সাইকেল বালক ও শোকসভার করিডোর

সুবীর সরকার ও মানিক সাহা



১।

সমস্ত শোকের দিন,আদিগন্ত লেখা থাকে
বাড়ির পথে বকনা মহিষ
হসন্ত বিষয়ক সেমিনারগুলি
দীর্ঘদিন আড়ালে থাকায় ভুলে গেছি
মুচকি হাসি


২।
এই যে মনস্তাপ আর সেদ্ধধানের গন্ধ
কুয়াশার রেলিং ধরে নেমে আসা
পাখিরা
তোমার রেগে যাওয়া দিয়ে ভোরবেলা
শুরু


৩।
জনবহুল শহরে একা একা ঘুরে বেড়ানোয় সামান্যতম দ্বিধা কাজ
করে কি!কথাবার্তা হতেই থাকে দুধ ও ঘি নিয়ে।এলাচদানা মুখে
ক্রমসম্ভাবনা জাগানো দলাপাকানো মেঘেরা।রেশমকুঠি ও মেয়েদের
হাসির মধ্যে রহস্য ঝরে পড়তে থাকলে করার আর কিছুই থাকে
না।অনর্গল জীবনযাপন ঢুকে পড়তে পারে শহরে কিছুটা
নতুনভাবে


৪।
হাঁস ও পাখির জগত।জনপ্রিয় খেলনাগুলির তালিকা তৈরী
করি
গামছাবান্ধা দই নেই।
কী ঝলমলে একটা সন্ধ্যা নামছে
কাজ বলতে পান্ডুলিপিতে ছবি
আঁকা


৫।
আড্ডা নেই।আত্মহত্যা আছে।
ঘুমোলেই দেখতে পাই নানা পাটেকারের
চোখ
পাদদেশে তারিখ লিখি
কারও কারও বিবাহ
বাজনাবিহীন


৬।
জল ঠেলে জলস্তর ঠেলে জলবাহিত অসুখের
পাশে
পাপোষে পায়রা।
সুদূরবর্তী হাওয়ার মধ্যে একধরণের
ম্যাজিক



৭।

আমি ও ফুটবল একই সাথে মাঠে নেমে
যাই
শোকসভা মূলত শোকহীন
আলো জ্বলে না
করিডোরে



একটি কমলা রঙের ঝুলবারান্দার খুব শখ ছিল। দিন মগ্ন হয়ে এলে যেখানে শীত গুড়ো হয়ে পড়বে আর কমলালেবুর কোয়াগুলি হাসির মুচকিতে মেয়েদের ঠোঁট হয়ে যাবে। বারান্দায় বসে বা দাঁড়িয়ে দেখব কমলা রঙ লেবু, লেবুগুলি কোয়া, কোয়াগুলি হাসি অবশেষে হাসিগুলি মেয়ে হয়ে যাচ্ছে।
রাস্তা আড়াল করে চলে যায় আরেকটি রাস্তা। তার বুকের উপর ফেলে আসা দিন। মুহূর্তেই মেঘের বালিশ নিয়ে আমাদের শৈশব ও কিশোর বেলা। হয়তো সাইকেল চলে যাচ্ছে তার ক্রিং ছড়িয়ে দিয়ে। চোখ খুঁজছে মনের গদিতে গোঁজা তুলো ও কাঁশবন। বনের নাম এ অঞ্চলে অরণ্য দিয়েছে অর্বাচীন নাটুকে মানুষ। তাদের হাতের কাছে দেশলাই বাক্সে তৈরি রেলগাড়ি। তাতে ফুল ফোটানো লতা ও গুল্মের ঝোপঝাড়। 'সুদূরবর্তী হাওয়ার মধ্যে এক ধরণের ম্যাজিক"। কেউ কেউ ম্যাজিক লন্ঠন নিয়ে হেঁটে যায়। রাত ঝাঁকিয়ে পেরে আনে ভোরবেলার রোদ। আমরা সেই রোদে একটি সাইকেল ও একটি ঝুলবারান্দার গল্প অতি যত্ন করে রাখি।

এই যে গাভীন শব্দ ছুঁয়ে মৃদু হয়ে আসছে বিকেলের রোদ। শোক মেখে কবিতা হয়ে উঠছে রাস্তার ধারের সার সার গাছ। তাদের ছায়ায় বসে চমৎকার একটি প্রেম আঁকতে চাইছি। চাইছি বৃষ্টি হোক --- ভিজে যাক পুরনো মেঘের গায়ে লেগে থাকা আমাদের স্মৃতি ও সত্ত্বা ও... ; না ভবিষ্যৎ নয়, তার যমজ বোন এই বর্তমান।

