যাপন আমার ভালোবাসি

নীতা বিশ্বাস ও উমাপদ কর



এ যাপন আমার একার

আমার যাপনকথার উচ্ছাসী উড়ানে
অনেকটা খাদের কিনার
অনেকটা পা ফস্কানোর আসকারা

বাতাসে নেশানো ডাক

যাদুকর রঙ-বিশ্ব যদি
ঝড়ের তুমুল নিয়ে তছনছ গায় কী
কী করি কী করি আমি মৃত্যুকে
ভালোবেসে বাঁচি

চৌকাঠে হোঁচট খেতে খেতে
ভাঙতে শিখেছি চৌকাঠ
কঠোর কঠোপনিষদ

অস্থায়ী ঠিকানার হাল্কাপাখা
কাঠকুটো চড়ুইভাতি, বিগতর কথা
মনে রাখতে পারিনা। এই তো
আমার দোষ, এই তো খাদের কিনার
তীব্র এসে মৃত্যু, হাতে হাত রাখে
ভালোবেসে...

এভাবেই ভালোবাসি
জীবনে জড়িয়ে রাখি মরণের ভালোবাসা-স্কার্ফ
সারা সারা দিন

পাখিরঙ নিয়ে ডাকে যে সকাল
ভালোবাসি
বীতশোক নাগিনীর চোখের রোদ্দুর


ভালোবাসি

কাশবনে ফিসফিস কে ডেকেছে যেন
মরে-যাই রূপের ঠিকানা থেকে
হৃদয় কাঁপানো ভালোবাসা এসে
ভালোবেসে
মৃত্যুর দাওয়াত দিয়ে যায়...

ভালোবাসা আর মৃত্যু একটি ফুলের দুটি নাম


বন ময়ূরের পাখে নেচে ওঠা মোহিনী আট্টম
পঙ্খ থেকে চুঁয়ে পড়া বিস্তারিত ক্ষণপ্রভা প্রেম
বর্ষো রে মেঘা মেঘা বর্ষো রে...

ভালোবেসে সে মরেছে মরণের চূড়ান্ত আস্বাদে
এই তো জীবন, বলো!
পায়েল ছম ছম

ভালোবেসে ক্ষণে ক্ষণে আশ্লেষী মৃত্যু পোহাই...



মোহিনী আট্টম। দক্ষিন ভারতীয় নাচের শৈলী। আর আমি ফিরে যাই আমারই বালকবেলায়। ফোর ফাইভ হবে। আলতারঙা হাতে রঙীন রুমাল জড়িয়ে এক বিশেষ বিভঙ্গে কিশোরী মেয়েরা ঘুরে ঘুরে কখনও এক পা এগিয়ে এনে কখনও দু-পা পিছিয়ে নিয়ে নেচে চলেছে। প্রায় স্বর না বেরোনো হারমোনিয়াম গলায় যিনি মূল গায়ক, তিনিই শিক্ষক। তাঁর বয়স পঞ্চাশের ওপর। সঙ্গে গাইছে আরও কিছু প্রৌঢ় আর যুবক। গানের কলি আর মনে নেই। কিন্তু সুরটা ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না সেই নাচের ভঙ্গি আর স্টেপিং। আর রুমাল নাড়ানো। আমার বুকে ঝড় তুলে দিত কোমর দোলানো আর হঠাৎ পায়ে ঝটকা মেরে কিছুটা নিচু হয়ে যাওয়া। গাজনের সময় বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেই নাচ। নাওয়া খাওয়া ভুলে ওদের পিছে পিছে দু-দশটা বাড়ি। হেমন্তে কালীপূজোর পরও অনেক সময় সারারাত কবিগানের পরে সকালে বসানো হত এই নাচের আসর। কতটুকু মুগ্ধ হতাম আজ আর মনে নেই। কিন্তু একটা উত্তেজনায় কেটে যেত প্রহর প্রহর। কিশোরী মুখের টান, সেও ছিল এক বাড়তি আকর্ষণ।

