আমি হেনরি ও অমিতাভ

অমিতাভ মৈত্র ও উমাপদ কর



চল্লিশ পা দূরে

শুধু সেই অস্ত্রের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়
যে নির্জন, যে পরিগণিত নয়

চল্লিশ পা দূরে একজন গরম মানুষ
বিশ্রাম না নিয়ে শেষ পর্যন্ত বরফ খেয়ে যাচ্ছে

করমর্দনের পর হেনরি আর আমি চল্লিশ পা পিছনে ফিরে
ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম আবার

সামান্য চল্লিশ পা- তবু অস্ত্র নেই বলে
কেউ কাউকে কোনোদিন আর দেখতে পেলামনা


কৃত্রিম হেনরি

পরস্পরকে হত্যা করে হেমন্তের মৌমাছিরা যা বলতে চায়
বরফের অভিশাপ সারাজীবন মাথায় নিয়ে
কোনো পাহাড় যা বলে
মুখভর্তি নকল দাঁত নিয়ে
চোখ নামিয়ে সেটাই আজ বলছে হেনরি-

দেওয়ালের দিকে অনন্তকাল তাকিয়ে থাকতে থাকতে
একটা টিকটিকিও কিন্তু খারাপ হয়ে যায়

সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি

একটা চামচ ফেলার মধ্যে হেনরি বোঝে
সে বাতিদানের নিভে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে।
ভয় পেয়েই সে আরো জোরে কাচ মুছতে শুরু করে দেয়
আর চামচটাকে ছুঁড়ে দেয় চুল্লির মধ্যে।
আর এমনভাবে বাতাসকে ভয় দেখায় যাতে বাতিদানের কাছে
কিছুতেই আর যেতে পারেনা সে।

আয়না নিয়ে হেনরির প্রথম সন্দেহ

প্রথম দুটি ফলকে তেমন কিছু নেই
কিন্তু তৃতীয় ফলকে হেনরি লিখেছে
অন্তঃস্রাবী, স্যাঁতসেঁতে ধূসর এক আয়নার কথা
যে হেনরিকে প্রতিফলিত করে বিশুদ্ধ কোনো আত্মার মত
অথবা ছুঁড়ে ফেলা প্যান্ট বা রক্তাক্ত তুলোর মত নির্মোহভাবে
আর গতি এক তৃতীয়াংশ নামিয়ে
তার চারদিকে ঘুরতে থাকে
অর্ধেক হিংস্র অর্ধেক অনুভূত নারী ও বেড়ালের অস্তিত্বের মত।

হেনরি লিখেছে, এখান থেকেই সে সন্দেহ করতে থাকে আয়নাকে।
তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়।



বিষক্রিয়া

যারা আগে কখনো হাসেনি তাদের পর্যন্ত খেয়াল হয়নি
হেনরি আজ তিনদিন ধরে হাসছে।

শুরু করেছিল দেবতাদের প্রশংসা করে
একেবারে স্বর্গে তুলে দিয়ে।
তারপর আসল কথাটা বলার আগে
ওর মুখ অদ্ভুতভাব কুঁচকে যায়।

বিকেল পর্যন্ত তার সদ্গুণগুলো কেউ কেড়ে নেয়নি।
কিন্তু বিকেল শেষে সে সবার পেছনে চুপ করে দাঁড়িয়ে
বাড়িটাকে আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে দেয়।



