আগুন পাখি

নভেরা হোসেন ও মৃগাঙ্ক শেখর




১.
তোমার জানালায় কৃকলাস ম্রিয়মাণ
জলপাই গাছ, সকালের রোদ, শিশুর চিৎকার
ছিঁড়ে ফেলছে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের পৃথিবীকে
কবিতা এবং দীর্ঘশ্বাসের বার্তা
কখনো কখনো লোকালয়ে অশ্রু জমিয়ে দেয়
না পাওয়া যত আর্তি
তোমাকে জলে ডোবায়, আগুনে পোড়ায়
পোড়ো বৃষ্টি ও নাস্তিতে
রোদে পুড়ে, জলে ভিজে হও শাণিত
যেন এক তলোয়ার
ছিঁড়ছে কাচের পর্দা
সময়ের বাঁকানো দাঁত-
দাও গেঁথে পোড়া চোখ লুসিফার
ভূতগ্রস্ত অস্থিতে

২.
সে ছিল সবুজ পোশাকে ঢাকা
পায়ে সমতল চপ্পল
এবং সে ছিল না যখন বইয়ের স্তূপ
ভেঙে পড়ছিল হৃদপিণ্ডের অলিন্দে
অলিতে-গলিতে
আহা আমাদের শহরেও ভোর হয়
দুপুরে গন্ধ ছড়িয়ে সাদা ভাত
পড়ে থাকে গোলাপি ডিশে
পুড়ে পুড়ে চিলের ডানা
ছাই হয়ে আসে
বাতাসে এবং জলের আগুনে-
থাকো তুমি মিনারে, বৃষ্টির ফোঁটায়
স্রোতে ভাসা গাঙচিল নদীর আকাশ
থাকো তুমি মজ্জায়
মরীচিকায়..

৩.
আগুনখেকো তুমি
আগুনমুখো নদী
সরসর সরিসৃপ
মাথাভর্তি কোকড়া চুল
ঠোঁটে গোলাপী আভা
পথ একটা দেখা যাচ্ছে
পথ একটা খুলে গেল
একদা সেখানে ছিল নীরবতা
এবং ছিলনা কোনো গন্ধম ফল
যা খেয়ে বানালে ড্রাগনের পৃথিবী
ক্রমে ক্রমে এইরূপ ছায়া গজায়
যেন আর দেহ নাই
দেহহীন কায়াহীন ব্রহ্মার চোখ
নলাকার দ-, নল আকার পৃথিবী
তাই খেয়ে খেয়ে স্মৃতি ছারখার
জ্বলে চোখ জ্বলে বিস্ফার
জ্বলে লুসিফার
আগুনের চোখ

৪.
রাত ভোর হয়ে এলো
কিসমিস, আখরোট সব ছিল পকেটে ভরা
বোতলের ছিপি খুলতেই অর্গানিক ড্রিঙ্কস
তুমি কি ঐখানে ছিলে?
কালো শীতল মেঝেতে?
চারপশে বহু পথ, কবিগান, সমগীত
আমিও ছিলাম তোমার সাথে
এক বিন্দু সর্ষে হয়ে
সর্ষের ভূত-
কোনো কথাই আর জানা যাবে না
অথবা যা কিছু জেনেছ
তাওতো বানিয়ে বানিয়ে
রাক্ষসপুরীর ব্যাঙমা-ব্যাঙমী
ঘুমন্ত ডালিমকুমার
কেউ তোমাকে জাগাতে পারনি
তুমি পারো নাই কাউকে
লুসিফার তবু রাত জেগে থাকে চোখে আগুন
লুসিফার তবু ঘুমিয়ে পড়ে
হাতে মৃত্তিকা

