বসত

জয়শীলা গুহ বাগচী ও শতাব্দী দাশ



-১-

দলা দলা জ্বর পড়ছে
তর্জনী শেষ হলে
প্রাচীন আলোর গায়ে
নিদ লেখা
থার্মোমিটার আজ আর কিছু বলছে না
আমাদের বার্তায় তাপ
চল পড়শি পড়শি খেলি
সারা গায়ে নক্ষত্রের মেঘ জমে জমে
আমি ক্রমশ তফাত
আরশি ভেঙে যাচ্ছে
আরশির নাম জারজ রেখেছি

-২-

বিরোধ হবে না
একছত্র সু টিপে টিপে
খিচুড়ি ছড়িয়ে পড়ছে
আমাদের ভোলানন্দে
কিসিম কিসিম বিকেল হল
রঙের মাঝে গো হারান হল
তূরীয় হল বেলা
পুরনো মদ বলে গেল
বিরোধ পুড়ে উঠলে
রুটি মিলবে
রুটির ফাঁক দিয়ে
হাড় দেখা যাবে না
হীম নয়
অণু নয়
হা: আমাদের পরমাণুজন্ম
আমাদের পরমায়ু!

-৩-

মন ঘিরে ধরে গুটি সুটি পোকা পোকা
অথচ ধারণার ভেতর
ফিসফিস করছে সে
যাকে মহামান্য চামড়া বলে জানি
প্রথমে পা
তারপর
বসতি জুড়ে চিটচিটে উপনিবেশ
দাগ বসে গেছে মজ্জায়
আকাশের ভার ঠেলে
মাটি সামলে নিই ধারণায়
স্পাইন পুঁতে পুঁতে
সীমান্ত সাজাচ্ছি কেমন
আমিও নরমে গরমে
গুজব খেতে খেতে
চরণামৃতে বংশী দোলাই


আনন্দ ফেনিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। হাঁই হাঁই করে ছুটছে সব লোক।যেন থামলেই মন-খারাপ পুট করে গিলে নেবে তাদের। আটকে রেখেছে দড়ি ফেলে, কিন্তু খুলে দিলেই সে কি স্রোত! স্রোতে পিছলে যাচ্ছে, হড়কে যাচ্ছে মানুষ। এ’ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। তাও কি উল্লাস! বিরাট সব হাঁ-য়ে ঢুকে যাচ্ছে রোলেরা। কষ বেয়ে টম্যাটোর রক্ত গড়াচ্ছে। অন্ধকারের গায়ে শপাংশপ পড়ছৈ হ্যালোজেনের চাবুক।
দমবন্ধ লাগে। প্রজিত ছুট লাগায় হঠাৎ অচেনা হয়ে যাওয়া চেনা রাস্তা দিয়ে। গর্তে সেঁধিয়ে যেতে চায় সব আলো পেছনে ফেলে। ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে কেউ। একট খুদে দানো তার ছুটন্ত কাঁধে এসে বসে, হিসহিসিয়ে হাসে, ডিগবাজি খায়, ভয়ের গান গায়।
“কি রে আজ যে আর্লি ডিপার্চার নিলি, বস্‌ জানে?”
“কাজ ছিল না তো। আর্লি আর কই? আধঘন্টা। সবাই কত আগে...”
“সবাই কি তোর মতো খোরাক? সবাই কে নিয়ে কি মজাকি জমে? দ্যাখ, কী হয় কাল!”
আধঘন্টা আগে বেরিয়েছিল ট্রাফিকজ্যাম এড়াতে, আনন্দে কেলি করতে নয়। ভয় চেপে রেখে “যা হবে কাল দেখা যাবে শ্লা” বলে ঘাড় গুঁজে হাঁটে সে। ক্ষুদের খিকখিক-এ মাথার দপদপ বাড়ে। একদিকে ভাল। অষ্টমী আর দশমী ছাড়া ছুটি নেই। নইলে গা-জোয়ারি ফূর্তিতে নির্ঘাত পাগল হয়ে যেত। ভাবতে ভাবতে তালা খোলে সে। সিঙ্কের আরশোলাটা খেদিয়ে মুখে-হাতে জল দেয়। ঘাড় থেকে দানো উধাও হয় জলের ছিটে পেয়ে।