আমার কবিতায় আমি জানি এসবের প্রভাব রয়েছে। এই কবিগান/কবির লড়াই, গাজনের গান-নাচ, দোল-যাত্রার বসন্ত-গান, সঙের নাচ, রামযাত্রা, রামায়ণ গান, রূপবান পুতুলনাচ, পদকীর্তণ, নামকীর্তণ, পালাগান, পঞ্চরস ইত্যাদি আমার কৈশোরত্তীর্ণ যন্ত্রনার বয়সের আগে পর্যন্ত তার রাজ কায়েম রেখেছিল। সাহিত্যের চেয়ে সে বড় কম সম্পদ নয়। আমার গড়ে ওঠার মধ্যে ছিল এসবের অনেক রসদ। মোহিনী আট্টম এর সঙ্গে আমাদের লো্কনাচের হয়ত কোথাও মিল থাকতে পারে আবার নাও পারে। হয়ত সেই কিশোরী মেয়েদের আঁচল থেকে চুঁইয়ে নামতো এক ক্ষণপ্রভা প্রেম! তখন এসব কিছুই বুঝতাম না। আজ দৃশ্যগুলো মনে ভাসিয়ে তুলছি, আর ভাবছি। ময়ূর দেখছি, কলাপ দেখছি। কিন্তু কোনও বিশেষ কিশোরী-মুখের অস্তিত্ব আজ আমার কাছে বিলীন। আর একদিন হয়ত পারিবারিক ও সামাজিকভাবে আমাদের থেকে অনেক দূরবর্তী কোনও নিম্ন জাতির অশিক্ষিত গরীব-গুর্বো কিশোরী আমার মোহিনী হয়ে উঠেছিল।

এই তো জীবন কালী দা। কালী দা কি কালের প্রহরী? নয়ত এই তো জীবন এর পর কালীদাই কেন উঠে আসে বার বার। যুগে যুগে, দশকে দশকে! সেই কবে সাতের দশকে কোনও এক মঞ্চে কোনও এক একক অভিনয়ে অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের মুখ থেকে শোনার পর শুধু আমি নই আমার মত কতজনের মুখে চলে আসে কথাগুলো। কেন? কেন? জীবন কি খুব ভার আমাদের কাছে, যাতে কালীদাকে সামনে রেখে মান্যতা দিতে হয়, জীবন এরকমই। কালীদাকে আমার শিখন্ডী মনে হয়। এ নিবেদন কালীদার কাছে নয়, নিজেরই কাছে। এ স্বীকারোক্তি কালীদার কাছে নয়, নিজেরই কাছে। ক্লান্তি আর অবসাদ যদি কথার ভাঁজে লুকিয়ে থাকে তবে তা নিজের জন্য। এই তো, হ্যাঁ এই-ই তো, ব্যস্, চ্যালেঞ্জ যদি চিবিয়ে বলে কথাগুলো তাও নিজেরই জন্য। আর যদি আত্মপ্রসাদ পায় জীবন, দীর্ঘশ্বাস সহ তবে তাও নিজেকেই উৎসর্গ করা। জীবনের প্রতি ভালোবাসা নয়ত না-ভালোবাসা। প্রেম আর প্রেমহীনতা। ভালোবাসা হৃদয় কাঁপানো, ভালোবাসা ময়ূর কলাপে মোহিনী আট্টম, ভালোবাসা মৃত্যুর দরজায় দৌবারিকের কাছে জমা দেওয়ার ভিসাপত্র। নয়ত ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান’ কেন? জন্ম তথা জীবন ও মৃত্যুর নাম ভালোবাসা। এরা ভালোবাসার দুটো পিঠ। একটা শূন্য থেকে অপর একটি শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার ভ্রমণটিই জীবন। এখন জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে ভালোবাসাটিকে যেদিকেই রাখা যাক তা একটি ফুলের দুটি নামের মতই। জীবন ভ্যারিয়েবল, মৃত্যু আর ভালোবাসা সত্য। এক সত্য আরেক সত্য কে আশ্লেষে ডেকে নেয়। ‘ভালোবেসে যে মরণও ভালো’, শুধু তৃতীয় শ্রেণীর সিনেমা বা যাত্রার ডায়লগ হয়েই থেকে যায় না। নেমে আসে জীবনে, মেঘা মেঘা, ছম ছম… ।

