মিল্কিওয়ে পরিভ্রমণ

শিমুল সালাহ্উদ্দিন ও পাপড়ি রহমান



সত্যিমিথ্যাচুমু ১


A kiss makes the heart young again
and wipes out the years.
—Rupert Brooke


প্রাণের ভেতরে মিথ্যামিথ্যি জমিয়ে রেখেছো বেহুদা সত্যচুমু

জেনো একাকিনী, আমাকে না পেয়ে তোমার প্রভূত ক্ষয়ই হচ্ছে—
প্রতিমুহূর্তে তোমা-কর্পুর-আতরকৌটো প্রাণের রেকাবি থেকে
উড়ে যায় সবুজ ঘ্রাণ

বিন্দু বিন্দু সেই সবুজ কণারা ক্রমাগত মিশে যাচ্ছে বাতাসে—
যেখান থেকেই অঙ্গার-অম্লজান একা বুকের ভেতরে নিয়ে
বেঁচে থাকো গুণগুণ গান গাও স্নান ঘরে,
রান্না করো জীবনের নির্মম সালুন,
শ্যামল সন্তান নিয়ে যাও ভোরের রাস্তা ধরে,
ভালো না বেসেও ঠিক তোমার স্বামীকে
ঘুম পাড়িয়ে দাও ঠোঁটে...

সাবধান হও সোনা, মিথ্যাচুমুতে ঘা হয়ে যায় মুখে

সত্যিমিথ্যাচুমু ২

Women still remember the first kiss after;
men have forgotten the last --Remy de Gourmont

মিথ্যামিথ্যি জমিয়ে তুমি রেখোনা সত্যচুমু
সত্যিসত্যি ঘা হয়ে যাবে মুখে
ক্যান্সার মানে কর্কট জেনো আঁকাবাঁকা পথে চলে
মুখ থেকে বুকে ছড়াতে কতক্ষণ
তোমার স্বামীতো জানে না আমার কথা
কিভাবে সে দেবে প্রাণের চিকিৎসা!

কেবলি তোমার রুদ্ধ কথার যাতনার ভার
ও গো-বেচারার ঝরবে অশ্রু হয়ে?
অফিস ফেরতা কেবলা কেবল তাকিয়ে থাকবে
আমারই মতন আকাশের দিকে...

চুমু খেতে খেতে তুমি স্বামীকেই ভুল করে
উমম শিমুল বলে ডেকেই না ফেলো অবচেতনে !


সত্যিমিথ্যাচুমু ৩

You have to kiss an awful lot of frogs before you find a prince. -Graffito

ভালোবাসা ছাড়া কেউ জানেনা সঠিক চুমুর নিয়ম।

বিছানার সঙ্গে বাঁধা তোমাকে চুমু খাবে একজন সুন্দর, একটি শুকনো ডাঙায় থির থাকা কোষা। জলভরা কলসির মতো ঘাঁড় ধরে তোমার মুখ দিয়ে ঢালা হবে জিভখসা ভালোবাসা, ইটভাটার আগুন। জল না দিতে চেয়ে প্রানের ভেতর থেকে কলস নিজেই ফেটে পড়বে রাগে, ঝনঝন ভেঙে পড়বে চুড়ি তিনগোছা, তুমি শুনবেনা ও কাঁচ ভাঙার শব্দ, মধু ঢালবে, ঢেলে চলেছো ফোঁটায় ফোঁটায়, গলায় মুখে গলবিলে, আর সে জানবে জানছে জেনে গেলো-- বিষ। আর জানবে জানছে (জেনে গেলো কিন্তু)-- এই নয় শেষ। এরপর পাখিদেরও নিদারুণ গজাবে গজালো বিষদাঁত আর একুশ দিননাগাদ বিষবৃষ্টি হতে থাকলো থাকবে চরাচরে...

বিছানাবাঁধা পাথরে পারবে চুমু খেতে?

