সাডেন ডেথ

সম্বিত বসু

দুদিকে চোয়াল ঝুলে এসেছে। চোখে একটু ঝিমুনি। ছেলের সংখ্যা পাঁচ। মেয়ে দুই। গত শতক ছাড়িয়ে আরও এক শতকে পিছোলে তাকে একটু মাঝবয়স্ক দেখাবে। এখন আটাত্তর। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বাড়ির দরজা দুদিকে খুলে যায়। শিকল লাগানো। ভেতরে ঢুকলে দুটো সিঁড়ি। একটা সোজা। আগে চাতাল। লাল। পরে হলুদ-কালো সিঁড়ি। ঘুলঘুলি জুম করে লাগানো এরকম জানলা দিয়ে আলো কেটে কেটে পড়ে। আরেকটা সিঁড়ি ঢুকেই বাঁদিকে। এটায় ছেলেদের ওঠা নিষেধ। শুধু মেয়েদের। বাইরেটায় দাঁড়ালে দেখা যায় খাটের দুদিকে কাঠ দিয়ে উঁচু করে মশারি খাটানো। মাথার ওপর ফ্যান। ফ্যানের থেকে একটু নিচে নেমে এলে ভগবানের খোপ। দেওয়ালে। হলুদ মশারি যখন ঝোলে, মাঝে মাঝে সেটা আড়াল করে দেয়। একসময় ধবধবে হলুদ ছিল ওই মশারি। অনেক মশা মরে গিয়ে, আস্তে আস্তে কালো হয়ে এসেছে সেটা। প্রায় ওই দোতলার হলুদ বারান্দার গায়ে নেমে আসা পোকাদের রাস্তার মতো। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া চুনকাম-হলুদ দেওয়ালের মতো কালো একটা মশারি পাহারা দিচ্ছে নিত্যবাবুর ঝুলে আসা চামড়াকে।

চলেছেন মন্দিরের দিকে। কালীমন্দির। পুকুরের মেঘ বিকেলের সঙ্গে দেখা করতে যাবে জলের ভেতর চিনচিন করছে। মন্দিরে চললেন? হ্যাঁ,ওই আর কি। কথা শোনা গেল। জড়ানো। অনেকদিন কথা বলে বলে ক্লান্ত তার জিভ মুখের ভেতর নাচানাচি বন্ধ করে দিতে চাইছে। গত ডিসেম্বরে অন্ধকারকে ধাক্কা মারতে মারতে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছিল বাড়িটার সামনে। সাদা অ্যাম্বুলেন্স। কিছুই হয়নি। ওটা পাড়ার ক্লাব এর। সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে আশেপাশে গেছে কোথাও। চমকে গেছিল সবাই। ভেবেছিল নিত্যবাবু কিংবা হেমলতাদেবীর কিছু একটা ঘটে গেল বোধহয়। ভেতর থেকে সন্তু, সন্তুর দিদি সোমা বেরিয়ে এসেছিল। ওরা ভাড়া থাকে একতলায়। সোমার পেট ফোলা। বর ফুলিয়ায় থাকে। শাড়ির ব্যাবসা। মামার হাত থেকে পাওয়া। শ্বশুরবাড়ি বালিতে। এই অবস্থায় বাপ-মার সঙ্গে থাকা জরুরী, তাই চলে এসেছে। কিন্তু নিজের ফোন নেই সোমার। সোমার বাবার মোবাইল আছে। সম্পর্ক ভালো নয়। পালিয়ে বিয়ে করেছিল,তাই। ফোন ওই দাদুর বাড়িতে আছে। লাল ফোন। নাক দিয়ে মাঝে মাঝে রক্ত পড়লে, ডাক্তার ডাকতে হয় ওই ফোন দিয়ে। পেটে লাথি মারলে ফুলিয়ায় ফোন যায় ‘ছেলে দুষ্টু হয়েছে খুব। ফুটবল প্লেয়ার হবে। মারাদোনা’।
