অফসাইড

কিশোর ঘোষ

মৃত্যুর আগে অবধি জীবনানন্দ ছিলেন অফ সাইডের লোক।
বিষন্ন ট্র্যাপে পড়েছিলেন ভদ্রলোক। ব্যাপারটা ঘোষণা করেছিলেন ঘুরিয়ে---সকল লোকের মাঝে বসে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা।’ এখন কথা হল তিনি কি অন্যদের দ্বারা ট্র্যাপে পড়েছিলেন না নিজের ‘মুদ্রাদোষে’ই কেস খেয়েছিলেন! মনে হয় দুই। অর্থাৎ দ্বিমুখী আক্রমণে পড়েছিলেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা বরিশালের ব্রাহ্ম। দাশ মশাই।
অফসাইড কাকে বলে?
আপাত অর্থে এটা একটা ডাল দিক, একটা ডার্ক সাইড। যে সাইডে পড়লেই লাইন্সম্যানের হাত গগনে উঠে ফ্ল্যাগ নাড়া শুরু করে। দর্শক ও প্লেয়ার যখন ভাবছিল---মার দিয়া কেল্লা তখনই কে যেন আনন্দের টুটি চিপে ধরে! প্রাণহীন স্বপ্ন মুখ থুবরে পড়ে নির্মম সবুজে। অতএব গোল আর হল না। গোলের গন্ধ শুঁকেই ফিরতে হল! সাউথ সিটি মল অন সাইডে থেকে যে গোল করছে প্রতিনিয়ত, তা কখনোই পারছে না বিটি রোড পেরিয়ে একা নির্জনে দাঁড়িয়ে থাকা বারো মন্দির গঙ্গার ঘাট। সেই নিয়মে জে ইউ-র সুহানী সেন আর বিরাটি কলজের মৌমিতা মণ্ডল-এর মাঝখানে রেফারি পি-ই-ই করে বাঁশি বাজিয়ে দিচ্ছে থেকে থেকে। আর মৌমিতা কাঁদতে কাঁদতে ঢুকে পড়ছে প্রকৃত সুন্দরী গৃহকর্মে নিপুনা রান্নাঘরে। ইচ্ছে না থাকলেও শুয়ে পড়ছে বরের সঙ্গে। কারণ বাচ্চা জন্মানো আর সিরিয়াল দেখার জন্যই তো সে এসেছে এই মহান পৃথিবীতে।
মৌমিতার দুরবস্থার জন্য কি সুহানি দায়ী? মোটেই না। সুহানী কী কোনোদিন এই ট্র্যাপে পড়বে না----সে কথাও বলা যাবে না নিশ্চত করে। ভবিষ্যতে সে যদি প্রফেসার ট্রফেসার হয় আর প্রিন্সিপাল তাঁর ফিগারের প্রশংসা করে এবং সেই প্রশংসাকে সে পাত্তা না দেয়। তাতে যদি কর্মক্ষেত্রে খুচরো সমস্যা হয়। তথাপি সে যদি মিঃ প্রিন্সিপালকে এড়িয়ে চলে, তবে সেও তো অফসাইড ট্র্যাপে পড়বে। পড়বেই। আর তাঁর সামনে দিয়ে দৌড়ে সিড়ি বেয়ে উঠে যাবে আযোগ্যা কোনও হাত পা বুক। তারপর?
তারপর কী বাথরুমে একান্ত সুহানি তাঁর শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখবে না একবার! ভাববে না---ভুল করল না তো সে!
বিবেক খুব গোলমেলে শব্দ। সাউন্ডলেস। স্যুট করে না সবার।
এই যেমন সুদীপ্ত সেন, সুব্রত রায়দের উল্টো দিকে তাকালেই দেখবেন বসিরহাট, বনগাঁর লাস ঝুলছে। ঝুল পরা ফ্যান আর অন সাইডের স্বপ্ন দেখা একটা মানুষের সুইচ অফ হয়ে গেছে জীবনের মতোন।
সক্রেটিস যে বিষ খেতে বাধ্য হল, রামকিঙ্কর যে মদের বোতলের সঙ্গে রাত কাটল, ঋত্বিক ঘটক যে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে পারল না কোনওদিন---এ’ সবই ওই অফসাইডের শয়তানি। মানুষ নিকটে গেলে যেহেতু প্রকৃত সাড়স উড়ে যায় তাই বিনয় মজুমদার সরে থাকলেন শুধু মাত্র ফুর্তি থেকে নয়, এমনকী প্রাত্যহিক চাহিদা থেকেও। এরা কী একেক জন চুরান্ত ব্রাত্য এবং ব্যর্থজন! পোড়া বিড়ির মতো এদের জীবনেরও দাম? নাকি এদের দাম অন্যরকম!
হ্যা। ঠিক তাই। কারণ অফ সাইডই ছিল এদের আরাধনা। কারণ বিষ পান করল সক্রেটিস আর অমৃত পেল গোটা পৃথিবী। তারাটা হয়তো মেঘে ঢাকা। কিন্তু সেই মেঘ সরাতে সরাতে নশ্বর মানুষের আবিনশ্বর বাইসেপ ট্রাইসেপগুলো ফুলে উঠত লাগল একের পর এক। তাই। সেই নিয়মে জীবনান্দেরও অফ সাইডই অন সাইড, যেমন হিটলারের অনসাইড ছিল অফ সাইডের সমান। তেমন আর কী। প্রেম যেমন কাগজে কলমে অফ সাইডের জিনিস। সামাজিক প্রাণীর কাছে খুন করা আর প্রেম করার মধ্যে পার্থক্য নেই। আর বিয়ে হল সানাই বাজানো, শাখাপলা পরা অন সাইড গেম। সত্যি কী তাই? প্রেমের অফসাইডই কি অনসাইড না! এ কথা বুঝতে বুঝতে চিতায় যাওয়ার সময় হয়ে যায় অনেকের। আর কতো লোকের প্রেম হয় না লাইফ টাইম সুযোগ পেয়েও! আমার বাবা তাঁদের কাছে বোকা। একটা গাছ পোতা পাগল লোক। অন্যের জমিতেও! গাছ পুততেন আনন্দে। কেন বলুন তো?
সেখানেই সূর্যের আলো। সেখানে গাছ বাঁচবে বলে। বড় হব তর তর করে। তাই। সারাজীবন একটা রোগাটে মাইনে পাওয়া অফ সাইড ট্রাপে পড়া লোকের কী হিম্মত ভাবুন!
পরিশেষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ আর অর্থনৈতিক শংকট।
দু’জনে খুব জায়গা বদল করছে। অন সাইড অফ সাইডে বদলা বদলি হচ্ছে খুব। বিশ্বজোরা মিডিয়ার আশির্বাদে সব। কে জীতবে! অন সাইডের জেল্লা না অফ সাইডের সাধনা?
ভগবান জানে!