স্বপ্নের মুখ

ওবায়েদ আকাশ ও ইশরাত তানিয়া




কয়েকটি অথবা কয়েকশো ঘণ্টা পর
আমি ব্যালকনির খাড়ায়
কমলা রঙের অন্ধকার হয়ে বলবো যে
একদিন যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম
আজ তাতে কতদূরব্যাপী সূর্যাস্ত দেখা যায়

এবং আমাদের উত্তরাধিকার যারা
ঘোরতর রাতে কালোকে কমলা এবং
ঘরকে বাহির দেখছে--
তাদের জন্য পরিকল্পিত আবাসে আমরা
কতদূর পরাপ্রাকৃতিক সংযোজন রেখেছি

যেহেতু এখনই তারা
মরুতে মাছ এবং সমুদ্রতলে উটের
চাষবাস বিষয়ে
সারারাত মুখস্থ করছে পরাবিদ্যার বই!



সাম্প্রতিক কিংবা অতীত ভবিষ্যৎ নিয়ে
যে সমরপৃথিবী চিত্রে বিধৃত আছে
তাই নিয়ে একটি নৌকোর শরীর বানাতে দিয়েছি

আর ভোর হতে না হতেই দেখি
নৌকোর কারিগর
চমৎকার নির্মাণ করেছে আমার সন্তানের মুখ

আমি নির্মাতাকে বলি--
এতে বুলেট কোথায়, কামান কোথায়
কোথায় গোলাবারুদের ঝাঁক--

কারিগর নৌকোর শরীর উল্টেপাল্টে
নৌকোর গলুই থেকে ভাবনাগুলো খুলে
আমার স্বপ্নের সাথে জোড়া দিয়ে দেয়







চিকিৎসা কিংবা নৃবিজ্ঞানে যে ভবিষ্যধূসর
ভাবনাগুলো এখনো টিকে আছে
তা থেকে মুক্তির জন্য
আমার সন্তানের মুখ আকাশে ঝুলিয়ে দিয়েছি

যতিও তাতে এখনো চোখ নাক কান
কিছুই বসানো হয়নি

আর যখনই সব ঠিকঠাক জুড়ে দেয়া হলো
আকাশ ফেটে নেমে এলো ব্যাকুল সৃষ্টির ধারা

সৃষ্টি মানে বৃষ্টি, আর
বৃষ্টিপাত থেকে রক্ত, এবং
রক্তের পরিধি জুড়ে
দৃশ্যত অপার শূন্যতা

আমার পরিপার্শ্ব ঘিরে আছে
স্বদেশি বিদেশি পরিদর্শকগণ
আমি আমার সন্তানের মুখ
যথার্থ এঁকেছি তো!

***



কী বা এক আঁজলা নৌকো, কী বা তার এক মুঠো উঠোন! সেখানে রোদ্দুরে ছেলে শুয়ে পাটির ওপর আর সদ্য ঘানিভাঙা তেলের সর্ষেগন্ধী বাতাস। ভিখিরিকে পয়সা দিয়েছি সন্তানের মঙ্গল কামনায় আর ঈশ্বরকে বলেছি যেন সূর্য রোজ আলো ফেলে যায় শিশুর গালেমুখে। এদিকে দীর্ঘ ছায়া নিয়ে বিকেল ঢলে পড়লে কোমল কমলাভ আলো বলে দেয়, গন্তব্য জেনে কিংবা না-জেনে জীবন গেছে অন্য এক দূরত্বে। সে দূরতর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখছি আমার উত্তরাধিকার। যদি ভাবি সে জিন গঠিত, রক্তের ধারাবাহিক বংশগতি, তবে অসম্পূর্ণ ভাবনা। সংস্কৃতি-মনন- ঐতিহ্যের সে উত্তরলব্ধি। তার ধমনীতে প্রবাহিত আমার রুচিশিক্ষা। ঐ যে পূর্বপুরুষের পায়ের ধুলো মেখে হেঁটে চলে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে, সে আমার উত্তরপুরুষ। নীল। তার সংস্কারজাত মন একলা চলছে হরিতকী বনে। আমার হাত ছেড়ে বহেড়ার গাঢ় ছায়ায় পথ খুঁজে নেবে।

স্কুলভ্যান থেকে নেমে আবছায়া অচেনা পথ। কাঠের সাঁকো পেরিয়ে, রোদকুয়াশায় সে এগিয়ে যায় জীবনের কার্নিভ্যালে। সেখানে লাট্টু ঘোরে বনবন আর আকাশে ঘুড়ি শনশন ওড়ে। জলাশয়ে সাদা রাজহাঁসের যে ছানাটিকে ছেড়ে এসেছিলাম, তার হাতে সে পৌঁছে দেবে আমার ব্যথাতুর শোকগাথা। টিফিনবক্স খুলে বাদাম খাওয়াবে ছটফটে কাঠবিড়ালীকে। আবার এমনটিও ভেবে নিতে পারি, দুধভাত থেকে সরে হয়তো পুরোটাই বৈপরীত্যের দিকে যাবে। তবুও জানি, ঠোঁটের ওপর লেগে থাকবে দুধের রেখা। আদর শাসন মিহি সরের মতো ঠিকই লেপ্টে রবে ঠোঁটের কোণে যতই মার্বেল গড়িয়ে সময় পেরিয়ে যাক।

