এভাবেও শুরু করা যায়...

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ও সাগুফতা শারমীন তানিয়া




নিজ-মুখে অস্বীকার যাই
আমি মরি আমার খাঁচাত্
আমার তো সামনা কোনো নাই
আছে এক বিপুল পশ্চাৎ


আমারে শেষদিকে চিনতে পারত না একদম। আমারে সে
কাচের নজরে দেখত। যেন আমি বদ্ধ ছদ্মবেশী।
তারপর তিনটার দিকে একবার চেনবার দুশ্চেষ্টায়
ভুরুটা বাঁকিয়ে রাখল, তা-সমেতই হাওয়ার তেষ্টায়
নেমে গেল শতশত রাজস্থানী ধাপ। আমি আর
শুনি নি পানির শব্দ, খুলি নি কাশ্মীরী জামিয়ার
পাতের উচ্ছিষ্ট ঢাকতে। আমি খালি ডাকলাম ডাক্তার।

আমার অস্তিত্ব থেকে মুছে গেল শতদ্রু আখতার।

ও স্বচ্ছ, স্বচ্ছ রে,
এ-চল্লিশ বৎসরে
কয়টা দিন, কয় মিনিট
বাঁচলি তুই ইনফিনিট?
আজকে রাত কৃস্টালের
দৃষ্টিপাত বৃষ্টালে
তুই অটুট খাম খুলে
নিস তুলে আঙ্গুলে
আমার চোখ, চোখের ঘুম,
শবের শেষ তবসসুম—
তার পরে দিস ফেলে
নির্মুষ্ক নিষ্ফলে।
স্বার্থপর, হারামখোর,
মকার-তীর্থধ্বাঙ্ক্ষ,
এর লাগি মরলে কি
স্বর্গলাভ তোর? লেকিন
অদ্য তুই জন্মাবার
মুহূর্তে, শোন্ বাবা,
এই ছায়া ছিন্ন কর্,
তীক্ষ্ণ কর্ শ্যেন-নখর,
বাক্-ঢাকনা-মুক্ত হোক
ইস্টারের সপ্তাহ—
আয় বেরো খোল ছেড়ে,
ও স্বচ্ছ, স্বচ্ছ রে!

প্রায় সকলেই সুখী, সুখী-সুখী চোখে-মুখে আলো;
আমিও সুখীই প্রায়, সুখে-সুখে জৈবন গোঁয়ালুঁ।
যারা যে-রকম সুখী তারা সে-রকম সুখই চায়;
যে-মুখে সুখের স্বেদ, সে-ই মুখে কালো চোখে চায়।
একতিল অসুখ, সেও রূপসীর সাদা-গালে তিল—
আজি এ সুখের দিনে, আইসো হই একসাথে বাতিল,
কাতিল আমার! আমি তোমার বুকের উপাধান
জুড়িয়া চষিতে চাই দংশনের রূপশালিধান...

একটা জীবনে যত জীবন
একটা মরণে তত মরণ।

রোদের অভাব অন্ধকার?
অন্ধকারের অভাব রোদ?
আমার হিংসা, ক্ষমা তোমার
কে কার চাইতে প্রবল যোধ?

একটা জীবনে যত মরণ
একটা মরণে তত জীবন।



এটা খাওয়াদাওয়ার গল্প

এই যে আমাকে দেখছ, মৎস্যগর্ভা পাতুরির পাতার মতো পোড়া-জীর্ণ মুখ, এর একটা গল্প নিশ্চয়ই আছে, সে গল্পে একটা লোক নিশ্চয়ই আছে, গ্রাফাইটস্টিকে আঁকা কালো লোক তার বুকটাও লেডপেন্সিলের শিষের মতো কালো আর শুধু পিঠখানা ছিল ওয়ালনাট ফিনিশ। তার গল্প আমার ভেতর থেকে গলগল করে ভলভল করে বেরিয়ে যাবে বলে আমি একটা নিখুঁত বেকড চিকেন কিয়েভের মতো উপুড় হয়ে শুয়ে থাকব। চাপ দিও না আমাকে।

