রূপকথার মিসিং লিঙ্ক

কিশোর ঘোষ ও বিশ্বদীপ দে



বারবার ঝড় মেখে ফিরছে বাতাস
সাইকেলের সামনে বসিয়ে
সন্ধেকে নিয়ে
ঘুরছে চাঁদ
বেদনার ঔরসে বাড়ছে প্রতিভা, স্পষ্ট হচ্ছে জানলার কাজ---
আমিও এক উশকো খুশকো দৃশ্য
বক্তব্যপ্রধান


যে বিকেলে রেখেছি নিজেকে, সেই চায়ের দোকান থেকে
তিন মাইল দূরে
শ্বেতভল্লুকের দেশ
ভিতরে বরফ পড়ে, বাইরে বোঝা যায় না---
এ চায়ের দোকান যে অপার্থিব ইগলুবাড়ি,
আমরা যে মারা গেছি বহুদিন আগে
এখানে এলে আর মনে থাকে না!


তবে ধানখেত এখনও চেনে
গা ছমছমে রাতের দিকে
অভিযাত্রী চেতনার চাঁদ
স্বপ্নের ফসল কাটে...

আর
সাইকেল ভিজে যায় কার
সুস্বাদু জ্যোৎস্নার
পাল্লায় পড়ে




তাছাড়া এখনও অনেক অকারণ মর্নিং ওয়াকেরও
মুখ চিনি আমি---
মিষ্টি শিউলি যে দুষ্টু উঠোনের ঠোঁটে
চুমু খেতে নামে, সুন্দরের গা ঘেঁষে হাসে... আমি ওই
পাশে পাশে বড় হওয়া
প্রত্যক্ষদর্শী


এবং দেখেছি, শিখেছি বহু
মানুষ হেরে গেছে লোডশেডিং-এ
জানলার সামনে চাঁদ না, এসে দাঁড়িয়েছে
অ্যাসিডের কারখানা
কত কতবার দীর্ঘশ্বাসেই
বাতাসের কাজ চালিয়ে দিয়েছি

তোমাদের ভাঙা মন সারাতে সারাতে
নিজেকেও ভুলেছে প্রেমিক দর্জি


ডায়েরি লিখে রাখে সব, এইসব
এক জীবনের সমস্ত আহ্নিকগতি
সূর্য এবং
ঝোলানো কানের দুলের মতোন তারা
রাজপুত্র, রাজকন্যা ও রাক্ষসের কাহিনি---

ঈশ্বরচন্দ্রের বর্ণপরিচয় আর
অনন্ত সরস্বতী পুজোর রাত
মানুষের হাতে-খড়ি



সূচনা
লেখার ওপর ঝুঁকে আছে মেঘ। মেঘের গভীরে ঈশ্বরীর অসুখ।
এক অপার্থিব শিস মাথার মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে লেখকের। উৎসবের শেষে গভীর রাতের মতো গমগমে হয়ে আছে মন। একটা সুরকে কাগজের পিঠে অক্ষর দিয়ে বুনে রাখতে চাইছে সে। বলা হয়, শিল্পের এক মাধ্যম আরেক মাধ্যমের দিকে চলে যেতে পারে। কেবল নিয়ে যেতে পারার ক্ষমতা চাই। লেখক নিজের ক্ষমতা নিয়ে খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। একটা সুরকে বাক্যের আধারে আলতো করে রেখে দিতে পারা সহজ নয়। তবু... সুর আর কাব্যের মতো অশরীরী নির্মাণ তার কলমের ডগায় এসে ফুটিয়ে তুলছে গদ্যের ঘরবাড়ি...