৫.
এখানে অনেক রোদ্দুর, বারুদ, লোবানের গন্ধ
পথে পথে সোনাঝুরি
রাঁধাচূড়া, অম্লজান
ছুঁয়ে থাকো প্রেম ও পারদ
নকল এনামেলে বানানো দাঁত
ছুঁয়ে থাকো হর্ষ ও বিষাদ
জল্লাদখানার আর্তনাদ-
ছিঁড়ে টুকরো করে বানিয়েছ যত মন্দির মিনার
তার শরীরে রক্তের গন্ধ
তার শরীরে মিনজাতক
জলে জলে সলিল সমাধি
করাতের দাঁত. করাতের চোখ
কাটো পুস্তক, আসমানি কিতাব
ভেঙে দেখ কোথায় সে নরকের কীট
রে পাষ- আগুনের আত্মা
পুড়ে ছাই হ
পুড়ে পুড়ে নাই হয়ে যাও সোনাভান

৬.
পথে হিরার টুকরো শ্বাপদ,
প্রেমিকের ঠোঁট
আপেলের গোলাপি আভা
তোমার মনে খুব গাঢ় কোনো রঙের স্তূপ,
ছড়ানো ছিটানো রেশমী চুল
পায়ে রোদের চিহ্ন
চোখে সময়ের ডানা
লুসিফার তোমার বুকের মধ্যে উষ্ণধারা
চোখে অনির্ণিত বায়োস্কোপ

কালকেতু এবং ফুল্লরা তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে অমৃতনগরে
সেখানে নটরাজ, বেহুলা লখিন্দর
কত স্বপ্ন-বাসর ভাসে অগাথ জলে
এইসব লোকালয়, ফুলের মুকুট তোমার নয়
তুমি শরৎ এবং বর্ষার কদম
নুয়ে থাকো জলের আড়ালে
মেহগনির কালো শরীর
তোমাকে জড়িয়ে নেয়
রাতের মধ্যমায়

৭.

প্রিয়তম শহরে আজ বৃষ্টি নেমেছে
সুউচ্চ মিনার, বৃক্ষ, স্বচ্ছ কাচ
ধুয়ে যাচ্ছে জলের ধারায়
তোমার চোখ হৃদপিণ্ড কড়ে আঙুল সব ভিজে চুপচুপ
শহরের বুকে আজ বৃষ্টি নেমেছে
একটা জর্দার কৌটা, সিলিকন চিপ
শাড়ির অর্ধভাজ, কালো স্তন
বৃষ্টিতে ভিজছে
রিকশার হুট, গ্যাস পাম্প, সিগারেটের প্যাকেট ভিজছে
এবং তুমি, তোমরা যারা আজ নেই
এবং যারা আছো
সকলেই ভিজছ প্রখর বৃষ্টিতে

৮.
লুসিফার এখানে অনেক মাটির পাত্র
ওখানে তামাটে শরীর
আজ কোনো নিবিড় কোনো আলিঙ্গন তোমাকে টানছে না
ভোটের, ব্যানার, অয়েল পেন্টিং, চামচের ঠোঁট
এইসব পড়ে আছে মগজের কোণে
হৃদস্পন্দনের উচ্চহার তোমাকে নুইয়ে রেখেছে
সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, জারুল
রাজপথের দুপাশে
এখানেও বলাৎকার হয়
শিশ্নের ডগা ঢুকে পড়ে কোমল শরীরে
কোকিলের ডাক এখনও শোনা যায়
গ্রীষ্ম সমাগত তবু তুমি ছায়া হারিয়েছ
গোলাপি শাল-
বাতাসে রক্তের গন্ধ
এই হাত হত্যা করেছে সহস্র হাত
দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙেছে স্পাইনাল কর্ড
রাষ্ট্রের যন্ত্র, যন্ত্র মানুষ ছিঁড়ে নিয়েছে ফুলের গর্ভকেশর-
হাত হাতকে বাঁধছে, চোখ চোখকে ঢাকছে
পাতাবাহারের গণ্ধহীনতা খাবারের প্লেটে
হান্ডি বিরিয়ানি আর মাটন চাপ টিভি স্ক্রিনে
ঐ চোখ তুমি খুলে নাও
ঐ ঠোঁট তুমি স্পর্শ করো
রাখো হাতে হাত
লুসিফার তুমি কেউ নও
কখনো ছিলে না
তবু আজো খরা ও বর্ষণে
মারি ও মৃত্যুতে, জীবনে
তুমি নাই ভুল এবং শুদ্ধতে
ত্রিকালনাথ ছুঁয়ে আছে তোমার
ভ্রু-যুগল


