লেগ বিফোর উইকেট…

সৌরাংশু

খেলা ভোলার দিনগুলো সব আসে মাঝে মাঝে
সেদিন আমার মনের ভিতর কেমন তরো বাজে…
বাবাকে বলে দিয়েছি আর খেলা টেলা হবে না আমার। অনেক ঘষটেছি… হাঁটুর লোম উঠে গিয়ে টাক বেড়িয়ে পড়লো। বয়সটাও হচ্ছে। সঙ্গে গার্লফ্রেন্ডের বাপের ঠ্যালা। আর আমি ক্যালা শালা যে তিমিরে থাকার সেখানেই রয়ে গেলাম।
অথচ বছরের শুরুটা অন্যরকম ছিল কিন্তু, বিশুদা বাবাকে বলে নিয়ে এল যখন সোনারপুর ইউনিয়নে তখন একটা শেষ ফুলকির জন্য মনটা ছটফট করছে। সময় ফুরিয়ে আসছে যে, আমার সঙ্গে খেলতে খেলতে লাহিড়ী, অজয় সব বেঙ্গলের কন্টেন্সনে ঢুকে গেল আর আমি সেই ভাসি আর ডুবি। মিনু তো এসব বুঝতে চায় না, বোঝেও না। তার আমাকে চাই। আর সেই চাইটার পিছনে যে ছাই, কতটা ছাইচাপা দেওয়া আঁচ পরে থাকে তার আঁচ কি করতে পারে।
মিনুর বাবাও সেদিন আমার কপালে স্টিকার সাঁটিয়ে দিল… আমার রিটায়ার করার আগে কিছু একটা করে ফেল। করে ফেল বললেই তো হয় না, বল তো আর হাতের মোয়া নয় নিজের মতো করে লাড্ডু পাকিয়ে গড়িয়ে দিলাম তো স্বাদ একই থেকে গেল।
সোনারপুর ইউনিয়নের প্রথম দিন প্র্যাকটিসের আগে যখন বাবার শেষ এল টি সি থেকে ফিরছি… তখনই ঘটে গেছিল অঘটনটা। নখটাকে সরাতে পারি নি… আঙুলটাকে তো নয়ই। সারা রাত ক্যুপের প্রস্থ মাপতে মাপতে একটা শিরশিরানি পিস্টনের মতো পিঠ বেয়ে ওঠা নামা করতে লাগল। তিন দিন পরেই শিশমহল খেলতে যাবার কথা। এখন তো ফুলকির কথা চুলকিয়ে ব্যথা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
বাধ্য হয়েই পরদিন বিশুদা-র সঙ্গে গিয়ে দেখা করলাম। প্রথম দর্শনেই একটা তাচ্ছিল্য। আসলে ক্রিকেটের পাতে বোলাররা চিরকালই অপাংক্তেয় হয় আর সে যদি ক্যাপ্টেনের সগোত্রধারী হয় তাহলে তো কথাই নেই। মুখে মাখন আর বুকে ছুরি… কাকে ধরি আর কাকে ছাড়ি।
ব্যাট করতে পারলাম না কিন্তু ওই হাত দিয়েই বলটল করার পর দৈব বাণী এল। তোকে যেতে হবে না… ফিল্ডিং করবি কি করে? শুধু ৯ ওভার বোলিং করাবার জন্য ৯০০ টাকা নষ্ট করার তো মানে নেই। তাও যদি দিলিপ দোশি হতিস। বিনা দোষেই ফাঁসি হয়ে গেল… নাকি যাবজ্জীবন?