মেয়েটি ফিরে আসছে।
ফিরে আসছে সসংকোচে। কাঁধের ব্যাগটাকে আঁকড়ে ধরে, কেমন জবুথবু ভঙ্গিতে। তার চলার মধ্যে এক আশ্চর্য ব্রীড়া। খুব ধীরে সে এসে দাঁড়ায় পলাশ গাছটার কাছে। এইখানে কাল রাতে তার কানের দুল খুলে পড়ে গেছে। গোল, উজ্জ্বল, সোনালি একটা দুল। সোনার নয়। সোনালি। সামান্য দাম। পাড়ার দোকান থেকে কেনা। তবু সেই দুলের জন্যই আজ তার ফিরে আসা। এই নির্জন দুপুর, রোদের যথেষ্ট তেজ... তবু কলেজ থেকে ফেরার পথে বাড়ি না গিয়ে অন্য পাড়ার এই গাছের কাছে ফিরে এসেছে মেয়েটি।
কিন্তু কোথায় গাছ? মেয়েটি চমকে ওঠে। যে পলাশ গাছের শরীর এই রাস্তায়, এই পার্কের পাশে অবলীলায় দাঁড়িয়ে থেকেছে এতগুলো বছর ধরে, সেটা উধাও! নেই... স্রেফ হাওয়া হয়ে গেছে। গাছের গুঁড়ি বা ন্যূনতম চিহ্নের আভাসটুকুও নেই। তার শূন্য শরীরের জায়গায় এখন খানিকটা রোদ আর ধুলো পড়ে আছে।
এক রাতের মধ্যেই গাছটা কী করে অদৃশ্য হল? কেমন এক অলৌকিক ভাবনায় ছমছম করে উঠল মেয়েটির মন। দূরে পুকুরপাড়ে কারা যেন গল্প করছে। মেয়েলি আড্ডা। একটা আইসক্রিমের গাড়ি চলে গেল। উলটোদিকে পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দুই তরুণ সিগারেট খাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, কোথাও যাওয়ার নেই তাদের। কথা বলতে বলতে ছেলেদুটো তাকাচ্ছে মেয়েটার দিকে। চারিদিকে একটা অলস সময়ের খোল পড়ে আছে।
আস্তে আস্তে ছেলেদুটো স্থির হয়ে যায়। পাশের বাড়ির কার্নিশে বসে থাকা কাকটাও। সবকিছু ‘ফ্রিজ’ করে যায়। মেয়েটা আবিষ্কার করে সে একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একটা নিরালা দুপুরের ছবি। জল রঙে আঁকা। ক্যানভাসে আটকে থাকা সেই ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। ছবির ভেতর পার্ক, পোস্ট অফিস, আইসক্রিমের গাড়ি, দূরের পুকুরের হালকা আভাস, ছেলেদুটো... সব সব কিছু অবিকল জলছাপের মতো লেগে আছে। মেয়েটি ছবিটার দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকে।
আসলে যেভাবে গাছটা আর ওই জায়গায় নেই, ছবিটাও নেই কোত্থাও। তবু মনের ভেতরে ক্যানভাসে রং চড়ায় মেয়েটি।

