ক্রিকেট বিষয়ে জরুরি কিছু কথা

প্রবুদ্ধ ঘোষ

My face today is the face of Bastar’sfight: Soni Sori

খেলা চলছে। ভয়ানক এক খেলা। প্রাতিষ্ঠানিকেরা বলবেন, প্রয়োজনীয়। জাতীয়তাবাদী ও সংসদীয় বলবেন, দেশপ্রেম বা ক্রিকেট। আর, নিন্দুকেরা বলবেন, মারণযজ্ঞ। আসলে অসম এক খেলা। যে খেলার পরিণতি মৃত্যু, যে খেলায় হারজিতের থেকেও বড়ো ইজ্জতের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের ইজ্জত বনাম মানুষের ইজ্জত। রাষ্ট্রের বিশাল সম্মিলিত শক্তি, তার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি একটা বৃত্ত তৈরি ক’রে ঘিরে আছে মাঠ। মাঠে অসহায় একটি দলের সতেজ লড়াই। তার চারপাশে ফিল্ডারের মতো ঘিরে আছে সেনা, আধাসেনা, সংসদীয় রাজনীতিকেরা, রাষ্ট্রপোষিত সংবাদমাধ্যম, আইনরক্ষকেরা। একের পর এক বাউন্সার ধেয়ে আসছে ব্যাটিং দলের খেলোয়াড়দের দিকে। আহত হচ্ছেন, চোট পাচ্ছেন, রক্ত ঝরছে; খাঁটি ক্রিকেটিয় ইতিহাসে কুখ্যাত বডিলাইন সিরিজে যেমন হয়েছিল। কিন্তু, এখানে খেলা ছেড়ে কেউ পালাচ্ছেন না। কারণ, মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, এটা খেলা নয় শুধু, জীবনের প্রশ্ন। তাই, যাঁরা পালাচ্ছেন না, তাঁদের জোর ক’রে আউট দিচ্ছে আম্পায়ার। নতুন খেলোয়াড় নামছে, আবার অসম প্রতিপক্ষ; পেশিবহুল এবং ক্ষমতাবহুল বোলার ফের বাউন্সার দিচ্ছে, বিমার ছুঁড়ছে। এই ক্রিকেটে আরেকটা বশেষত্ব হচ্ছে ড্রেসিংরুম নেই। তাই প্রত্যেক ব্যাটসমেন-ঊইমেন ওই বৃত্তাকার মাঠের ভিতরেই দাঁড়িয়ে সেনা-আধাসেনা ইত্যাদি পরিবৃত হয়ে। একের পর এক রিটায়ার্ড হার্ট, আউট... খেলা চলছে। রান বা ওভার গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, মনে রাখতে হবে এই ক্রিকেটের পরিণতি জয় অথবা মৃত্যু। হারজিতের থেকেও বড় অধিকারের প্রশ্ন। আর, এ খেলায় সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে আম্পায়ার রাষ্ট্র। লেগ-আম্পায়ার রাষ্ট্র। থার্ড আম্পায়ারও রাষ্ট্র।


এবার আসা যাক বোলিং দলের কার্য ও ক্ষমতা বিষয়ক আলোচনায়। বিমার, পরের পর বাউন্সার, পপিং ক্রিজ পেরিয়ে গিয়ে বোলিং- সমস্ত ধরণের বোলিং অ্যাকশনই এই ক্রিকেটে বৈধ। কারণ, রাষ্ট্র ঠিক ক’রে দিয়েছে অবৈধ বোলিং অ্যাকশন বলে কিছু হয় না। তাই, নক্সাল টেস্ট। [em]“In ‘Naxalite Test’ in order to prove that, the Adivasi woman is not a naxalite, she is forced to take out milk from their breast. Sometimes the military would do the test by tearing the Adivasi woman’s clothes and by pressing their breasts or sometimes the women do it by themselves to save their lives. The test is applicable to all women irrespective of their age and even the breast feeding mothers are not untouched. If milk is not coming from their breast, she is a naxal...” [source- adivasiresurgence.com] [/em]ভারতরাষ্ট্রের রক্ষকেরা আদিবাসী মহিলাদের স্তন টিপে পরীক্ষা করছে, দেখছে দুধ বেরোয় কী না। যদি দুধ বেরোয়, তবে তিনি নকশাল নন; আর, যদি দুধ না বেরোয় তা’লেই