যন্ত্রণার চামড়া উঠিয়ে নেওয়া হলো। ত্বকের নীচটা ঘুম ভেঙে জাগে। ধূসর সাদা। আরেকটু নীচের লোহিত কণিকার চলাচলের তেমন হেলদোল নেই। শুধু সামান্য উত্তেজনা অনুভব করে। আর তাতেই সাদা মাংসে লাল আভা বা লালিমা ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ছোটবেলা থেকে একটা ধারণাই বয়ে নিয়ে এসেছি—যন্ত্রণার রঙ কালো, নেহাৎ নীল।
বেদনাকে তোলা হলো অপারেশন টেবিলে। সার্জিক্যাল ছুরিতে চিরে দেওয়া হলো খানি্কটা। সামান্য খোলামুখে দুভাগ হয়ে গেলো মাংস। সাদা ধবধবে। ভেতরের দেয়ালে জড়ো হতে থাকলো বিন্দু বিন্দু রক্তকণিকা। প্রথমে ধীরে পরে গতিতে। লাল হয়ে উঠল অঞ্চল। ভেজা। সার্জনের পরের কাজটি নিয়ে মাথাব্যথার চেয়ে বেদনাকে নিয়ে মাথাব্যথা আমার বেড়ে গেলো অনেক অনেক। এই তার রঙ? এত তার তাপ? আমার বোধে বেদনার রঙ নীল, বড়জোর আকাশি। এখানে লাল। আমার চেতনায় বেদনা শীতল। এ যে তাপিত।
ভালোবাসার একটা ফোলানো ব্লাডার আছে। তাতে কুঠার মারা হচ্ছে রোমশ হাতে। অথবা কোনও কোমল আঙুল-ডগা ব্লাডারটা ঘোরাচ্ছে ধীরে, পৃথিবী ঘোরার মত। তো, কুঠার বার বার ব্যর্থ হোলেও একবার নিশ্চিত ব্লাডারটা ফাটিয়ে দেবে। আর আঙুলের নখ ঘূর্ণনে ঘর্ষণে ফুটো করে দেবে ব্লাডারটা। বাতাস বেরিয়ে চুপসে যাওয়া ব্লাডারটা দেখতে দেখতে একবার ঝালিয়ে নিই বুদবুদের মত প্রশ্নগুলো। জেনে এসেছি, ভালোবাসা অপার, মৃত্যুহীন। কিন্তু এ যে শেষ বাতাসটুকুও ছেড়ে দিয়েছে। তাহলে ভালোবাসা কি…
এখান থেকেই এক বিপন্নতার শুরু আমার মধ্যে। মানে আমি, আমি উমা, আমি অমিতাভ, আমি হেনরি বা আমি এক্স-ওয়াই-জেড। বিস্ময়ের সঙ্গে রহস্যকে আমি নেড়েচেড়ে দেখেছি, আমি বিপন্ন বোধ করি। কোনও কিছুই গোটা দেখতে পাইনা। ভাঙা ভাঙা আর অগোছালো। কোনও সুবেশ বাক্য ভাষা দেয় না। বলা যেমন পূর্ণতার দাবি করে না, শোনাও তেমন ড্রপ-টেল এ ভরা। কোনও কিছুই বিন্যস্ত নয়। আবার কেওটিকও নয়। যে কোনও একরকমের হলে বিপন্নতা আসে না। ধরে নেওয়াই যায় সেটাই স্বাভাবিক। বিন্যাস আর অবিন্যাসের মাঝে বিপন্নতা তখন দুলতে দুলতে বিপন্নতর হয়ে ওঠে। আদা-জল খেয়ে আমি এই বস্তু জগতের অভীপ্সাগুলোকে বাজিয়ে দেখেছি, আমি বিপন্ন বোধ করি। আমার যে এর বিপরীতে এক কল্প পৃথিবী আছে। আমার আছে। আমার মানে আমি, আমি উমা, আমি অমিতাভ, আমি হেনরি, আমি এক্স-ওয়াই-জেড। সবারই আছে। কল্পের সঙ্গে চলমানকে মেলাতে গিয়ে আমি যদি সম্পূর্ণ বিফল হতাম, তাহলে বিপন্নতার চেয়ে বিষণ্নতা আমাকে গ্রাস করে ফেলত। মুহ্যমান আমি আর মেলানোর ভাবনাতেই যেতে পারতাম না। আবার সবটা যদি অকস্মাৎ বা কাকতালিয় বা অন্য কোনওভাবে একদম মিলে যেত, তাহলে উল্লসিত আমি, জয়ী আমি, তৃপ্ত আমি হারিয়ে ফেলতাম আমার বাহ্যজ্ঞান। তা হয় না। আশ্চর্যভাবে কিছুটা মেলে, যেন