সত্যিমিথ্যাচুমু ৪

ভোরবেলা চলো যেদিকে ইচ্ছে যাবো...
আজই, আজ
আমাকে তোমার ইচ্ছের কথা বলো




অবতরণিকা:
মেঘমেদুর কোনো রাত্তিরে বিজলী ঘনঘন চমকে উঠছে। ফলে ঘনমেঘ ও রাতের আঁধার ক্ষণকালের তরে ছিট্টিছান। বিদ্যুতের স্বল্পালোকে জেগে উঠছে এক নারিকেল বিথী। যার ঘাড়-ভাঙা-মাথা ঝুলে আছে বুকের-ওপর। আদতে বজ্রপাতে পুড়ে গেছে ওই বিরিক্ষের পত্রশাখা। সেই পুড়ে যাওয়া ছাইভস্ম নিয়ে তার এমন করুণ দশা। প্রশস্ত ছায়াপথের কার্নিশে নক্ষত্র ফুটে আছে ক্ষতের মতো। আর কবির হৃদয় জুড়ে মর্মরধ্বনি। যেন-বা মনের ভুলে খোয়া গেছে এক কিশোরের সখের বাইসাইকেল। ফলে সে খানিকটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়। ওই বাইসাইকেলের ক্রিং ক্রিং সুরেলা শব্দ কবির বুকে শত-সহস্র ক্রন্দন তুলে আছড়ে পড়ছে। হায়! কোন ভুলে সে হারিয়ে ফেলেছে স্বপ্নলোকের চাবি! এক আটপৌরে জীবনের গল্প তাকে শোকে মুহ্যমান করে তুলেছে। আর অতৃপ্তির হাহাকার ক্রমে বিলাপে পর্যবসিত হতে চলেছে। গহীন অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলা এক বিহঙ্গকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে সে। আর রহস্যময় মেঘেদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে পংক্তিমালারা।
এক.
Love is from the infinite, and will remain until eternity.
The seeker of love escapes the chains of birth and death.
Tomorrow, when resurrection comes,
The heart that is not in love will fail the test.
(জালালউদ্দিন রুমী)
ওই বসন্তে বৃক্ষেরা পেয়েছিল বাদামী বরন। মরুঝড় হয়ে উড়েছিল ধূলিকণা। রোদ্দুর তাকিয়ে ছিল সটান। আর পাতারা ঝরেছিল খুব।হাওয়া বইছিল দুদ্দাড়। ছেলেটি গিয়েছিল মাঠে। গরুর পাল নিয়ে। তার শ্যামল হাতে ধরা ছিল বাঁশি। গলায় ছিল সুরের তুমুল ঢেউ। একটি কমলারঙা কাঁঠালপাতা হু-হু বাতাসে উড়ে এসেছিল। আর লুটিয়ে পড়ছিল পদতলে। ছেলেটি সুরের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। ফলে বুঝতে পারেনি পাতার প্রেম। কমলাপাতার সর্মপণ। শুনতে পারেনি মর্মরধ্বনি। বুঝতে পারেনি কে লুটায় পদপ্রান্তে? বা কেন এই পাতার তুমুল ওড়াউড়ি?
খানিক পরেই কালো জালের মতো অন্ধকার ঘিরে ধরেছিল তাকে। এমনই ঘোরঘুট্টি অন্ধকার যে, হাত খানিক দূরের কিছুও আবছা। ফলে ছেলেটি বাড়ি ফেরার পথ ধরেছিল। ফিরতে ফিরতে তার পা জড়িয়ে যাচ্ছিল ঝরা পাতার রাশিতে। এত পাতা কেন ঝরছে ছেলেটি বুঝতে পারেনি। বা আনমনা ছিল বলে পদতলে গোত্তা-খাওয়া পাতাদের অভীষ্পা সে জানতে পারেনি। বাড়ি ফেরার পথে সে দেখেছিল হু-হু হাওয়ায় ভেঙে পড়েছে বৃক্ষের ডাল। আর উড়ে যাচ্ছে অজস্র বাদামী পাতা।
হাওয়ারা এত প্রবল ছিল যে, যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে ছেলেটির বাড়ি। আর দুমড়েমুচড়ে দেবে গুল্ম বা বনস্পতির মাথা। কিংবা ছেলেটিকেই। অতঃপর সেটাই ঘটেছিল। ছেলেটি উড়ে না গেলেও প্রায় মরে গিয়েছিল। কারণ ছেলেটির প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অন্য গাঁয়ে। আর পদপ্রান্তে লুটিয়ে পড়া পাতাটি ছিল সেই মেয়েটির বার্তা। তাতে সে লিখেছিল--- বিদায় চুম্বন এঁকে দিলাম।
সেই থেকে ছেলেটির স্বপ্নে বা দুঃস্বপ্নেও চুম্বন এসে ভর করে। যা তার প্রেমিকা এঁকে দিয়েছিল ঝরে-পড়া কাঁঠাল-পাতাটির বুকে।
দুই.
When your chest is free of your limiting ego,
Then you will see the ageless Beloved.
You cannot see yourself without a mirror;
Look at the Beloved, He is the brightest mirror.
(জালালউদ্দিন রুমী)
ছেলেটির চোখে রাত নামে নির্ঘুম। দিনগুলি সাপের মতো কুণ্ডুলী পাকিয়ে যায়। বাঁশি থেকে সুর মুছে গিয়ে চিরঅন্ধকার তাকে গ্রাস করে ফেলে। যেন সে জন্মান্ধ। পৃথিবীর কোনো রঙ সে দেখেনি। কোনো গান সে শোনেনি। শুধু তার চোখে ছায়া ফেলে বেড়ায় একরত্তি নাকছাবি। পাতা-ঝরার-মরশুম আসার আগেই যা সে মেয়েটিকে উপহার দিয়েছিল। মেয়েটির নাসিকা ছিল ফুলের পাপড়িতে গড়া। কোমল পাপড়ি সন্নিবেশিত নাকের পাটাতন। ওষ্ঠের উপরে ঝিলিক দিয়ে দোল খেত নাকছাবি। যেন গোলাপের ওপর বসেছে কাঁচপোকা। আহ! কি করে সে থাকে অন্যের গৃহে? কেন সে আয়ান ঘোষের ঘরনী?
ছেলেটি বৃক্ষের ছাল-বাকলে লিখতে শুরু করে চিঠি---
‘সাক্ষী হইও ইজল গাছ নদীর কূলে বাসা
তোমার কাছে কইয়া গেলাম মনের যত আশা’
(চন্দ্রাবতী)