সেই মহিলা নকশাল। তারপর পরিণতি? সোনি সোরি। যেভাবে সোনি সোরি নামক মহিলাকে থানায় নিয়ে গিয়ে, যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে, বহুবার ধর্ষণ করে ‘নকশাল’ প্রমাণ করেছিল পুলিশ-সেনা। আর, অ্যাকশনগুলো যে অবৈধ, সে খবর যাতে বৃত্তের বাইরে না যায় তাই মাধ্যমগুলোকেও ছেঁটে ফেলার সুবন্দোবস্ত। যে সংবাদমাধ্যমগুলো ওই অঞ্চলে খবর সংগ্রহ ক’রে, তাদের প্রতিনিধিদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ বেরিয়ে যেতে না চাইলে, সন্ত্রাসবাদী ধারায় গ্রেফতার! [em]“As the Chhattisgarh Police launches a strong push into this Naxal stronghold, there have been other casualties: journalists and activists told to leave and a spike in alleged police excesses...” [source- indianexpress][/em] স্থানীয় সংবাদপ্রতিনিধিরা এই অত্যাচারী ফরমানে অভ্যস্ত; এমনকি বৃহত্তর মাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে খবর যাচ্ছে পুলিশ কর্তৃক ‘পরিশোধিত’ হয়ে। কত মানুষ মারা হল, কতজনকে অপহরণ করা হল থানায়, কত মহিলা আইনরক্ষকদের দ্বারা ধর্ষিতা- সেসব পরিসংখ্যান চাপা পড়ে যায় সরকারি রক্তচক্ষুতে। সমাজকর্মী যাঁরা, অনুন্নত অঞ্চলের উন্নতিকল্পে উদ্যোগ নিচ্ছেন বেশ কয়েকবছর ধরে কিংবা যে মানুষেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকারি বীতরাগ উপেক্ষা করেই শিক্ষা-স্বাস্থ্য বিষয়ে সাহায্য করছেন অঞ্চলের মানুষদের তাঁদের সক্কলকে হয় মিথ্যে মামলা সাজিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে, নয়তো ভুয়ো মামলার ভয় দেখিয়ে অঞ্চলছাড়া করা হচ্ছে। [em]“Dr.Saibal Jana was arrested in a case related to the police firing on agitating workers of the Bhilai Industrial Area on 1 July, 1992. Dr Jana was, on that day, among the team of doctors providing medical assistance to trade union activists of the Chhattisgarh Mukti Morcha who were injured. We believe that Dr Jana’s arrest in this case, after a gap of 24 years, is motivated by sheer vendetta against him by BJP led Raman Singh government, that has an ideological hatred of anyone who stands up for the democratic rights of workers, farmers and ordinary Indian citizens… Bela Bhatia, an independent researcher has also been threatened and her landlord is being found for questioning… The domestic worker in Malini Subramanium, an independent journalist’s house was called and kept in the police station till late at night to terrorize her into implicating the journalist of being Naxalite.” [source- countercurrents.org] [/em]ডাক্তার শৈবাল জানা দীর্ঘ তিন দশক নিঃস্বার্থভাবে ছত্তিশগড়ের আদিবাসী মানুষের সেবা করে যাচ্ছিলেন, সরকারি বাধা সত্ত্বেও। আর, মালিনী সুব্রহ্ম্যণ্যম একজন সংবাদকর্মী যিনি ছত্তিশগড়ের অনুন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় অত্যাচার, স্কুল