দা থার্ডম্যান ভিউ

নীলাদ্রী বাগচী

দৌড়। এবড়ো খেবড়ো পিচ রাস্তায় উঠে আসা ঢালু জমি বেয়ে। থামা নেই ততক্ষণ যতক্ষণ রাস্তার ওপারের ফিট পাঁচেক উঁচু বারান্দায় সামনে দৌড়ন ক্যাম্বিস বলটা ধাক্কা খায়। ধাক্কা খেয়ে গেলে গতি কমিয়ে আধা ছুটে গিয়ে শুকনো ড্রেন থেকে বলটাকে উদ্ধার করে ঢালু জমির ও’মাথার মাঠে ছুঁড়ে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই অঞ্চল থেকে ততক্ষণে শ-কার, ব-কারের ঝড় শুরু হয়ে গেছে, হাত ফসকে একখানা ফালতু বাউন্ডারি দেবার জন্য। ক্রিকেট বলতে সবচে প্রথমে মনে পরে এইটাই।

রবীন্দ্র ভবনে সারা সন্ধে বাজিয়েছেন শিব কুমার শর্মা। উইংসে দাঁড়িয়ে যারা তন্ময় শুনছিল সেইসব ধুন তাদের মধ্যে একমাত্র ১০০ ভাগ খাঁটি সুরকানা আমিও ছিলাম বুকে ব্যাজ পরে। আসলে ওই অনুষ্ঠান সংগঠক আমাকে ভালোবেসে স্বেচ্ছাসেবক বানিয়েছিলেন। তাঁর ভালোবাসাকে মর্যাদা দিতে এবং আমি কতবড় একজন বোদ্ধা সেটাও হাতেকলমে দেখিয়ে দিতে সারাক্ষণ উইংসের পাশে। আর একটি মানবিক কারণও ছিল, সে উহ্য এবং ব্যক্তিগতে থেকে যাক। সারা সন্ধে শিবকুমারের পর রাতের সব্জি রুটি আর সামান্য পানীয় নিয়ে আমি ও আমার বন্ধু আমার একচালা টিনের বাড়িতে। মা বাবা নেই। ফাঁকা বাড়ি। প্রায় সারারাত সব্জি রুটি ও সামান্য পানীয় শেষ করে সকালের আলো যখন বারান্দা ছুঁল তখন আমরা শুতে গেলাম। নেশা ও ঘুম দুটোর কোনটাই কাটার আগে বন্ধু ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিল আমাকে। সেদিন ইউনিভারসিটির ইন্টার কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল। এই শহরে একই নামের যে দুটি কলেজ আছে, কলা ও বিজ্ঞাণ শাখার এবং বাণিজ্য শাখার তাদের পরস্পরের মধ্যে হবে সেই ফাইনাল। আমার বন্ধু কলা ও বিজ্ঞাণ কলেজ দলের অধিনায়ক। তাকে, ফলত, মাঠে যেতেই হবে। যেহেতু আমি তার বন্ধু, যেহেতু সারারাত একসাথে আমরা সামান্য পানীয়ে এবং যেহেতু সে সারারাত আমারই অতিথি হয়ে ছিল- সেইসব যুক্তির প্রাসঙ্গিকে আমার তার সাথে মাঠে যাওয়া উচিত, এবং তার স্কুটারেই যাওয়া উচিত, খেলা শুরুর খানিক আগে নিজের সাইকেলে নয়। সামান্য বাদানুবাদের পর যখন বুঝলাম ঘুমটা চটে গেছে, আশু নেশা নামার কোনও সম্ভাবনা নেই এবং আমার কাছে জোরাল প্রতিযুক্তি কিছু নেই- আমি তার সাথেই মাঠে যেতে সম্মত হলাম।

আমার বাড়ির থেকে ওদের কলেজ মাঠে যাওয়ার রাস্তা আজ, আমার এই ক্রিকেট অভিজ্ঞতার কম বেশী পঁচিশ বছর পরেও, প্রায় একইরকম আছে। গলিরাস্তা পিচ পেয়েছে, গর্তের অসুখ থেকে অনেকটাই সেরে উঠেছে- এছাড়া বাকি প্রায় হবহু রয়েছে । শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লি হয়েছে, আগের মতো যাতায়াতের পথে কালো ধোঁয়া পাক খেয়ে আর আকাশে উঠে যায় না। সেদিন মাঠে যাবার পথে ধোঁয়া চোখে এসেছিল কিনা মনে নেই তবে শ্মশান অবধি গিয়ে আমি আর না যাবার জন্য নানা রকমের বাহানা করেছিলাম এটা মনে আছে। বৈরাগ্য আক্রান্ত হয়ে নয়। প্রবল ঘুম ছিল তার কারণ।