দু সপ্তাহ বাদে লক্ষ্য করলাম আমি কেমন যেন চন্দ্রচ্যুত হয়ে গেছি… চাঁদের কলঙ্ক পরিষ্কার করতে গেলে তো ফিনাইল লাগে। কিন্তু সে চক্করে ময়দানের বেনোজল ঢুকে পড়ে মজ্জায় মজ্জায়।
সময় চলতে থাকে, দিন যায় না। যে ফিল্ডিং করা যাবে না এক হাত দিয়ে বলে শুরু করতে পারলাম না, শেষ পর্যন্ত সেই ফিল্ডিন-ই সম্বল হয়ে ঝুলে থাকে রোপওয়ের রেলিং থেকে। মাঝে মধ্যে দৌড়ে গিয়ে খোঁয়াড়ে মিড উইকেট বাউন্ডারি… নাহলে মারণ শর্ট লেগ। হেলমেটটা ভারী হতে হতে মাথা গেঁথে যায় নিজের ছায়ায়। মিনু শোনে কিন্তু শোনে না… বোঝে না কিন্তু বোঝেও হয় তো। আমি খালি দেখতে থাকি উইথড্রয়াল গালিতে আমার পাটা চোরাবালিতে সেঁটে যাচ্ছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো পাগলা বলে খেপায় আর টিটকিরি দেয়… আর আমার কালি ঝুলি মাখানো চেহারাটাও নিজের দিকে তাকিয়ে বলে… না হে এবারেও হল না তো!
মোহনবাগান ম্যাচ, বড় ম্যাচ বলে বড় বড় প্লেয়ারদের পেট ব্যথা হয়। বিশেষত কাপ্তানের কাপ্তানি ঢুকে গিয়ে খবর আসে তিনি নাকি অফিস ম্যাচ খেলতে চলে গেছেন দিগন্ত ছুঁয়ে। মনে আশা, যা হোক এবার তো একটু হাত ঘোরাতে পারব। দেড় বছর আগে আদিল শেখ আর এন পি সিং-এর ডাণ্ডা নড়িয়ে দিয়ে যে পাঁজরটা বুকের পাশে জুড়েছিল সেটা তো ইন্দ্রদেবের হাতেই তুলে দিয়েছিলাম… আজ হয়তো তার ঝাড় পোঁছ করার দিন।
সকালের মাঠের চক্করটায় যেন পায়ের সরষেদানারা একটু বেশীই সরস। ২৩৯এ করে আধঘণ্টা আগেই হাজির হলাম। মলয় দা বেশ অনেকক্ষণ ধরে হাত ঘোরাতে বলল। টিম লিস্ট লেখা হল চলে গেল আম্পায়ারের কাছে ছাপা হতে। টিম ফিল্ডিং পেয়েছে। বুট পরতে পরতে শুনতে পেলাম, আমার নামটা কি করে যেন নয় ব্যাটসম্যানের তলায় চাপা পরে চলে গেছে। মোহনবাগান মাঠের টয়লেটটা বড়ই দূর হয়ে যাচ্ছে যে… পৌঁছব কি করে জানি না… গুগল ম্যাপসও আবিষ্কার হয় নি যে ঝাপসা চোখে ছেঁকে নিতে পারব।
এক একটা মিনিট খুঁটে খুঁটে বেঁচে নিতে নিতে শুনলাম মলয়দা বলছে- বার্ণপুরে তো তুই খেলবিই, বিশু তো এসে উঠতে পারবে না। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল, যদি একটুকরো আলোও এই বাঙ্কারটায় এসে পৌঁছয়… একটা হলুদ পাখি শিস দিতে লাগল টু হুইট টু টু।
নির্দিষ্ট দিনে খান দুই ব্যাগ নিয়ে হাজির হলাম ইউনিয়নের টেন্টে। কালো মেঘ ফুঁড়ে যদি উড়ে যেতে পারি… কিন্তু বৃষ্টি পড়তেও দেরী হল না। যমদূতের মতো বিশুদা এসে হাজির। কর্পোরেশন নাকি আগেই হেরে গিয়ে আমার উইকেটটাই ফেলে দিয়েছে… তাই স্টেশন থেকে রিটার্ন টিকিট নিয়ে হাজির। দলের জন্য পরান যে জ্বলিয়াই যায়।
