দেশ, রাষ্ট্র, একদিন, পাঁচদিন, এবং স্লেজিং

অনুপম মুখোপাধ্যায়

স্লেজিং হল বীরত্বের পরীক্ষা। যে স্লেজ করে, সে বীর কিনা পরের কথা, কিন্তু সে বীরকে উসকে দেয়। মহাভারতের যুদ্ধগুলোয় প্রথমে বাকযুদ্ধ হত। দুই বীর আগে একে অপরকে তেড়ে গালাগাল দিতেন, তারপর অস্ত্র বর্ষাতেন। সারথিরাও ছেড়ে কথা বলত না। অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধের আগে শল্য তাঁর যথাসাধ্য করেছিলেন যাতে কর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়েন। বিবিধ কটূবাক্য প্রয়োগ করেছিলেন। সঙ্গে বাসুদেব আর পার্থর বচনামৃত তো আছেই। যিনি হীন যোদ্ধা, তিনি স্লেজিং-এই কাহিল হয়ে পড়তেন, আর প্রকৃত মহাযোদ্ধার আচ্ছন্ন অবস্থাটা যেত কেটে। কর্ণ নিস্তেজ হননি। ভাইকে পরাস্ত করেছিলেন, তারপর তার বাণে খুন হয়েছিলেন। শল্য জানিয়েছিলেন সেলাম।
যে স্লেজ করে, তার সেলাম করাটাও জানা চাই। স্লিপ থেকে সবচেয়ে ভালো স্লেজ করা যায়। স্লিপ থেকেই হাততালিটা ব্যাটসম্যানের কানে সবচেয়ে মধুর লাগে।
আমাদের সময়ে সবচেয়ে বড়ে দুটো যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রিকেট আর লোকনীতি। ভোটের আগে লোকনীতির স্লেজিংটা ভালোই জমে। এতে শুধু ভোটপ্রার্থী নন, ভোটাররাও প্রভাবিত হন। সে যাক। লোকনীতি নিয়ে এখন ছাগলরাও কথা বলতে লজ্জা পায়।
যে ব্যাপারটায় এখন স্লেজিং শব্দটা সবচেয়ে বেশি খাটে সেটা হল ক্রিকেট। ক্রিকেট এখন আমাদের জীবনে ধর্মের জায়গা নিতে চলেছে। ক্রিকেট আমাদের জীবন থেকে অনায়াসে হটিয়ে দিয়েছে সাহিত্যকে, এমনকি সিনেমাকেও, সম্ভবত সেক্সও অতটা কাঙ্ক্ষিত নয় অনেকের কাছে যতটা দেশের জয়। দেশ! ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই দেশ ব্যাপারটা খুউউব গোলমেলে। পাশের রাষ্ট্র বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন যুদ্ধের আরেক নাম। ভয় হয়, সত্যিই না একটা উপমহাদেশীয় যুদ্ধ ক্রিকেটের কারনে ঘটে যায়। যেতেই পারে।
ক্রিকেটাররা খেলেন মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। তাঁরা এন্টারটেইনার। বিপজ্জনকভাবেই একটা সময় তাঁরা দেশের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। আরো ভয়ানক- তাঁরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিও হয়ে ওঠেন। দেশ আর রাষ্ট্রকে আলাদা করতে যে বোধ লাগে, সেটা এখন খুউউব কম মানুষের আছে। অনেকে তো এগারজন ক্রিকেটারের একটা দলকেই আস্ত একটা দেশ বলে ভুল করে। বাংলাদেশে কিছু অত্যুৎসাহী তো দেখছি আজকাল ক্রিকেটারদের জাতীয় বীর-টীর বলতেও কসুর করছেন না। কোনদিন না তাঁদের হাতে ব্যাটের হাতলের বদলে ব্যাটলের রক্ত লেগে যায়।
এই যে কথাগুলো বলছি এগুলোও স্লেজিং। কিছু মানুষের মানসিকতাকে হীন করতে চাইছি, তাঁদের সেই বলটাকে হ্রাস করতে চাইছি, যেটার গায়ে থ্যাঁতলানো ঘাস নেই, যেটায় সেলাই নেই, যেটা শুধু আনন্দের আর নেই, বিষাদেরও দূত। ওই বলটাকে হীন করতে পারলে আমাদের সাহিত্য বেঁচে যায়, সংস্কৃতিটাও একটু শ্রদ্ধাশীল ও সহিষ্ণু হয়ে ওঠে।
হ্যাঁ, আমি আপনার ক্রিকেটপ্রেমকেই স্লেজ করছি, যখন বলছি ক্রিকেট আমাদের অনেক কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে টেস্ট থেকে টুয়েন্টি টুয়েন্টিতে নেমে। ক্রিকেটটা পাঁচদিনেই মানায়। অন্তত তাকে একটা দিন তো দিন! ওয়ান ডে পর্যন্ত মানতে পারি। টুয়েন্টি-টুয়েন্টি তো একটা সার্কাস!
কিছু মনে করলেন? করুন। দমে যান, প্লীজ। আমি আপনাকে হীনবল করতে চাইছি। প্লীজ ফিরুন। পাঁচদিনের ক্রিকেটে ফিরুন। বুঝে নিন, এমনকি বুলফাইটও একটা খেলা, সেটা সেই প্যাশন থেকে উপভোগ করতে হয় যেটার মধ্যে ইনভলভমেন্টের উত্তেজনা আছে, কিন্তু মত্ততা নেই।