যখন অবশ শব্দেরা হু হু ঝাঁপ দেয় ধ্বংসে

অদ্বয় চৌধুরী ও অরিত্র সান্যাল


কৌশলী বিন্যাসে সাজানো রেললাইন
একটি মৃত্যু থেকে আর একটি মৃত্যুর মাঝে ভেসে ওঠে চাঁদ। আগে চাঁদ ছিল পৃথিবী থেকে আদর-দূরত্বে। তখন কী অনায়াসই না ছিল ভালোবাসা, খুনসুটি, খেলা, বকুনি, শাসন। চাঁদের কপালে চুম্বনের পরে নেমে আসত মায়ার নাতিশীতোষ্ণ কুয়াশা। সম্পর্কের দিক নির্ধারণে তখনও বসেনি হাওয়া-মোরগ। এখন, সেই সব দিন পেরিয়ে হাজার হাজার বছর পরে, চাঁদ সরে গেছে বহু বহু দূরে, কোনো এক মেঘ-ভাঙা বৃষ্টিতে ভেসে। এখন, সেই সব মনোরম জলবায়ু পেরিয়ে, সম্পর্ক মাপা হয় সিসমোগ্রাফে।

মাটি কেঁপে ওঠে। আমাদের খোলা উঠোনের পাশেই রেললাইন ধরে হেঁটে আসে বিস্ফোরণের নিম্বাস ডাক। রেললাইনের ওপারে আছে মৃত্যুর সুবিন্যস্ত অপেক্ষা। মেঘ-নিশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বায়ুমণ্ডল। এলোমেলো বাতাসে অগোছালো হয়ে যায় আয়নার আমি। ভয় নামের অন্য কোনো মানুষ আমাকে পায়। দখল করে আমাকে— আমার ঠোঁট, স্তনবৃন্ত, চোখের পাতা।
The eyes of others are my prison; their thoughts are my cage.

চাঁদ যেদিন প্রথম চোখ মেলে তাকালো, আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম সাদা প্রান্তর। তার উপরে দাফনের কালো কর্নিয়া। যেখানে আলো জন্মায়, সেখানেই দুর্বোধ্য অন্ধকার স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্ত আমাকে নিয়ে যায় সুদূর ভবিষ্যতে যখন মানুষ অহরহ ফেটে পড়বে রেস্তোরাঁয়, খোলাবাজারে, বিস্তৃত বরফ-আচ্ছাদিত গোরস্থানে। আমি মুখ হাঁ করে দেখতে থাকি দুঃখের বিস্ফার। আলো নিভে আসে। অন্ধকার। আমি অপেক্ষা করি বিগ-ব্যাং মুহূর্তের।
We don’t remember days, we remember moments.

দিনগুলো ক্রমশ বিস্ফারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের স্প্লিন্টার। সেই মানুষটা ছিল আমার আলো। সেই ছিল আলোময় যাপন। তারপর ট্রেন এল। চকিত হুইসলে। হাড়ের ভিতর ফুঁ দিয়ে উঠিয়ে দিল মজ্জার হাওয়া। তখন আলোর সমস্ত ক্ষত থেকে গলে পড়ল মরে যাওয়া পাখির আওয়াজ। নদীতে ভেসে এল মেঘেদের ঝাঁক। তখনই শুরু হল চাঁদের বনবাস। সমগ্র উপত্যকা জুড়ে পচনের দুর্বিষহ চিৎকার। দূরবর্তী মেঘের ঘামে ভেজা পিঠে নিজেকে দেখতে থাকে চাঁদ। আর, চাঁদ-দূরত্বের স্থিরচিত্রে আমি নিজেকে দেখি।

আমি দেখেছি। অন্দর তোবড়ানো মস্ত এক বাড়ি। সাড়া গায়ে মেঘের দাগ। আমি তার ভিতর হাজার বছর আগে হেসেছিলাম শেষ বার। তখন চাঁদ ছিল আমার থেকে চুম্বন-দূরত্বে। তখন আলো ছিল সুখের হা হা উল্লাস। আমি দেখেছি কীভাবে মেঘ শুষে নেয় আলোর গতিপথ। আমি দেখেছি চাঁদের কী অপূর্ব বিষদৃষ্টি তীর্যক নেমে আসে পৃথিবীর নিরক্ষরেখায়। অসহ্য তার দহন। আমি দেখেছি চাঁদও পারে ঝলসে দিতে পৃথিবীর সমস্ত খেলাপ। আমি দেখেছি রেললাইনের উলটো পারে লেগে আছে নিম্বাস রং।

আমি দেখেছি। রেললাইন ধরে হেঁটে চলেছি আমি। আমার ভিতরের আমি। যে বহুকাল দেহে আদর বেঁধে এসেছে সে আজ একে একে নিষিদ্ধ বিস্ফোরণে খুলে যাবে দ্রুত। নিজেকে ফাটিয়ে ফেললে তবেই প্রজাপতি স্থান নেবে নিম্বাস মেঘের। চাঁদ কাছে আসবে রঙে ভিজতে। সেই বিস্ফারিত আমি-র নাভিমূলে হু হু ঝাঁপ দেবে শূন্যতা ও শেষ। তখন, চাঁদ, আমাকে আলো নামে ডেকো।
The woman is perfected. Her dead body wears the smile of accomplishment.

