অস্থি রঙের মাটি

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি কী ভাবি হাবুর কথা? আচমকা একটা ঝড় না আসা দুপুর শেষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে চৈত্রের ছদ্ম ছুটিতে। পরীক্ষা শেষ,নিশ্চিত খারাপ ফল। আমার মত যারা জীবনে কখনো দ্বিতীয় হয়নি(মানে যারা প্রথম, তৃতীয় বা পঞ্চবিংশও হয়নি)তারা জানে এসময় কেমন যায়। সময় খারাপ যাওয়া বলতে যা বোঝায়!

পরে দেখেছি একবার অঙ্কে খারাপ হলে দুনিয়া কিছুতেই আর বাগে আসেনা। এখন এই শেষ তিরিশের মন্থর পিচে কিছুতেই বাউন্ডারি আসছেনা। শুধুই সিংগল। শুধুই রানিং বিটুইন দা উইকেটস। যাহোক করে টিকে থাকা। কিন্তু একটা ভয়। এই বুঝি পার্টনার পড়ে যায়। এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসহীনতার মিনার। এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে যাচ্ছি। পার্টনারের কলএ সাড়া দিচ্ছি। কোথাও তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে কিন্তু সময়ের স্থিরতা কাটছেনা। ক্রমশ শানিত হচ্ছে বিপক্ষের খেলা। পার্টনার কি আত্মবিশ্বাস দেয়? দেয় হয়ত। এক দীর্ঘ তাড়াহীন আবেগের মন্থরতায় শানিত হাতে বিপক্ষের দিকে বুকচিতিয়ে লড়ে যাবার যে টেস্ট দুপুর তা হয়ত আমার কপালে আসেনি। কখনই আমার টাইমিং ঠিক হয়নি। ফ্লিক করতে চাইলে বল উঠে গেছে। তাড়াহুড়োয় ইম্প্রোভাইজড গ্লান্স হয়ত বেশিরভাগদিনই চলে গেছে ফিল্ডারের কাছে। শট সিলেকশান শেষকথা। আর তা বল দেখে হয়। আমার মত আনাড়িরা হয় পিচ বোঝে না হয় খেলাটাই ভুল বেছে নেয়!

