অন্ধকার দৃশ্য নির্জনতা

সূর্য্যমুখী ও নির্ঝর নৈঃশব্দ্য




নৈশভোজের ‘পর হাত পেতে তুলে নাও যে অকালকুষ্মাণ্ডের গোলাপ বাগান
সেখান থেকেই শুরু হয় বিনিদ্র বর্ষাক্ষরণ
রোজ বাড়ি ফেরা থেকে ঢের দূরে সরে জেনেছি পিতার অপেক্ষার ঘ্রাণ।

প্রতিটি প্রচ্ছদের মৃত্যুর পর দেখা মেলে যে নিঃসঙ্গ ঈশ্বরের অবয়ব
তাঁর ব্যকরণজুড়ে রাজত্ব করে শৈশবের বারান্দা;
নোনতা জানালা, উত্তরের শিরীষ গাছ, স্যাঁতস্যাঁতে আসবাব;
কখনোবা পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা সফেদার বাণ। আসমুদ্র শৈবাল অথবা
পুরাতন শালিকের নিঃসঙ্গ হাহাকার।

অলিখিত নৈঃশব্দের মাঝে তবু থাকে টিনের স্কুল, জাদুর পেন্সিল,
হারানো চশমার আলো। একে একে ডুবে যায় কাঁসার শহর, দূরের বাতিঘর।
পিতার কোমল বারকোশের শেষ রঙ ডুবে গেলে জেনেছি-
মানুষ একা। মানুষ ঠিক মাগরেবের আজানের মতন একা।



মানুষের বসতির পাশে কোনো নিবিড় অরণ্য নাই, বন-ঝাউয়ের গন্ধ ভারাক্রান্ত দৃশ্য নাই। স্থির অন্ধকারের নামে বদলে যায় দৃশ্যমান সমুদ্রযাত্রা আর অজস্র মৃত্যুর বিনিময় বুঝে নেয় অনাগত খলসের আলো। আলোর কথা বললেই মনে পরে উজ্জ্বল বালিহাঁস অথবা ডুবে যাওয়া বালিকার দেহের কানাচ।
বালিকা- বিস্তৃতির সজল উপাখ্যানের নাম।
মৌলিক কুয়াশা অথবা বারোয়ারি বর্ষালোচনা শেষে বলিদান চড়াও যে সুডৌল মৃত্যুহার- ভুলে গেছো সেই বিষণ্ণ ঘুঙুরের সশব্দ প্রণাম? অলৌকিক চন্দ্রাভিযান শেষে চিবুকের রক্ততিলক জানে ছায়াহীন জমিতে কে চাষ করে উপেক্ষার ঘ্রাণ; নিষিদ্ধ দয়িতার নামে কেন পড়ে থাকে কৌমার্য্যের বকুল! জেনে যায় অন্ধকারজুড়ে জেগে থাকা সাপ আর শেয়াল রহস্য।
তবু বেহুলার ঘাঁট বাঁধে নামহীন কিশোরীভ্রমণ; স্থির অন্ধকার বদলে ফেলে এক দৃশ্য সমুদ্র অথবা দৈহিক প্লাবন।



সময়ের মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে যে চূড়ান্ত নাটাই
জমাট কামিজের রক্তে লিখো তার সামরিক দীর্ঘশ্বাস,
জারুলের বুক চিরে ডানা মেলা শালিকের দল জানে-
শীতার্ত বালিকার স্লেজে আসে কোন পরিযায়ী আয়না!

আজকাল সন্ধ্যা হলেই বুকের পাশে আয়না খেলা করে।
মৃতের নাম ভুলে যায় মার্চের শেষ সূর্য
ভেসে আসে হাজার নর্তকি-জেগে ওঠে নাভিশ্বাস-
ক্ষীণ কটির হাত ধরে চলে আসে পবিত্র ভাতার।
অথচ নৈঃশব্দের পাঠশালা ঘেঁটে মনে পড়ে সনাতন জন্মের কথা-
আয়না খেলার দিন; হুটহাট এঁকে ফেলা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।
নত হয় সেমিজের দৈর্ঘ্য, সোমেশ্বরীর বুক- নত হয় অশোকের অনুজ;
মুছে যায় দ্বিপ্রহরের ছায়াহীন নখ; স্থির দৃশ্য অথবা ম্রিয়মাণ কৈশোর।

শুধু অলৌকিক নিমের আড়ালে জেগে থাকে ম্যালানকলি হোর!