তিন.
Your love lifts my soul from the body to the sky
And you lift me up out of the two worlds.
I want your sun to reach my raindrops,
So your heat can raise my soul upward like a cloud
(জালালউদ্দিন রুমী)
একদিন ছেলেটি পেয়ে যায় কাঁঠালপাতা আর মাটির ঢেলার গল্প। মাটির ঢেলা আর কাঁঠালপাতার গল্প। এক ঝরে পড়া কাঁঠালপাতা উড়ে আসে ঝড়ে। আর উড়ে এসে পড়ে মাটির ঢেলার বুকে। মাটির ঢেলার শ্যামল বুকে সবুজ ঘাসের মতো রোমরাজি। আর মাটির গন্ধ। কাঁঠালপাতার প্রেম হয়ে যায় মাটির ঢেলার সংগে। মাটির ঢেলার কাঁঠাল পাতাটির সংগে। তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে। মাটির ঢেলাকে ঢেকে রাখে কমলারঙা-কাঁঠালপাতা। তারা জড়িয়েমুড়িয়ে থাকে একে অপরের সঙ্গে। আর থাকে লোকচক্ষুর আড়ালে।
হঠাৎ একদিন ঝড় ওঠে। আর বৃষ্টি নামে মুষল ধারায়। প্রচণ্ড ঝড়ে উড়ে যায় কাঁঠালপাতা। বৃষ্টির জলস্রোতে গলে যায় মাটির ঢেলা।
ছেলেটি অনুভব করে সে ধীরে ধীরে পাথরে রূপান্তরিত হচ্ছে। বড় এক পাথরে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর সে ঘুমিয়ে পড়ে। নিশ্চিত এক ঘুম। এরপর কোনো চুম্বনের জন্য তার আর হাহাকার নেই। অতৃপ্তি নেই!
পাথরকে কোনো বেদনা কখনও স্পর্শ করতে পারে না।

চার.
নারী, তুমি তো এক নিছক পাতাবাহার। তোমার গর্ভে ফুল নাই। ফল নাই। আয়ান ঘোষের ঘরনী তুমি। নয়নের তৃষ্ণাই কেবল মিটতে পারে তোমায় দেখে। অন্যের হৃদয় বুনে দেবার মতো বাবুইপাখি তুমি নও। কারণ তুমি বুনে দিয়েছিলে আমার হৃদয়।যে আমার হৃদয় বুনে দেবার কৌশল জানে, সে কী করে অন্যের হৃদয়েশ্বরী হওয়ার ছল করে?
আমিই তোমার কানাইয়া। আমিই তোমার শ্যাম, হে রাধা। প্রেমহীন বেহুদা চুম্বনের মায়া পরিত্যাগ কর, ফিরে এসো যমুনায়। ফিরে এসো নীল জলে। যমুনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে আজও ভেসে বেড়ায় আমাদের প্রণয়গাথা।
এসো হে সখী, এসো। এসে বসো আমার জলসিক্ত দেহে। আর জুড়িয়ে দাও বিরহ যত। তোমার স্পর্শ মাত্রই আমার সহস্র বছরের পুরাতন ব্যাধির নিরাময় হয়। তোমাকে দেখা মাত্রই স্বর্গের সিঁড়ি নেমে আসে আমার পায়ের কাছে। আর ঝুলন উৎসবে মেতে ওঠে ধরনী। পার্থিব আর লৌকিক জীবন লুপ্ত হয়ে যায় একনিমিষে। অসীমলোকে অবগাহন করে এসো আজ দুজনেই হেমলক পান করি।