ছেলেটি শিস দিয়ে চলেছে অনর্গল। এফএমে গান বাজছে। নেহাতই বাজারচলতি হিন্দি গান। তেমন কিছু মেলোডিয়াসও নয়। আচমকা গান থামিয়ে দিয়ে যদি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা যায়, কী গানের সঙ্গে সে শিস দিচ্ছিল, বলতে পারবে না। কেবল সুরটুকু হয়তো শুনিয়ে দেবে, কিংবা কে জানে, সেটাও পারবে কিনা।
রেডিয়োর পাশেই অলোকদার উনুন। সেখানে ফুটে যাচ্ছে চা। সামনে রাখা বিস্কুটের বয়ামগুলোর ভেতর উঁকি দিচ্ছে প্রজাপতি, শোলে, মেরি, সন্দেশ বিস্কুটের সারি। এপাশে বেঞ্চে বসা কাকু-জেঠু-দাদাদের সম্মিলিত চায়ের আসর। কথা কখনও থেমে থাকে না এখানে। ওই চায়ের মতোই সব সময় বগবগ করে ফুটে যাচ্ছে। চায়ের গন্ধ, আড্ডার মেজাজ আর গায়ে এসে লাগা আলতো রোদ্দুরের ছোঁয়াচ... ছেলেটির ভালো লাগছে সব। ছেলেটির পাশে বসে আছে তার বন্ধু। আলতো করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে ছেলেটিকে দেখে। সামনে রাখা চায়ের কাপ। কিন্তু ছেলেটি খাচ্ছে না। শিস দিয়ে যাচ্ছে। দু-চোখ বোজা।
কাল রাতের দৃশ্যে এখনও নিজেকে রেখে দিয়েছে ছেলেটি। ওই পলাশ গাছের নীচে যখন আদরের ভেতর ঘন হয়ে আসছিল দুজনের শরীর... মনে পড়ছে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং ধ্বনি আর ভিড় কেটে বেরিয়ে যাওয়ার কথাও... ছেলেটির নাকের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল মেয়েলি গন্ধের একটা আস্ত বাগান।
আচমকা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছেলেটির বুকে একটা ছোট্ট কিল মেরে মেয়েটি ছিটকে সরে যায় দূরে। তারপর হাঁটা দেয় বাড়ির পথে। ছেলেটিও সাইকেল নিয়ে হাঁটে। হেঁটে চলে যায় দুজনে। পাশাপাশি।
সকলের অলক্ষ্যে একটা দুল পড়ে থাকে গাছের নীচে। তার ওপর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়ে। কোথা থেকে এত রাতে দুটো প্রজাপতি যেন উড়ে যায় চাঁদ আর দুলের মাঝখান দিয়ে। আবার ফিরে আসে।
তারপর আর আসে না। গাছটার সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় ওরাও।

ছেলেটি হাঁটছিল এক নির্জন ধানখেতের ভেতর দিয়ে। এত রাতে... শরীরের ওপর যেন কেউ মদ ঢেলে দিয়েছে। একা একা নেশাগ্রস্তের মতো হেঁটে যাচ্ছে সে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে চিরকালের জ্যোৎস্না। দুধ আইসক্রিমের কাঠি থেকে গলে গলে নেমে গেছে খেতের ভেতর। ছেলেটি জানে আজ আর বাড়ি ফেরা যাবে না। সারা শরীরে মেয়েলি একটা বডি স্প্রে-র গন্ধ!
প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে কবে সে দেখেছিল এক দৃশ্য। মুচকি হেসে চলে যাচ্ছে পাশের বাড়ির বনিদি। আর বন্ধুদের নিয়ে উলটোদিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখছে রানাদা। কবেকার এক সকাল। সবে প্রাইমারি স্কুল সেরে হাইস্কুলে ভরতি হওয়ার বয়সে পৌঁছেছে সে। দিদির সঙ্গে সকাল সকাল হাঁটতে বেরোত। তখনই চোখে পড়ে দৃশ্যটা। রানাদার বলা একটা কথাও মনে আছে, ‘ধুর শালা, আর কতদিন ফিল্ডিং দেব বল তো। বেকার ঘুম থেকে উঠে...’
বনিদির সঙ্গে রানাদার বিয়ে হয়নি। প্রেমও হয়েছিল বলে কোনওদিন শোনা যায়নি। খুব গোপনে কিছু হয়ে থাকলে আলাদা কথা। ওই ছোট্ট পাড়ায় অবশ্য সেটার চান্স খুব কম ছিল। কারও না কারও চোখে পড়তই। কিন্তু ওদের সেদিনের সেই মর্নিং ওয়াক ছেলেটিকে রাতারাতি বড় করে তুলেছিল।
সেই সকাল সে ভুলবে না কোনওদিন। মনের মধ্যে একটা দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ হয়েছিল যেন। তক্ষুনি এত কিছু বোঝা যায়নি। কিন্তু যত সময় গেছে, তত সেদিনের সেই তার মাথার মধ্যে কেউ একটা ফুলঝুরির মতো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। অনর্গল সেই ফুলঝুরি থেকে ঝরে ঝরে পড়েছে লাল-নীল নানা রঙের ফুলকির রোশনাই।
সাইকেল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছেলেটা। কোথায় যাবে? কদ্দুর যাবে সে? সে কি পলাশ গাছটার কাছে ফিরে যাবে? তার মনে হচ্ছে সে একা নয়, মেয়েটিও ফিরে আসছে ওই গাছটার কাছে।