***





১। একটা বিশাল ব্যাপার

আকাশে চাঁদ ধরিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকা
অতবড় পাখি কই যে গিলে নেয় সবটুকু?
অতএব ভয় দেখতে হলে সেই মেঘের চিন্তা
আমি আমার পুরনো বাড়ির দেওয়ালে দেখেছি মেঘের দাগ
গভীর মোষের মত মৃত ছায়াই
তাহলে শস্য শ্যামলিমায় ভরিয়ে রাখে,
মুখে অন্ন তুলতে গিয়ে কেঁপে উঠতাম এককালে।
যে মাছটি ছিপ কামড়ে ধরেছিল শৈশবে
তার গলায় ছিল কী অপূর্ব নিম্বাস মেঘের ডাক
উত্তর পূর্ব থেকে ভেসে আসা মেঘ
সে মাছের স্বাদকে করে তুলেছিল ভয়াবহ
এরপর থেকে
গলায় কাঁটা বিঁধে যেকোনও শিশুর কান্নায়
আমি মুখ হাঁ করে দেখতে থাকি দু:খের বিস্ফার
সুদূর ভবিষ্যতে মানুষ দু:খে যখন তখন ফেটে পড়বে,
রেস্তোরাঁয় খোলাবাজারে,আমি দেখেছিলাম
ব্যাপারটা বিশাল বলেই আমি ভেবেছিলাম
আমাদের ছোট বন্ধুত্বগুলি ছোট মানুষদের সঙ্গে হওয়া উচিত











২। যে মাছটি ছিপ কামড়ে ধরেছিল

আমার মাথার মধ্যে কী ভীষণ অস্থিরতা –
লাইনে একবার দিতেই হু হু ছুটে গেল ট্রেন –
এরকম প্রবল পংক্তি লেখার পর
বোঝা যায় অনেকদূর চলে এসেছি –
সাদা নিশান দেওয়া একটা বাড়ির দৃশ্য
কাকে পুড়ে ঝামা হয়ে যাচ্ছে –
জনমনিস্যিহীন একটা জায়গায়
ভুলুর কবর ছিল – খুঁজে পাইনি
সারা সকাল ধরে যা দেখলাম – তার কোনও মানে নেই।
একটা লোক চাঁদ ফেটে মারা গিয়েছে –
তার কোনও মানে নেই। এবং সারাজীবন কোনও মানে ছিলও না।

















৩। তার কবর আমি খুঁজে পাইনি

পায়ে শূন্যতা ফুটে একবার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল
আমারই একটা পুতুল আমি।
রাস্তার আঁকাবাঁকা বিষে গা তখন প্রায় অসাড়।
ক্লান্তিতে মেরুদন্ডের সেলাই আলগা হয়ে আসছে।
খসে পড়ছে নক্ষত্রের মত পুতির চোখ
এমন সময় চকিতে শুরু হল আজকের দিনটা।
সারাজীবন ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নের একটা দ্যোতনা খুঁজে পেয়েছি।
যেকোনও সময় সেই দ্যোতনায় ওঠার মত মই
দেহ ভেদ করে উঠে আসবে।
আমার শরীরের মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে
ধাপের পর ধাপ। নিজের ভেতর আস্তে উঠে আসছে একটা অন্ধ পুতুল
একটা লাল সূর্য, সে দেখতে পাচ্ছে, এক্ষুণি ধরে ফেলবে শ্রমিক লোকজন
মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে ভাঙা বিশাল এক ডিমের সাদা ও কুসুম
রেলময়দানে পড়ে আছে।

ওদিকে মন্ডলদের বাগান। ওখানে আমার ক্ষতর পাপড়ি দেখা যায়
হলুদ গন্ধহীন ফুটে ওঠা দেখতে দেখতে
মন্ডলদের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে ধ্বংসের যাবতীয় কথাবার্তা










৪। বেওয়ারিশ একটা প্রাণী

মনে হল, অরণ্যে মাংসময় বেওয়ারিশ প্রাণী হারিয়ে গিয়েছে।
মাঝরাতে
তোমার পিঠের ওপর দিয়ে একটা পিঁপড়ে গড়িলে পড়ল তরাই শব্দে।