মাস আট আগের কথা। বাথরুমে ঢুকে আর বেরোতে চাইছিলেন না হেমলতা। এদিকে তার ছেলেমেয়েরা দুপুরে জমিয়ে খাবে বলে বসে আছে। একটাই মাত্র দিন। সবাই একসঙ্গে। বাইরে তারে ফুটো-ফুটো গেঞ্জি, খোপ-খোপ লাল গামছা ঝুলছে। কোনোটা ঠিক করে মেলা হয়নি। শুধু নারকেল দড়ির মতো পাকিয়ে রেখে দেওয়া। কিন্তু হেমলতা আসছে না দেখে প্রথমে প্রভাত উঠে আসে। বড়ছেলে। বিজনেস। একটা প্রেস চালায়। মাটির তলায় অফিস। বেশি না। খান পাঁচেক লোক। কলেজের প্রশ্ন ছাপে। টুকটাক বই। পাড়ার লিটল ম্যগাজিন। হ্যান্ডবিল। বিয়ে-শ্রাদ্ধর কার্ড ছাপে না। কিন্তু অর্ডার নেয়। মানে মাঝখানে থাকে। একটু মুনাফা খায়। মন্দ না। বিয়ের তাও সিজন থাকে। মরার কোনও সিজন নেই। এই যেমন আজ, রবিবার, তাকে বিকেলেই ছুটতে হবে গুছাইতবাবুর কাছে। কে গুছাইতবাবু, সে কথা পরে হবে একদিন। কিন্তু আপাতত প্রভাত বাথরুমের সামনে এসে শুধু জলের শব্দ শুনতে পায়। মা-আ-আ,মা-আ-আ-আ। জল পড়ে যাচ্ছে। জলকে কেউ শরীরে নিলে জল পড়ার শব্দ একরকম, আর না নিলে, আরেকরকম। ভেতর থেকে অবিনাশ উঠে আসে। ছোট ছেলে। স্কুলে পড়ায়। বাংলা। তার খাতা দেখতে বসতে হবে। বিকেলে মণিদীপার সঙ্গে দেখা করার কথা মাথার ভেতর ঝিনঝিন করছে। আরও লোকজন হয়ত আসত। কিন্তু বাথরুমের নিচ দিয়ে হেমলতার সাদা শাড়ি জলের সঙ্গে কেটে পড়তে চাইছিল ভিতর বারান্দায়। তা দেখে আর সময় নষ্ট করেনি হেমলতা-নিত্যদাসের দুই ছেলে। পলকা ওই দরজা নিজের দিকে টেনে খুলে নেওয়া হল ভেতরের শিকল দেওয়া ছিটকিনি। হেমলতা তখন পড়েছিলেন আধনগ্ন অবস্থায়। কোনও শিল্পী তাক আঁকতে আঁকতে উঠে পড়েছে যেন তার আত্মাকে নিয়ে। দুজন মিলে টেনে বাইরের চাতালে। গায়ে ভেজা শাড়ি কোনোমতে জড়িয়ে। ডাক্তার এসে বলে দিল ‘নেই’।
এই ঘটনার পর আরও চুপ মেরে গেছেন নিত্যবাবু। এতদিনকার একসঙ্গে থাকা। প্রেম-যৌনতা-দুখ-আনন্দ- অন্নপ্রাশন-হাতেখড়ি এইসব পেরিয়ে এখন তিনি শুধু দুপুরের রোদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী, হেমলতা, বিছানার যে জায়গাটা জুড়ে ঘুমোতেন, সেই জায়গাটায় তিনি হাত-পা রাখেননি। বিছানার এককোণে শুয়ে শুয়ে তার নিজের শুয়ে থাকা জায়গাটার প্রতি একটা অধিকার এসে গেছে। কিন্তু গতরাতে তিনি পা তুলে দিয়েছিল হেমলতার অংশে। স্বামী তার স্ত্রীর পায়ে একটু পা তুলতে পারবে না? এরকম তো কত ঘটেছিল। প্রথম প্রথম ভাগাভাগিই ছিল না এমন। আ গ্রীষ্ম-শীত-বসন্ত তারা একখাটে নিজেদের জড়িয়ে শুয়ে থাকত। শুধু মাথার ওপর একটা হেলমেট পড়া ফ্যান মাঝে মাঝে এই প্রেম-ভালবাসা দেখে কেঁপে কেঁপে ওঠে আওয়াজ করত। তার হাওয়ায় বোধহয় এরকম এক প্রেম জন্মে উঠেছে, সে ঠিক বিশ্বাসই করতে পারত না। হেলমেট পড়া ওই পাখার তলায় সাত সন্তানের জন্য তারা কত কি গোপন কাজই না করেছে। সোমাকে দেখে তার সেই গোপন কাজের কথা মনে পড়ে যায় মাঝে মাঝে। সোমা কথা বলতে এলে ভান করে থাকেন যেন কাগজ পড়ছেন। প্রায় নিদ্রামগ্ন। কিন্তু আসলে তিনি শুনছেন। আর শুনছে এই শব্দ করে চলা ছটফটে পাখা। ইস! কোনোদিন সেসব আর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই!