৯.
বিরিশিরি কোনোদিন যাইনি, গজনী, সিকিম
কোথাও না
শীতের রাতে দেখিনি ঈগলু ঘর
তুমি ছিলে সর্বক্ষণ রক্তের ভেতর
চনমনে বিকাল, দীর্ঘ রাত
শুয়ে শুয়ে পায়ের পাতায় পা
সারি সারি সেগুনের দণ্ডায়মানতা
এইসব বৃক্ষ-বৃক্ষা, নদী, ইট-পাথর
সবকিছু ঢুকে আছে মজ্জায়
তোমার উজ্জ্বল চোখ, নরম চুল
আমাকে আদ্র করে রাখে
লুসিফার হয়োনা উচাটন
শুষে নিচ্ছি চর্ম ও চক্ষু
ওষ্ঠ ও জিহবা
যত ঝড় ওঠে, ঝঞ্ঝা
শরৎ ও বসন্ত
এইখানে একবিন্দু অমিয়জল
এইখানে একরাশ ফুলের শয্যা
যা ছিল স্বপ্নে, প্রতিবাসত্মবে
জ্বলনত্ম শিশ্নের আগুন তাকে জাগিয়ে তুলেছে
আমিরূপ তুমি আর তুমিরূপ আমি
একাকার হয়ে ধুন্ধুমার-
এখানে অপর হয়ে ওঠে নিজ
অপরাপর সকলেই ঢুকে পড়ে কপাট খুলে
খিলানের এইপাশে মধুকূপি ফুল
গর্ভকেশর ছিঁড়ে থিরথির কাঁপছে
ছুরি দিয়ে কেটে কেটে লহমায়-
শ্যাওলায় ঢাকা পথ এঁকেবেকে চলে গেছে দূরদেশ কালকূট
তুমিও চলেছ পথ
সরবন, বেহেস্তের ঐপারে
এইপরে কালো দেশ, কালো কালো নেকাবে ঢাকা
বিরিশিরি যাইনি কখনো
গজনী, সিকিম কোথাও হয়নি যাওয়া



১০.

রাতগুলো জেগে আছে
ফায়ার ফায়ার
রেলক্রসিং পার হয়ে বাঁশবন
চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠছে কাটা রাইফেল
কার্তুজ, গুলির খোসা
গাছের আড়ালে লুকিয়ে মানুষ-
ট্রেঞ্চে, জলে, স্থলে
মানুষের খুলি, ভগ্ন হাত
যুদ্ধের দামামা ছিল এখানে
কিছু থেমে গেছে
কিছু রয়ে গেছে-
বিস্ফোরনের শব্দে তোমার ঘুম ভেঙে যায়
থেমে থেমে বোমার আর্তনাদ
ঝলসানো মুখ, বিস্ফোরিত সত্মন
জঙ্ঘার হাড় বেঁকে ঢুকে গেছে মেরম্নদে-
রাতগুলো জেগে আছে

কিছু ফায়ার থেমে গেছে
কিছু রয়ে গেছে আগুনের ফুল্কি..

১১.
প্রিয় রাত প্রিয় রাত্রি
তোমার বারান্দায় পাতাঝাজি, শ্যাওলার আস্তরণ
হিজলের কালো শরীর জলের দ্রাঘিমায়
নুয়ে থাকা বৃতি, পাপড়ি
ওখানে শিৎকারধ্বনী একা জেগে থাকে
এখানে স্তনের নীরবতা
রোদ্দুর, ঘাস, মেঘ
পায়ে পায়ে কত কোমলতা
একটানে খুলে ফেল পোশাকের কারুকাজ
উত্থিত লিঙ্গ, উষ্ণ ঠোঁট
মিশে থাকো মধ্যমায়
রাত বাড়ে, ঘুমন্ত শহর-
ঘুমিয়ে থাকো আগুনের চোখ
জেগে ওঠো জ্বলন্ত বিষ্ফার
আগুনের লুসিফার

