ফাউল

অলক্তা মাইতি

অলোন্ধ্রনা। রন্ধ্র অর্থাৎ ছিদ্রপথে যে আলোর প্রবেশ। মাতৃগর্ভের নিকস কালো অন্ধকারে সেরকম কোনও ছিদ্র ছিল না। ছিল না সিকিভাগ তথ্য সঞ্চারের সুযোগ। জ্ঞান তবু কিভাবে যেন ঠিক কব্জা করে নিলো ছেলেটার ধূসর জন্মবৃত্তান্ত। তখনও তার কান ছিল না, চোখ ছিল না ছিল না সহজাত পরিবর্তের চাপ। কিম্বা ছিল। একটু একটু করে ফুটে উঠছিল বৃষ্টি শেষের খোলা আকাশের রামধনুর মতো। অতল যমুনার নীল জলে অনেকটা সিমের বীচির মতো ভাসতে ভাসতে সে নাকি শিখে নিয়েছিল দুর্লভ কৌশল। আচ্ছা ভ্রূণের কি থাকে ভাষাজ্ঞান? যদ্দুর জানি থাকে না। তাহলে কি সম্ভব আড়িপাতা? যদ্দুর জানি অসম্ভব। তাহলে কি করেই বা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে জঠরের প্রাচীর গলে ব্যবহারিক জ্ঞান পৌছালো ছেলেটার কাছে? আসলে বীর্যের পরতে পরতে তো সেই দিগ্বিজয়ী পিতার শৌর্যের ব্লু-প্রিন্ট। ক্রোমোজোমে ক্রোমোজোমে জড়িয়ে আছে গাণ্ডীবের টঙ্কার। চক্রব্যূহে অনুপ্রবেশের শিক্ষা পিতা দিয়ে গেলেন আদরের উত্তরাধিকারীকে ঔরসের অহংকারে। সৃষ্টির আদি কাল থেকে এইভাবেই অস্তিত্ব রক্ষার অজুহাতে একটার পর একটা চক্রব্যূহের রচনা হয়। শুক্রকীটের কামড়ে কামড়ে রক্তাত্ব যোনীতে জন্ম নেয় ভ্রূণ। ভ্রূণের ভেতর ডি এন এ-র অতৃপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ভূমিষ্ঠ হবার আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় চক্রব্যূহে জড়িয়ে ফেলার খেলা। দুঃখ, জরা, মৃত্যু, উদ্বর্তনের নিয়ম, অন্ন-বস্ত্র- বাসস্থানের খোঁজ, পুনরায় ব্যূহের রচনা… দৌড় আর দৌড়। চক্রব্যূহে প্রবেশের পথ সেই কবে থেকেই শিখে ফেলেছি; কিন্তু অভিনিস্ক্রমনের পথ? কেউ বলেনি।
ফল ভাল হল না তার। বারবার আমার রথের চাকা মাটিতে গেঁথে গেছে। আমার নিশ্চিত বিজয়ের মুখোমুখি খাঁড়া হয়েছেন শিখণ্ডী। সভা মধ্যে ছলনায় হেরেছি সাম্রাজ্য, সম্মান এমনকি আদরের গরবিনী বৌটাকেও। স্বয়ম্বরে জাত পাত তুলে আমায় বাতিল করেছে সুন্দরী। গুরুদেব কেটে নিয়েছেন ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল। সাত দিক থেকে সপ্তরথী ঘিরে ধরে নিরস্ত্র, নিঃসহায় অবস্থায় হত্যা করেছে আমায়। কেউ প্রতিবাদ করেনি। আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করতে কেউ বাজায়নি বাঁশি।
ফুটবলের বারো নম্বর নিয়ম টা মনে আছে তো? কেবলমাত্র প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে কোনরকম সাবধানতার ধার না ধেরে, বেপরোয়া ভাবে খেলে এবং মাত্রা ছাড়া শক্তি প্রয়োগ দরুন যখন একজন খেলোয়াড় রেফারীর বিবেচনায় দোষী সাব্যস্ত হয়, তখন নাকি সবদিক থেকে বেজে ওঠে শ্যামের বাঁশি। ফা-আ-আ-উ-উ-উ-ল-ল-ল।
জন্মাবধি বহুবার। স্কুলে, কলেজে, অফিসে, সেমিনারে, বাসে, ট্রামে, বিছানায়, বাজারে আমায় কিক করা হয়েছে, পুস করা হয়েছে, অন্যায় ভাবে চার্জ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষ বহুবার ট্রিপিং করে এগিয়ে গেছে সাফল্যের কাছাকাছি। কোনও পেনাল্টি পাইনি কখনো। এক আধটা ফ্রি কিক... হয়তো বা... ঠিক মনে পড়ে না। চক্রব্যূহের ঠিক মাঝামাঝি যে গোলাকার উপবৃত্তে জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো খেলা হয়, সেখানে পৌঁছেই খেলাটা তার যাবতীয় সৌজন্য হারিয়ে ফেলে। দাঁত, নখসহ ক্রমাগত হিংস্র হতে হতে পানসে হয়ে যায় রেফারীর নিয়মের খাতা। প্রতিবার। আমি নিষ্ক্রমণের উপায় জানি না। তাই গোল গোল ছুটতে থাকি মাঠময়। কিম্বা নিজেই রচনা করি আরও এক ব্যূহের। আটকে ফেলি অন্য কাউকে। অন্য কাউকে অন্যায় ভাবে জড়িয়ে ফেলি লাল সুতোর ফাঁসে। অসদবৃত্তির পৌনঃপুনিকতায় জমে ওঠে খেলা। ভিড় আছড়ে পরে গ্যালারীর তার ঘেঁষে। জীবনচক্রের জ্যামিতিক বৃত্তকাশে ছুটতে থাকে বল। থামতে পারে না।
ওদিকে খেলা শেষ হয়ে গেছে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেই। জোৎস্নাসিক্ত আষাঢ়ে পূর্ণিমার রাতে সদ্যজাত পুত্রকে রাজপুরীর নরম আলোয় শুইয়ে, কণ্টক ঘোড়ার পিঠে চড়ে, কোন সেই নাম না জানা নদীর দিকে মুখ করে এগিয়ে চলেছেন সিদ্ধার্থ। ছন্দক দাস ফিরে এসেছে। মাথার মুকুট, হাতের বালা, কানের কুন্তল, গলার মালা, এমন কি প্রিয় ঘোড়াটাও ফিরে এসেছে একে একে। সারা রাত পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে কখন ফুটেছে সকাল। পুব দিকের সোনাঝড়া আলোয় জেগে উঠছে শহর। এক এক করে খসে যাচ্ছে কৌশল। ভেঙে যাচ্ছে ব্যূহ। চিরকালীন খেলা শেষের বাঁশি বাজতে বাজতে মিলিয়ে যাচ্ছে অনুরণনে। প্রকট হচ্ছে অনন্ত আদি প্রণব। জন্ম নিচ্ছে নতুন শব্দরাশি,-- “ভিক্ষাম দেহি মাতা!”