আস্কিং রেট

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

‘ক্যাপ্টেন, রান কত হল?’ টীটাগড় জুট মিলের লক আউট হওয়া বাইশ গজে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসছিল দাদু। নন-স্ত্রাইকে নন-সেটলড বাবা। পিচ জুতসই না। নেভিস কার্ডাসের স্কোর বোর্ড থেকে একটা গাধা বেরিয়ে এসে তারপর আবার একটা গর্তে পড়ে গেল। ওটাকে কেউ তুলছে না। আর ওভারে রিকোইয়ার্ড পরিশ্রম, মাসমাইনে, ফ্যামিলি কাঁধে ক’রে ভিক্টরি ল্যাপ সব কেমন পয়ে পয়েন্টের পর এক এক করে বেড়েই চলছে। তারপর খেতে বসে একান্নটা খোলা পিঠ, ঘরের বউদের ব্লাউজ ঢাকা ক্ষোভ, নাবালিকার ঐশ্বর্যের মতো ক্রমশ শিখরের দিকে এগতে থাকে। ‘রান কত বাকি, ক্যাপ্টেন?’ উত্তর মেলে না। রাত অনেক হল। ক্রমশ খাটের তলার আলো আঁধারিতে ব’সে মিথিকাল পড়াশুনোর অহঙ্কার, ঘাড়ে ক’রে মতি নন্দীর উপন্যাসের নায়কের মতো ফ্যামিলি কেয়ারের ক্রিজে এসে থমকায়। ‘পারব তো?’ বাবা জিজ্ঞেস করেনি। দাদু কিন্তু মাথা নেড়েছিল। ঠাম্মা মালা জপতে জপতে কাছে এসে ধরেছিল রুদ্রাক্ষ। মনের ভাব পড়ে নেওয়া। দাদু চকচক ক’রে তাকিয়েছিল। ‘নে, ফুল ছোঁ, এসব একটু মানতে হয়’। আমার বামপন্থী বাবাদের মুখের জোর খুব বেশী না থাকলেও নাস্তিক্যের একটা নিজস্ব জোর থাকে। ঠাম্মাও সমীহে ফুলটা কপালে ঠেকাতে পারেনি। বাবা সুভেনিয়ার হিসেবে রেখে দিয়েছিল ফুলটা। সেই চাকরিটা হয়নি। ঘরে বেকার ভাই, একাধিক, আইবুড়ো দিদি। টাইট ফিল্ডিং, ডট বল। একসময় লেগে যায়। সেলিব্রেশনের চল ছিল না। শুধু জন অরণ্যের ভেতর প্রবাসী বাড়ির মতো যখন ‘চাকরিটা হয়ে গেছে’, ব’লে ঘরে ঢোকে সবেমাত্র পঁচিশে পা দেওয়া আমার বাবা, তখন আধঘুমে ঢুলছিল দাদু। পেছনে তেল চিটচিটে দেয়ালে দাদুর মাথায় লেগে একটা আশ্চর্য সিলুয়েট অলক্ষ্যে নজর রেখেছিল ছেলেকে। মোমবাতি, অন্ধকার, আগুন আর লোডশেডিং নিয়ে খেলা আমার বাবার কোনও বৌদি ছিল না। ৯৯ এর সেমিস। বোলার ডেমিয়েন ফ্লেমিং। পরপর দুবলে দুটো চার। অলৌকিক, ল্যান্স ক্লুসনার, সব একাকার। একটা সংসার। রানরেটটা ৬ এর মধ্যেই বেঁধে রেখেছিল বাবা, তাই সমস্যা হয়নি। হল পরে। কদ্দিন আর। চোকার্স। সাউথ আফ্রিকা। কেপলার ওয়েসেলস। ক্রোনিয়ে। দাদু। ঠাম্মা। বাবা। বনেদিয়ানা। সবাই। ১৩ বলে ২২ থেকে ৭ বলে ২২। ডাকওয়ার্থ লুইস। একদিকে বিজ্ঞাপন, ছেলেমেয়ের ফিউচার, ‘এইটুকু জায়গায় হয়?’ এগুলো ডাকওয়ার্থ, অন্যদিকে ‘ওনারা তো আছেনই’, ‘টাকা পাঠাব, ঠিকমতো খেও’, সামার ভ্যাকেশনে দেখা, ‘দাদুভাই কত বড় হয়ে গেছ’, এগুলো লুইস। আর এই সময়টা, এই সবেমাত্র চলে যেতে শুরু করা মায়াবী নাইনটিস, ভাঙ্গন - এগুলো বৃষ্টি। ওটা আসবেই। দাদু স্কোর দেখে। বাবা বড় চাকরি নিয়ে একসময় মফস্বলে সেটল হয়। হিরো কাপ। তখন স্কুল। ৬ বলে ৬ রান। ওটা বৃষ্টি নয়। কিন্তু সেই সাউথ আফ্রিকা। রান আউট, শচীন, ম্যাকমিলান, ডোনাল্ড পেরিয়ে শেষ বলে আসার আগেই একটা সেরিব্রাল। লোডশেডিং, একসাথে খেতে বসা, শনিবার করে বাবার জন্য হন্যে হয়ে বসে থাকা, ক্রসওয়ার্ড পাজল, জ্যোতি বসু, ছুটি ছুটি, মিলে সুর মেরা, রোববারের