আচমকাই ডেকে নিয়েছিল হাবু,কখনও বা হাবুদা। কী হবে বাড়িতে বসে? আমি ও কী জানি ছাই! প্রথমবার বেরোনয় ভয় ছিল। সেও ছিল গ্রীষ্ম ও প্রখর। তবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে যাওয়ায় যে আবিষ্কার ছিল তা আসলে কাঁচা আমের স্বাদ ও তার মহাদেশ। মন্থরতা। এবার আর ভয় নতুন করে করল না। বন্ধ না হওয়া ট্যাপকলের বিরক্তিকর আধোফোঁটার শব্দের মত দুপুরটা থেকে বেরনো কি সম্ভব? ভাবিনি। বেরিয়ে এসেছি। সঙ্গে আরও এক সমবয়সী। বাড়ি থেকে কাছেই, সে ঢেউ, সে তখনও জাঙাল। আসলে গতি বলে কী কিছু হয়? ভাবি। কখনও খানিকটা জোর করে মনে হয় এগিয়ে যাওয়াই শেষ কথা। না থামা। আর সে ঝড় না আসা দুপুর শেষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমরা ধীর লয়ে অস্থি রঙের মাটি,তার ওপর পড়ে থাকা শুকনো পাতা ও কী করে-না-জানা আশ্চর্য সবুজঝোপ,তার মোটা পাতা পেরিয়ে এক লক্ষভেদের দিকে যাচ্ছি। লক্ষ্য কী বলা নেই। হাবুদার বারণ। তার খালি গা। লুঙি। বয়স বোধহয় ১৮/১৯, ইশকুল যায়নি সে কোনওদিন। বলে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা ১৩/১৪রা জানি সে খবরের কাগজ পড়তে পারে না। আমরা ৩জন। পাতার খসখস শব্দে কিছু পাখি উড়ে গেল। একটা পোড়া হলুদ হাঁড়িচাঁচা। একটা কোকিল ছিল। এই যে এগোন, তারপর আচমকাই বসে পড়া ঝোপের আড়ালে থাকা পুকুরটার পাড়ে। প্রায় জলহীন অথচ একটা শীতলতা। জলীয় সবুজ। তার পাশে থেকে যাওয়া পাঁকগন্ধ। আবিষ্কার। এতদিন ভাল ছেলে হয়ে থাকার ফল। কখনওই আক্রমণাত্মক না হওয়ার ফল। এই বাগানের পাশ দিয়েই ছিল স্কুল ফেরত। হাবুদার ডাকে আগে বাগানে এসে চিনেছি পিঁপড়ের ডিম দিয়ে মাছধরার কল। কিন্তু এ পুকুর দেখিনি। হাবুদা তার রোগা চেহারা নিয়ে আমাদের বাকি দুজনের সামনে অতি সাবধানে নামছে পুকুরে। আমরাও। কিছুটা নামতেই টের পেলাম কারণ। একটা গর্ত। তাতে ঠিক ১৫টা মলিন রঙের ডিম। একটু বড়। হাবুদা বলল কাঠার ডিম। কাল নাকি কাওরার ছেলেরা এসে মা টাকে তুলে নিয়ে গেছে। হাবুদা বারণ করলেও শোনেনি। এখানে কাঠা আছে? শোনা গেল এই পুকুরেই আগে নাকি কাঠা থিকথিক করত। অনেকদিন পরে হাবুদা সেদিন দেখেছিল। মা কাঠাকে। আমরা তাকালাম পুকুর। আশে। পাশে । যদি বা দেখা যায় সেই অতি প্রাচীন জীবকে। যাকে প্রথম ও শেষবার আমি দেখেছিলাম ক্যানিং এর কাছে ডাবুতে। আমার হাতে ছিল শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মারাদোনা মারাদোনা। বাবার বন্ধু অমলকাকু দেখিয়েছিল। দেখেই মনে হয়েছিল অরণ্যদেবের হিজ। কাঠা। kachugakachuga বা Bengal Roof Turtle। অনেক পরে আবিষ্কার
করেছিলাম । সেই ঝড়না আসা দুপুর শেষ আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল বেশ কিছুদিন। ডিমগুলোর পিছনে কৌতুহল। কিন্তু কিছুতেই তার থেকে বেরিয়ে এলো নাহিজ বা হার্জ। পচে গন্ধ বেরিয়ে গেল।

আমরা তখন চলে গেছি সে মফস্বল ছেড়ে অনেকটা দূরে। একদিন একটা নীল ইনল্যান্ড লেটার এ আক্রান্ত হলাম। ১৭বছর বয়স দেয়ালে গ্রেম হিক এর পোস্টার লাগায়। গ্রেম হিক যাঁর কাউন্টি ক্রিকেটে করা রেকর্ডগুলো আজও প্রায় অমলিন। ১৭বছর বয়স কোচিং এর মেয়েদের দিকেই বেশি চোখ। কিন্তু সে ইনল্যান্ড এসেছে হাবুদার নামে। হাবুদা তো লিখতে পারেনা। তাছাড়া আমার ঠিকানা? অতি দ্রুত পড়ে ফেললাম কুশল ইত্যাদির পর বেশ বড়বড় অক্ষরে " পুরো বাগানে এখন বাড়ি তৈরি হইতেছে। পুকুর বুজাইবার সময় ৩টি বড় কাঠা পাওয়া গিয়াছিল। তাহাদের মারিয়া বনভোজন হইয়াছে।"

যেহেতু আমাদের প্রত্যেকের সামনে, আমি বা কাছিম, আস্কিংরেট চিরকাল হাই আর কখনই টাইমিং ঠিক থাকেনা তাই সে দুপুরের ডিম আর আমাদের বাকি সিলিপয়েন্টের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া দুনিয়া বোধহয় সব সময় লড়ে। কাঠারা বনভোজনের অংশ।

গ্রেম হিকের কথাই মনে পড়ে। অনেক চেষ্টা করে টেস্টএ হলেও ওয়ান-ডে ফরম্যাট এ কিছুতেই পারছিলেন না। রানিং বিটুইন দা উইকেটস ভীষণ খারাপ।