সেই ছবি, সেই রঙ, সেই ভঙ্গি, সেই ঘটনাক্রম, সেই প্রবাহ। কিন্তু তাও আধো, আংশিক। অনেকটা একরকম কখন অন্তর্হিত হয়ে ভিন্ন হয়ে যায়। এই যেন স্পষ্ট, ছুঁয়ে দিতে পারব। এই খুব কাছে চলে এলো, আবার কোথায় মিলালো। ধরা আর অধরার মাঝে আমিই পেন্ডুলাম। এই যেন যেতে যেতে বা আসতে আসতে এক বিন্দুতে মিলে গেল প্রায়। কিন্তু মেলার আগেই দূরে সরতে লাগলো, কিছুটা হয়ত সমান্তরাল চলল, তারপর দূরে আরও দূরে। যেন এক অভিসারি রশ্মিগুচ্ছ এক বিন্দুতে মিলিত হওয়ার আগেই আমাকে বিপন্নতার চূড়ান্তে নিয়ে গিয়ে অপসারি হয়ে গেল। হেনরি অমিতাভকে বলে—দেখলে দেখলে কান্ডখানা? অমিতাভ এক্স-ওয়াই-জেড কে হেনরি মনে করে। আমি হেনরির সঙ্গে অমিতাভর দূরত্ব কমিয়ে বিন্দুতে নিয়ে আসি। আমরা একই বিভব প্রভেদের বৃত্তের মধ্যে প্যারালাল সারকিটে থেকে একই বিপন্ন উজ্জ্বলতায় জ্বলতে থাকি।
আমার অস্তিত্বর ওপর আমারই চেতনার আলো ফেলে দেখেছি তার প্রতিফলিত ক্যারিশমা। বাতাস বইয়ে অনুভব করেছি তার এলোমেলো উথালপাথাল প্রতিচ্ছবি। জলে সিক্ত আর তাপে উষ্ণ করে দেখছি তার বিপরীবর্ত উদ্ভাস। অনস্তিত্ব সে কখনই প্রতিষ্ঠা করেনি। ‘আমি নেই’ কে মান্যতা দেয়নি। কিন্তু আমি কি আছি? এই প্রশ্নে বিপন্নতার তীক্ষ্ণ পেরেক আমার মধ্যে প্রোথিত করেছে। সরাসরি কোনও অনুবাদই আমাকে প্রকাশ করে না। যেন আবছা, কিছুটা বোঝা কিছুটা না-বোঝা অনুবাদই আমার জন্য বরাদ্দ। আমি, মানে আমি উমা, আমি অমি্তাভ, আমি হেনরি, আমি এক্স-ওয়াই-জেড। আমার বাসনা আছে পূর্ণতার জন্য জেগে। অপূর্ণতা সেখানেই ঘুম হয়ে নামে। আমার কামনা রাগবি খেলতে নেমে খেলে ফেলে সাদামাটা ফুটবল। আমার রাগ দ্রোহ দ্বেষ অভিমান ঝংকার তুলতে গিয়েও বাজিয়ে ফেলে আলাপ। আমার আনন্দ মজার উর্ধ্বমুখী গ্রাফটা বারবার কেটে কেটে যায়। আমার প্রেম আর যাপনের প্যারাবোলাটিক ঘূর্ণন যান্ত্রিকতার বাইরে বেরোতে চেয়ে হাঁপালেও অস্ত্র খুঁজে পায় না। অস্ত্র নেই, অস্ত্র নেই। অস্ত্র নেই বলে অধিগত হয় না সেই বৈপরীত্য, যেখানে গরম মানুষ বরফ খেয়ে যায়; অথবা সেই পরিপূরকতা, যেখানে অস্ত্র কেন্দ্রে রেখে চারদিকে শুধুই নির্জনতা। আর অস্ত্র নেই বলেই পরস্পরকে দেখার আশ মেটে না কোনওদিনই। আমার এমনই হতে থাকে। আমার, মানে আমি উমার, আমি অমিতাভর, আমি হেনরির, আমি এক্স-ওয়াই-জেডের।
আমার সামনেই ঘটে যাচ্ছে নানারকম ও ধরণের দৃশ্যাতিদৃশ্য। দৃশ্যের সঙ্গে সবসময়ই কোনও সম্পৃক্ততা অনুভব করিনা। আবার সমমেলে বেজে উঠি কোনও ফ্রেগর্যান্স অফ কালার এ। অতলান্ত স্পর্শে। মজে যাই অবিকল রসের ভিয়েনে। এ যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য হাসতে হাসতেই আমি আমারই সামনে গড়ে ওঠা কোনও মঞ্জিল ভেঙে পড়তে দিই। এ শুধুই আমি। আমি আছি বলেই নিত্যতার এই