অন্ধকার আমার চোখ জুড়ে, বুক জুড়ে অন্ধকার… সুমনের গানও আর ভেসে আসছে না ইডেন উদ্যানের গাছ পালা বেয়ে… ট্রেন ধরে হাওয়াগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়, হাওয়া আমার মুখ চোখ নাক মুখ ছোঁয় না। জোকারের মতো শোনপাপড়িতে নাক মুখ চোখ ডুবিয়ে একটু হাওয়া নিতে চেষ্টা করি… হাহাকার ফুঁড়ে ওঠে সমবেত হাসির মূর্ছনার মধ্যে। পথের যে শেষ কোথায়…
আবার সেই দুয়োরাণীর ছেলে ফিল্ডিং আবার সেই গালিতে দাঁড়িয়ে একটা অসম্ভব কাজ আবার সেই ফালতু পিঠ চাপড়ানিতে বুক দুলে ওঠা। আবার সেই পেট খালি করা দমকা বাতাস এক বুক সারল্য নিয়ে ছিটকে পড়ে যায় বুক জুড়ে।
ফিরে এসে বাবাকে জানিয়ে দিলাম যে আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে… কিন্তু আমি ভিজলাম না। মন দিয়ে কিছু একটা করি। প্রেমে পড়ি বা উঠি। কিন্তু মাঠ থেকে মন শুধু উঠেই গেল। পড়ে থেকে গেল থ্যাঁতলানো নখ, আর ভোঁতা হওয়া বুটের স্পাইক। বাবা কি বুঝলো কে জানে কিন্তু ম্যাজিকের মতো নিজের অফিসের হয়ে খেলার বন্দোবস্ত করে দিল… শেষবারের মতো।
খড়কুটোরও যে শিকড়ের টান থাকে… ভেসে যাবার আগে একবার নাক উঁচিয়ে বেঁচে নিতে চাইলাম… প্রথম ম্যাচ সি ই এস সি-র সঙ্গে ৪ উইকেট। দুই তিন দুই তিন করে বেশ ভালো অবস্থায়। মরালের গ্রীবা বেয়ে বেহাগের রাগ গাওয়া শুরু হয়েছে। দিনের আলো কমে আসছে… কমে আসছে। কিন্তু মনে তো কেউ আলো জ্বালাচ্ছে। দু বেলা মরার আগে মরব না যে।
কোয়ার্টার ফাইনাল, সামনে পড়ে গেল কলিকাতা পৌরসভা… আমার জ্বলে ওঠার দিন নাকি নির্লিপ্তির অন্ধকারে নিজেকে গুটিয়ে নেবার দিন। যাই হোক না কেন, মিনুকে বলে এলাম, আঙুল দুটো এদিক ওদিক করে রেখো… ফিঙ্গার ক্রসড, আমার দিন আজ।
সেদিন আবার হল এক কেলেঙ্কারি, ক্যাপ্টেন দা সুস্থ নয় তো সিনিয়র প্লেয়ার হিসাবে যার ঘাড়ে দায় পড়লো সে আবার বুদ্ধিকে প্যাক করে রাখে ঘাড়ে। এমনিতে বোলাররা ক্যাপ্টেন হয় না কারণ হয় বেশী বল করে বা কম। চিনির মাপ কিছুতেই ঠিক রাখতে পারে না বলে। এখানেও সেই হল। বিশুদা পাত্তা দিল না। অন্য যারা চেনা পরিচিত তারা এসে করমর্দন করে আদর করে দিয়ে গাল মুলে গেল। বুঝলাম সেতারের এক দুটো তার ছিঁড়ে গেলেও সুর থাকে মন জুড়ে, বাকিটা তো মনে মনে বাজুক…।
টসে জিতে ফিল্ড। এক দুই তিন চার… ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে দিনের কাঁটায় পৌঁছে গেল… তোমার দেখা নাই রে তোমার দেখা নাই। বল খালি ব্যাট ছুঁয়ে হাতে আসে আর ভাঙা ভঙ্গিতে উড়ে যায় বোলারের হাতে হাতে। আমার হাত আর কানের পাশ দিয়ে আসে না… একুশ বাইশ তেইশ… চব্বিশের মাঝামাঝি এসে সেই বোলার দা আমায় জিজ্ঞাসা করল, কি ভুলে গেলাম বল দেখি… আমার হিসাবে মিলছে না যেন?