তার চেয়ে ছোট ছোট মৃত্যুর কথা হোক। যতবার ঠাঁইনাড়া হয়ে আবার বসেছি, সেইসব স্থানে আমি রেখে এসেছি ছোট ছোট স্যান্ড-ডিউন, বালিতে গড়া অবতল- সেইসব গল্পের কথা হোক। যে গল্প তোমাদের বলবো না বলে ঠিক করেছি, সে গল্পের চারদিকে আমি সারাবেলা পিটুলি গুলে আলপনা দিতেই থাকব, দিতেই থাকব, কিছুতেই পরিধি ছেড়ে ভেতরে ঢুকব না। তোমাদের গায়ে এসে লাগবে দীর্ঘশ্বাস- হাওয়ার ঝাপট, ভেতরে কোথাও প্রবল বিষাদের রূপতরাসী হাতিঘোড়া খেয়ে ঘুমোচ্ছে এইসব বোধ করে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যাবে। জানবেই না আল্পনার ভেতরে আপূর্যমান কে, তুলে দেয়া সুরকির দেয়ালের আড়ালে কোন নর্তকীর শব। কিংবা তুমি আসলে দেখবে আমার সুখী সুখী মুখ, সকালের আলোয় কী নির্মল- নিপাট করে রেখেছি, দেখলেই তোমার মনে হবে এই তো নিকোনো আঙিনা- কাঠের সদর দরজা- দু’পাশে ঝুমকো জবা- পেছনে হাঁসপুকুর। বিপুলনিতম্বিনীর মতো করে আমার না বলা কথা আমার পিছেই থাক। দুষ্টলোকে দেখবে আসলে আমার বিপুলাজঙ্ঘাও তো... তার মানে নিতম্ব বিপুল, তার মানে আমি আসলে থপথপিয়ে এলেই আর কিছু লুকোতে জানি না। তার মানে সদর থেকে হাঁসপুকুর আর বাঁশঝাড় অব্দি যেতে যেতে তুমি বা তোমরা দেখেই ফেলবে কি আছে লুকোনো ছায়াচ্ছন্ন মশারীঘেরা কাঠের তক্তাপোশে কিংবা তার ঠিক তলায়। নাহ, এমন সহজ করে কিছুই রচনা করি না আমি। এই আলো-আলো ভোর-ভোর মুখটা সত্ত্বেও না। আমি কেবল আমার চৌকাঠ থেকে বাচ্চার কান্না শুনে ভেতরঘরে দৌড়তে দৌড়তে বলবো, “বাছা কুশান, লাগলো তোর?” তোমরা শুনে নিও মর্মান্তিক “বাছা, এলি না তো!” মিলিয়ে নিও আন্তর্জাতিক খবরে কোনো টাটকা মৃত শিশুর জলের ধারে উপাতিত শুয়ে থাকবার দৃশ্য (গোটা লেন্টের ছুটি আমি তাই নিয়ে হাহাকার করেছি জেনো)। তার বাইরে আর কিছু নিও না, অন্ধকারে কম্প্রগাত্র হরিণীর কান্না নিও না, শীতে ওর গা থেকে ওঠা ভাপ নিও না। বেপথু সুরভোলা হরিণীকে শিকার করতে মহারাজা বাজিয়েছিল তোড়ি- নিও না।

আহা, যেমন ইচ্ছা তুলে নিও। নিও-না বলবার আমি কে। আমাকে তো পাবে না। আমি সেই নর্তকীর শব। দেয়ালের বাইরে মাথা কুটে গেছে দাঈ, শৈশবের ভাই আর যৌবনের খেলুড়ি যুবরাজ। তোমাদের যার যার কাটা-কাপড়ে আমার জামা ছাঁটবে, আমি তাই তাই পরে সামনে দাঁড়াব। যার যার যেমন যেমন ছিট-কাপড়ে মনে হবে আমাকে মানাবে, আমি তাই তাই গায়ে জড়িয়ে আবার আমার আলো-আলো মুখটা পরে দাঁড়িয়ে পড়বো। ঝোলের মাছটা তপসে না ফ্যাঁসা জিজ্ঞেসও করবো না।

বাজারের দশকর্ম্ম ভান্ডারের পাশে আমি সাজিয়ে রেখেছি আমার হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক। সারি সারি বোতলবন্দী মুশকিল-আসান। কেউ চুরি করেও নিতে পারে না এমনি সব ওষুধ। জানবে কি করে কোনটা কোন ওষুধ। কোন আরশোলা রঙ কাঁচের আড়ালে স্ফটিকীকৃত আছে সানাইয়ের তোড়ি, হরিণীর ভাপ?

তার চেয়ে এসো, সুজাতার পায়সের মতো বিভোল শৈশবের কথা বলি। ছোট ছোট স্যান্ড ডিউন, বিঘতমাপের সব গর্ত যা যা বসে থেকে থেকে ফেলে এসেছি ভেজা মাটিতে। এই আমার কেমন গলার যেখান থেকে বড় ক্বাফ উচ্চারিত হয় সেইখানে ব্যথা-ব্যথা করতো সকালের লুচিভাজা খেলে। কারণ লুচি খাবার সময় নানাভাই প্রতিবার বলতো তার ছোটবেলায় বড়ভাবী ময়ান দিত গাওয়া ঘিয়ে আর ভাজতো ভয়সাঁতে। মুর্শিদাবাদের সকাল। মহারাজা নন্দী আর মহারাণী কাশীশ্বরীর ইস্কুল। অপশন দিয়ে চলে আসবার সময় ঘিয়ের ময়ান, নেতানো লুচি, শরতের পচে ওঠা তালাবের পানি, বড়ভাইয়ের কবর নাকি জ্যান্ত বড়ভাই কি কি নিয়ে এসেছিল সেইসব আর জানা হবে না তো। নানাভাই বেঁচে নেই। তার তিন সোহাগিনী বোন চেলী-বেলী-ফেলী বেঁচে নেই। ফেলীনানীকে আমি দেখেছি কবেকার বটিতে কাটা দাগ দেখিয়ে জলঢোঁড়ায় কেটেছে বলে কাঁদতে নানার কাছে। বেলীনানীকে দেখেছি পালংকের অন্তিম অন্ধকার থেকে ডাক দিতে আমার মাকে, “অই রে হাসু, আয় আমরা শুইয়া থাকি!”, এমন মিষ্টি যেন শুয়ে থাকা জগতের শ্রেষ্ঠ একটি কাজ। আমি এইসব লিখছি আর আমার নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে, শুইয়া থাকার গল্প শুইয়ে রেখে মুখে ভোর-ভোর আলোটা টাঙিয়ে রেখে আমি শুয়ে পড়ার গল্প ভাবছি। লেডপেন্সিলের শিষের মতো রঙ পাটাতন মাপের বুক- একদা আমার একান্ত উপাধান, কাশের শরের মতো কিসব মুখে অভিঘাত করতো আমায়- পায়ের তলায় কখন সরসর করে চলতে শুরু করেছে কাশবনের সাপ... আমরা দুই অপাংক্তেয় গোটা পৃথিবীর পংক্তি থেকে ঝরে ঝরে যাব বলে, গুঙিয়ে গুঙিয়ে ঝরে যাব বলে-