টিভিতেও অমুক সংঘ, তমুক কেলাবের মোচ্ছব। একটা পেগ বানিয়ে প্রজিত সার্ফ করতে বসে – যেমন রোজ করে। সিডি প্লেয়ারটা চালিয়ে দেয়। প্রতিটা মুহূর্তের ফাঁকে-ফোকরে গুঁজে দিতে হবে কিছু না কিছু। দানোটার মুখে নুড়ো জ্বেলে ফিকফিকানো ঘুচিয়ে দিতে হবে। এমন তো নয় যে ভন্ডুল তাকে ঠেকে ডাকেনি। তার মোবাইলওতো বাজে মাঝেসাঝে। কিন্তু ভাল্লাগে না। স্রেফ বিরক্তি লাগে। সেই একই মৌতাত, একই মাল, একই চাট, একই মাতাল, একই বিলাপ। সব – সব বড় একঘেয়ে। সবার সেই একই ভয় – বিরাট কোনো হাঁ-মুখে সেঁধিয়ে যাওয়ার। তাই গুঁজে দাও কিছু হুল্লাট, কিংবা বোলাও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, অথবা দাম্পত্য, বা প্রেম, বা বিরহ, বা ফেসবুক স্ট্যাটাস, এ বি বা সি – কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকো, বাওয়া! হাঁ-এ আগ্রাসন কমব্যাট করতে ব্যস্ততার ব্যাটেলিয়ন সাজিয়ে রেখেছে সব। যেন গিলতে এলেই বলে উঠবে – “এক মিনিট দাদা, যুদ্ধবিষয়ক একটা আপডেটেড স্ট্যাটাস দিতে দিন, প্লি-ই-জ!”

ফুটকি ফুটকি সবুজ আলোরা হাতছানি দেয় চ্যাটবক্সে। প্রজিত খানিক ধন্দে পড়ে যায়। গর্ত থেকে মুখ বাড়িয়ে ভাবে, বেরোবো? কিন্তু গর্তজীবীর ধাতে সয় না। “সুরুচি সংঘের মাইনে বউবাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ভাই”, “ আয় না শালা, মস্তি হবে”, “নাগের বাজারে তাহলে বসা হোক জমিয়ে” জাতীয় কথোপকথনে খানিক ফ্রি-স্টাইলে ভাসবে ভেবেও পেরে ওঠে না। পেরে না উঠে উন্নাসিক হয় প্রজিত। সুপারম্যান লাগে তার নিজেকে। গর্তের বোধকে মেনে নেওয়া, হাঁ-মুখের সামনে ক্লাউনের মতো লাফালাফি না করে নিস্পৃহ, নিরাসক্ত থাকা – এইটুকু সাহস তার নিজস্ব অর্জন।

তার চেয়ে বরং শোনা যেতে পারে রফি বা লতা। “দিন ঢল যায়...হায়.....” “ইয়া-আ-আ-আদ”-এ এসে রফির আর্তিতে সে খানিক দুর্বল হয়ে পড়ে অবশ্য। আর তখনই দানোটা মশার মতো ভনভন করে আবার সেই ঘাড়ের কাছে। খুনসুটি করে – “ন্যাকা! নেকু আমার!” “হু-উ-শ্‌” করে দেয় প্রজিত। আমার ওল্ড মঙ্ক, আমার রফি, আমার ডুকরে ওঠা ....... তুই বলার কে বে? ফয়েলে মোড়া রুটিরা শুনতে থাকে ওদের ঝগড়ার দৈনন্দিনতা।

খাবার গরম করতে করতে শুরু হয় “লগ যা গলে...” বহুযুগের ওপার হতে আসা স্বরের সাথেই তার রোজদিনের রতি। হাতের আঙুলগুলো নেচে ওঠে চেয়ারের হাতলে। পায়ের আঙুলেরা চঞ্চল হয় মেঝেতে। শরীর জেগে ওঠে কি এভাবেই?

তারপর মাঝরাত নামে কলকাতায়। প্রজিতের একান্ত রাত সেদিন বারোয়ারি। প্রজিতের সিঙ্গল-রুম ফ্ল্যাটে সেদিন ফেরে না তার নিজস্ব রাত। আজ সে পথে পথে ঘুরবে। বেলুনে, ভেঁপুতে, হোলনাইট প্যান্ডেল হপিং-এর আদিখ্যেতায়, রিকশাওয়ালার ফোকলা হাসিতে যুবতী হবে কবেকার সেই রাত। কী-ই বা প্রজিত দিয়েছে তাকে, রামের গন্ধ আর চাপচাপ অন্ধকার ছাড়া? রাতের অভিসার প্রজিত ব্যর্থ প্রেমিকের মতো বসে বসে দেখে।

সকাল গড়িয়ে বেলায় বাড়িওয়ালি কাকিমার বেলে ঘুম ভাঙে প্রজিতের। নাড়ু-নিমকি-বিজয়া-দাঁতক ্যালানো ইত্যাদি। সে-ও বলতে গেলে সেই একই চর্বণ। জামাটা চাপিয়ে ছুটির রাস্তায় নামে প্রজিত। গলা সাধছে ভাড়াটের মেয়ে। মিষ্টির দোকানে উপচানো ভিড়। খাসির পেলব গোলাপি। ধরাচূড়ো নামিয়ে রাখছে উৎসব। হারিয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া গা-সইয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রশয় চলকে ওঠে প্রজিতের চোখে। প্রজিত তার দরজা হাট করে দেয়। মেলা-ঘুরুনির দল ফিরছে বসতবাটিতে।