বন্ধ ক’রে দেওয়া, ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার বিরুদ্ধে রিপোর্ট লিখতেন। এইসব ঘটনায় অবগত হয়ে পাঠকের মনে হতেই পারে, এ কেমন খেলা? আইন নেই, কানুন নেই, বিচার করার কেউ নেই? হ্যাঁ আছে হয়তো, তবে বিচারের হাত খুব ছোট তাই প্রান্তিক মানুষদের কাছে পৌঁছায় না। আর, আইন সান্দ্র পদার্থের মতো এবং আইনভক্ষকদের পকেট থেকে বেরোতেই চায়না। আর, এটা তো প্রমাণিত সত্য যে এই ক্রিকেটে আম্পায়ার রামন সিং, লেগ আম্পায়ার রাজনাথ সিং এবং থার্ড আম্পায়ার নরেন্দ্র মোদি। ম্যাচ কমিশনার বোধহয় মহামান্য সংবিধান। সংবিধানের পঞ্চম শিড্যুল অনুযায়ী আদিবাসীদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য এবং তাদের জমি-বাসস্থান যথাযথ রাখাও। কিন্তু, ম্যাচ কমিশনারকে রিপোর্ট দেবে আম্পায়ার। আর, রাষ্ট্র যদি আদিবাসী মানুষ মারে এবং রাষ্ট্রই যদি হয় আম্পায়ার; আম্পায়ার যদি স্পষ্টতঃই অ-নিরপেক্ষ হয়, তা’লে... এই ‘খেলা’র ক্ষমতাশালীর দম্ভোক্তির সূত্র ধরে নবারুণ ভট্টাচার্য একবার লিখেছিলেন, “আমরা রাতকে দিন করে দিতে পারি ফ্লেয়ার দিয়ে আলো ফেলে, যাতে গ্রাউন্ড অপারেশন হয়। বা সমস্ত রকম কমিউনিকেশন জ্যাম করে দিতে পারি। আমাদের অসীম ক্ষমতা... সরকারি ভাবে বলা হয়নি, কিন্তু গ্রীণ হান্ট শুরু হয়েছে চলছে- সেখানকার মানুষজন ভয় পেয়ে পালাচ্ছে, এই যে বিশাল ডিসপ্লেস্‌মেন্ট...” [আনাড়ির নাড়িজ্ঞান, ১৩১]


বৃত্তাকার এলাকায় ঘিরে ফেলে ‘লাইফ হেল’ করে দেওয়ার এই ক্রিকেট শাসকের প্রিয়। বহু শাসক বহু জায়গায় বহু সময়ে বহু ভাবে এই ক্রিকেটে বাধ্য করে জনগণকে। অস্ত্র, আইন, ইউএপিএ, আফ্‌স্পা ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে ফেলে মানুষ মারার খেলা। বিগত ইউপিএ সরকারের ‘অপারেশন গ্রীণ হান্ট’-এর পদ্ধতি বিষয়ে অরুন্ধতী রায় লিখেছিলেন, “What kind of war is Operation Green Hunt going to be? Will we ever know? Not much news comes out of the forests. Lalgarh in West Bengal has been cordoned off. Those who try to go in are being beaten and arrested. And called Maoists of course. In Dantewada, the Vanvasi Chetana Ashram, a Gandhian ashram run by Himanshu Kumar, was bulldozed in a few hours. It was the last neutral outpost before the war zone begins, a place where journalists, activists, researchers and fact-finding teams could stay while they worked in the area.” [Ray Arundhati, Mr. Chidambaram’s War, Outlook, 2009] আর, ওই যে হারজিত দিয়ে মাপা যায় না শুধু। যদি এত অসম লড়াইতেও জিতে যায় জনগণ, তা’লে তাদের জীবন-জমি-মৌলিক অধিকার রক্ষা হবে। কিন্তু, যদি রাষ্ট্র জিতে যায়? তা’লে রাষ্ট্র অধিকার করে নেবে বিশাল বনভূমি, খনিক্ষেত্র এবং বিলিয়ে দেবে বহুজাতিক সংস্থার পায়ে। দেশপ্রেম আর উন্নয়নের নামে প্রতিটি জীবনকে লগ্নিপুঁজির ফাঁদে ফেলা হবে। মুনাফা এবং আরো মুনাফার লক্ষ্যে সুবিস্তৃত অঞ্চলের মানুষ তাড়াতে বহুজাতিক ও রাজনীতিকদের গাঁটছড়া। [em]“That’s just