জলশ্বাস

ফেরদৌস নাহার ও শামীম আজাদ



ফেরদৌস নাহার

ধাক্কা, সবুজে সাহারাতে আলোতে আঁধারে, বেশ বেশ
তোমাকে কি একেবারেই চিনলাম না, অদ্ভুত বিস্ময়
গরহাজির ভঙ্গিমায় চোখ পিটপিট করে তাকাল
একজীবনের গল্প অন্য জীবনে গিয়ে আড়ি পাতে
আমাদের বিচ্ছেদ বিচ্ছিন্ন নয় কিছু
কিছুটা বাতাস লাগা, কিছুটা তৈরি করা
আমরাই করেছি যা দিনে দিনে, কালে কালে ঘোরে

এই চিৎকার
এই ঊর্ধশ্বাস ঈর্ষা ঢেকে ফেলে তামাদি সাজ
একেই কি ভাবা হবে নিজস্ব বিমূর্ত আঘাত, অথবা
তারও চেয়ে বেশি কিছু জলকাটা সাম্পানের জলশ্বাস
নাকি সংযুক্ত যুগল অপঘাত



শামীম আজাদ
মনেপড়ে প্রথম আড়ি পেতেছিলাম জনতা পাঠাগারের পেছনে। শ্যাওলা ধরা সবুজ ঘাটের কাছে! সেদিন ছিলো শুক্রবার। আকাশ ভরা গন্ধ আর হাওয়ায় ভাসা বকুলের শুক্নো শবদেহের সিথান পেরিয়ে। কিন্তু কিছুই কি শুন্তে পারছিলাম নাকি কেবল জলকাটা জলস্রোত শুনেছিলাম আজ আর মনে করতে পারি না।
মরা মনু নদের ওপাড়ে একটি নৌকো উপুত হয়ে বালির যোনিতে মুখ বুঁজেছিলো।মুখবোঁজা নৌকাটা গলে গলে যাচ্ছিল। আমি চোখের জল মুছে তার অনুপরমানুর ভগ্নাংশ ঝাপ্সা দেখতে পাচ্ছিলাম। কখনো মনে হচ্ছিল তা আল মাহমুদের উগল মাছ। কখনো শামসুর রাহমানের রৌদ্রহীন রৌদ্র অথবা পথহীন পাথর। নৌকা ও নদের এমন সঙ্গমতো এর আগে দেখিনি এমন। আকাশ উপুর করা গন্ধের গরুটা তখন পুরাই পাগল। আমি বকুলের দেহ মাড়িয়ে তোমার দিকে মৃত্যুমুখী নব্বুইয়ের টেলিফিল্মের নায়িকা’র মত না… না… করে একমাত্র আবেগের গাম্ছা খানা ফেলে জলে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। কিন্তু নদতো মরা। এখানে শ্মশানের চিতা খুঁচিয়ে গা ধোবার মত জল ও অবশিষ্ট নেই। তুমি কি করে গলা অবধি জোৎস্নাজলে নৌকো হবে। নিজেকে যথেষ্ট বুদ্ধিমতি ভাবতাম। কিন্তু কানের কাছে তোমার কথার গলা হাত পা কোন কিছু স্পষ্ট হবার আগে এমন কান্ড করে রীতিমত বেফানা হয়ে গেলাম। বকুলের বদলে নিজের লাশ নিয়ে উঠলাম।
সে ছিল বেল গাছে নতুন কুঁড়ি আসার মৌশুম। তুমি সেই ম ম করা সুগন্ধী বেল গাছের নিচে এসে তার পরিণত পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে হাসছিলে। যেন এত বেশি সন্দেহ বাতিক যার তার এমনি শিক্ষা হওয়া উচিত। আমার খুব রাগ হচ্ছিলো। আমাদের একজীবনের গল্পইতো অন্য জীবনে আড়ি পাততে গিয়ে এভাবে কফিন হয়ে গেছে! আর তুমি কিনা তুমি মহা পুলকিত! সংযুক্ত যুগলের এ অপঘাত নয় আত্মহত্যা। প্রেমতো আত্মবিধংসী আধুনিক মৃন্ময়ী কবিতা।
হাঁটু পর্যন্ত নিষ্পাপ করতে পূন্যের চাপকল না পেয়ে পকেট থেকে রুমাল… না না সাদা টিস্যূ পেপার বের করে তুমি এগিয়ে এলে। আমি লটারীর টিকিট পাওয়ার মত এই এ্যাম দা উইনার … এই এ্যাম দ্যা উইনার চিৎকার করে উঠেছিলাম। আর তোমার মুখমন্ডল তখন সাহারাতে ধাক্কা খেয়ে টাইটানিকের সাংঘাতিক পতন দেখছে এমন হ’য়ে গেল।
ততক্ষণে এতদিনে তুমি আমার জন্য টিস্যূ পেপার হাতে নিয়েছো দেখে আমার অন্ত্রজুড়ে হৈ হৈ শুরু হয়ে গেছে। আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম আমাদের বিচ্ছেদ আসলে বিচ্ছিন্নতার জন্য নয়। এ জলকাটা সাম্পানের জলশ্বাস। শূন্যস্থানেই গচ্ছিত ছিলো আমাদের চুম্বণ!