নাহ, ঝলসানো বুকে ভস্ম উড়িয়ে তোমরা দেখে ফেলবে ভাঙা পাঁজরে কত কত মাড-পাডল! কত সব স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার! ঠনঠনে কূপে বালতি ফেলতেই উঠে এসেছিল কোন রূপবান পয়গম্বর! আবার শৈশবে ফিরে আসি, কাঠের বেঞ্চিতে বসে ‘আন্তর্জাতিক তারিখ-রেখা’র দুইপাড়ে সময়ের অংক করছি আর পেন্সিলের শিষ চিবুচ্ছি তাতে ফিরে আসি। এই এখন আমি সারাবেলা চেলী-বেলী-নেলী করবো, তোমাদের খারাপ লাগবে না দেখো। মুখ ফিরিয়ে চোখ ঠেরে শাদাকালো নায়িকা গাইতেই থাকবে- “বানাওয়াট হি বানাওয়াট হ্যাঁয়, মুহব্বত করনেওয়ালোঁ মে”... ময়রার দোকানের সামনে আমরা মৌরিগন্ধী মালপোয়া খাচ্ছিলাম আর ধুলো উড়িয়ে ব্যারাকপুরের দিকে চলে গেল পুলিশের গাড়ি- কর্পোরেশনের গড়ে দেয়া সূর্যসেনের ভুঁড়িয়াল মূর্তিটা ডুবে আছে একহাঁটু কাদা আর আখের ছোবড়ায় সেইসব বলবো। এই যেমন “বুড়ি তোর জন্য ইলিশ এনেছি। লটকন এনেছি।” আব্বার গলায় এইসব আওয়াজ শুনে ভোররাতে জেগে উঠে কিছুক্ষণ বাপের শোকে কিছুক্ষণ ইলিশের শোকে কাঁদলাম, সেইসব বলবো। নিয়তির তিনবোনের একজনের মতো সুতোকাটুনি আমি- দীর্ঘ দীর্ঘ অন্তহীন গল্প হাতে ফিরে যাবে তুমি বা তোমরা। লুকিয়েছি বুঝবে না। ঠকিয়েছি বুঝবে না। অমল বাল্যের কথা হোক, নটিনী যৌবন দূর হোক। মনমাতানো কাশঝোপের চারপাশে কার্বলিক ছিটিয়ে রেখেছি, সাপ আসবে না। সাপের শিসের মতো বাজবে না দীর্ঘশ্বাস। আমি সেখান থেকে তুলে এনেছি আমার গল্পকে সেই কখন।

অন্ধকারে কিংবা আলোয় আরক্ত লাভার মতো যে গুমরানো চিৎকার, যে হিংলাজের কুন্ডে টগবগ করছে আমার অসহ্য ক্ষোভ-পিশাচ এসে টপ করে খেয়ে গেছে আমার নাক-কান, সেইসব আগ্নেয় লেখমালা কখনো বেরিয়ে পড়তে পারে বলে কেমন আলগোছে চলি আমি দেখেছ? আমি যেখানে যেখানে বসেছি, ছোট বড় অবতল হয়েছে ঘাসে। সেটুকুই। সব প্রবঞ্চনার ইতিহাস বের হয়ে পড়লে কাঁকনদাসীকে জ্যান্ত পুঁতে দিয়েছিল কেউ একখানা উঁইঢিবিতে, সে দাসীর নাম ধরে আমি বেনামীতে একবেলা কাঁদবো। লুকিয়েছি বুঝবে না।

আমি একটা উপুড় হয়ে থাকা চিকেন কিয়েভ, চাপ দিও না আমাকে, পুচ করে গেলে দিও না। ভসভস করে কী সব গলিত উন্মাদ রাগ কী সব দুর্বাসার অভিশাপ গড়িয়ে বেরিয়ে আসবে, আমাকে চাপ দিও না।