রোদ ঝড় আর শীতকালীন গল্প

মাসুদার রহমান ও বেবী সাউ



আমার বাঙলা কবিতা

১.
তাকিয়ে রয়েছি; কেউ নেই। দূর পথের ওপারে ধুলো উড়ছে
কোনো অশ্বারোহী ? -কেবল বিভ্রম

টানানো দরিদ্ররেখা; তার নীচে পাখিরা কাঁদছে । কাঁদছে মানুষ

আমার বাঙলা কবিতা তুমি কি বিশ্বাস করো প্রান্তরে ছড়ানো
এখনো এতোটা ধোঁয়াশা

পড়ে থাকা বিষাদ ও নির্জনতাগুলো
নীচু হয়ে পায়রার ঠোঁটে তুলে তোমাকে দেখাব !

২.
পাউরুটির পেট কেটে সবজি ও কাটলেট
পুরিয়ে
খেতে গিয়ে ভাবি নতুন কবিতা নিয়ে

ভাবি; অপর অথবা পুনরাধুনিক কবিতা কি !

এর মধ্যে একটি গরম চায়ের কেটলি চলে আসে
যা আসলে দুধ ছাড়া

লেবুগাছ গাভীর ভূমিকা রাখে বিধবা চায়ের কাপে

৩.
জ্বরের ঘোরে যা যা বলি তাকে তুমি কবিতা ভেবো না

আরশোলা আসলে কী পাখি উড়ে যাবে
উত্তরমেরু থেকে
দক্ষিণ সাগরের দিকে
একরাত্রি ঝিঁ ঝিঁ পোকা সঙ্গীত সমগ্র করে
অন্ধআলোয় গা লুকিয়ে গাইছে নিশ্চুপ

কথাগুলো কবিতা ভাবছে কেউ !

কবিতার গভীরে কেউ খুঁজে নিচ্ছে ব্যক্তিগত জ্বর

‘এক গ্লাস জল দাও’ জ্বরগ্রস্থ লোক চাইছে
সাররাত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে

চাঁদ একটি প্যারাসিটামল





পথ এতটাই বিভ্রম হয়ে ওঠে কখনও কখনও ! মহুলের গন্ধে ভরে ওঠছে পটমদার শাল পলাশের দেহ । সুবর্ণরেখার রুনুঝুনু শব্দ । কলসী কাঁখে ওই যে মহুল ফুল নেয়ে আসছে নদী ছেড়ে দুটুকরো চাউনি কি ছুঁড়ল আমার দিকে । শরীরে শিহরণ জন্মালেই জন্ম হয় নতুনের । কতদিন এই শিহরণ নেই ! কতদিন আগে চোখে ড্রপ ফেলতে ফেলতে ক্ষুদ্রতম জলবিন্দু টিকেও দান করে বসে আছি ফোর জি নেটওয়ার্ক এর কাছে ! খসখস শব্দ আজকাল বড্ড অচেনা লাগে, ভয় করে এই পিঠ ঠেকে যাওয়া দুনিয়ায় আবার কি নতুন কারো পদচারণ । আবার মানিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় ! আবার ভেঙে ফেলা এতদিনের পোষ মানা অভ্যাসের ! খুঁটে খাওয়া প্রতিটা জীবের জন্মগত ব্যাপার । মানিয়ে নেওয়াই তোর আমার সম্পর্কের দীর্ঘ পাঁচ বছর । তারপরেও কেমন ভাবে গোপন কেমন নিজস্ব জায়গা করে রাখে দেখ ! দেখ কেমন ভাবে ছুঁতে চায় আলোকধারার দুটুকরো গলি ! এখানে তুই নেই , কলেজ ক্যাম্পাস নেই , আমার জন্য বরাদ্দ চোখের লাল রঙ নেই । এখানেই মিশেছে যাবতীয় দিগন্তের সূত্র । আর ঠিক এখানেই পাখি হওয়ার বিস্তারিত স্বাদ । ভুবনডাঙার মাঠ ছুঁয়ে , জলজ্যান্ত নদী টপকে শুধু ডানা আর ডানা ।

