অজ্ঞানতিমির, গুরু, নাশ করো... টেইল এন্ডার, অথবা, নাইটওয়াচম্যানের স্বীকারোক্তি

ব্রতীন ভট্টাচার্য

It is far more than a game, this cricket. - Neville Cardus


উল্টোদিকে ধেয়ে আসছে বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম আক্রমণ। চারপাশের সবুজে-মোড়া বাস্তবের মধ্যেকার যে একফালি ন্যাকড়ার মত লালচে মাটি, সেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটাই কাজ। একমাত্র লক্ষ্য। পড়ে থাকতে হবে। ধরে থাকতে হবে। যে-যে বিদ্যায় পারদর্শিতা – ধনুর্বিদ্যা, ভূগোল বা অ্যাকাউন্টেন্সি – সেই চেনা পরিধির ঠিক বাইরে থেকে আসবে অ্যাটাক। বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম অ্যাটাক। দুর্বলতম পয়েন্ট লক্ষ্য করে।

অ্যামফিথিয়েটারের কোণে কোণে পোকার মতন পুঁজিয়ে থাকা মজালুটিয়ে দর্শকদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে ধরা রইল সমর্থনের পরিমাপ। প্রান্তবাসী, যারা সাফল্যে নেচে ওঠে অশ্লীল, আর ব্যর্থতায় ভঙ্গুর বৃষ্টির মতন ঝরে যায়- তারা তাকিয়ে আছে পোষ্যের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে। লড়াইয়ে ভাগ না-নেওয়া, দুর্বল, অপ্রাসঙ্গিক আমোদগেঁড়ে – কমরেডস – পথ-চলার সাথী। তারা দলের, দেশের সমর্থক। দেশ – যে ময়দানী ক্লাব তোমার-আমার হিংসাচর্চার স্থান। নিয়ন্তার ছেড়ে-দেওয়া জন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ে কখনও আঙ্গুল উঠবে, কখনও নামবে।

ব্যাডলাইটের পূর্বমুহূর্তে, যখন প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাহীন তবু রুদ্ধশ্বাস, চারপাশের আধখানা ঢেকে ফেলেছে কালো ছায়া – তখন হয়তো জ্ঞান গোঁসাই শ্রীরাগে ধরেছেন মহাদেব-ভজনা – যোগীশ্বর হর ভোলা মহেশ্বর / ভস্ম অঙ্গে, শিরে রঙ্গে গঙ্গাজল – গোধূলি-পরবর্তী সেই মুহুর্তকেই আক্রমণের আছড়ে পড়ার প্রকৃষ্টতম মুহুর্ত বলে চিনে নিতে হবে। যাঁরা রক্ষক হতে পারতেন, তাঁরাই পাঠালেন রক্ষণে – যাতে শেষবেলার আলোআঁধারিতে আঘাত তাঁদের না পেতে হয়। নায়কের বিমান উড়ছে, উড়বে! অনিশ্চয়তা মহানের জন্য নয়!

শাস্ত্রে বলে এক মুদ্রাক্ষেপে জয়ের সম্ভাব্যতা অর্ধেক। আর একটি জেতা-টসে হারার সম্ভাব্যতা? অসংখ্য! সুতরাং, আমাদের ব্যক্তিগত গন্তব্যগুলোকেই জিত বলে মনে হয়। পাহাড়-সমুদ্রের যুদ্ধ, ফ্লাইওভারের দেহালঙ্কার, শপিং মলের সন্ত্রাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যার-যার অর্গ্যানিক পথে গন্তব্যে ফেরা। এইটুকুই তো...

এই আলোধোয়া ধরায় ঝড়বিধ্বস্ত বক আকছার মরিয়া থাকে। সুতরাং তুমিও বাঁচিয়া থাকিতেই পারো, মরিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তাহারই বীচ-বীচ মহামায়ার অসীম কৃপায় যে দু-একবার ব্যাটে-বলে হইবে, তাহাকেই সাফল্য জানিও!

কুড়ি লক্ষ বছরের ঘষামাজা করা মগজে আঁকড়ে ধরে রাখা কয়েকটা শিক্ষা, তারই নাম দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা। মহাবিশ্বের কোটি সৌরজগতের মধ্যে স্বপ্নলোকের চাবির হদিস-জানা এই যেন এক, প্রজ্ঞা! তারই কাছে হাত পাতার অভ্যাস। অথচ প্রজ্ঞা এক শৈলী ছাড়া তো কিছু নয়! এই প্রজ্ঞা দিয়েই বানিয়েছি অযুত পাঁচিল। বন্ধু, এ-যাত্রা তুমি থামাও...

প্রজ্ঞা – সফল জীবনের মন্ত্র, শিল্পের আধার। না! শক্তির উৎস, ধ্বংসের কারক। শুদ্ধির কথা আজ থেকে অন্তত অর্ধ শতাব্দী আগে শেষবার উচ্চারিত হয়েছে, মনে হয়। প্রজ্ঞার শক্তিরূপী বিকাশ যিনি জানেন, খেলার চাবিকাঠিটি তাঁরই হাতে। আক্রমণের সাফল্য মেপে নেওয়া ধ্বংসের পরিমাণে।

নিজের সৃষ্ট উপাদান দিয়ে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করা। যাবতীয় ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব জমা হচ্ছে – ঈশ্বরের অবর্তমানে - শুধু ক্রমিক সংখ্যার ভিতর। সিস্টেমই শেষ কথা বলতে চাইছে। আলো পড়ে আসছে, মুঠি কঠিন হয়ে আসছে। নিয়মের সঙ্গে সাযুজ্য রাখার খেলায় ক্রমশই পিছু হটা।

ক্রীড়াবিদ হয়ে উঠছেন ক্রীড়নক। সভ্যতার বিবর্তনের খতিয়ান। মোর শকতি নাহি...

দিশাহীনতার নাম ভবিতব্য। অর্থাৎ, যাহা ঘটিবে।

মহা-আশঙ্কা জপিছে... তবু তারই মধ্যে কোনো এক মোহে... টিঁকে থাকার তীব্র এক মোহ আছে। না কি, ধ্বংসের মোহে ঢাকা পড়ল সব?

পুরোনো সময় চলে গিয়ে ক্রমে নতুন সময়ের জন্ম হয়। নতুন সময়ের নতুন মাপ, নতুন একক। সর্বব্যাপী ধ্বংসের ব্যাখ্যানে সৃষ্টিকে মনে হয় তাৎক্ষণিক সুখ। স্লো-মো ক্যামেরায় বারংবার আঘাত বা পরাজয়ের ছবি। জয় যেন একটা তাৎক্ষণিক অনুভূতি।

রাত পেরোলে, কাল সকালে, শিশির থাকলেও... দিনটা নতুন হবে। নতুন আক্রমণের সময় হয়েছে যেমন, তেমনই সময় হয়েছে নতুন করে তার মোকাবিলার। সবার চোখের আড়ালে তৈরী রেখেছি নতুন খেলার ছক।

নতুন নিয়ম। নতুন ব্যাকরণ।