ডট বল

তমাল রায়

সেই যেদিন তুমি ডাকলে,আর আমি ঘুম থেকে উঠলাম না। আকাশ ফর্সা হচ্ছে। একটা একটা করে রাত শহরের স্ট্রীট ল্যাম্পগুলো নিভে যাচ্ছে।
তাঁতিয়া নিয়ে এসেছিলো ছোট্টো কাপে করে চা। আমি খেলাম। গাল টিপতেই দেখি চোখ দিয়ে জল গড়ায়।-কিরে কাঁদিস কেন? পারলাম না,গলা দিয়ে যে স্বর আর আসেনা। ও একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো অনেকক্ষণ। -আঙ্কল তুমি চলে যাবে? জলটা খুঁজছিলাম বাঁ হাত বাড়িয়ে। ধরলাম, একটু চলকে পড়ে গেল। বিব্রত লাগে। তাঁতিয়া বলে উঠলো -আঙ্কল ইটস অলরাইট। আমি মুছে নেব। আমি মুছতে যাচ্ছিলাম,হাতের মুঠো দিয়ে। আঙুলের মাথা দিয়ে আঁকলাম গাছ,ফুল পড়ছে,-কুসুম ঝরিয়া যায়…
জল শুকালেই ছবি ভ্যানিশ। ও দেখে ফেলেছিল ইত্যবসরে। -আঙ্কল কি সুন্দর আঁকো তুমি। মুখে হাসি আনলাম। আনতেই হয়। কি করব। আমার হাত চেপে,বলল -তুমি থাকবে বল। পাশ ফিরে শুলাম।
তুমি ডাকলে আমায়,যেভাবে ডাকো রোজ। ভোরের অস্পষ্ট আলো মেখে চড়াইটা আমাদের বারান্দায় এক্কা,দোক্কা..প্রথম ট্রেন ছেড়ে গেল স্টেশন,আকাশ লাল ক্রমশ। দেওয়ালে একটা টিকটিকি চলছে। তাকিয়ে আছি।কোথা দিয়ে আর একটা। মারা মারি,ধুপ করে দুজনেই পড়ে গেল নীচে। এটা কি আদর না লড়াই? বুঝিনা। আদর আর লড়াই এই দুই এর দুনিয়া থেকেই আমি অনেকটা দূর আজ। মা যখন ছিলেন,বলতেন- দেখ জীবনকে দূর থেকে দেখবে কি সুন্দর। কাছে যাও দেখবে কত গু মুত ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এ মার শেষ জীবনের উপলব্ধি। যৌবনে? বলেছিল- যৌবনে কুকুরীও সুগন্ধা। সুগন্ধে বাস করে কি আর এ উপলব্ধি আসে! -ফুলের বনে যার পানে চাও,তারেই লাগে ভালো। মা চলে গেলে রেখে গেল যা,তা দেখার চোখ,আর বোঝার মন। সেটুকুকেই সম্বল করে আজও। আজ রান্নার লোক আসেনি।খাবার নেই। টেবিলের তলায় হাত বাড়াতেই পেলাম চিঠি। হ্যাঁ,তার। বড় সুঘ্রাণ এ চিঠির। জোরে নিশ্বাস নিতে গেলাম। বুকে ব্যথা করে। পারলাম না। সু এর চিঠি-
“একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলাম নয়ন জলে
সহসা কে এলে গো,সে তরী বাইবে বলে।
কোথা হতে এলে,আমিতো তোমায় চিনতাম না। কি দরিদ্রের মত কাটছিলো দিন। আজ আমি রাজেন্দ্রাণী..”
চোখে আজও কেন জল আসে,এত গুলো দিন। সু খুব ভালো থেকো,যার সাথে যেখানেই থেকো। সুখের সাথে আমার বড়ই শত্রুতা ছিল,যেমন থাকেনা অনেকটা পিঠোপিঠি ভাইবোনের সাথেও। দু:খ আমার জীবনবোধ পালটে দিচ্ছে দেখে,সুখ আর এলোই না। আমি আর কিই বা পারি,মিচকি হেসেছিলাম। অভিযোগতো কারও ওপরই নেই। একা শরশয্যায় যার জীবন,যাপন,তার আর আফশোষে কি লাভ,বরং শিখেছি মেনে নেওয়াই ভালো। তাতে বরং নূন্যতম সম্মানটুকে থেকে যায়,জিদ করে কি হয়,কে শুনবে বল সু!