বাবা বলতেন , মানিয়ে নেওয়াই মধ্যেই পৃথিবীর যাবতীয় সমৃদ্ধি । সেই বাবা তখন সিনিয়র সিটিজেন । পেনশনের লাইনে মানিয়ে নিতে নিতে হঠাৎ ছুটে আসা দু'চারটে "যৌবনের দূত"দের মধুধারা ; বাসের লাইনে টাইট জিন্স এর "চোখের মাথা খেয়েছেন" -- দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের মানুষ গড়া কারিগরি র চোখে কি তখন আগুন জ্বলেনি কিংবা জলস্রোত ! ভোর ভেঙে জেগে ওঠার মধ্যে যতটুকু যুদ্ধ থাকে তাচেয়ে খানিক বেশী সূর্য ভেঙে ঘরে ফেরার । হাঁটু ভর্তি ধূলো ,সাইকেলে পিছলে ওঠা রোদ নিয়ে প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরতেন বাবা । কাঁসার ঘটিতে জল তুলে ধরতেন আমাদের মা । কপালের লাল টিপে জ্বলজ্বল করত সূর্যের প্রতিচ্ছবি । আমাদের তখন নামতার বই ,আমাদের তখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বর্ণপরিচয় । শিউলির তলা ধরে থাকত সাদা ফুলে । এই দুমুঠো উঠোন জুড়ে ছুটে বেড়াত শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টো । বাবার দরাজ গলায় দেবী আহ্বানের সুর । মা তো রবীন্দ্র সঙ্গীত । খুন্তির শব্দে বেজে উঠল হারিয়ে যাওয়ার মানা ... । জ্যোৎস্নার আলোকে হারিয়ে যাওয়া তারাদের খোঁজে বাবার তর্জণীর সঙ্গে চোখ বুলাতাম নীলের খাঁজে । নীল তখন শূন্যতা নয়, নীল মানে একমুঠো আকাশ ---বিরাট ছাদ , আদিগন্ত আকাশ ।নীল মানে পুকুরপাড়ের ঝিঁঝিঁ , পাতিলেবুর গন্ধ, ভরপুর আলোমাখা জ্যোৎস্নার গল্প । এই ছিল আমাদের কাঠা দুই বাড়ির কবিতা । আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রা । আমার আর বোনের পুরানো পোষাক পাল্টে ফেলা এরপর । বারবার । বহুবার ।

অনেকটা সময়ের পর , আজ মনে হচ্ছে এবার জেগে উঠি । সকালের এই বিচিত্রমুখী হাওয়াটা অনেককিছু টেনে তুলছে , পৌঁছে দিচ্ছে এক আশ্চর্য ভ্রমণে । কৌণিক দূরত্ব চোখের অসুখে বৃহত্তর হয়ে দাঁড়ায় । দূরের দলমা তখন শুধুমাত্র পাহাড় --- হঠাত করে মেঘে হারিয়ে যাওয়া কিংবা জল ছুঁই খেলা আপনভোলা মেয়ে ।সর্বত্র ছেয়ে আসা হাতির শুঁড় তখন আর কত ভয় দেখাবে আমাকে । জল নেই বলে শস্যক্ষেত শুকনো পড়ে আছে। আমি একা একা দূরত্বের সঙ্গে জমিয়ে তুলছি আলাপ । ভাবছি এই দূরত্ব নিয়ে এবার নাহয় গায়ক রূপকল্পের দু চারটি কথা কিছু পোশাকী গান ।

চোখগুলি জ্বালাচ্ছে খুব । অধিক জ্বলছে তোকে না-পাওয়ার বায়নাগুলো।
এত নিষ্ঠুর হোস কীভাবে ! কীভাবেই বা হত্যা করিস সু-খবর পালকগুলি !

কোথাও কী যাওয়ার নেই ! অখন্ডে নেই কী কোন নির্ভেজাল ভরসা ! কোথাও যেন জমা হয়ে আছে অবসরের ব্যাগ । চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্মৃতি মুগ্ধতা ।
শুধু মেঘ গাঢ় করে আছে ! হারিয়ে যাচ্ছে আনন্দ-নিদর্শণ ।

রোদের অপেক্ষা না করে আমাদের ঝড়কে আমন্ত্রণ জানানো উচিত এবার ।