সে এক জ্যোৎস্নায় ডুবতে থাকা রাত। তার বাহু ছড়িয়ে বিস্তর ধানক্ষেত। বাইক চলছে যদিও তবু ঘুমের আবেশের মতো ভেসে আসছে ঘ্রাণ --- সেদ্ধধানের--- স্পষ্ট টের পাই। এ অঞ্চলে ভাল ধান হয়। ধানের স্তনের গায়ে আঁকিবুঁকি কাটে চাঁদের আলো। পথ এগিয়ে যায়। কুয়াশা জড়িয়ে থাকে পাখিদের ডানায় --- পাখশাট। বাড়ি ফেরার পথে টের পাই তুমি --- মানে যে আমাকে আমি বানিয়েছ--- খুব রেগে আছো। তোমাকে মানাতে আমার আরো একটি চাঁদের প্রয়োজন। আরো একটি জ্যোৎস্নার জালিয়াতি।

জালিয়াতি নিয়ে আমাদের জীবন যাপনের ভেতর প্রতিনিয়ত শহর ঢুকে পড়ে। শহরের কানায় কানায় রহস্য। রহস্য মানে তো নারী। তার ভাঁজ, তার প্রকৌশল --- আমাকে বিনম্র হতে দেয় না। তাদের চাউনি ও চোয়াল থেকে রঙিন প্রজাপতিগুলি উড়ে বেড়ায়। আমরা কখনো পাহাড়ে যাই। পাহাড়ের মেয়েরা তখন হয়তো স্নান করছে। ঝরনার জলে তাদের গায়ের রঙ সোনার মতো হয় না। গম -দুধের রঙ তাদের স্তনে। তারা জলের ফেনা গায়ে মাখছে আর আরো উজ্জ্বল হিয়ে উঠছে তাদের চোখ ও চাঁদের বৃন্ত। তাদের হাসির মধ্যে অনর্গল রহস্য ঝরে পড়তে থাকে। আমরা কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে।
আমার ঘর-সংসার মূলত পাখিকেন্দ্রিক। পাখি-মা তার ছানার মুখে আস্ত একটি উপার্জন ঢেলে দেয় নির্দ্বিধায়। আমি সাইকেল ছুটিয়ে সন্ধ্যা পার করতে চেষ্টা করি। সাইকেলের চাকায় লেগে গুড়ো হয় রোদের কাচ। কাচ লেগে রক্তাক্ত হয় চাকা। পা টিপে টিপে তুমি হেঁটে যাও। তোমার মুগ্ধতায় কোথাও আমি নেই। কোথাও সেই সন্ধ্যা নেই যার কপালে একবার চুমু খেয়ে বলেছিলাম --- তোমাকে দেখতে ভারী মিষ্টি। আর সে খুশি হয়ে আমাকে একটি লজেন্স ধরিয়ে দিয়েছিল। সেই লজেন্সটি যে এইভাবে একটি কবিতা হয়ে উঠবে তা আগে কে জানতো!

সে যাই হোক, চুমুর গল্পটি ক্রমশ ভাইরাল হয়ে উঠল। এবং গুরুত্ব হারাতে লাগল। ঘুম পারিয়ে দেবার সময় লিরিকবিহীন একটি বাজনা বেজে ওঠে। কালক্রমে একটি ছোট আকারের হতাশা ফুটে উঠলো এক ভোরের ছোঁয়ায়। সেখানে আড্ডা নেই। মৃত্যু রমণের মতো হাতছানি দেয়। যদিও তা এতটাই রহস্যময় যে তার হাতের আঙুলে টোকা লাগে এবং ঘুম হয়ে গড়িয়ে যায়। ঘুমের অলিন্দে ওড়ে পায়রা ও পায়রার ছায়া।
আমি মানুষের কথা ভাবি। মানুষ চিরকাল বড় কাল্পনিক এক ছায়া। তার আনন্দ, দুঃখ সব মিথ্যে। তার শোক জল ছুঁতে চাওয়া এক পাখি। শুধু ছোঁয়াটুকু লেগে থাকে। বাকি মন জুড়ে ফাঁকা মাঠ। আমি তার একমাত্র বল। আমি গোল পোস্টের দিকে হেঁটে যাই। বল হেঁটে যায়। আমাদের শোক মূলত অন্যকে দেখাতে চাওয়া একটি ছবি। ছবির আড়াল থেকে উঠে আসছে আলোহীন ছিন্ন করিডোর।