বই ... তখন একতলায় পোষা খরগোশটার মতই আর জল পাচ্ছিল না। অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছগুলো এক এক ক’রে ভেসে উঠছিল। বিক্রি হয়ে গেল। এলো কালার টিভি। রঙ ফিরলনা না। যে কথা বলছিলাম, সেরিব্রাল। প্রথমবারে একটা ছোট্ট ক’রে। জোরদার আপিল। আম্প্যায়ার শোনেনি। বল লেগের দিকে টার্ন নিচ্ছে। এই বল বেল ফেলত না। পরের বল আবার, ষ্টাম্প। আপিল। তৃতীয় আম্পায়ার। হাসপাতাল, কোমা, আর ঠাকুমার পাথরপ্রতিমার কাকতালীয় ম্যাজিক, দাদু ফিরল। বিশাল স্ক্রিন জুড়ে নট আউট। শুধু ক্ষতি বলতে ফিজিওথেরাপির ঝক্কি, মুখের একদিক বেঁকে যাওয়া, কথা জড়ানো আর শখের থেকে চেন স্মোকার হয়ে যাওয়া আমার বাবার লাংস। ততক্ষনে অবশ্য ৭ বলে ২২ থেকেও ম্যাচ আরও ছোট হচ্ছে। প্রথম ব্যাট করা টিম ৯২ এর গ্রাহাম গুচের ইংলণ্ড শ্বাস নিচ্ছে। কিম্বা হিরো কাপ। শচীনের চতুর্থ বলটা ওয়াইড ডাকছেন না ষ্টিভ বাকনার। ২ বলে ৫। শেষমেশ একদিন। দাদু স্কোর দেখছিল। ছেলেগুলো কথা বলে না। বৌমারাও। বাচ্চাগুলো যা একটু। হাঁটতে হাঁটতে হয়ত একটু চোখ ভিজেছিল। রক্ত ... রক্ত ... রক্ত। হাসপাতালে দাদু বলেছিল ‘লাগছে’ ... – ‘কোথায়?’ - ‘ছবিতে’। পরে নার্সিংহোম। ছেড়ে দিয়েছিল। ২৪ ঘণ্টার আলো, আকাশ, ঘর, রোয়াক। বিকেলের সাড়ে চারটের দিকে সূর্য হেলে পড়ে। ১ বলে ২১। ‘এইখানে একদিন এক বটবৃক্ষ ছিল’। বাবার সলিলোকুই। আর আমার ছিল ‘সুমন চ্যাটার্জির একঘেয়ে সুর’। আর ‘ছিল দিলীপকুমার রায়ের কণ্ঠ, সমস্তদিন হন্তদন্ত, চায়ের দোকান’ ... আমাদের তখন ‘সাজান’, ‘আশিকি’ পেরিয়ে ‘কুছ কুছ’ ... আর নতুন নাম শোনা বব ডিলান। ঠাম্মা ধরেছিল। নন-স্ত্রাইক এন্ডে। একা। হ্যাঁ, আমাদের পাড়ার খেলায় যেরকম, লাস্ট ম্যানের ব্যাটিং আছে্,‌ সেরকম। স্কোর দেখত না। সোজা ব্যাটে খেলত। হপ্তায় একবার ক’রে ফোন। সুযোগ পেয়েই কথা শোনানো পাশের বাড়ির রিসিভারে। চার চারটে বছর। একদিন ‘শরীরটা ভালো নেই রে’। রাখালের বাঘ। রোজই আসে। সেদিন সত্যি এল। ডাক্তার। তাও, হাতুড়ে। আবার সেরিব্রাল। বাঘটা তখন কামড় বসিয়েছে। হাসপাতালে দেড়দিন। লরি করে পাশের বাড়ির পাচার করা বেড়াল বাচ্চার মত ঘরে ঢুকলেন পিতামহী। প্রগার। পড়শি এল। কেউ চমৎকার কিছু ইঁদুর ধরল। কেউ, ‘জিজ্ঞেস করবে কেউ আর, এমনভাবে সবার খবর’ ব’লে একটু ফুঁপিয়ে...। তবু গাছ থেকে দড়িটা নামানোর কথা মাথায় আনলোনা কেউ। লাশকাটা ঘর। বাড়িটা। কোনও ক্লান্তি নেই। চাঙ্গর ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে। প্রোমোটার। শরিকি বিবাদ। প্রেস কনফারেন্স। আর খেলার শেষে এটাই মজা – তখন আর আস্কিং রেটের কথা ভাবা হয় না। শুধু হার আর জিত। আমাদের এই খেলায় বনেদিয়ানা তো হারল। জিতল কে, কে জানে।

পুনশ্চ – ৯২। ক্রিস লুইসের শেষ বলে যত্ন ক’রে ১ রান নেন ব্রায়ান ম্যাকমিলান। ৯৩। হিরো কাপ। এবারো সেই ম্যাকমিলান। শচীনের শেষ বলে ফ্লাইট মিস। ৪ এর জায়গায় ১। ৯৬ এ ফ্লেমিং-এর শেষ বলে সব শেষ জেনেই আর পেছনের দিকে তাকাননি ক্লুসনার। টেবিলের নীচে অন্ধকার বেড়েছে। তবে টেবিল পাহাড়ের দেশে ট্রফি ঢোকেনি।