ফেরদৌস নাহার
মুছে দিচ্ছি। ইরেজার হয়ে গেছি, তুমিও কি মুছে গেছ
আসলেই কি মুছে গেছ! হয়তো নয়তো করে কতকাল
বেশ লাগছে, এই অনুপরমাণু খেলায় ভাঙতে ভাঙতে এখন
আমিও যে বুঝতে পারি নদ-দংশন, চিনতে পারি সরাসরি
সন্দেহ বাতিক গভীর অসুখ। নিজেকেই তাই বাহবা দেই
বারবার বলি, ওরে ও মৃত বকুলের লাশ, আজ কাল পরশু
তোমাকে উঠিয়ে এলাম শ্মশান চিতায়

আলগা গানের খুচরো মানে খুনচড়া রোদ্দুরে
দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছিটিয়ে দিচ্ছে একঝাঁক পাথর
অপদার্থ ভঙ্গিতে বিরক্ত করলেই এবার অঘটনা ঘটে যাবে
পুন্যের চাপকলে কেউ রুমাল ভিজিয়ে দিক, চাই না আর
হাওয়া দিচ্ছে বেগানা বাতাস

শামীম আজাদ
বিধ্বস্ত অস্তিত্ব নিয়েও কি আশ্চর্য সাহসে তুমি সন্ত্রাসী কথা বল! যেন সততার সঙ্গেই মোচন করে দিচ্ছো সমস্ত দাগ। পূণ্যের নয় পাপের চাপকলে সকল ঘাম ধু’য়ে ঘুড়ি হয়ে গেলে হয় না!
দারিদা তোমার পড়া মানুষ নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে বিনির্মান করছে ভেবে ছুটে যাবার সময় মনেই করতে পারে না অনেক কিছু। এই লক আপে তারা দু’জন ছাড়াও অন্তত আরো নিরানব্বুইটি সচল অস্থির অর্ধ-পরাজিত, সিকি-পরাস্থকৃত এবং কিঞ্চিৎ-জীবিত প্রাণ বন্দী হয়ে আছে বা থাকতে পারে! সহস্রাব্দ শতাব্দী আগে সেই নূহ্ নবীর নৌকায় উঠে প্লাবনে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবার কাল থেকেই।
আত্মপ্রেমে আট্‌কে যাওয়া প্রাণটা যখন নবাংকুর গজাবার জন্য জল কিংবা পানি পানি করে দূরন্ত দৌড়ে আবদ্ধ থাকে তখনই; ঠিক তখনই ঊটের চামড়ার তৈরি তিমি রঙা জুতোর নিচে পিষে যায় অপেক্ষমান প্রেমিক পতঙ্গ। দূরে আরো দূরে ব্যাপ্টিস্ট গীর্জার ধংসস্তুপের নিচে যীশুর রক্তরূপ মদ আর মাংসরূপ রুটিকনা হাতে শিক্ষার্থী নানরা ক্রন্দন করে। আশে পাশের অর্গানিক সব্জী বাগানে আপেলের ভেতরে কীটের ভোজ সভায় রাজা কীট তখন ক্যূ করে হত্যা করা আগের রাজার প্রেতাত্মা দেখে কেঁপে কেঁপে ওঠে। হয়তোবা কোন কামিনী ফুল সন্ধ্যার শেষ আলোতে লুকিয়ে পড়ার আগে লাচাড় মৌমাছি দ্বারা ধর্ষিত হয়ে নিস্ব ঝোলে। এসব হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। কে জানে? আমিই কি জানি? সমস্ত কে জেনেছে কখন!
হায়রে আমার সোনার কাঁটা। আমার চুল থেকে খসে পরা পাথরের ঝিনুক। বলতে ইচ্ছে করছে নদ-দংশন দেখেছো নাড়ির কম্পন টের পাওনি। যে সঙ্গীতকে বিচ্ছিন্ন গান বোধ হচ্ছে আসলে তা অনেকটা গাব বৃক্ষের শৈশবের সেই আঠা। যা দিয়ে পরী ও পাখি ধরতে হয়, পানসীকে পানির উপরে লাগিয়ে রাখতে হয়। যা আসে ইস্পাতের ডানায়। পা ফেলে স্বপ্নের অনুতে। জিবের সাপে, শরীর ভিক্ষুকে।
আর কি করি আমি কোন মানবেরে বিশ্বাস? এর চেয়ে আমি আবাবিলের পাথরকেই
পরানে পুষবো। সুনীল গাঙ্গুলীর বরুনার সুগন্ধী রুমালের মত। কিশোরী আমানকারের মিয়া কী টোরীর মত। ভিভ্যালদীর চৌ-ঋতু রাগের মত। নিজ মাংসের মদ থেকেই মাদক বানাবো। কাউকে লাগে না আমার। তাতে নতুন করে আর কতইবা বৈরী হবো!
জয়তুনের সঙ্গে যে ধোঁয়া উঠবে তাতেই কূহক হবে। নাক পাবেনা স্পর্শের গন্ধ। স্বাদ পাবে না শিথিল সুবাস। শ্রুতি পাবে না বেলা অবেলার ডাক। সে অবস্থায়ই যাত্রার মোড় ঘুরে যাবে। লাইক এ্যা ম্যাসমারাইজিং মন। হাউ এ্যাবাউট দ্যাট!