একটি কবিতার জন্যে

নীলাদ্রি বাগচি ও অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়



তন্তুবায় ও অন্যান্য কবিতা

১.
লিখেছি বিষণ্ণ কিছু তন্তুবায়
শহরের অর্থহীন ধূলো
এখন তড়াস এলে দিগন্ত মনে পড়ে
মনে পড়ে শব্দ অতি ক্ষীণ
ভেঙে ফেলছে রূপরেখা হতোদ্যম ট্রয়ে
কেবল আগুন জ্বলছে
কেবল বসতি গলে পাঁক হয়ে যাচ্ছে আর
অধৈর্য কলম স্বেচ্ছাচার বেছে নিচ্ছে
বেছে নিচ্ছে রক্তপাত...জিঘাংসার অনন্ত উল্লাস...


২.
একটি স্পর্শের জন্য অনেক অপেক্ষা জন্ম নেয়। অনেক অপেক্ষা শেষে একটিই শব্দ উঠে আসে- স্বীকৃতি। স্বীকৃতি যা বিষ; যার অন্যরূপ নুব্জ দেহ, পরাজিত ও অস্থির পথের নির্দেশ।
এখানে অনন্ত তুমি গোধূলির প্রাণ ছুঁয়ে তাকে যে বিন্যাস দাও সেইই তার মূল্য মাত্র। সে তুমি মানো বা না মানো তবু তার জন্যই এই আর্তি, এই অস্থির..
তুমি পা ফেল আর জল তার চেনা উপমার বাইরে আগুনের সমার্থক হয়.. কেবল গরম বাড়ে.. রাত্রি আসে সময় শৃঙ্খল মেনে নিয়ে..



৩.
আমাকে বুঝিয়ে দাও রৌদ্র এত তেজ হল কেন?
এখন দিনান্তে এই পাথুরে উত্তাপ কুড়ে খাচ্ছে সহ্যশক্তি
কুড়ে খাচ্ছে স্বীকৃত চেতন...
দূরে ঘন হচ্ছে স্তন- পাহাড়ি দুধের স্বরলিপি
তার আহ্বান আসে এইখানে গরম বাতাস...
সেই অমৃতের স্বাদ প্রাণপণে খুঁজে যাচ্ছি
শুকনো ঠোঁট, বিষণ্ণ কোটরগত মণিবিন্দু তছনছ করে
অথচ এখানে
কেবল দহন জ্বালা, কেবল প্রলয়মত্ত রুদ্র ভৈরবের শ্বাস
যৌনতার আহ্বানে অস্থির শারঙ্গ যাপন...



৪.
চুম্বন অসীম:
এই অপরিসীমের আরাধনে
বাঁকা রাত্রি জমা হয়...
আলো খোলে ভোরের সদর
কোনোখানে ঘুম নেমে আসে
বয়স বিছিয়ে দেয় আদরের গাঢ় কালি
হ্রস্ব হয় শরীর গঠন
আর লাল আলো বাধ্য করে দেখে নিতে
দেখে নিতে এই যে শরীর তার কোনোখানে নেই
অস্তিত্ব বা বসবাস
কেবল হ্রস্ব কিছু ক্ষতচিহ্ন ক্ষীণ
যেন
অপরিসীমের চুম্বন ফিরে আসছে
ফিরে আসছে স্রোতমুগ্ধ
তোশক পুড়িয়ে যেন বিশ্রাম নেমে আসছে
তুলো পুড়ছে কোনোখানে..
ভোর জাগছে আলোড়নে
আহতর সন্নিধানে
জলে ভিজছে শব্দ অনুরোধ ...