১২
কথামৃত, চরনামৃত কতশত পুস্তক আদি জ্ঞান
মৃত চোখ চেয়ে থাকে
ঘুমন্ত সরবন, তৃষিত ওষ্ঠ
জখম আত্মার নীরব ক্রন্দন
এসব দুমড়ে-মুচড়ে জেগে ওঠে নীল সাগর
মাটিতে চাবুকের দাগ, জিহ্বায় আদিরস
কে তুমি ঝঞ্ঝা, উল্কার পতন
কাচের পর্দা, যবনীকা?
দেয়ালের ধার ঘেষে বেড়ে ওঠো
বটের অযত্ন ছায়ায়-
কে তুমি চোখ কেড়ে নাও
শুয়ে থাকো হৃদপিণ্ডের অপরপাশে
শত শত ক্রেঙ্কারধ্বনী, শৈবাল হ্রদ
এপারে মহাস্থান, মহা মহা গড়ের সমাধি
ঠনঠনিয়ার রাতের জমাট
লুসিফার তোমাকে খুঁজে পাইনাতো
অথবা তুমি ছিলে গনগনে উত্তাপে
মোম হয়ে গলে পড়ি মোমের শরীরে
না দেখো সে অগ্নুৎপাত
ঝরোকার কাচ দিয়ে জঙ্ঘার শ্বেত-স্রাব-
ছিড়ে-খুড়ে লোহার খাঁচা
বানিয়েছি ছায়া এক তোমার মতন,
তাকে নিয়ে সমস্ত রাত্রি-
এইসব মধুরস, যক্ষের ধন
কে তুমি হারালে বসন্ত বাতাসে-
পর্বতা-পর্বতা ঘরের সমীপে?
লুসিফার তুমি কেউ নও কখনো ছিলে না
আগুনের শরীর হয়ে জ্বলতে থাকো
নিভবার কালে.

১৩.
প্রিয়তম এইখানে মরুঘাস, লোবানের গন্ধ
শার্দূল, বৃষ, সুতানলি সাপ
কেটে কেটে বানাও মন্দির, মিনারের কঠিন শরীর
তারকাঁটায় গেঁথেছো কত কোমল চোখ
অথচ আমাদের কোনো তারকাঁটা ছিল না
পরষ্পরকে বিদ্ধ করেছি জঙ্ঘা ও লিঙ্গের অসি'র উত্থানে
তারপর মেঘের শরীর
ভেসে ভেসে অজনার পথে
পায়ে কত কাদার ছোপ
জুতোয় রক্তের ধারা
প্রিয়তম তোমাকে আজ কি নামে ডাকি?
জয়তুন, জারুল, মধুকূপি ঘাস
যে নামেই ডাকি না কেন
পথে মৃগনাভি, চোরকাঁটা সারি সারি
পায়ে বিঁধে রক্ত ঝরাল
বুকের বাম পাশে করাতের দাগ
কেঁপে ওঠা আঙুলের ভাঁজে
একবিন্দু সর্ষেও ভূত
এই ছিলে তুমি-
আছো ভেতরে কালো ভূত হয়ে
জানি না কে সে ভূত তাড়াবে নাকি কোনো ওঝা হয়ে এসেছিলে কাল
নিজেকে ছাড়াও নিজের দ্রোহে
আমি শুধু শীতে কাঁপি, রোদে পুড়ি
হিজলের লাল ফুল চোখে মেখে
বাজাই একতারে ঝাপটানো পাখা
অন্য তারে চাতকের চাওয়া
সেই সুর ওষ্ঠে মেখে
সেই সুর পান করে
আমি এক পা ধা নি সা
সা নি ধা পা মা গা রে সা