হাড়ের ভেতর কে যেন ফুঁ দিয়ে উঠিয়ে দিল মজ্জার হাওয়া।
যারা বহুকাল থেকে দেহে আদর বেঁধে এসেছে
তারা আজ একে একে বিস্ফোরণে ফেটে পড়বে।

খুব সূক্ষ্ম চেষ্টায়
নাসপাতির রোঁয়া রোঁয়া, সবুজ ভেদ করে
মনে পড়ে তোমার একদা উত্তেজনার কথা

একদিন পাথরের উচ্চতা ঘুরতে গিয়ে গিরিখাত দেখে এক অসহ্য স্মৃতি এসেছিল
তোমার যোনির
ভাঙা বাড়ির মাথায় একটা হাসির দ্বাদশী ঝুলে আছে
এখন তার পোড়া আওয়াজ আসছে
এভাবে দেখলে একটা জগৎ কত সহজেই কাঁদিয়ে ফেলে একটা শিশুকে।
ভয়ে।












৫। তাকে ঠিকভাবে বুঝতে

দেখ আমার কান্ডে কত হাড়ের
কাষ্ঠল নেমে যাওয়া শিকড় অবধি
হারানো মাটিতে ফলে উঠছে শুক্রশস্য
নিজেকে খুব আদরের প্রাণী ভাবার মধ্যে
আমার এক জন্তুর সারল্য ছিল
যে সুতো এখানে পড়ে আছে
তাকে গুটোতে গুটোতে আরেকটু দূরে
পৃথিবীটা একটা নরম আনন্দের বল হয়ে যাবে

যা আসলে রক্তে মিশে যায়
তাকে শেষ পর্যন্ত বুঝতে
আমাদের চেতনা গুলো জ্বলে থাকে নক্ষত্রের মত
















৬। আমাদের এই জং ধরা ক্লান্তি

অনেকটা বৃহস্পতির মত দেখতে ছিল আমার চেতনা
অনেকটা ওপরে ঝুলে থাকে উজ্জ্বল –
দূরবীক্ষণে আরও স্পষ্ট হয় যে –
আমি আর কিছুই ঠিকঠাক ভাবতে পারছি না – অনেকদিন ধরে –
অনেক ঝড় ঝাপ্টা – শতাব্দীব্যপী বাতাসে
জং ধরা ক্লান্তি – তবু এই সমস্ত কাটিয়ে
এর থেকে লাখ দুই বছর পর আমার উত্তর পুরুষ, দেরী হলেও,
আসবে। এটা আমি খানিক বুঝতে পেরেছি।
আসল বৃহস্পতি এখনও পারেনি



















৭। আদিনাথ হেসেছিল, এইসব ভেবে

অন্দর তোবড়ানো সে এক মস্ত বাড়ি।
আমি তার ভিতরে একশ বছর আগে হেসেছিলাম একবার।
দেওয়ালে তাকালে ডাকছে কে যেন –মনে হয় আজও
কার ভিতরটা এমন ভাঙা পুতুলের মত হয়ে আছে?
সর্বত্র্য ছত্রখান স্মৃতি –
একটা মানুষ আজ বিস্ফোরণে দ্রুত খুলে যাবে –
তারই সামান্য আগে – তার সারা দেহ ফাঁকা করে দিচ্ছে
তার হৃদয়ের সমস্ত খেলাপগুলি, পুতুলের মত –
তখন সমস্ত ক্ষত থেকে গলে পড়ছে মরে যাওয়া
পাখির আওয়াজ –
সারা ঋতুকাল জুড়ে
নিজের ভেতরে
উলু বুনে তুলছিল মায়ের অকাল স্মৃতি –

কোথায় কী হল
তুমি সবকিছু যাবজ্জীবন দিলে স্থিরচিত্রে












৮। চাঁদে লোক আহ্লাদে মারা যায়

ক্লান্ত ভাবে প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা লোক।
ওই ওটা আমার দূরের আমি।
নিজেকে ফাটিয়ে ফেললে বহু ভাঙা প্রজাপতি
উড়ে আসে সন্ধের মুখে।
বহুদূর মেঘের গন্ধ পাই –
সামান্য মরচে ধরা আকাশে সামান্য আমি-লাগা বিমান

দেখি, আমার ক্ষতর নাম গভীর মল্লিকা –
নিজের পিঠের ওপর চড়ে
দ্রুত খেয়ে ফেলছে আমাকে।
গা থেকে তার পাপড়ি ঝরে পড়ে –

বহুক্ষণ ধরে একটা ক্লান্ত নৌকা দেখতে পাওয়া যায়
পলি মেদ ও বয়সে থুবড়ে আছে মাতলা নদীর পাশে
কখন জোয়াড় ছেড়ে গেছে
ওহো সে নৌকা উপচে পড়ে আমাদের মনের লবনে