সূত্র, এই মহিমা। আমি আছি বলেই রূপ রঙ রস স্পর্শ। আমি দেবতা গড়ি, উচ্চতায় তুলি, আবার চুপে আমিই গড়াকে ভেঙে পড়তে দিই চুরচুর। আবার আমি না থাকলেও এসবই থাকবে। এই গড়া ভাঙা, এই হাসি হাসিমুখ অন্য কোনও আমি, সদ্গুণ সমৃদ্ধ হেনরি, কোঁচকানো মুখ অন্য অমিতাভ, দেবতার প্রশংসা করতে থাকা অন্য এক্স-ওয়াই-জেড। আমি না থাকলেই সব অনিত্য নয় তাহলে? বিপন্নতা এ সময়েই এক কাপ চা নিয়ে আমার মধ্যে বসে। হালকাসে পরিতৃপ্তির চুমুক দেয়। আর আমি সবার পেছেনে চুপ দাঁড়িয়ে থাকি।
আমার মধ্যে সবসময়ই একটা ভয় কাজ করতে থাকে। কিসের জন্য ভয়, নির্দিষ্ট নয় তা। কেন ভয়, নেই তার হদিস। আবার অহেতুক অমূলক এমন বিশেষণে নিজেকেই খাটো করে দেখানো হয়। সে আমি পারি না, আর বিপন্নতার মধ্যে সারভাইভ্যালের একটা কৌশল আবিষ্কারে মগ্ন হই। আমি কি বয়ে যাওয়া বাতাসের তোড়ে নিভে যাওয়া বাতিদানের জন্য অপেক্ষা করি? অন্ধকার। সহ্যের সীমা ভাঙা অন্ধকার। অলস মন্থর অন্ধকারকে আমি তো ভয়ই পাই। আবার ভয়ের মধ্যে কৌশল হিসেবে বেছে নিই সেই পন্থা যাতে আমিই ভয় দেখিয়ে বাতাসকে থমকে দিতে পারি যেন সে বাতিদানের কাছে কিছুতেই যেতে না পারে। আলো, অনেক আলো যেন আমার ভয়কে আস্বস্ত করতে পারে। আমি তখন হেনরি হয়ে যাই, বা হেনরি ঢুকে পড়ে আমার মধ্যে। আমি অমিতাভ, আমি এক্স-ওয়াই-জেড। আবার ওরা প্রত্যেকেই আমি।
দর্পণে দেখতে হয় মাঝেমাঝে নিজেকে। আমি দেখি। হেনরি দেখে। অমিতাভরাও দেখে। স্বাভাবিকই থাকে বস্তু আর প্রতিবিম্ব। কিন্তু কখনও এমনও হয় প্রতিবিম্ব বিম্বের চেয়ে অনেক বেশি শুদ্ধ হয়ে ধরা দেয়। তখনই সঠিক চিনে নেওয়া নিজেকে। আহা হা, সেই দর্পণ, হয়ত সে ‘অন্তস্রাবীঃ, স্যাঁতসেতে ধূসর’। অন্তরে ক্ষরণশীল ভেজা আর ছাইরঙা হলেও তার প্রতিবিম্বে আমার বিশুদ্ধ আত্মার উন্মোচন ঘটে। উন্মোচিত আত্মা আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। আর আমি সংকোচে সংশয়ে দীর্ণ হতে হতে ভাবতে থাকি, এই কি আমি? আমার সন্দেহ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। আমি দর্পণের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্বীকার করি। হেনরিও তাই করে। আর সবাইও। নিজেকে দেখার মধ্যে এই বিপন্নতায় আমি বা হেনরি বা অমিতাভ শুদ্ধ হতে পারিনা কিন্তু শুদ্ধতার চিন্তন আমাদের পিড়ীত করে চলে। সম্পর্ক ভাঙার মধ্যে আত্মশ্লাঘা খুঁজে বেড়িয়ে আরও আশ্রয়হীন হতে থাকি। কবেই বা এই মানুষদের মাথায় একটা অবিকল সত্য ছাদ ছিলো?
