। বৃষ্টিস্নাত রাত কেমন অন্ধকার গিলে নিচ্ছে শরীর থেকে আর বৃষ্টির কুচি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ডায়েরীর পাতা; এরই মধ্যে ঘরবিহীন পাখিরা উড়ে যায় অন্যঘরের আশায়। মাথা বনবন করে ওঠে; যেন দাঁড়ালেই এই মুহুর্তে পা টলে উঠবে, আর চোখের সামনে কেউ জ্বালিয়ে দেবে একশ ওয়াটের বাল্ব। এমন ক্ষয়ে যাওয়া নিস্তব্ধতায় নিজেকে ঘন করতে চাইলে বৃষ্টি আরও প্রবল হয়...

যে উচ্ছ্বাসে সে প্রথম উড়েছিল শব্দে, আজ ডানার সে উচ্ছ্বাসেই শব্দ ফালা ফালা হয় আর রাত জাগা পাখি বয়ে বেড়ায় সেসব শব্দ টুকরোর বিষম ভারী যাপন। অন্ধকার লেপ্টে থাকে তার গা জুড়ে, অন্তহীন এ সমুদ্রেও বেড়ে চলে অন্ধকারের দাপট। অতল থেকে যে সব প্রশ্নচিহ্ন উঠে এসেছিল, যাদের কিছু কিছু আবার তলিয়েও গেছে আর কিছু ভেসে আছে নিছক আজীবন ভেসে থাকার অজুহাতে; সেসবের উত্তরেই যেন সে ঝাপটে যাবে ডানা....অনন্তকাল......