নবারুণকার মাথার কাছে যে জানলাটা। আদ্দেক পাল্লা ভাঙা। যার অন্যপাশে লাল দলা পাকিয়ে লাল লেখাগুলো । ওপর মাথার গোল ফ্যানটা, মাঝ দিয়ে, দুটো চোখ - হাসি দাঁত বের করা। বাঁশিটা সেলোটেপের সাথে ঝুলছে। ঘস ঘস ঘস ঘস। প্যাট্রিওটিসিমের চকের নীচে মশার রক্ত থ্যাঁতলানো । ক্যাবল রক্ত মশা মারলে বেরয়। আর বন্দুক দিয়ে বেলুন মারলে, দাগ দাগ হয়ে যায় মৃতের সহিত কথোপকথনের সাইন বোর্ড। মাথার ভেতর তখন হরবার্ট ঘুরছে, নবারুণকার। একটা বিড়ি, জন্ম আগুণ পাচারের । আর গরাদের হাত ধরে গাল তোবড়ানো। রাত ভোর হয়ে এলে কিসমিস আখরোট নেতিয়ে। নিন্দ গাঁজিব কি। জিস রাত শাহর মে খুন কি বারীশ আই রে। সান্টাটাআআআআআআআআআআআআ আআআআআআআআআআ। তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ ডাউনটাউন। চুপচাপ। চুপচাপ। যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়। উপত্যকা দেশ মৃত্যু সব ঘেঁটে ঘ। মনে করার মানে নেই, বিপ অর্থ সব কিছুর পরিবর্ত, স্ল্যাং বা চোত্তার নয়। এই সময় ফ্যাতাড়ুরা দেয়াল টপকে যায়, সোসালিজিমের গল্প শোনায় আর আলুর দাম বেরে যায় হুড় হুড়। আপনার না বোঝাটাই স্বাভাবিক। একটা হুয়া ডাক। মনে হবে মাটির অনেক নীচ থেকে আসছে। গলা ফাটিয়ে। ছাদের কার্নিশ আর পাশের বাড়ির বাথরুমের জানলার ভেতর শাওয়ারের জল বন্ধ। সিরিয়াল সোপ বন্ধ। মৃত্যু সম্প্রচারের মাঝখানে বন্ধ আতরের এন্ডোর্সমেণ্ট। আপনার না বোঝাটাই স্বাভাবিক। এক পা বেঁধে মাথার ওপর। শক্ত দড়ি। নীচে মাথা। আর একটা ঠ্যাং ত্রিশ ডিগ্রি কোণে। এসব পাত্তা না। ঘুট ঘুট দু পাক মেরে গলার কাছের যেখানে আল জিভটা তার নীচ থেকে বুকের হাড়ের ওপর পর্যন্ত্য চালিয়ে দেবে ছুরি। গদ গদ রক্ত ছিটকে যাবে। ব্যাকগ্রাউণ্ডে গান হবে বালাম পিচকারি। প্রথমে ওরকম নাদুস চেহারা নিয়ে কিছু বোঝা সম্ভব না। তারপর রক্ত কমলে কোমরে এক ঝটকা খাবেন। ধর ফর করতে করতে লাফাতে লাফাতে মুখ ঠুক নীল হয়ে শরীর ঠাণ্ডা শক্ত হয়ে, আর কি! এভাবেই শুয়োরের বাচ্চারা মরে। হরবার্টের এসব গালগপ্প অনেক কেটে গেছে। বরং আমরা সেবার বেরিয়ে পড়লাম। হুহু ঠাণ্ডা আর উদম একটা হাওয়ার কলকাঠি পেরিয়ে। লেকের জলের শ্যাওলা, বুমেরাং মার্কা চাঁদ - দেখে টেকে নবারুণকা কবিতা। মাঙ্কি ক্যাপের মধ্যে যেটুকু দেখা। কুয়াশা আর বিড়ির ধোঁয়া-দু টো পাহাড়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে হিসির মতো একটা নদী। তারপাশে ঘাস জমি। ঘাস জমির ওপর, প্ল্যাকার্ড পোঁতা। সাদা ঠাণ্ডা টিনের ক্যানেস্তারা মার্কা। চাঁদের ঝাপসা আলো। গায়ে লেখা, একমুখ দাঁড়ি লোকটা। আর একটার গায়ে, টাক মাথা, নাক ভোঁতা বুড়ো আর একটার - সুন্দর চোখের বাচ্চাটা। নবারুণকা, আমি পড়তে পড়তে । এই সময় ফ্যাটফ্যাটে চাঁদের মধ্যে- দূরে সাদা কালোর মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করে না কিছু। নবারুণকা গলা তুলে হুয়া ছাড়ে- এরা কারা? লোকটা দু হাত তুলে দেয়। হাত অনেক লম্বা আলখাল্লা, আল্লা জানে । তখন হউ হউ হাওয়া দিচ্ছে খাপছাড়া পাথরের ঢিবির দিক দিয়ে। আর বিড়ির গোল্লা খাওয়া ধোঁয়া মেরে, বেউকুফটা বাতেলা মারতে মারতে এগোতে থাকে, কেউ তেমন কথা বলে না। শুধু শুধু সামনের আধ খাওয়া ঘরটার চালের নীচ দিয়ে হালকা একটা আলো বেরিয়ে রাক্ষুসে অদ্য গদ্যর মুত ফুট ছিটকে লেপতে হেগে দেয়। ঘরের ভেতরে রোডম্যাপের মতো মুখটা ছাড়া আর কোন বুড়ো মুখও নেই। মা-টা বেউকুফের। বা বেউকুফটা অন্যও কারও বাচ্চা। তখন এতকিছু ভাবা যায় না। পেটে খানকির ছেলে খিদে। রুটি চিবিয়ে শক্ত। আর ডালের গোটা গোটা চিবিয়ে। নবারুণকার মাথা ঝাঁকড়া , দাঁড়িতে ডাল লেগে লেগে পিঁপড়ের পোদের মত। খ্যাঁক হ্যাক হাসছিল বদখদ দেখতে মা'টা। অত কি জানি। তখন জিপের ঘড় ঘড় আর ট্রাকের দাগ দাগ রাস্তায়। বেউকুফ দরজা খুলে দাঁড়ায়। নবারুণকা হিস মারে - কি হল? বডি - জিভটা ঠেলে দেয় মা-টা মুখের বাইরে। -কার? বুড়িটা কি বলবে! জিপ আর ট্রাকের ঘড় ঘড় সড়ে গেলে, বাইরে আসি। তিন চারটা আধ খ্যাচড়া লোক পড়ে। গুলি খেয়ে বদন বিগড়ে বুক গর্ত গর্ত হাত পা ছেড়া। কোদাল নিয়ে বেউকুফটা খুঁজতে বেরয় কোথায় জমি ফাঁকা। রাত থাকতে থাকতে তিন চারটে গর্ত নামে। ধপা ধপ নামে বডি। সাইনবোর্ডে লেখার আলকাতরা বুলিয়ে দেয় - মোটা মাথা, দাঁড়ি মুখ ছেলেটা / পেট মোটা জোড়া ভ্রু বাচ্চা / ইয়া ইয়া ও। ওরকম অনেক কিছু লেখা হয়, অত মনে পড়ে না। বিনু - নবারুণকা হুয়া ছাড়ল - বিনু।