the story of the bauxite in Orissa. Expand the four trillion dollars to include the value of the millions of tonnes of high-quality iron ore in Chhattisgarh and Jharkhand and the 28 other precious mineral resources, including uranium, limestone, dolomite, coal, tin, granite, marble, copper, diamond, gold, quartzite, corundum, beryl, alexandrite, silica, fluorite and garnet… Scores of corporations, from relatively unknown ones to the biggest mining companies and steel manufacturers in the world, are in the fray to appropriate adivasi homelands—the Mittals, Jindals, Tata, Essar, Posco, Rio Tinto, BHP Billiton and, of course, Vedanta.” [Ray Arundhati, Mr. Chidambaram’s War, Outlook, 2009][/em] আর, মনে রাখতে হবে যে, এ খেলা বিনোদনপ্রেমিদের কাছে ক্রিকেট, সরকারের কাছে অপারেশন গ্রীণ হান্ট বা অপারেশন বাস্তার এবং মুক্তিকামীদের কাছে জীবনযুদ্ধ।


ওই ‘ক্রিকেট’ খেলায় আক্রান্ত সোনি সোরি বৃত্তের বাইরে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বর্ণনা দিয়েছেন প্রবল রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের। সে এমন এক বৃত্ত যেখানে গণতন্ত্র পৌঁছায় না, কিন্তু ভারী বুটের নিচে থেঁতলে যায় অধিকার। সে এমন এক বৃত্ত যেখানে সরকারি উদ্যোগে অপহরণ হয়ে যেতে হয় স্কুলপড়ুয়াদের। সোনির পরিবারের লোকেদের বয়ান বদলাতে হুমকি দেওয়া হয়। আর, সবশেষে যত অত্যাচারী আইনরক্ষক, তত বেশি পুরষ্কার পায় সে। ‘মাওবাদী’ তকমা এঁটে গুম করে দেওয়া বা গণহত্যা করা প্রশাসনের প্রিয় খেলা। আর, খেলার নিয়ম ঠিক করেছে যারা, তারাই বাউন্সার, বিমার নো-বল, বল-বিকৃতি, বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য সবই করে যাচ্ছে অবাধে। অর্থাৎ, অবৈধ অ্যাকশন চলছেই। আম্পায়াররা তেমনি নির্দেশ দিচ্ছে। খেলাটা বন্ধের জোরাল দাবি জানাচ্ছেন সোনি সোরি। [em]“We tribals, adivasis also want azadi , we want azadi from the government oppression, from the way we are targeted by the state. We cannot sleep peacefully at night inside our houses. There is always this fear that we will be picked up by the CRPF men and framed as naxals” [source- thehindu.com][/em]


খেলাটা একপেশে। প্রবল ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র, যাদের হাতে রয়েছে সমস্ত প্রতিষ্ঠান, খেলা-সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা কাউন্সিল যারা কিনে নিয়েছে তারা জিতে যাবে একথা গ্যালারির দর্শকেরা ধরেই নিয়েছে। আর, ফাটকা অর্থনীতি, লগ্নিপুঁজির বাড়াবাড়ির যুগে বেটিং-ও যে খুনে রাষ্ট্রের পক্ষেই হবে, তাও বলাই বাহুল্য। কিন্তু, ইতিহাস বিশেষতঃ শাসকের না-লেখা ইতিহাসে কিছু উদাহরণ আছে। যেমন ভিয়েতনামে এরকমই ক্রিকেট চালু করেছিল ইউএসএ। এরকমই ঘিরে ধরে পিষে দেওয়ার খেলা। সব্বাই জানত, ইউএসএ জিতে যাবে। কিন্তু, জনগণের অদম্য জেদ আর প্রতিরোধে মুখে কালি লেপে গেছিল অত শক্তিধর