কর্নার

জয়দীপ চ্যাটার্জী

একটা কোণ খুঁজে নেওয়া...যে যার মত, একটা নিজস্ব কোণ খুঁজে নেয়... নিতে চায়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও, কেমন সরতে সরতে একটা কোণের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যার পর আর সরা যায় না, দু'টো দেওয়ালের মাঝে একটা কোণ। আমরা, হ্যাঁ আমরাই সব এক একরকমের কোণের কারিগর। যতগুলো আমি, ততগুলো কোণ... হয়ত তার থেকেও বেশি। ঘরের কোণ, সিঁড়ির কোণ, আঁধার কোণ... সর্বত্র কোণ বানিয়ে রাখা। এমন কি মনেরও কোণ। গোপণ, নিবিড়, একলা আপন কোণ। মানসিক বাহ্যিক সব কিছু এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার অবিনশ্বর রূপক যেন এই কোণ!

ঊষ্ণায়নের রাতে, ভেসে চলা এক বিশাল হিমবাহর ওপর গারগয়েলের মত ঘাপটি মেরে বসে চারপাশটা দেখতে গিয়ে নজরে পড়ল, শুধু জল থই থই করছে। ঠিক আমার হিমবাহ’র মতই কাছে দূরে ভেসে থাকা হিমবাহ অল্প অল্প করে গলে যাচ্ছে, একটু একটু করে চিড় ধরছে তাদের এতদিন ধরে টিকে থাকা সাদা শরীরে। ফাটল বাড়তে বাড়তে হঠাৎ করে একটা বরফের চাঙড় ধসে পড়বে জলের ওপর। আরও একটু ওপরে উঠবে লবনাক্ত জলের স্তর। এই সিংহভাগ নিমজ্জিত হিমবাহ, এই দিগন্ত বিস্তৃত উদ্ধত জলরাশি আর অনন্ত রাতের অরোরা বোরিয়ালিসকে কোন জ্যামিতিক আকারে বাঁধা যায়, তা ভাবতে ভাবতেই পায়ের পাতা ছুঁয়ে নিলো নোনা জল। এই হিমবাহও পুরোপুরি জলে মিশে যাবে, ফেটে চৌচির হবে তার সহস্রাব্দ প্রাচীন অহংকার, আমিও আবার ঠাঁই নাড়া হব ভেসে ভেসে।

কিছু কাঠকুটো জড় করে হাড়-কাঁপুনি অন্ধকার রাতে আগুন জ্বালিয়েছিলাম।বুনো খরগোশের ঝলসানো দেহ আর আমার দু’টো হাত সেই একই আগুনের তাপে গরম হয়। ওটা মরেছে, আমি খাব বলেই মেরেছি। আর আমি বেঁচে, আমাকে কেউ ঝলসিয়ে খেতে চায়নি বলে। আগুন আছে, জলও আছে... আর কিছু সামান্য আত্মরক্ষার রসদ... যতটুকু নাহ’লেই নয়। শুধু নিজেকে দেখার কোনও উপায় নেই। আছে আছে... হাত, পা, পেট, বুক, ঘাড়, মাথা... ছুঁয়ে, টিপে, পরখ করে দেখে নিই... সবই আছে জায়গা মত... শুধু নিজের স্থির প্রতিবিম্বটা দেখতে পাওয়া ভার। তাই খালি মনে হয়... কিছু একটা নেই। সেই সকাল হ’লে কোনও নদীর অস্থির জলে নিজের আঁকাবাঁকা প্রতিবিম্বকে কিছুক্ষণ দেখতে পাব। দৃষ্টি যতই স্থির হোক, সে অবয়ব স্থির হবে না কোনওদিন। তবু, ওইটুকুই ভরসা ওইভাবেই তো আজও দেখতে পাই নিজেকে। অথচ নিজের সব কিছু ভুলে যদি ওই ঝলসানো খরগোশটা (সেও কি নিজেকে ওই একই নদীর জলে দেখতো জল খেতে খেতে?) কিংবা এই আগুনে পোড়া লালচে কাঠ, আর দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধিকিধিকি জ্বলা দাবানল রেখার দিকেও তাকিয়ে থাকি... সারা রাত খুঁজেও,সেই কাঁটাতারের বেড়া খুঁজে পাব না, যাকে সভ্যতা অভয়ারণ্য বলে ডাকে। কিন্তু, জানি, ওই পাহাড়েরই গায়ে, বা ওপারে... কোথাও কাঁটাতার ঘেরা সেই অভয়রাণ্যআছে ঠিকই। তার গণ্ডির মধ্যে সুখে বেঁচে আছে তারা, যারা দূরে জঙ্গলের আকাশে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখলেই ‘জল জল’ করে ছুটোছুটি করে। আমারও একটা ঘর আছে সেই গণ্ডির মাঝে, কোনও এক কোণে, যেখানে অনন্তকালব্যাপী হিসেব আর সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মাঝেই কাটিয়ে দেওয়া যায় আজীবন... ‘জল জল’ চেঁচিয়ে ছুটোছুটি করে।