আমার যাপন এমনই। নিষেধ ছিল, কিন্তু পাহাড়প্রমান নয়। বাধা ছি্ল, কিন্তু বেঁধে ফেলা ছিল না। সেভেন-এইটে দুই বন্ধু হল। জেলেদের ছেলে। সম্ভবত জেলেপাড়া থেকে ওরা দুজনেই প্রথম সেভেন-এইট। আমাদের এই সমস্ত এলাকা দেশভাগের পরে গজিয়ে উঠেছে। তেমন প্ল্যান মাফিক গড়ে না উঠলেও জাতের বেলায় বেশ সচেতন। একদিকে জেলে-পাড়া। বিপরীত আরেকদিকে ধোপা-পাড়া। ডানে বোষ্টম পাড়া তো বাঁ-য়ে কুন্ডু তথা তিলি পাড়া। নামে বোষ্টম পাড়া হলেও সেখানে কয়েক ঘর তাঁতিও ছিল। আর মাঝখানে অনেকটা জায়গাজুড়ে আমাদের বামুন-কায়েত পাড়া। আশ্চর্য, এখানে তেমন আলাদা কিছু নেই। বামুন কায়েত মেশানো। বামুন ঘরই বেশি, কায়েতরা কম। দূরে আরও আছে নমশুদ্র পাড়া। জেলে-পাড়া আর বোষ্টম পাড়া ঘেঁষে প্রাইমারি স্কুল। পাশেই বড় খেলার মাঠ। এই ফ্রি-প্রাইমারি স্কুলেই আমার প্রথম পাঠ। ছেলেদের আর মেয়েদের সেকেন্ডারি স্কুল ছিল বামুন-কায়েত পাড়ায়। গোটা এলাকা জুড়ে ওই দুটিই। তো, বন্ধু দুজন প্রাইমারি সেরেছে জেলেপাড়ার স্কুলে। কাটিগঙ্গার ধারে সেই স্কুলে পড়ার লোভ আমারও ছিল। কিন্তু তা হয়নি দূরত্বের জন্য। ফাইভে আমার সঙ্গেই ভর্তি হয়েছিল ওরা। কিন্তু বন্ধুত্ব হতে সময় নেয়। সেভেনে কাটিগঙ্গায় ওদের সঙ্গে জেলে-নৌকো চড়তে পারব এই লোভেই মূলত বন্ধুত্ব। আমরা তিন-চারজন মিলে মাঝেমধ্যে ঘাটে বেঁধে রাখা নৌকো চড়ে কাটিগঙ্গায় চড়তে বেড়াতাম। শোনা যায় একসময় মূল গঙ্গা এদিক দিয়েই প্রবাহিত হত। পরে সে তার গতিপথ পাল্টায়। আমরা কখনো-সখনো নৌকো চড়ে যেখানটায় দু-তিনটে লকগেট দিয়ে মূলগঙ্গার সঙ্গে এই কাটিগঙ্গার যোগ সেখানে চলে যেতাম। কাটিগঙ্গার অনেকটা জায়গা দামে ভর্তি ছিল। আর ছিল পানিফলের লতা। জলে ভাসত। কোনও কোনও দিন সেই কচি পানিফল তুলে মুখে পুরতাম। অমৃত মনে হত। এভাবে বল্গাহীন আমাদের নৌকোবিহার। ওই বন্ধুদের কাছেই আমি কিছুটা বৈঠা চালানো শিখে নিই। প্রথমদিকে নৌকো শুধুই ঘুরে যেত। পরে অনেকটাই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। ওরাও নৌকো আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত। একদিন আমরা আমাদের ঘাটের বিপরীত তীরে চলে গেলাম। সেখানে ছিল চাঁইপাড়া। নদীর ধারে ছিল তাদের সব্জিক্ষেত। বাড়ি-ঘর ছিল একটু দূরে। ক্ষেতে নেমেই দেখলাম, অনেক রকম শাক সব্জি। মন ভরে গেল। মূলো, পালং, ধনে-পাতার সবুজে। পাশেই বেগুনক্ষেত। প্রচুর বেগুনে ভরে আছে গাছগুলো। যেমন রঙ, তেমনি জেল্লা দিচ্ছে। লোভ সামলানো দায় হয়ে পড়ল। পটাপট কয়েকটা বেগুন তুলে নিল কেষ্টা। দেখাদেখি আমরা দুজনও। আট দশটা হতে আমার সম্বিত ফিরল। আরে এ কী করছি আমরা? না বলে পরের জিনিস নিলে সে তো চুরি। গরীব চাষী এরা। এই ফসলেই যা আয়। হায় হায়। ‘এ কেষ্টা। আর নয়। চল এবার।’ হ্যাঁ হ্যাঁ বলেও কেষ্টা আরও দু-একটা। হঠাৎই দেখলাম কিছুটা দূরে একটা কিশোরী মেয়ে ছুটে যাচ্ছে ঘর-বাড়িগুলোর দিকে। আর মুহূর্তে বেশ কয়েকজন মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে রে রে করে তেড়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে। আমরা প্রমাদ গুনলাম। দে ছুট। দৌড় দৌড়। হাতে বেগুন, ছিটকে পড়ল কয়েকটা। ওই ওরা এসে পড়ল বলে। সঙ্গে চীৎকার এবারে স্পষ্ট। ভয়ে মুখ শুকনো। ছুটছি আর ছুটছি। হঠাৎই একটা পাবড়া মত লাঠি ধেয়ে এসে পড়ল ঠিক পেছনটায়। মনে হল আর উপায় নেই। কিন্তু আমরা লাফিয়ে নৌকোয় উঠে পড়লাম। হাতের দু-একটা বেগুন ছুঁড়ে নৌকোর ভেতর। কেষ্টা মুহূর্তে ভেড়ানো নৌকো ঠেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠল আর বৈঠা তুলে নিল হাতে। ওরা দূর থেকে ঢিল ছুঁড়তে লাগল। আশেপাশে পড়ছে। ঘুরে তাকিয়ে দেখি, বহু মা্নুষ, সব বয়সের, মেয়েরাও, হাতে লাঠি, হেঁসো, মুখে অকথ্য গালি। আর কয়েকজন ঢিল কুডোচ্ছে, আর তাক করে ছুঁড়ছে। এবারে আমাদের লাগল প্রায়। ওরা একদম পাড়ে চলে এসেছে। ‘কেষ্টা, কিছু একটা কর’। বলতে না বলতেই, দেখি কেষ্টা বৈঠা দিয়ে দিল দামুর হাতে। আর নিজে নৌকোর একদম একধারে দাঁড়িয়ে আড়াআড়ি ভেসে থাকা একটা দড়ি ধরে প্রাণপন টানতে লাগল। মুহূর্তে নৌকোর গতি গেল অসম্ভব বেড়ে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ওদের ঢিল নাগালের বাইরে। ওই দড়িটা ছিল ভাসাজালের সঙ্গে লাগানো দড়ি। পাড়ে কোথাও খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ছিল তার এক প্রান্ত। চীৎকার চেঁচামেচিও ক্রমে কমে এল। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কেষ্টা প্রথমেই নৌকোর খোল থেকে তুলে বেগুনগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিল জলে। হতে পারে সে বমাল ধরা পড়তে চায় না। কিন্তু আমরাতো মাঝ-নদী পেরিয়ে প্রায় এপাড়ের কাছাকাছি। বুঝলাম হয়ত সেজন্যই। সে চুরির কোনও চিহ্ন রাখতে চায় না। আসলে ও খেয়াল করেছে আগেই। আমি এবারে দেখলাম, এপাড়ে যে মহিলা বা পুরুষেরা স্নান বা অন্য কাজকর্ম সারছিল তারাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু। ওপারের কথাবার্তা বা অঙ্গভঙ্গি এরা অত দেখতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু কিছু যে একটা হয়েছে তা অনুমান করতে পেরেছে। এপারে নৌকো ভেড়াতেই, অনেক প্রশ্ন ধেয়ে এল। কেষ্টা, দামুর সবাই পরিচিত এরা। কাচুমাচু দুজনেই প্রায় সবটাই মিথ্যে, কিছুটা সত্য মিশিয়ে বলতে বলতে কেটে পড়ার ধান্দা। আমিও পালাই পালাই প্রায় দৌড়ে। উঁচু পাড়ে উঠটে উঠতে শুনলাম কোনও একজন পুরুষ বাজখাই গলায় বলছে—‘ ওটা হেডমাষ্টার সতীশ করের ছোট-ব্যাটা না? ও আবার এদের সঙ্গে কোথায় গিয়েছিল? কী ই বা করে এসেছে? মরে যাই সঙ্গী দেখে।’ তিনজনই ছুট। একদম প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায়। বসতে গেলাম, দেখি হাফ-প্যান্টের একটা পকেট ফুলে আছে। হাত ঢুকিয়ে বের করতেই বেরিয়ে এল এক ছোট্ট কচি বেগুন। কখন যে ভরেছিলাম! রাগে ছুঁড়ে দিলাম পাশের জঙ্গলে।