উঁচু দেয়াল আর কালো কালো ঘরগুলো পেরলে নিজেকেও আর দেখা যায় না। চারপাশটা মড়ার মতো ঠাণ্ডা। এক সময় নিজের রক্ত চলাচলের শব্দ শোনা যায়। চোখে বাঁধা কালো কাপড়ের নীচে গুঁজে দেয় কাদার ডেলা। এলোমেলো পায়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তুমিও ভুলে যাবে, কোথা থেকে এসেছ। একটা সময় বিশ্বাস হতে থাকবে- তোমার আর কেউ নেই, আর কোন নাম নেই, এই ভাবে হাঁটতে হাঁটতেই তুমি বড় হয়ে গেছ। অন্ধকার কালোর মধ্যে দিয়েই তুমি শিখেছ- যা কিছু ভুলে যাচ্ছ। হাতের আঙুল - যে কটা নাড়াতে পারছিলে, সে কটা এক সময় কাজ বন্ধ করে দেবে। তোমায় মাথায় বিলি কেটে আদর করতাম, জট পাকিয়ে দুটো চুলকে আর আলাদা করতে পারবে না। তুমি ভুলে যাবে বাধ্য হয়ে। তোমার ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে, শক্ত করে চেপে থাকার সময়টা ছট ফট করছিল - যখন ছুঁড়ি দিয়ে কেটে ফেলল আসতে আসতে দুটো সমান্তরাল মাংস পিণ্ড। তোমার পায়ের পাতাগুলো এতক্ষণ হেঁটে বেড়াচ্ছিল, আমার চোখের সামনে। একটু আগে ক্লান্ত হয়ে চুপ করে দাঁড়াল ঘরের দু প্রান্তে। বাবা এসেছিলেন। থানায় কেউ কিছু বলতে পারে নি। তুমি কোথায় আছ। ভাই কাঁদছিল থানার বাইরে। না, চোখ দিয়ে জল বেরচ্ছিল না ওর। খুব ঠাণ্ডা তো এখানে। মা, অনেকগুলো রুটি পুড়িয়ে ফেলেছে। কালো শক্ত হয়ে আছে। ইঁদুরটা সেটাই খাচ্ছে এখন। তোমার ওখানে ইঁদুর আছে? তুমি এতো ভয় পাও কেন ইঁদুরকে? কি সহজ চোখ দুটো দেখ। তুমি তো আর নিজে থেকে হাঁটতে পারবে না। কি করে পালাবে ইঁদুর দেখলে? বরং দোস্তি করে নিও। খাবার ভাগ করে খেও। শুনেছি তোমাদের ওখানে অনেক মানুষ থাকেন। তাদেরও কি হাত পা নেই ? আচ্ছা ওরা তো চোখ উপড়ে জিভটা কেটে ছেড়ে দিতে পারত। তোমার জানলার পাশের জলপাই গাছটা কেমন শুকিয়ে এসেছে। সকালের রোদে আরও রুগ্ন লাগছে। জানলা দিয়ে দূরে বাষ্প জমেছে পাহাড়ের মাথায় । গা বেয়ে নেমে আসা নদীটা পুঁতির হারের মতন জড়িয়ে আছে গলায়। গোল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে একটা চিল সকাল থেকে।