যে রাতে মেয়েটি চলে এসেছিল গাছটার কাছ থেকে।
যে দুপুরে মেয়েটি ফিরে এসেছিল আবার।
দুটোর মধ্যে দিয়ে সময়ের এক বিরাট সাঁজোয়া গাড়ি চলে গেছে। সেই গাড়ির তলায় চাপা পড়ে গেছে সব। মেয়েটির শরীর ওই গাছের কাছে গিয়েছিল। মেয়েটির মন এক দুপুরের নিরালা প্রশ্রয়ে আবার ফিরেছিল ওই পার্কের পাশে।
পুরোনো মন কি ফেরে? অবিকল? মেয়েটি ভাবতে থাকে। গাছটা কোথায় চলে গেল? ভাবতে ভাবতে সে জানলায় এসে দাঁড়ায়। তার শীত করছে। এত শীত করছে কেন? মেয়েটি বাইরে তাকায়। আর তাকাতেই চমকে ওঠে।
ধু-ধু বরফের প্রান্তরের ভেতর একটা গাছ। ডালপালাহীন। তার মাথার কাছে গোল ন্যাড়া একটা চাঁদ। কোনও সন্দেহ নেই এটাই সেই গাছ। এরই ডালপালায় একদিন পলাশের লাল রং লেগেছিল। মেয়েটি ছুটে যায় খালি পায়ে। বরফে যেন পা ঝলসে যায় তার। তবু সে ছোটে। কেননা, ওই গাছের তলাতে বরফের গভীরে একটা দুল পড়ে আছে। মেয়েটি বরফ খুঁড়তে থাকে পাগলের মতো।
আস্তে আস্তে দুপুর থেকে রাতদুপুর হয়ে গেছে কখন, মেয়েটি জানেও না। খুঁড়তে খুঁড়তে মেয়েটির হাত কেটে যায় কীসের খোঁচায়। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে হাত সরিয়ে নেয় সে। দেখে একটা বিস্কুটের বয়াম। ভেতরে প্রজাপতি বিস্কুট। বয়াম খুলতেই শোনা যায় এক অলৌকিক শিস। কেউ কোথাও নেই। তবু চরাচর জুড়ে সেই শিস তীব্র হয়ে বেজে ওঠে।
মেয়েটির রক্ত টপটপ করে ঝরে পড়তে থাকে নিঃসঙ্গ বয়ামের ভেতর।