নৈঃসঙ্গ্যের তিনটি নাম


নৈশভোজ কথাটা মনে হলেই আমার যিশুর শেষ খাওয়ার কথা মনে পড়ে। উম্মত বেস্টনির ভিতর যিশু শেষবারের মতো খায় পরিব্যা্প্ত রুটি—সহসা আলো নিভে যায় মেরি ম্যাগদালিনের কৌমার্যের বামপাশে কৌণিকভাবে। আলো নেভার আগে জানতে পারি না আলোর গন্তব্য, বুঝি না আলো নিভে কোনখানে যায়। এইভাবে আলো আলো করে ঘুমের মধ্যে ঘরের দেয়ালে একটা বোকা টিকটিকির লেজ খসে যায়। আর একটা জুনিপোকা তা দেখে। তারপর আলোর মধ্যে জ্বলে নিভে যায় তার বুকের লুসিফেরিন। তিনশোমাইল বেগে টিকটিকির লেজ ছুটে যায় ছায়ালীন আফিমের বনে। আফিমবনের ছায়ায় বুড়ো গোরখোদক কারো প্রেতাত্মা তাড়ায়। প্রেতিনী তার ডানকাঁধে বসে ডাকে তিনটিপাখির নাম। ওইধারে আমার পিতার তরুণ কবরের জৈব খেয়ে বেড়ে ওঠে অড়হড়রে ডাল। অড়হড়রে পুষ্ট লতা কবরে উলম্ব পুঁতে দেয়া খেজুরের ডালে জড়িয়ে আকাশগামী হয়। আকাশে দীঘল প্রলাপ বাজে। কে করে প্রলাপ? ঈশ্বর নাকি! তার প্রলাপ ঘিরে দুইটা পাগল করে আরো দীর্ঘ বিলাপ। রাত্রির ভিতর ঘুমরে ভিতর, স্বপ্নের ভিতর, চোখের ভিতর দুপুর, দুপুরে টলটলে রোদ নামে। আমার নিঃসঙ্গ ছায়াটাকে আঁকে—সবিনয়ে আমাকে উপহাস করে। অমৃত যৌবনের লোভ দেখায় আমাকে। নির্বাসন থেকে ফিরে আমি কতোকাল বুকে বাঁধি হংসধ্বনি! নারী আর রতি এসে তাকায় স্বেদাতুর দেহে। কোথাও খাজুরাহের মন্দিরের গায়ে একটা টেরাকোটা ভাস্কর্যের নাম হয়তো আলাদা নয়। একটা পেয়ারার ত্বকের সবুজে বন্দী ভূমির ললিত সমুদ্রযাত্রা। সমুদ্র তার অশ্রুর বেড়িতে বেঁধে রাখে যে ভূমিতল, তার নাভীমূলে আমি মৃত্যুকে উপহাস করে জন্মাই বারংবার। একটা গভীর আলো ভাঙে অন্ধকারের পিঠে, দুইটা বাদুড় ডানার কানে পৃথিবী হয়ে উঠে শব্দময়।