এ কি কৈশোরে পা ফস্কে যাওয়া? কি জানি! আমি জানি না। আজও মাপ করে দেখি নি। আর খাদের কিনারে এসে দাঁড়ানো? তাও যাপনেরই অঙ্গ। নাইন-টেন হবে। সরস্বতী পূজো। ক্লাব, বন্ধু-বান্ধব, রাতজাগা, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ক্লাব আর তাদের পূজার সঙ্গে কমপিটিশন, পূজোর আগের দিন সন্ধ্যায় ঠাকুর এনে সারারাত ধরে সাজানো-গোছানো, ফাঁক-ফোকরে ছোলাপোড়া, সুযোগ পেলেই এর বাড়ির পাকা-কলার কাঁদি, ওর বাড়ির ডাব, আর ফুল। ফুলের প্রতিক্রিয়া পরদিন সকালে খুব কমই হত। ডাব-এ একটু বেশি। তবে অনেকেই সঙ্গে সঙে খেয়ালও করত না। আর কলার জন্য পাড়া মাৎ হয়ে যেত। আমাদের ভূমিকাটা ছিল, যেন কিছুই জানি না এমন মুখ করে চুপ করে থাকা। তো, এক প্রাক শ্রীপঞ্চমীতে রাত আড়াইটায় আমাদের তিনজনের খেয়াল হল গৌরাদার বাড়ির নারকেল গাছ থেকে ডাব চুরি করতে হবে। আমি, মঙ্গল বা মনু আর ফটিক। ভাবা, আর কাজ শুরু মুহূর্তে। মনু ছিল এক্সপার্ট। যে কোনও গাছ তার করায়ত্ত। অদ্ভুত কায়দায় সে উঠে গেল প্রায় দোতলা সমান নারকেল গাছটাতে। সেটা আবার আমার বাড়ির সীমানার পাশেই। উঠে গেলে তাকে আর দেখাও যাচ্ছিল না। কিন্তু ওপর থেকে ডাব ফেলতে লাগল। আমরা দুজন নিচে একটা চাদর ছড়িয়ে সেগুলো ধরতে লাগলাম। সবে তিন-চারটে হয়েছে। হঠাৎ একটা নারকেল ডগা ঝুলে পড়তে দেখলাম। আর ধপাস করে কিছু একটা পড়ল। ডাব পড়ার শব্দ এতো নয়। ‘মা-গো’ বলে কঁকিয়ে ওঠার শব্দ। দেখি ফটিক দৌড়ে পালাতে চাইছে। আমি ওর হাত ধরি। ‘কী করছিস? পালাচ্ছিস কোথায়? মনু পড়ে গেছে। ওকে নিয়ে যেতে হবে।’ ডাব ফেলে, ওই চাদরেই জড়িয়ে দুজনে মিলে প্রায় টেনে হিঁচড়ে মনুকে পূজোপ্যান্ডেলের কাছে নিয়ে এলাম। মনুর দাদা যেমন ছিল ওখানে, আমার দাদাও ছিল। আরও অনেকে। সব বললাম ওদের। দেখা গেল কিছু ভাঙে-টাঙে নি মনুর। কিন্তু মুখ ফুলে গেছে খুব, আর মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। কথা বলতে পারছে না ও। কিছুক্ষণের মধ্যে ভ্যান-রিক্সা যোগাড় করে নিয়ে যাওয়া হল ওকে প্রায় চার কিমি ঠেঙিয়ে বহরমপুর হাসপাতাল। ভর্তি করে দেওয়া হল। চিকীৎসা শুরু হল। জানা গেল ওর মুখের ভেতরে নীচের পাটির দাঁতের সামনে থুতনির কাছে ওনেকটা জায়গা ছিঁড়ে গেছে। তাতেই রক্ত। সাতটা সেলাই পড়ল। তবে সময় না গেলে জানা যাবে না আরও কিছু হয়েছে কিনা। হতেও পারে ইনটারন্যাল হ্যামারেজ কিছু। দু-একজনকে হাসপাতালে রেখে ফিরে এলাম আমরা। জড়ো হলাম মন্ডপে। এবার ড্যামেজ কন্ট্রোল। এখনও পর্যন্ত আমরা ছাড়া আর কেউ জানে না। বড়দের (কত আর বড়! দু-তিন বছরের) একপ্রস্থ বকুনির পর শুরু হল সাজানো। ডাবগাছ থেকে পড়ে