‘সুরটা মাথার মধ্যে যেমন যেমন ছবি আঁকছে, সেই ছবিটাই লিখে রাখতে হবে।’ বিড়বিড় করে লেখক। আর লিখে যয় সোনালি দুল, পলাশ গাছ, সাইকেল, ধানখেত, প্রজাপতি বিস্কুট আর বরফের গল্প। সে কখনও বরফ দেখেনি সামনাসামনি। কিন্তু টিভিতে দেখেছে। সিনেমায়, ডকুমেন্ট্রিতে। কবেকার প্রিয় এক রিংটোন মাথার মধ্যে নাগাড়ে বেজে যায়। এক প্রাগৈতিহাসিক মনোফোনিক রিংটোন। কিন্তু সেই পুরোনো নোকিয়া এগারোশো ফোনটা সে খুঁজে পায় না। হয়তো বরফের তলাতে চাপা পড়ে আছে। লিখতে লিখতে থমকে গিয়ে ভাবে লেখক। সেই শিসের সঙ্গে কি ওই টোনের কোনও মিল আছে? ভুরু কুঁচকে ভাবে সে।
পৃথিবী জুড়ে একটা যুগ পেরিয়ে অন্য যুগ আসে। সেটাই নিয়ম। আগের যুগের সবকিছু খুঁজে বের করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা। একটু আগে, এই লেখা লিখতে বসার আগেই সে ডিসকভারি চ্যানেল দেখছিল। সেখানেও এরকমই এক খননদৃশ্য দেখাচ্ছিল। লেখক আবার লেখার ওপর ঝুঁকে পড়ে।
মফস্‌সলের বিকেলের মতো মেঘ করেছে আকাশে। তার নীচে এক প্রাচীন সভ্যতার আবিষ্কারে মত্ত এক প্রত্নতাত্ত্বিক। তার মুখে ঘাম জমে আছে। আঙুলের ডগায় জমে আছে বর্ণ। এত নিস্তব্ধ রাতে কাগজের গায়ে কলমের খসখস শব্দ যেন ঝড়ের মতো শোনাচ্ছে।
ঝড় তো একটা হচ্ছেই। লেখক আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় আঁকাবাঁকা বিদ্যুৎরেখা। ঠোঁটের ডগায় ধরানো সিগারেটে আগুন ধরাতে ভুলে যায়। দেখে হাওয়া এসে সরিয়ে দিচ্ছে ধুলো। জমে থাকা পাথর কুঁদে কেউ একটা নোকিয়া এগারোশো ফুটিয়ে তুলছে। একটা ছোট্টো রিংটোন। অ্যাসাইন করা এই টোন বাজত কেবল মেয়েটার ফোন এলে। কিন্তু ফোনটা ধরল না ছেলেটা। খানিক পরে একটা মেসেজ আসার শব্দ। কেঁপে উঠে থেমে গেল ফোনটা।
মেসেজটা খুলতেই খানিকটা উষ্ণ তরল তার চোখেমুখে ছিটকে এসে লাগল। চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল ছেলেটা। নিঃশব্দে অ্যাসিড এসে পুড়িয়ে দিচ্ছে চামড়া। চামড়া ভেদ করে গলিয়ে দিচ্ছে মাংস। শরীরের মধ্যে ফুটিয়ে তুলছে শূন্য গর্ত।
উপসংহার
এক অনন্ত রাত আজ নেমে এসেছে শহরের বুকে। লিখতে লিখতে লেখক হেঁটে বেড়াচ্ছে ফাঁকা রাস্তায়। কেউ টেরও পাচ্ছে না, অ্যাসিড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আর গলে গলে পড়ছে চারপাশ। মুছে যাচ্ছে সব। শহরের বুকে জেগে উঠছে মফস্‌সল। কবে কোথায় কী এক ভুল বোঝাবুঝি শেষে যে ছেলেটি আর মেয়েটি এই গল্পের থেকে দূরে চলে গিয়েছিল তারা আজ আবার ফিরে এসেছে। কীসের ভুল, দোষ কার সেসব জানার কোনও ইচ্ছে নেই লেখকের। কেবল এক অপার্থিব শিসের ভেতর সে কেবলই খুঁড়ে চলেছে নিজেকে। যেন অন্য কারও স্মৃতির ভেতর ঢুকে পড়ছে।
লেখকের মনে হল, এইসব অক্ষর আর যতিচিহ্ন সব তার কাছে নতুন। এইমাত্র সে লিখতে শিখেছে! প্রিয় ছবি ‘ফরেস্ট গাম্প’-এর একটা দৃশ্য আচমকাই মনে পড়ে যায়। যখন নিজের প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে আচমকাই দৌড়োতে শিখেছে এক মরিয়া কিশোর... আর দৌড়ে বেড়াচ্ছে পাগলের মতো... নিজেকে অবিকল সেরকমই মনে হচ্ছে। এতবার চেষ্টা করার পর অবশেষে আজ তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে তার কলম। কাগজের গায়ে খসখস করে সে লিখে চলেছে অনর্গল।
নিজের গতজন্মের কথা লিখে রাখছে এক জাতিস্মর। মিলিয়ে দিচ্ছে সব রূপকথার মিসিং লিঙ্ক।