হোক তা পরিযায়ী, কিন্তু প্রকৃত আয়না কখনো প্রতারণা করে না। আয়নাও এক অর্থে জীবন। আর জীবন থেকে পালানো যায় না। একা পালানো সম্ভব নয়। কোনোদিন আষাঢ়ের পূর্ণিমায় সিদ্ধার্থ পালানোর সময় তার পিছে পিছে চাঁদও গিয়েছিলো। একা যেহেতু পালানো যায় না, পালানোর কোনো মানেই হয় না এই ভেবে বিভিন্ন সন্ধ্যা ছিঁড়ে চায়ের কাঁপে জমিয়ে রাখি। ভাবি, বর্ষাযাপন সেও নিজের সঙ্গেই ছল। বিবাগী হওয়ার মধ্যে মুক্তি এই কথা সত্য নয় জেনে, মনে হয় বৈরাগ্যে পলায়নকামিতা থাকে। মৃত্যুতেই মুক্তি সাধারণ অর্থে। আর অসাধারণ অর্থে মৃত্যুতেও মুক্তি নাই। সুতরাং মানুষের আসলে মুক্তি নাই। আবার বৃষ্টি শেষে যখন রামধনু দেখি— তখন মনে হয় রামধনু প্রকৃত অর্থে এক রঙিন নৈঃসঙ্গ্যের নাম। আর মনে হয় কোনোরূপ বন্ধনেও মুক্তি নেই। মুক্তি আছে নৈঃসঙ্গ্যে। নিঃসঙ্গতাই তো আপন। সে কখনো ছেড়ে যায় না। আলোর মধ্যে সে ছায়ার ভিতর লুকিয়ে থাকে। আর অন্ধকারে বুকের ভিতর দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায়। আর আমি স্মৃতির ড্রয়ার হাতড়ে বের করে আনি শৈশবে হারিয়ে আসা প্রিয়তম বালিকার অস্ফূট দেহের ঘ্রাণ, কচি লেবুপাতা রং। সেই সবুজ ঘ্রাণও এখন প্রিয়তম নৈঃসঙ্গ্য হয়ে আছে।

একটা শাদা থানের নামে, একটা লালপুষ্প বৃক্ষের নামে, একটা ছিন্নমূল নদীর নামে জলের তলের সব পাথর মাছ হয়ে যায়। সেইসব মাছের কানকো কেঁপে কেঁপে যায়। সেই কম্পনেও গান থাকে। গান ও রতি সমার্থক। রতিরক্ত মদে আমি কেবল দূরের বাঁশি শুনি। আমি জানি, আমার যে বাঁশিঅলা—তার জন্মাবধি শ্বাসকষ্ট, তবু সে বাঁশি আমার জন্যেই বাজায়। বাঁশি শুনে শুনে আমি একটা নামহীন নদীর দিকে যাই। সেই নদী আর দূর সমুদ্রের গভীর শৃঙ্গারে যে সন্ধি হয় তা আমার আরক্ত দেহকে ঢেকে দেয়। আমি একটা বনের দিকে যাই। গিয়ে দেখি বনে গাছপালা নাই। বনে গাছ না থাকলে সেটা প্রান্তরে পরিণত হয়। প্রান্তরের শূন্যতা জানে আমার সকল পরিমাপ, আর স্মৃতির ভিতর তিনশো ষাটটা উদ্ভাস। আমি ভাবি, মানুষের নিউরনে গাছ লাগানো থাকে—গাছের পাতা নাই। মানুষের রক্তের ভিতর সেগুনের বন থাকে—বনে গাছ নাই। আমার বনসাই ভালো লাগে না। বনসাই চায় আকাশের উচ্চতা। অ্যাকুরিয়ামে মাছ ভালো লাগে না। সোনামাছ খুঁজে সমুদ্রের গভীরতা। খাঁচায় পাখি ভালো লাগে না, এই পাখি জানে না বনের বিস্তার। চিড়িয়াখায় জিরাফ ভালো লাগে না। জিরাফ আমার সহোদর বলে বোবা হয়ে আছে। আমার চোখের ভিতর পুড়ে যায় পৃথিবীর আলো। দূরগামী চোখে আমিও পরেছি মীনচক্ষু। এইভাবে চোখ ক্ষয়ে গেছে, ক্ষয়ে গেছে। ক্ষয়া চোখে দেখি রূপজীবার বিষাদ সেও সাধারণ, সবার মতোই। প্রতিটি মানুষই প্রকৃত অর্থে নানাভাবে নিজেকে বেচে দেয় নিয়ত।