যতটা সম্ভব মিহি করে বললাম, তুমি আমায় বল করতে দাও নি… তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল… মানুষের মুখে যে কত কালী মা লিপ্ত থাকে সে তার জিভ কাটা দেখেই বুঝলাম… বললাম আর শেষ পাতে দই নাই বা দিলে… চলো ম্যাচটা জিতে আসি।
চোখ মাটিতে আর মন আগুনের আঁচে পুড়ে পুড়ে শান্ত হয়ে গেল। চারিদিক যেন নিস্তব্ধ পারাবার, শান্তি শান্তি আহ…। কত দিন যে বুক ভরে শ্বাস নিই নি। ময়দানের হাওয়ায় যে জীবন ভেসে বেড়ায়… এদিক সেদিক হয়ে ট্রামের ঘন্টি আর সাঁজোয়ার সজ্জায় ফিরে ফিরে আসে। আহা আমার শহর তো আমাকে দিয়েই যায়, আমি খালি ফ্যাৎনায় নজর রাখি আটকে আর এক ঝাঁক সাদা বক উড়ে উড়ে যায়। মনকে বলি ময়না তুই আমরে হ প্রবীণ আমরে…কামড়ে পড়ে থাক। যা পাবি তাতেই গরুর রচনা লিখে দিয়ে যাস… আর তার পর… আমি ফিরব না আর ফিরব না রে… ফিরব নারে।
৪ উইকেট পড়ে যাবার পর নামলাম। ব্যাটের হাতটা চলনসই… কিন্তু নাম কেনার জন্য যথেষ্ট নয়… কিন্তু তাই সই তাই সই তাই সই। উল্টো দিকে তখন মূর্তিমান গজকচ্ছপ মিচকি মিচকি হাসছে। কেয়া শোচা থা? সর্দার বহুত খুস হোগা সাবাসি দেগা…? প্রথম বল… ইনার পিস ইনার পিস। ছটা সেলাই দেখতে পেলাম। ভেসে ভেসে আসছে পড়বে ঠিক অফ স্ট্যাম্পের বাইরে গুড লেন্থে… হাঁটু মুড়ে বসে যে কাজটি করলাম তা নেটে কেন? পাড়ার ক্রিকেটেও করি নি। ব্যাট উলটে রিভার্স সুইপ। থ হয়ে থাকা উইকেট কিপারের পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে চলে গেল বল। দ্বিতীয় বল, আও ঠাকুর হাত তো দেনা হি পড়ে গা… বোলারস ব্যাক ড্রাইভ… মাথাটা সরাতে পারল শুধু। কিন্তু আঙ্গুলে সিঙ্গাপুরী… বাইরে চলে গেল বিশু দা।
আমার লড়াই চলতে থাকল… গদা যুদ্ধে দুর্যোধন… অসম্ভবকে সম্ভব করতে ছুটেছি… ১০-এর আস্কিং রেট নেমে এসে ৬ তখনই ভীমের গদা পড়ল উড়ুতে। গগনবিদারী নিনাদ… হাউজদ্যাট। আম্পায়ার ভাবলনা বেশী, আঙুল বলল ফাইন থ্যাঙ্ক ইউ। আমি অবাক… উইকেট কিপার বলে গেল ওয়েল প্লেড কিন্তু বলল না ব্যাড লাক। দরকার নেই তো। লাক তো আমার হাতের মুঠোয়… ধরলে ধরব ছাড়লে ছাড়ব… রাজার মতো ফিরে এলাম। তারপর তাসের ঘর পড়ল ভেঙে। কিন্তু ভাঙা ঘরেও তখন চাঁদের আলো… মন ভালো হয়ে গেল এই ভেবে… যাই হোক না কেন হার মানা হার আর পরব না গলে।
বিশুদা আর দাঁড়ায় নি। বুদ্ধিমান মানুষ থাপ্পড়টা হজম হয় নি বটে কিন্তু সর্বসমক্ষে অশ্রুপাত তো আপাতপুরুষের লক্ষ্মণ নয়। আমার অবশ্য সে অসুবিধা নেই…। প্রমাণের কিছু নেই, সৃষ্টি স্থিতি লয় পেরিয়ে যা পড়ে রইল তা হল বিশ্বাস… একরাশ ভাল লাগা আর একটুকু আশা… নিজেই নিজের অবলম্বন হবার সময় এসে গেল তাহলে…। মিনুকে শুধু বাড়ি ফেরার পথে পাবলিক টেলিফোন থেকে বললাম, “চল ঘর বাঁধি”! কি বুঝল কে জানে, কিন্তু হাসতে হাসতে নিঃশব্দে ঘাড় নাড়াটা অলম্বুষ কালো ফোনটার মধ্যে দিয়েও যেন দেখতে পেলাম।