দেখা না দেখায় মেশা হে

রঞ্জন মৈত্র

লম্বা রান আপ শুরু করেছে শোয়েব আখতার । হাতে লাল বল । ঘন্টায় ১৪৫ কিমি বেগে বেরিয়ে যাবার জন্য তৈরি । ওভার দ্য উইকেট । সচীন একদৃষ্টে সে দিকে তাকিয়ে । কম বেশি আধ সেকেন্ড সময় নেবে বলটা বাইশ গজ পেরোতে । শর্ট , গুড লেংথ বা ইয়রকার । হাত আর আঙুল ঠিক কোথায় , ডেলিভারির মুহূর্তে কি করছে আঙুল আর হাত , বলটা কতক্ষন হাওয়ায় থাকছে , এই সবের নিবিষ্ট পাঠ ওই সময়টুকুর মধ্যেই । যথাসম্ভব ফিল্ডারদের পোজিশন অনুযায়ী শট বাছাই ও ব্যাটের সম্ভাব্য অ্যাঙ্গেল সব স্থির করে নিতে হবে , ওর মধ্যেই । দুরন্ত বেগে ছুটে আসছে শোয়েব । মাঝপথে হঠাৎ শচীনের হাত ঊর্ধ্বমুখী । বোলারকে থামানোর ইশারা । তারপর আম্পায়ারের অনুমোদন এবং মনোযোগ আকর্ষণ । আম্পায়ার পিছন দিকে ঘুরে গ্রাউন্ডসম্যানদের নির্দেশ দিলেন । স্ট্যান্ডের বিশেষ জায়গায় লোক চলাচল বন্ধ হোল । তারপর ঘর্ঘর শব্দে , হাতের ঠেলায় ধীরে ধীরে সামান্য বাঁ দিকে সরে যাচ্ছে বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো সাদা সাইটস্ক্রীন । টেস্ট । ওডিআই বা টি-টোয়েন্টি হলে বল হোত সাদা , পর্দা কালো ।

খাতড়া ( বাঁকুড়া ) ধোকার কিছু আগে মনে হোত , দু' পাশে অনন্ত সবুজ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে পথটি চলেছে বাসের আগে আগেই । শৈশবের কিরণসম্পাত । অনেক কাল পর , প্রথম যেবার ভালোপাহাড় যাই , তখন ভালোপাহাড় তৈরি হয়নি তেমন , শুধু কিছু চারা রোপণ , আজকের ঘন জঙ্গলের প্রথম পদক্ষেপ । তো বান্দোয়ান থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর সেই একই পটভূমি । সেই টাটা সুমোর আগে আগে পথের সর্পিল দৌড় , সবুজ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে । হঠাৎই সুন্দরের বশীকরণ ছাপিয়ে খাতড়া উঠে এল নজর বরাবর । চোখ একটু ঝাপসাও হোল । হু হু ক'রে ছুটে আসছে ভালোপাহাড় । সব ছাপানো সবুজে মিশে গেছে পরিপার্শ্ব । গাড়ি ও পাতার শোরগোল । চোখ খুঁজে পায় না কিছু । আন্দাজে মাথা নামাই । সাঁত ক'রে কিছু একটা সামান্য স্পর্শ দিয়ে পেরিয়ে যায় আমাকে । জমা পড়ে কোনও এক গ্লাভসে । সে কি খাতড়া নাকি ভালোপাহাড় ! আমি তো ঠিক জায়গায় পৌঁছোতে চলেছি । কে আমার ঠিক জায়গা ! গাড়ি থেকে নেমে পিছনে তাকাই । শরীরে তাকাই । নিজেকে দেখি । মাথা নিচু , ধীর পায়ে বড়সর গেট পেরিয়ে ঢুকছে ।