যাওয়া, ডাব চুরি, নৈব নৈব চ। অতএব মন্ডপের কাছে এক সাজনা গাছে মিছি-মিছি ওঠানো হল মনুকে। মাইকের চোঙ বাঁধতে চাওয়া। ডাল ভেঙে ধপাস। সেই মোতাবেক গাছে উঠে সাজনার ডাল ভেঙে ঝুলিয়ে দেওয়া। এসবের রিহার্সালও হল। প্রশ্ন উঠিয়ে উত্তরও ঠিক করা হল। কিন্তু মনু বাঁচবে তো, ওর কিছু হবে নাতো? এই প্রবল দুশ্চিন্তার মধ্যে বাড়ি এসে ঘুমিয়েও পড়লাম। বাড়িতে কী নিয়ে যেন বকবকানি চলছে। পাশের গৌরাদার বাড়িতে ডাব পড়ে থাকার সংবাদের মধ্যে আমি শুধু মনুর কথাই ভাবছিলাম। যদি মরে যায় কী হবে তাহলে? আমি যে সঙ্গী ছিলাম। যেন আমি এক গভীর খাদের একদম কিনারায় এসে ঝুলছি। একটু ঠোকাতেই দফা রফা। মনুর পা ফস্কে গেছে নারকেল গাছে বা হাত ফস্কেছে। কিন্তু আমার যে কী ফস্কেছে তা বুঝতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে পড়ে যাব। ৪৮ ঘন্টা কেটে যাওয়ার পর ডাক্তার এবং সবাই বলল—‘যাক, এ যাত্রা বেঁচে গেল’। হ্যাঁ, মনু বেঁচে গেল। কিন্তু সে আনন্দ ফিঁকে হয়ে গেল যখন সত্যটা চাউড় হয়ে গেল পাড়ায়। সর্বত্র, মন্ডপে পাড়ার দোকানে স্নানের ঘাটে একটাই কথা উমা মনু আর ফটিক মিলে গৌরদের বাড়ি ডাব চুরি করতে গিয়ে এই অবস্থা। আমরা তো অবাক। কে, কে বলে দিল? গদ্দারি করল। মার বকুনি ও মারের মধ্যেই জানতে পারলাম, হাসপাতালে দ্বিতীয় দিন বিকেলে মনু যখন খুব আস্তে দু-একটা কথা বলতে পারছে তখনই সে তার মার কাছে সত্যিটা বলে দেয়। মনুর মা আর আমার মা সই। সেখান থেকেই চাউড় আর শাসন। আর সবার মুখে এক কথা, যদি মরে যেত! কথাগুলো যেন ইকো হতে হতে এসে আমার কানে ঢু্কত। আর আমি নিজেই নিজেকে আরেকবার জিজ্ঞাসা করতাম—‘যদি মরে যেত! কী করতে চাঁদু তুমি? কী হত তোমার?’। সাত দিন হাসপাতালে থেকে মনু ফিরে এল বাড়িতে। ধীরে ধীরে সে আবার স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু হাসপাতালের ওই বিশেষ দিন দুটো যেন আমার ফুরোতেই চায় না। আজও কি ফুরিয়েছে?
এও তো নেশানো ডাক। পা ফস্কাক বা খাদের কিনারায় চলে যাই, কৈশোর থেকে আজও সেই ডাকে সারা দিয়ে ফেলি। ডাকের চরিত্র হয়ত আলাদা, কিন্তু সাড়া তো দিই। হোঁচট খাই, কিন্তু চৌকাঠ পেরোই। অজানা অচেনা যাপনে নিজের স্বাভাবিক চলে-চলা যাপনকে গ্লোরিফাই করতে চাই হয়ত। হয়ত মৃত্যুর হাতছানিও থাকে। কিন্তু সব মিলিয়েই আমার যাপন, যাকে আমি ভালোবাসি। মৃত্যু, সে তো অবধারিত। তাকেও যেন যাপনেরই অঙ্গ ভেবে স্কার্ফ জড়িয়ে ভালোবাসতে পারি।

আনন্দই জীবন। যাপনে আনন্দ অন্বেষা আমার। ভালোবাসা তাকে রঙিন করে, বিচিত্রতায় ভরিয়ে দেয়। অজান্তে যাপনই ভালোবাসা হয়ে ওঠে। আমৃত্যু তার কাছে ঋণী হয়ে থাকতে চাই।