তুমি ডাকলে আমায়,যেভাবে ডাকো রোজ,প্রথমে এস এম এস এলো। ফেসবুকে ও সময় দু একজন জয় কালী,বা কোরাণ থেকে লিখে রাখে কয়েক পঙক্তি।
কাল সারারাত জুড়ে বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ে বৃষ্টি মানেই কি বিপত্তি তা পাহাড়িয়ারাই কেবল জানে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছিল। আমি ভিতু লোক। তেমন সাহস করে কখনোই বলতে পারিনি বাবাকে - এত যদি বোধ তোমার,তবে আমার মা কেন এমন জনমদু:খিনী? মা’কে বলতে পারিনি - কেন মেনে নিতে হয় সব,দুয়োরানী হলেও দোষ নেই, ঘুঁটেকুড়ুনিও হতে পারো,কিন্তু কোনো বর্ষার রাতে একবারও কি জ্বলে ওঠেনা স্যাঁতসেঁতে দেশলাইকাঠি? বিনুনি দুলিয়ে কমলা পাড় শাড়ি পড়া আমার দিদি যখন স্কুল যেতো,কত স্বপ্ন তার চোখে,ভালো লাগতো। দিদি আর কই আলো পেলো? এত অন্ধকার। সারাটা জীবন ভোর সে লুকোচুরির চোর হয়েই রইল। চোখ বন্ধ করে কেবল গুণে যাচ্ছে এক দুই তিন… আর লুকিয়ে পড়ছে একে একে সব্বাই,এখনতো কর্কটক্রান্তিতে সে। ক্রান্তিই বটে,হা মুক্তি! কাঁহাতক গুণে যাবে ধারাপাত? পাহাড়ের ওপর থেকে নীচটা অস্পষ্ট লাগে,অবশ্য সমতলের ওই জীবন আমারও তো বড় অস্পষ্ট অথচ কি তীব্র দহনজ্বালা। মৃগনাভির সুগন্ধের মত এক জীবনের গল্প বলত মা। কই সে জীবন? কেমন দেখতে মা? কত ছুতো নাতায় জিজ্ঞেস করেছি,মা চুপ করে থাকত। হয়ত নেই,অলীক কল্পনা,হয়ত এমন কোনো জীবনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে মা চলে গেল,অলীক রাজ্যে,সেখানে নিশ্চিত সুখের সাথে ভাব হয়েছে,তাইনা মা?
তুমি ডাকলে আমায় যেভাবে ডাকো রোজ
চ্যাটের দরজায় কড়া নাড়লে। চায়ের দোকান খুলছে। নেড়ি কুকুরগুলো ইতস্তত পায়চারিতে,খাবার খুঁজছে হয়ত,এবার সকাল যাবে বাড়ি বাড়ি। গার্ডার বাঁধা প্রভাতী সংবাদ হয়ে টুপ করে খসে পড়বে বারাব্দায়, যেভাবে ফুল..চাকরি জুটে ছিল একটা। দোষ দিয়ে কি লাভ অন্যকে,নিজেই মানাতে পারিনি। উইনিং হর্স নেভার স্টপস,হি রানস উইদ অল পেইনস এন্ড এগনিজ,এন্ড দ্যাট ইজ হিজ ওনলি রিলিজিয়ন। আমিতো সফল নই। তবু কেন যে লোকের এত মাথা ব্যথা ছিল আমায় নিয়ে। ডারউইন সাহেব অভিযোজনের যা তত্ত্ব দিয়েছিলেন,তা থেকে বুঝেছি,দোজ হু লুজ,দে বিকামস এক্সটিংট। ভাগ্যে এই পাহাড় ছিল,আর নিশ্ছিদ্র আঁধার। নইলে মুখ লুকোতাম কই? মা নেই তাতান নেই। তবু যে বেঁচে আমি এ অশক্ত শরীরে,সেতো আঁধার আমায় আশ্রয় দেয় তাই। কি ভীমরতিতে ধরেছিল, যে এই স্মার্ট ফোনটা কিনলাম, আর বুধিয়া যাকে,এই পাহাড়ের সবাই গাঁওবুড়া বলে,সেও বটে এক মানুষ!আমায় ভালোবেসে ফেলল,বলে মাস্টারজি আপ বহুত নেক আদমি। আমি মাথা নাড়ি, ‘না’ বলি। কই ভালো? ভালোরা এত একলা হয়? তাঁতিয়া হল বুধিয়ার বেটির মেয়ে। সে পড়তে আসত আমার কাছে। টুক টুক করে শিখিয়েদিল ওই সব সোশাল নেটওয়ার্ক। আর ব্যস। আমি বন্দী। কোথা থেকে সু ও খুঁজে পেয়ে গেল আমায়। এবার? ভয় লাগে যে বড়। কত বার বলেছি – ‘সু তুমি তো দিব্যি ভালো আছ স্বামী সন্তান নিয়ে,আমি তো একাই,কি দরকার,এও তো তপস্যা বল। কি লাভ এ তপস্যা ভেঙে’। আবার সেঁজুতি জানতে পেরে খোঁজ খবর করবে, এ বরং আমার কিছু নেই, তবু শান্তি! কিন্তু যার আছে সে যে যেন কেন এই অর্বাচীনকে এত অসহ্য রকম ঘৃণা করে,জানিনাতো। সেঁজুতি কে আমি তো বিয়ে করতেও বলিনি। নিজেই জোর করল। আমার মত উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মানুষের সাথে তার পটে,বল? আজ নয় কাল ছাড়তেই হত তাকে আমার সঙ্গ। আর ছাড়লো ও। তবু তাতান ছিল শেষ আশ্রয়। তাকেও...

সেই,তুমি ডাকলে আমায়, যেভাবে ডাকো রোজ,আর অনেক ফুলের মাঝে আমি হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে যাচ্ছি,একাই,
সেই যেদিন তুমি আমায় ডাকলে,
অজস্র মিসড কলে ভরে যাচ্ছে ফোন,যেভাবে ভরে গেছিল আমার যাত্রাপথ…
তাতান আমার হাত ধরবে এবার,মা নিয়ে আসুক সেই চাকা লাগানো গাড়িটা,সেই কোন ছোট বেলায় এ গাড়ি চড়েই আমরা পেরিয়ে যেতাম প্রশান্ত মহাসাগর,চীন এশিয়া মাইনর…
মার হাতে দড়ি,আমি মাইনর পেরিয়ে যাচ্ছি পথ,মেজর যারা তারা এবার নিশ্চিন্ত হোক। কি কুয়াশা...দেখা যায় না কেন কিছুই,সু তুমি কি আমায় খুঁজছিলে???
কেবল জানো কি করে যেন গাড়ির চাকা আটকাচ্ছিল,লম্বা গাছের গুঁড়িতে,কে জানে...
চলে যাবার আগে এ সমস্ত গুঁড়িকেই কি নস্যাৎ করতে করতে যেতে হয়েছিল সিদ্ধার্থকে? সেই নিস্ক্রমণের পথে? জানো? তুমি? ??