নিত্যবাবু চলেছেন কালীমন্দিরের দিকে। মাথার ওপর আশীর্বাদের মতো একটা কাক নখ ছুঁইয়ে চলে গেল। ঝিনঝিন করে উঠল মাথা। জায়গাটা চড়চড় করছে। হাত বুলিয়ে দেখলেন ফুলে উঠেছে অল্প। কাক যত আবর্জনা থেকে খুঁটে খায়। বেশিরভাগই মৃত প্রাণী। এটা কি তবে নখে থেকে যাওয়া মৃত আত্মার আঁচড়ানো? কি চায় তারা? রাস্তার একটা টাইমকলের তলায় মাথাটা বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখলেন। কাকটা কাছেই। লাফাতে লাফাতে এসে তার মাথা ধোয়া জলে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। সামনে ইট পড়ে। নিত্যবাবুর কাকটাকে মারার কোনো ইচ্ছেও নেই। হিসি পেয়েছে তার। রাস্তায় হিসি করতে হবে। এক কোণায় দাঁড়িয়ে হিসি করতে করতে একটা গাছের পাতা উড়ে এল। একেবারে হিসির তলায় এসে পড়ল। এ ঘটনায় চমকে একটু পাশে করতে শুরু করলেন। কিন্তু এবার আরও চমকে গেলেন তিনি। একটা আরশোলার মৃতদেহ নিয়ে অনেকগুলো পিঁপড়ে যাচ্ছে। তার পায়ের ওপর দিয়েই চলে যেতে পারে। নিত্যবাবু সেকেন্ড পাঁচেকের জন্য তার পেচ্ছাপ চেপে পিঁপড়েদের জায়গা করে দিলেন। পেটে অল্প ব্যাথা হতে লাগল। বাকিটা আর একবারেই হয়ে গেল। কিন্তু মাথার চিনচিন গেল না। কখন যাবে এই চিনচিন করা? কখন আর কেউ আঁচড়ে দিলে, পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিলেও কোনো ব্যাথা হবে না? কখন আসবে সেই শেষ আত্মীয়। হয়তো হিসি করতে করতে। গরম ভাত চটকে মুখে তুলে দেওয়ার সময়। হেমলতার ফাঁকা অংশে যখন আহ্লাদ করে পা তুলে দেবে,তখন। ছাতা খোলার মতো করে তার চোখ একদিন ঠেলে বেরিয়ে আসবে তার শরীর থেকে। এই ঘুরতে থাকা পাখা তখন কি জানতে পারবে? খটখট শব্দ করে উঠবে? ঘোরা থামিয়ে বিশ্রাম নেবে কি? নিত্যবাবু তার কিছুই আর জানতে পারবেন না। এখন আকাশ ফরসা হলেও অল্প অল্প ভয় করে নিত্যবাবুর। মনে হয় একটা বড় সাদা চাদর দিয়ে কেউ ঢেকে দিয়েছে তার মাথা। চাদরের কোনো শেষ নেই। কোথাও দিয়ে মাথা গলিয়ে তিনি আর নীল আকাশের দিকে ফিরতে পারবেন না। এসময়, মাঝে মাঝে নীল দেখা দেয়। নিত্যবাবু একটু শান্ত হন। ফিরে আসেন লাল জগের কাছে। জল খান ঢকঢক করে। গলার অনেক নিচ অবধি ঠাণ্ডা একটা স্রোত ছুটে যায়। মুত্যু তখন বেপাড়ার কোনো গলিঘুঁজিতে কাউকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করছে। সে আসবে। আসবেই। হঠাৎ।