বিনু হাত নাড়তে নাড়তে, আরে কাকা! হরবার্ট হাত মুঠো আকাশে ছোঁড়ে- তোর সাইনবোর্ডে কি লেখা? -বোমা তো কাকা, উড়ে গেলে কিছু বোঝা যায় না। ওই টুকরো টাকরা যা পেরেছে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা। সাথে আরও তিনজনের মাংস মিশে ফিসে । সে ভালো চারজনে রুম শেয়ার করছি।

তোমার বাবার কাছে আজ চারজন লোক এসেছিল। বলছিল, তুমি তখন ক্রিকেট খেলছিলে, ফোর্স তুলে নিয়ে যায়। তোমাকে ওরা জিজ্ঞেস করছিল, পার্সেলের ব্যাপারে। তোমার কাজের জায়গায়,বিছানার তলায় পেয়েছে। তুমি জানো না, কে রেখেছে জানো না। বিশ্বাস করল না ওরা। তোমার আঙুলগুলো টেবিলের ওপর রেখে বন্দুকের বাট দিয়ে মারতে লাগল। যতক্ষণ না রক্ত বেরিয়ে আসে। নখ উপড়ে না নিলে কোন দিন জানতে পারতে? কত নরম হয় নখের নীচটা। আজ রাতে কিছু খেতে দেবে না। দেয়ালের কোণাটা দেখ, শ্যাওলার গায়ে জিভ ছুঁইয়ে, যদি জল পাও । না পেলে, পিসাব হয়েছে সকাল থেকে ?