দেশের। ভিয়েতনামী প্রতিরোধের সেই ট্রফি আজও জ্বলজ্বল ক’রে। কিংবা, আপাতদুর্বল হয়েও এবং ম্যাচ প্রায় হারতে বসেও শক্তিশালী ইংল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে জিতে যায় ওয়েস্ট-ইন্ডিজ; খানিকটা যেন বাস্তবের রূপকথা জন্ম নেয়। উদাহরণ আরো বহু আছে। এই যে ভারতের বিস্তীর্ণ মধ্যভাগ তথা সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল জুড়ে রাষ্ট্রের একপেশে হত্যালীলার ক্রিকেট, সেখানে মাঝেমধ্যেই খুনে বোলারকে সপাটে ‘বাপি বাড়ি যা’ স্টাইলে উড়িয়ে দেয় প্রতিরোধী জনগণ। নিরস্ত্র এবং সশস্ত্র দু’রকমের গণআন্দোলনেই শাসককে নাকানিচোবানি খাওয়ায় মাঝেমধ্যেই। কুলকিনারা না পেয়ে বাধ্যতঃ ‘ড্রিঙ্কস ব্রেক’ নিতে ছোটে প্রশাসন। বহুজাতিক সংস্থাগুলো যাদের খাবার জোগাতে মরিয়া শাসক তারা ফের উৎসাহ দিয়ে মাঠে পাঠায়। সঙ্গে আবার নতুন সেনা, আধাসেনা, পুলিশ, মারণাস্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র, কৌশল। এইবারে যোগ দিয়েছে এবং বিপুলবহরে দিতে চলেছে বায়ুসেনা। আর, মানুষের তীব্র প্রতিরোধকে ‘অবৈধ’ বলে দেগে দেয় আম্পায়ার। নির্বাসিত হন ব্যাটস্‌ম্যান-ঊইমেনর । বিচারের প্রহসন কিছু চলে অবশ্য! এই খেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও ‘অবৈধ/সংবিধানবিরুদ্ধ ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে শোরগোল ফেলে দেয় রাষ্ট্র। ক্রিকেটমাঠের নাম বাস্তার। ছত্তিশগড়ে। ভারতবর্ষে। একের পর এক রিটায়ার্ড হার্ট, আউট, জোর ক’রে আউট (রেফারেল নেই অথবা থাকলেও মনে রাখতে হবে যে, ফার্স্ট আম্পায়ার রাষ্ট্র, লেগ আম্পায়ার রাষ্ট্র... ইত্যাদি) চলছেই। মৃত্যুমিছিল বাড়ছে। গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস ওখানে উঠেই থাকে, আপাততঃ লবেজান অবস্থা। কিন্তু, খেলা ছেড়ে কেউ পালাচ্ছে না। পালাবার উপায় নেই। কারণ, এই খেলায় স্কোর মানে কতজন আদিবাসীর লাশ ফেলল রাষ্ট্র। আর, খেলার একমাত্র ফলাফল মৃত্যু অথবা জীবন। বাঁচতে গেলে তাই প্রতিরোধ করতেই হবে। শেষ অবধি। দেশের মধ্যে এইরকম অবৈধ ক্রিকেটে জোর ক’রে জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে- এটা আমরা ক্রিকেটীয় বিনোদনের মতই গ্যালারিতে বসে উপভোগ করব বা ‘নিরপেক্ষতার’ ভণ্ডামি করব নাকি গ্যালারিতে বসা আমরাও শোষক রাষ্ট্রের নোংরা খেলা বন্ধ করাতে মুখ খুলব তার উপরেও নির্ভর করছে এই ক্রিকেটম্যাচের ফলাফল। এই ‘খেলা’তে জনগণের জিত হলে জিতে যাবে গণতন্ত্র আর রাষ্ট্রের জিত হলে শুধু বস্তার নয় বাকি দেশের মানুষের ভবিষ্যৎও অন্ধকার। তবে, ‘ক্রিকেট’টা চলছেই। মার খেয়েও, রক্ত ঝরিয়েও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাস্তারের মানুষ। সেটাই মানুষের ইতিহাস আর ভবিষ্যতের একমাত্র যোগসূত্র।

ক্রিকেটীয় মরসুম চলছে। বিশ্বকাপ, আইপিএল... তবু, সেসব উৎসবের মধ্যেই বলির বাজনা বেজে চলেছে বাস্তারে। ক্রিকেটিয় উৎসবের জমকালো রোশনাই এবং জগঝম্প বাজনায় অন্ধ ও বধির আমাদের বাস্তারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বোঝানোর জন্যেই ক্রিকেট-রূপকের অবতারণা।