বারণ করেছিলাম- নীল, ভাঙা আয়নায় মুখ দেখিস না। দেখতে নেই, ভারি অমঙ্গল। কথা শোনে না কেনো ছেলে? কুড়িয়ে নিল ভাঙা আয়নাই। তারপর চারিদিকে কী প্রবল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা! সেনাঘাঁটিতে বাড়ছে তৎপরতা। জগৎ জুড়ে গজ কচ্ছপের লড়াই যুঝতে হবে কূটকৌশলের সাথে। স্বাধীনতার অদম্য সংগ্রামে রক্তের ছিটে লাগে সময়ের গায়ে। কোথাও বা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের প্যাকেজ আওতাধীন সমরাস্ত্র বিকিকিনি। অর্থনীতি চাঙ্গা করে নেয় বিদেশী প্রভুশক্তিরা। নীল, তুমি জেনে রেখো অজস্র গ্রেনেড, বোম, বন্দুকে অভয়ারণ্য ক্রমশ সংঘর্ষের জঙ্গলে পরিণত। গুলি-স্প্লিন্টারে কোনো আয়নাই আর অক্ষত নেই। ভাঙা আয়না দেখে নিশ্চিত উপলব্ধি করেছ, কিছু ব্যাপার জীবনে অনস্বীকার্য। যেমন ধর, জানলার কাছে চুপটি করে বসে আছো, দেখছ দুএকটি উসখুস শালিক গাছের ডালে। হঠাৎ গুলতি ছোঁড়ে কেউ। উড়ে যাওয়া শালিকরা পেছনে রেখে গেল শূন্যতা আর কিছু মন খারাপ। তুমি বারান্দায় এসে বসলে, দেখতে দেখতে আকাশ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মেঘ বিছিয়ে দিল। বৃষ্টি তুমুল, তুমি মনে মনে দুমড়ে যাওয়া কোনো চিঠি টানটান করছ পড়বে বলে। ক্লান্তিহীন চেষ্টা করছ যেন জল লেগে অক্ষর হারিয়ে না যায়। জীবনে জলহাওয়ার ঝাপটা লাগে। তবু জেনো, জীবন কারো অধীন নয়। সে চলে নিজস্ব নিয়মে। হয়তো পাল্টে গেছে স্থাপত্যকৌশল। ভুল প্রমাণিত হকিং এর কৃষ্ণগহ্বর ধারণার ব্যাখ্যা। তবু শেষ পর্যন্ত মানুষ স্বপ্নচারীই যতদিন না সূর্য সাদা বামুন নক্ষত্র। এসব যখন ভাবছি, টোস্টের ওপর নরম মাখন ছড়ানো ধারশূন্য ছুরিতে কেটে যায় তর্জনী। সে নিদারুণ রক্তপাত আর বারুদঘরের নিচে চাপা পড়ে আমাদের সন্তানসন্ততি। সন্তান সে তো তোমারও।

টন টন গোলা আর গুলির ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে তাকিয়েছে নীল। ভীরু হরিণছানার টোল পড়া গালে রোদ্দুর নেই। ধুলোগুলো উষ্ণ জলের কাদা গালে লেপে আছে। বুঝে নিও, আঁধার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে নদীতে নদীতে এবার জল এলো বলে। ধর্মযুদ্ধ বুলেটে ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিসের ঝাঁঝরা ঢেউ আছড়ে পড়ে গাঙ্গেয় সমভূমিতে। বঙ্গোপসাগরের সলতে জ্বলে জল যেন জ্বলন্ত ধারা। নিরন্তর যুদ্ধে ধ্বংস সহজ পাঠ আর যাকে বলি মানবতা, বেরিয়ে গেল চৌকাঠ ছেড়ে। এভাবেই পুড়ে যায় কবির প্রপিতামহ। তাঁকে চিনে নিয়েছে নীল, আমার স্নেহের উত্তরাধিকারী। সেই ভাঙা আয়নায়, বারণ না মেনে সে লুকিয়ে দেখেছিল পূর্বপুরুষের মুখাবয়োব। অবশিষ্ট কবিতাগুলো দমচাপা কান্নায় ধুয়েমুছে তুলে রাখে নীল আর শিউলির হাসি ঠোঁটে নিয়ে, সারি সারি মৃত কঙ্কাল পেরিয়ে ফোসকা পড়া হাতে নৌকো খুলে দেয়। আমি তার কানে অহিংসার মন্ত্র দিলাম। তুমি ছদ্মবেশে দেখে নিও অপরূপ ভোর আসে মৃত্যু উপত্যকায়। অগ্নি প্লাবনে ভাসতে ভাসতে নীল চলল। যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়ে সে রীতিমত জয়ী। তুমি কি প্রতিধ্বনিময় মুক্তির গান শুনতে পাচ্ছো? রঙিন কাগজের টুকরো হাওয়ায় উড়ছে। রোদ নরম হয়ে ধানের ওপর মাথা পেতে শুয়েছে। চারন কবিরা গাইছে মায়াবী পৃথিবীর গান। সমস্ত জ্বর ভুলে পপকর্ন নেমে এসেছে ভাটির দেশে, ছায়ারোদ আর ক্ষুদকুঁড়োর ভিড়ে।

ঝড়স্তব্ধ মেঘলামুখো আকাশ ডিঙ্গিয়ে, নীল, তুই যাবি ভোরের স্কুলে। আমি বলি জীবনের ফেস্টিভ্যালে। শিখে নিতে বিদ্যাপতি-চণ্ডী-গবীনে ভাষা। অসীম শূন্যতা ডিঙ্গিয়ে ইচ্ছে করলেই কি আর তোর সাথে যেতে পারি বল? দূরতর ঘাটে দাঁড়িয়ে শেষবার দেখে নেই যা দেখার। হিমশৈল ডাকছে আমায়। সবুজ ঘাস আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে কুয়াশা কেবিন পেছনে ফেলে সেখানে ধবধবে সাদার রাজত্ব। একদিন ঠিকঠাক পৌঁছে যাব বরফবিবশ উচ্চতায়, নিচের দিকে তাকিয়ে দেখব আলোআকাশ আর তোর মায়ামুখ।