হাত থেকে বেরোনোর পর বলটি হারিয়ে যেতে চায় । জনারণ্যে । বিভিন্ন রঙের কোলাজে । দেখতে পেতেই হবে । নাহলে রক্তাক্ত হওয়া অথবা মুছে যাওয়া । পরিত্রাণহীন । চোখ আর বলের মাঝামাঝি , পরিচিত এবং অপরিচিতর ভীড়ভাড়াক্কার মধ্যে একটা প্রকৃত শূন্যস্থান চাই । চাক্ষুষ পৃথিবীতে একটি পূর্বাপরহীন পিছুটানহীন শূন্যপথ । শোয়েব আর শচীন কিম্বা শচীন আর শোয়েব । নশ্বর পৃথিবীতে বাইশ গজের দুই প্রান্তে নামগুলি আসে যায় । লাল বা সাদা বল হাওয়ায় ছোটে । মাটিতে আছড়ে পড়ে আবার ছোটে । তার উইকেট চাই । আশা-ভরসা আনন্দ-উৎকণ্ঠায় গড়া স্টেডিয়ামে রক্ত মাংস হাড়ের পতন চাই ।

যেসব করতে পারতাম তাদের মধ্যে বসে থাকি মাঝেমাঝে অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিয়ে । যেসব করতে পারি , তাদের সময় বয়ে যায় । দীর্ঘশ্বাস খরচ হয়ে যায় এমনি এমনিই । টাইগার , মানে অজিত কাকু , বন্ধুর বাবা , বললেন , " এউগ্যা পোলা বিডিও হইলে সাইকেলে কইরা গ্রাম চইস্যা ফ্যালায় । আর অ্যালায় এউগ্যা মাইয়া বিডিও হইলে , জীপে চইড়া যাইবো তাও হ্যার চাইরডা সিকিউরিটি লাগে । মাইয়াগো চাকরি দ্যাওন কোন কামে ! " থাকতে না পেরে মৃদুস্বরে বলি , "কাকু , একটা মেয়ে পড়াশোনা ক'রে , সিভিল সার্ভিসের মত একটা পরীক্ষায় উৎরে বিডিও হলেও তার নিজের কাজ একলা গিয়ে করতে পারে না । তার চলাফেরা নিরাপদ নয় । সিকিউরিটি লাগে । এই পাপ কার ?" টাইগার জঙ্গল কাঁপানো আওয়াজ দেন , " হ , যত বুদ্ধি তো তগোই , তরাই যত বোঝদার , বাপে কাকায় বোঝে কি , ক ! " অসহায় লাগে । এই মাঠে কি বহুদিন কোন খেলা হয় না ! গ্রাউন্ডসম্যানরা কি নিজের কাজ ঠিকঠাক করে না । নাকি খেলোয়াড়রা অতিলৌকিক নজরশক্তি নিয়ে খেলতে আসেন । সাইটস্ক্রীনের ফ্রেম সর্বশক্তি দিয়ে নড়াতে চাই , নড়ে না । সেমিনার নড়ে যায় নির্ধারিত সময়ে । মিছিলের দীর্ঘতা ফুরিয়ে যায় যথাকালে । আঙুলের কালি মুছে যায় । পর্দা অবিচল । " কাকু , আমি ঠিক তা বলতে চাই নি '। " কওনের আর বাকি রাখছস কিতা ?" । মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসি । ব্যাটবেলা-বলবেলা , ইনিংস-প্রতিইনিংস , উদয়-অস্ত , ওয়াচ টাওয়ার আর সাইট সীইং থেকে বেরিয়ে আসতে হয় , একা ।