আবার নেমে এল সেই থকথকে অন্তর্ঘাত। পথ ও শহর। দিগন্ত ও আকাশ। যেখানে যে যে জেগে থাকে তার গায়ে লেগে আছে রক্ত। ম ম রক্ত গন্ধে দিবানা হয়ে যাওয়া শ্বাপদ, আর বেঁচে অথবা মরে, ভেঙ্গে অথবা জুড়ে থাকা এই সময়। বেজে চলেছে অনবরত। অনবরত ধুলো, অনবরত সন্ধ্যাবকাশ, অনবরত শরীর। তারপর আগুন এসে জোটে। দাউদাউ সমস্ত পথ, সব ঠিকানা গিলে ফেলে মৃত্যুর ভেতর খোঁজে তার উল্লাস। উল্লাসের ভেতর নেড়েচেড়ে দেখে কি আছে পথ নির্দেশ। এরপর সেই বিবিক্ত গোধূলী। অক্লান্ত অনবরত।
কেবল স্পর্শের জন্য বড় হয়ে যায় সময়। ছড়িয়ে যেতে যেতে তা একসময় কোনো এক স্মৃতির ভেতর থেকে হেঁটে আসে, আর পার হয়ে যায় হাজার হাজার মাইল। প্রত্যেক মাইল ফলকের আগে সে বিশ্রাম নেয় না। কখনো হয়তো নেয়। আসে একা, আর আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে কেমন আছি! তারপর তার সাথে কাটে অনন্তকাল। কথা হয়, ধানক্ষেত, বাড়ি, ট্রেনের গল্প হয় অনেক। একবার ঝিলমিলি গিয়ে কি কি হয়েছিল সেও...তারপর... হ্যাঁ তারও পরে জেগে ওঠে নদী আর বাস্তুচ্যুত শরীরের ঘ্রাণ। আনমনা দুপুরের কোটরে রাখা পায়রা তখন বেরোয় কড়া রোদে উড়ে পড়বার জন্য। হাজার বারণ স্বত্তেও তাকে থামানো যায় না।
‘আমি হেরে গেছি’ ছোট্ট একটা পাহাড়ী বাঁকে রেলিঙের দিকে দু পা এগিয়ে এই উক্তি করল আমার দীর্ঘশ্বাস। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি
-‘কাকে বলে হেরে যাওয়া?’
সে শুধু অবাক হয়। কোনো কথা বলতে পারে না। তাকায় আমার দিকে। মেঘের ছায়ায় তার চোখ। যেন সহস্রাব্দ। তাকে জল, পাখী, হাওয়া, গাছ এমনকি ডেকে গেছে শেষ ট্রেকারের আলো... তবু মেঘ লেগে সে বোবা...এমনিভাবে সে তাকিয়েছিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করি।
-‘কাকে বলে হেরে যাওয়া?’
এবার তার অল্প নড়ে যাওয়া ঠোঁট দেখি। বুঝি সেই আমাকে এই প্রশ্ন করবে বলে অনেকদিন ভেবে রেখেছিল। এই অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার মাঝে একতাল কুয়াশা এসে সমস্ত কমিউনিকেশন বন্ধ করে দ্যায়। আমার দীর্ঘশ্বাস আবার একলা হয়ে পড়ে।
শরীর আমার বুজে আসে রক্তে, ঘুম পায়। হাই ওঠে দিন যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কংক্রিট জঙ্গলে। তারপর প্রত্যেক বিকেলে অনেক ওপর থেকে দেখা যায়। সুলভ মূল্যে, আমার শরীরও দেখে সেসব। দেখে বাজপাখীর ছায়া নেমে আসে সনাতন গির্জার মাথায়। দেখে মানুষের সাথে পথ চলে হাইস্ক্র্যাপারের প্রতিবিম্ব। দূরে দূরে নির্মীয়মাণ উচ্চতায় সে নিজেকে দেখতে পায়। সেও ত এভাবেই চেয়েছিল আকাশকে ছুঁতে। হে প্রিয় শরীর আমার, তুমিও তো একদিন ছিলে, তোমারোত ছিল রোদের সকাল। সেখানে কেবল তুমিই টিলা পার হয়ে হয়ে চলে যেতে আকাশের দিকে।
বাগানে থাকত নাশপাতি গাছ। তুমিও ত পেয়েছ তার গন্ধ ও স্বাদ। অনেক ভোরের দিকে প্রেতপুরীর মত খাঁ খাঁ অন্ধকারে তুমিও তো ঘুরেছ অহরহ। আর কিবা থেকে চাইবার? ধীরে ধীরে নুব্জ হয়ে আসে জীবনের ধ্যান। মাথার ভেতর অদ্ভুত শব্দ হয়...গুনগুণ...গুনগুণ...বাজ তে থাকে একটা আধভাঙ্গা রেকর্ডার।
একটা মুহূর্ত। অসতর্ক। গলে পড়ছে শহর। সমস্ত গান ও বাজনার উপকরণে তৈরি বিরহ। বিরহ বাজছে চারপাশে।
-‘আমি কি রক্তপাত ভালবাসি ?’
-হয়তো!
-কেন এ পৃথিবী তবু আমাকেই ভালবেসে এত আহ্লাদ দিতে চায়। আমি ত চাইনা এসব। রোজ রাতে দিনের হিসেব নিকেশ শেষে দেখি হাতে রক্তপাত ছাড়া আর কিছু পড়ে নেই?
- তুমিও তো পৃথিবীকে ভালবাস? আলো, গান এইসব তুমিও তো চাও?
- আমি ?আমি চাই সে যাক। মৃত্যুর দিকে। মুছে যাক এই সূর্যের আলো।
-তাহলে তোমাকে ভালবাসবে কে? কে দেবে রোজ তোমার হাতে লাল মেহেদি...শেষরাতে ? কে?
কথপোকথন চলে আর বিরহের সুর বেজে বেজে চলে। দেখি শহরে মেঘ। সাজানো মানবিকতার তলায় থরে থরে সাজানো বিরহ, ক্লেদ, অভিশাপ, অসূয়া রাখা আছে। অন্তহীন সময় শুধু ছটফট। আমি হাততালি থেকে এগোই প্রবন্ধের যেখানে পরবর্তী হাততালি আছে তার দিকে। ফেটে পড়ি।

-