বোরা, চিনুক, কিম্বা হাবুব নয়... নিদেন পক্ষে শহরের লূ বা আঁধি সামলাতেও শরনার্থী হতে হয় স্থিতিশীল বরাভয়ের কাছে। একাধিক ডায়নামিক ফ্রেমের টানাপোড়েনে আমরা তো কেউই স্থবির নই। তাই এই ‘আমি’ আর ‘আমি’-র সৌরজগতে কোনওকিছুর তাত্ত্বিক ফয়সালা করে দেওয়াটা খুব মুশকিল। ঠিক যেমন থিসিস থাকে, তেমনই থাকে অ্যাণ্টি-থিসিস। যেমন ইয়ুফরিয়া আছে, তেমনই আছে ডিসফোরিয়া। যেমন ইউটপিয়ার রামধনু ওঠে, তেমনই ঘনিয়ে আসে ডিস্‌টোপিয়ার কালবৈশাখী। এত চেষ্টার পরেও সাধ করে খারাপ থাকতে কি কারও ভাল লাগে? হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও তেমন নির্মিত হয়ে কোটি কোটি অভয়ারণ্য, যে গণ্ডির এপারে নিজেকে গুটিয়ে রেখে রাতে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমনোর চেষ্টা করি। প্রকৃতি অথবা প্রাকৃতিক কোণও কিছু নয়, আমাদের প্রকৃতি-বিরোধী বিবর্তনের ধারাই বার বার সব জ্যামিতিকে পালটে পালটে আরও ধারালো, আরও নখর করে তুলেছে। বর্গক্ষেত্র ঘর, বর্গক্ষেত্র দাবার ছক, বর্গক্ষেত্র সাপলুডোর ঘর, বর্গক্ষেত্র খেলার মাঠ... পরিপাটি জ্যামিতির মাঝে কোণ কে একটা আলাদা জায়গা করে দেওয়া। ঈষাণ, নৈঋত, অগ্নি, বায়ু... বার বার কোণ পালটেও গৃহস্থের উন্নত বাস্তুর স্বপ্ন পূরণ হয় না, তবুও হাল ছাড়তে নেই... কোণগুলো আরও ভাল করে একবার সাজানো যাক, যতটুকু পারা যায়! জীবনটাই একাধারে কোণ-সর্বস্ব হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। বাজারের থলি হাতে, প্রতিদিন সকালবেলা, মানুষটা দরদাম করতে করতে ক্লান্ত চোখে ‘যা দিবি দে’ বলে সেভাবেই থলিটা ফাঁক করে দাঁড়ায়... যেভাবে পুজোর সময় চাঁদার স্লিপটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বোধহয়,কোনও না কোনও ভাবে, কোণঠাসাআমরা সকলেই। এই কোণই আমাদের রিফিউজ, আর কোণই সেলুলার জেল। ঠিক যেই অবস্থান থেকে প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দিতে চায়, ‘যতই হাত পা ছোঁড়ো বাছাধন... তেলও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না!’। ঠিক হতাশা নয়, চরম দুঃসময়ে বেঁচে থাকার জন্য নিজের সাথেও আপোশ করে নিতে হয়... চাপের প্রতিটা অভিমুখ যখন ঠেলতে ঠেলতে একদিকে নিয়ে যায়, তখন পা’দু’টো পিছু হটতে হটতে নিজের অজান্তেই কোণ খুঁজে নেয়... সেই প্রান্তীয় বিন্দু, যেখানে তিল তিল করে স্থিতিশক্তি সঞ্চিত হয়, নিউটনের তৃতীয় সূত্র উসখুস করে ওঠে, আর চোখে মুখে ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিলেও রাতে কিছুতেই ভাল ঘুম আসে না।

কোণ আছে বলেই আমরা কোণ-ঠাসা, কোণ আছে বলেই পিছু হটতে হটতে নিজের অজান্তেই হাতটা শরীরে পেছনে থাকা দু’টো দেওয়ালের সেই অংশকে খোঁজে, যেখানে দু’টো দেওয়াল সমকোণে এসে মেশে... সেই শেষ তারপর আর কিছু নেই। ভিড়ের মধ্যে কাঁধে কাঁধ ঘষে এগিয়ে যাওয়া প্রতিটা হৃদস্পন্দনের মধ্যেই এই ভাবে লালিত কোণগুলো রয়ে যায়। সেই কোণে সাজানো নানান রঙ, সেই কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকা অন্ধকার, সেই কোণ গুপ্তধনের সিন্দুক, সেই কোণ কারও কারও অভয়ারণ্য। আসলে এই কোনটাই যে নিজের একমাত্র নিজের তৈরী করা সব থেকে সুরক্ষিত আশ্রয়! সেইখান থেকে যে এখনও অভীষ্ট লক্ষ্যকে দেখা যায় (সে আপাত ভাবে যত দূরেই থাকুক), দেওয়ালে ভর দিয়েই ফিরে আসার চেষ্টা করা যায়। আমার এই কোণটাও যেন আমারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বসে চুপ করে সবকিছু পর্যবক্ষেণ করা যায়, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়, করা যায় অন্তর্দর্শন । ঠিক যেমন অলডাস্‌ হাক্সলি (Aldous Huxley) বলেছিলেন ‘There's only one corner of the universe you can be certain of improving, and that's your own self.’