নুড়ি ও নক্ষত্রকথন

প্রণয় কান্তি ও অনুপমা অপরাজিতা



পথহীন পথের নুড়ি--১
ঝড়কে চিনেছিলো স্বপ্ন প্রথম আলোর দিনে ।ফুলের ভাষা তখনো বোঝেনি সে ।
একরাশ রঙই শুধু ভাসতো চোখে !
লাল নীল কতো কি ! জানার কথা নয় তার কোনটি কীসের ।
ভালো লাগতো কেবল সমুদয় আলো ।
সকাল পেরিয়ে দুপুরে যখন কী যেনো বলেছিলো একদিন পথের ঘাসফুল,
নীল হয়েছিলো সে সবাক বেদনায়—মনে পড়ে ।

দ্বিতীয় ঝড়ের দেখা হলো মনের চিলেকোঠায়, গোলাপের সাথে দেখা হয়নি বলে
ঠাঁই নিয়েছিলো রক্তজবায় !
হাড়িকাঠে যাবার আগে তাই ঝুলছে সে এখন আঁকশির মাছের মতোন ।
সৈকত আলোয় কুড়ায় দিনের নুড়িপাথর ।

পথহীন পথের নড়ি--২
কথা রাখেনি নদী । ঘর বেঁধেছিলো দিনের ঘুম
শিপ্রা নদীর পাড়ে । ভালোবেসে ।
কথা রাখে না নদী । জানতো না অন্ধ কিউপিড ।
ভেসে গেলো তাই ঘুমের বাড়ি ।রাত্রিহীন সে
সেই থেকে ।খুঁজে বেড়ায় কেবল স্বপ্নের ঘরখানি সবুজ
কোনো দ্বীপে ।অপরূপ অশ্রুজলে ।

মেঘকে আকাশ ভেবে ভুল করেছিলো সে শতবার,
তৃষ্ণাকে তবু চাই তার ।নীল পাহাড়ের তারায়
তারায় গেয়ে ওঠে তাই বৃষ্টির গান দেখা যদি মেলে
মায়া হরিণীর অপরূপ অশ্রুজলে !
পথহীন পথের নুড়ি—৩
শ্বেতবামন সমাপ্তির আগে দেখা হয়ে গেলো নক্ষত্রের হঠাৎ
অশ্রুলীনার সাথে
থমকে দাঁড়িয়ে ধ্রুবতারা তাই এখন বেদনাকুটিরে
নক্ষত্রবাড়ি গিয়েছিলো স্বাতি কী যেনো এক আলোর খোঁজে
রঙ আর রেখার বাঁকে বাঁকে সকাতর প্রার্থনায় নক্ষত্রে
দিয়েছিলো বেদনাজল ঐকান্তিক শুশ্রূষায়

প্রজাপতি হয়ে উঠলো যখন বৃদ্ধ যাযাবর নিয়ে গেলো তারে
নীলিমার অন্তরালে
ধ্রুবতারা কি আদিত্যের ব্যথা কেউ বোঝে না এখন
নিকটেই রয়েছে কি তবে নক্ষত্রের শ্বেতবামন ?





***************


দু’মাস আগে এই শহরের নীলিমায় ঝড়কে চিনে চিনে
ঝুলন্ত নান্দনিক টবটিতে একদিন মাল্টিকালার ক্যাকটাস ফুটেছিল।
মালি বা মালিকবাবু হয়তো তালা ঝুলিয়ে অবসর যাপনে বিদেশ বিভূঁই।
জানলার শার্সি গলে নীল ক্যাকটাসটি নিষ্পলক চেয়ে কী জানি কি বলে্ই যেতো।
নীল, সুনীল শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল আমার হৃদয় আনন্দ ও বেদনায়।

একদিকে ওয়াজ মাহফিল
অন্যদিকে নাগরিক আর্তনাদে আমার কান পর্যন্ত তার ভাষা পৌঁছুতনা। রক্তজবার লোহিত প্লাবনে
ভেসে গিয়েছি দিক থেকে দিগন্তরে। শহরের জানলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমার চোখ দুটি ক্যামোন অলস থিতু হয়ে পড়তো, যেমনটি সকালের ব্রেকটি না খেলে ক্যাফেইনের অভাবে মাথা নির্জীব বোধ করে। সৈকতের আলোয় এখনও আমি কুড়াই ঝলমলে নুড়িপাথর।
একদিন আকাশ রাত থেকে বেরিয়ে পড়ার সাথে সাথে প্রাতঃভ্রমণে যাবার ছলনায়
ক্যাকটাসের দোর গোড়ায় পৌঁছে যাই জৈব সার আর এক ঘড়া জল নিয়ে।
শিপ্রা নদীতটে দাঁড়ানো এক অনিন্দ্য যুবক। ভালোবেসে বাতাসে আমার উড্ডীন কেশ।
স্নান করতে নেমে যাই জলে উতরোলে।

জল-কলকল হেসে অঞ্জলি ভরে ভালোবাসা জানালো নীল ক্যাকটাসটি। এভাবে প্রতিদিন আমি আর ক্যাকটাস
নগরের জানালায় বসে রোদের মাতন ভোরের শিশির রাতের তারা দেখে দেখে বাতিঘর বানাই। শরীরের মন খারাপ মনের শরীর খারাপ তোয়াক্কা না করে আমরা পত পত পতাকা উড়িয়ে দেই বাতাসের ঝুঁটিতে।
নক্ষত্রবাড়ি থেকে তারই জন্যে আলো নিয়ে ফিরি। অন্ধকারে জ্বালিয়ে দিই ধ্রুবতারা।

সমস্ত প্রহর জুড়ে ছিল মুঠো মুঠো নীল। এক বর্ষার প্লাবনে শরীর যেতে পারেনি সেই
নীলের কাছে জানালায়। গিয়েছিল মন। চোখ। উষ্ণতা। কার্নিসের কিনার দিয়ে হাঁটতেই দেখি পায়ের ছাপ জলের দাগ লেগে আছে ক্যাকটাসে। দোদুল দুলছে শিকের আঙুল ছুঁয়ে। হু হু ওড়ে পারিজাত সকাল। মন বরষার শ্রাবণ নিয়ে শরীরে ঘুমায়। জীর্ণ শরীর তার, কিন্তু ফুটন্ত অঙ্গার সেই যযাতিকে দিই উপহার
আপন যৌবন।
রাতপোশাকে সেজে নক্ষত্রের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে সম্বিত ফিরতেই ভাবছিলাম ওটা কী তাহলে
শুধুই বিজ্ঞাপন ছিল!