অনন্তের মধ্যে খন্ড হয়ে বাঁচি। ভালো মন্দ সার অসার তত্ত্ব জ্ঞান সব যে বুঝি তা তো নয়ই। সাধারনে সাধারণ দেখা আমার। স্পষ্ট গতিশীল কোনও উচ্চারণ নেই। স্বচ্ছ দৃষ্টির জোর নেই যেমন, নেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির বহিপ্রকাশ। তবু চোখে ভেসে ওঠে সেই পাহাড় যে লক্ষ বছর মাথায় বরফ নিয়ে অনন্তের মধ্যে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। অভিশাপ না নিয়তি? দেখি, এই বিশালের বিপরীতে ক্ষুদ্র এক দেয়াল। আর তার দিকে অনন্তকাল তাকিয়ে থাকা ততোধিক ক্ষুদ্র এক টিকটিকি। সে কি ফসিল হয়ে যাবে? নষ্ট হয়ে যাবে? আমি জানি না বললে ভুল হয়ে যায়। জানি বললে যে কোনও একটা দিক নিতে হয়। আমাকে বলতেই হয়, অভিশাপ অভিশাপ। বলতেই হ্য়, নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট নষ্ট। কিন্তু স্বাভাবিক আমি পারি না, প্রকৃত আমি পারি না। বলার আগে আমি নকল দাঁত লাগিয়ে নিই মুখভর্তি। নিজের বিপন্নতা অপনোদনের জন্যই কি আমি এই ছলনায় মেতে উঠি? তা আমি যেমন জানি না, হেনরিও জানে না, শুধু বলে বসে, এই যা। আমি নিশ্চিত অমিতাভ জানে না, এক্স-ওয়াই-জেড জানেনা। জানলে আমার মত এমন বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়ে!
এসবই অতীতের বর্তমানের এবং ভবিষ্যতেরও। আমি ছিলাম আছি থাকব। হেনরি ছিল আছে থাকবে। অমিতাভরাও ছিল আছে এবং থাকবেও। আমার চারপাশে এইসব জানান দেওয়া অস্তিত্ব, ঘটে চলা সমাজ সংসার সম্পর্ক যাপন, ঘটার সম্ভাবনায় থাকা বহুবিধ ওয়েটিং লিস্ট, নিজেকে খোঁজা দেখা অনুভব করা আর মিথস্ক্রিকায় ভরিয়ে তোলা চলতেই থাকবে। আবার আমি হেনরি বা অমিতাভরা ভাষ্য দিতে থাকব এসবের। তবে তা আনুপূর্বিক নয়। টানা নয়। মৌহর্তিক। খন্ড খন্ড। কোলাজ কোলাজ। মহাকাব্যের অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে সঞ্জয় উবাচ রণক্ষেত্রের ভাষ্য নয়। বা ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের Complete Commentary নয়। এ জাগতিক পরিসরের কাব্য-ভাষ্য। ভাঙা, অনুবাদ অযোগ্য, অপূর্ণ, আর জ্ঞান-তত্ত্বের বড়াই না করা। বানী নয়, শান্তি নয়, মোক্ষ নয়, সমর্পণ নয়। অমিতাভদের চেষ্টা এ কারণে, যেন এতে বিপন্নতা বোধ লাঘব হবে। আমি তাই করি। হেনরি তাই করে। অমিতাভরাও তাই করে। শেয়ার করতে চায়।
আমার কাছে যন্ত্রণার রঙ কালো বা নীল, লালাভ হতে পারে। বেদনার রঙ নীল বা আকাশি, গাঢ় লাল হতে পারে। ভালোবাসা অপার মৃত্যুহীন, চুপসে যেতেও পারে। আমার বিপন্নতার মধ্যেই ঘোরে সমাজ সংসার সম্পর্ক, দ্বেষ রাগ দ্রোহ, অনুরাগ অভিমান, ভাব অনুভাব অনুভব, চিন্তা চেতনা সম্প্রসারিত চেতনা, জন্ম আর মৃত্যু। অপটুভাবে আমি ভাষ্য রচনায় শেয়ার করতে চাই মৌহর্তিক বা খন্ডকে। কখনও বিপন্নতাই এসবের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে। হেনরিকে আমি দেখেছি একই অধ্যাবসায়ে। অমিতাভ হেনরির প্রতিচ্ছবি যেন। এক্স-ওয়াই-জেডও আমারই ভেতর বাহির। আমি হেনরি অমিতাভ কখন যেন একাত্ম ও এক আত্মা হয়ে যাই। আমেন, আমেন।