হাওয়া লাগে চামড়ায় , নৌকোর পালে , গাছের পাতায় । দেখতে পাই না । কেবল অনুভবে গতিতে উল্লাসে মর্মরে । অ-দৃশ্য তার আসা যাওয়া । কেবল চাঁদ সূর্য তোমার মুখ কিম্বা ডিউজ বলের চকচকে অংশটি চোখের গোচরে রাখতে চাই । বাইরে থেকে ভিতরে আসবে নাকি ভিতর থেকে বাইরে । এই অস্থিরতা , সংকল্প , অজানার অপেক্ষা সেও কি তের পায় ! সে কি আমায় চিনে নেয় ! বাস থেকে অটো স্ট্যান্ডের দিকে যেতে নীহারের সঙ্গে দেখা । আসলে নীহারই আমাকে দেখে , দূর থেকে । আধো হাসি দুজনের মুখেই । নীহার হাত তোলে । চারপাশে বাস ট্যাক্সি ভ্যানরিকশা মানুষজন দোকানপাট । চাকরিতে একই ব্যাচের কিঞ্চিৎ ঘোরালো স্বভাবের নীহার । কিছু বলবে বলবে ক'রে এগোচ্ছে । আমি প্রাণপন চেস্টা করি তার হাতের সাথে কথার সম্পর্কস্থল বুঝে দেখতে । গুড লেংথ নাকি শর্ট , ফুল পিচ না ইয়রকার বোঝার চেষ্টা করি আর হারিয়ে যায় বারেবারে । নীহারের সাথে খারাপ অভিজ্ঞতা আর ভালো অভিজ্ঞতা মনে করার চেষ্টা করি । ঠিক কোথায় তার হাতের সামনের দিক এবং পিছনের দিক । লেগ কাটার , স্লোয়ার নাকি দুসরা । এই দুনিয়াদিগরের কাছে , আমার মগ্ন কিম্বা সম্প্রসারিত চেতনার কাছে একটা পর্দা ভিক্ষা চাই আপ্রাণ । নীহার এসে হাত ধরে । তখন সন্ধ্যা নামে । তখন বাড়ি ফেরার সময় হয়ে যায় । ধীরে তীব্র ভেপার ল্যাম্পের চ্ছটায় গ্যালারী খালি হচ্ছে , ভরে উঠবে বলে ।

রাধারাণী রথের মেলায় হারিয়ে গিয়েছিল । শিবানী রেলের লাইনে । একজন উবে গিয়েছিল , গোটা । আরেকজন যাওয়ার পথে রেখে গিয়েছিল টুকরো টুকরো মাথা হাত পা । কাকে বলে অনুসৃজন , কাকে পুনর্নিমাণ ! সোমনাথ বলেছিল , " পিছন দিকে তাকিয়ে হাঁটা যায় না ছোড়দা , তাতে বারে বারে হোঁচট খেতেই হয় । এগোনো যায় না ।" এগোতেই তো চাই , দলের এবং নিজের রান । দৃঢ় স্টান্স নিই । নজর সোজা বোলার সরণীতে । কিন্তু দিগন্তে , নিলীমায় , সেক্টর ফোর-এ , মশক পাহাড়ের মাথায় ও' কে ? টানা টানা বড় চোখ , ছড়ানো চুল , টিকোলো নাক , মৃদু হাসি । সামনেটা হারিয়ে যেতে চায় , সম্মুখ । স্টাম্প আর নিজের পায়ের অবস্থানে বিশ্বাস থাকছে না । প্রবল উৎকণ্ঠায় হাত তুলি । বোলার দৌড় থামায় না । আম্পায়ারের জায়গা শূন্য । সব একাগ্রতা কাজে লাগাই , সব হাত নাড়া । রোলময় পূর্ণশস্য এই স্টেডিয়ামে কে আমার আম্পায়ার ! সাইটস্ক্রীনের মাথায় পাশে নড়াচড়া করে কবেকার টুকরোগুলো । আর তো পুনর্জোড়াই সম্ভব নয় । সম্ভব নয় রওনা হওয়া বলটিকে থামানো । অপেক্ষা করতেই হয় । হাত পা চোখ তৈরি রাখতেই হয় । বেরিয়ে আসতে পারি না । মাথা নিচু করাও চলে না । আমি হোঁচট খেতে চাই নি রে সোমনাথ ।
*******************************