কাকা, এসব তুমি বুঝবে না। এ মামলা অনেক ঘোলা। দিনে ক্যাট রাতে ব্যাট, ওয়াটার নিয়ে টানাটানি, ফিশ মরছে।

তোমার বাবা কোর্টে গেছিলেন। মামলা করেছেন। আজ খেতে খুব কষ্ট হল না? তুমি তো ছোটবেলায় আঙুলের কোণা দাঁত দিয়ে কাটতে। এখন না হয় কোমরের। নিজেরই তো মাংস। অন্য কাউকে তো ব্যথা দিচ্ছ না। কেটেও দিচ্ছে ওরা। সাথে নুন মশলাও মাখিয়ে দিচ্ছে। বেশ ঝাল ঝাল নোনতা। দেখ আস্তে আস্তে ভালো লাগবে। যখন কাটবে তখনো আর কষ্ট হবে না।

আপনি ওই ভায়োলেন্সকে সাপোর্ট করেন? -স্টেটের টেররও কিছু কমছিল না। ঝুঁকে পড়েছে চাঁদটা। চেপ্টে গেছে জলের চাপে। কালো আর উঁচু দেয়ালগুলো পেড়িয়ে এসে। দূর থেকে রবাবের সুর। তানসেনের রবাব। বেউকুফের ঘরে হ্যাজাকের আলো। রুটি সেঁকছে মা। আর বেউকুফটা গাডায় তাল ঠুকছে রবাবের সাথে। জানে না কে বাজায়। জানে না কোথা থেকে লাশ আসে। কে মরে কারা মারে। কারও গলায় কারো বুকে গুলির গর্ত। পাহাড়ের গায় ঢাকা এই ঘাসজমিতে সে গর্ত খুড়ে লাশ পুঁতে যায়। তারপর একটা গাছের ডালের ওপর টিনের পাতলা সিট লাগিয়ে, আলকাতরা দিয়ে লিখে দেয়, দাঁড়ি মুখ মানুষটা শান্তিতে ঘুমক। দাঁড়ি মুখ মানুষটার পরিবার জানে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিরুদ্দেশ ঘোষণা হয়ে যায়। তার পরণে ছিল সাদা কুর্তা পাজামা মাথায় সাদা টুপি গালে কাটা দাগ।

তোমার আজ খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যাবে। যদিও তুমি বুঝতে পারো না কখন ভোর হয়। গুমোট অন্ধকারের ওপাশ থেকে গার্ডের ফিস ফিস তুমি শুনতে পাবে। হাতে ভর দিয়ে একটু এগোলে দেখতে পাবে, মাটিতে শুয়ে একটা নিথর শরীর। যুবতী মেয়ের। গা দিয়ে সুন্দর গন্ধ বেরচ্ছে। তোমার শরীরটা টেনে টেনে তুমি কাছে আসবে। খেয়াল করবে তোমার পুরুষাঙ্গ শক্ত হচ্ছে, নারী শরীরের স্পর্ষে। তুমি তার স্তন ছুঁয়ে দেখবে। হাতের যে কটা আঙুল কাজ করে তাই দিয়ে খেলার করবে, স্তনবৃন্তে। দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে তার ঠোঁট। দু পায়ের ফাঁকে প্রবেশ করাবে তোমার শিশ্নের ডগা। শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে তুমি চেষ্টা করবে, বীর্যপাত হোক। হবেও। শুধু গর্ভবতী হব না।
লুসিফার, তুমি ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়বে আমার মৃতদেহের পাশে। আর গার্ডেরা তখন তোমার কানের কাছে রেকর্ডে বাজাচ্ছে, সাজ-ই -কাশ্মীর।



পুনশ্চ - তোমার বাবাকে বলেছিল, তিন লাখ দেবে, আর সাথে চাকরি, যদি কেস তুলে নেয়। বাবা রাজি হয় নি।

ঋণ - কাশ্মীর টর্চার ট্রেইল | হারবার্ট (বই এবং চলচ্চিত্র) । ( কিছুটা কাল্পনিক। বাকিটা সত্যি )