ওজর খাটল না। প্রতিপক্ষ অধিনায়কের সাথে আমি, এক অনিচ্ছুক এবং ক্লান্ত দর্শক, ক্রিকেট নামক খেলার প্রতি ঘেন্নায় তিতিবিরক্ত এবং বন্ধুত্ব যে শ্ত্রুতার চেয়েও ক্ষতিকারক বিষ এই স্বিদ্ধান্তে উপনীত মানুষ, মাঠে পৌঁছলাম। আমার বন্ধু তার কলেজের খেলোয়াড়দের ভিড়ে মিশে গেল। আর আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, দু দণ্ড শান্তির জন্য কোনও বনলতা সেন নয় একখানা গাছের ছায়া খুঁজে বের করলাম। পরিপাটি টানটান হয়ে গেলাম গাছের ছায়ায়। ঘুম চটে গেলেও খোঁয়ারির চমৎকার ক্লান্তি আমাকে অর্ধচেতনে পাঠিয়ে দিল। অর্ধনিমীলিত চোখে আধা ঘণ্টা গড়িয়ে মাঠের হই হল্লা শুনে উঠে ওখানে পৌঁছলাম। আমার কলেজ থেকে যারা খেলা দেখতে এসেছে তাদের দলে গিয়ে ভিড়লাম আমি। তখন আমরা বল করছি, বন্ধুর দল ব্যাট।

ইমরান খান তাঁর All Round View তে বলেছিলেন, I am always annoyed when players play for themselves and not for the team, and when I saw this happening I made my displeasure known in no uncertain terms. অধিনায়কের বক্তব্য। অধিনায়কোচিত সেই অসন্তোষ আমার বন্ধু তাদের ডাগ আউটে(আজকের ভাষায়) বসে শ কার ব কার সহযোগে চিৎকার করে জ্ঞাপন করছিল। মাঠে যারা ব্যাট করছে তারা বুঝুক না বুঝুক, আমি পরিষ্কার বুঝছিলাম, এ হল কাল রাতের সামান্য পানীয়ের অসামান্য অবদান। আমায় চিত করে ছেড়েছে সে আর ওকে ক্রুদ্ধ। ওর সহখেলোয়াড়রা অচিরেই বিদ্রোহ করুক এবং ওকে ধরে আচ্ছা করে দু চার ঘা দিক, আমি তখন মনেপ্রাণে এটাই কামনা করছি। কিন্তু শকুনের শাপ ফলপ্রসূ হল না। ওকে কেউ পাল্টা দুটো শ কার ব কারও দিল না উল্টে ওদের যে ব্যাটসম্যানটা ব্যাটে বলে করতে পারছিল না সেটা টেনশনে আউট হয়ে গেল। ওরা দিব্য ভদ্রস্থ একটা স্কোর খাড়া করে দিল এরপর। সেই স্কোরে আমার বন্ধুর আনতাবড়ি গোটা কয়েক চার ছয় ও ছিল।

সীমিত লাঞ্চের বিশ্রামের পর আমার কলেজের ব্যাট করার সময় এল। মফস্বলের তারকাখচিত দল আমাদের। সবাই স্থানীয় লীগের নিয়মিত খেলোয়াড়। ওই ভদ্রস্থ স্কোর টপকে যাওয়া আমাদের মহাবিদ্যালয়ের খেলোয়াড়দের পক্ষে কোনও অসুবিধাই নয়। আমাদের দল ব্যাট করা শুরুও করল জমজমাট ঢঙ্গে। সামান্য পানীয়ের অসামান্য কার্যকারিতায় আমি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা শুরু করলাম। একটু অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসই হয়ে গিয়েছিল বোধহয়। ফলে আমিই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দর্শক যাকে লেগ আম্পায়ার মাঠ থেকে বাইরে এসে সতর্ক করে দিয়েছিল। বন্ধু বান্ধব এ’এক নতুন তামাশা পেয়ে গেল। দেখলাম মাঠের ধারে ভিন কলেজের ছাত্র এইভাবে বিপদে পড়ায় আমার সহপাঠীরা কেউই এগিয়ে এল না। ওরাই টিটকিরি দেওয়া শুরু করল প্রথমে আমাকে। বিরুদ্ধ পক্ষ তো দেবেই। প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ইত্যাদি বিষয়ে দু একজন নিকটে এসে জ্ঞান দিতেও শুরু করল। আজ লিখতে লিখতে বুঝতে পারছি জীবনভোর প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ইত্যাদি বিষয়ে যে অনন্ত জ্ঞান আমায় খেতে হয়েছে/ হচ্ছে/ হবে তার সূত্রপাত সেদিন ওই মাঠে হয়েছিল।

এতক্ষণে পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে আমি ক্রিকেটে মন দিলাম, সংযত ভাবে। আগের সেই অনাবিল উচ্ছ্বাস নিজের কাছে রেখে মাঠের পরিস্থিতি বিচার করা শুরু করলাম। আমাদের টিম মন্দাক্রান্তায় ব্যাট করছে। হাতে উইকেট আছে ঠিকঠাক। এখনকার ক্রিকেটীয় সরল সমীকরণ, উইকেট থাকলে শেষে পিটিয়ে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেব- তখন খাটত না। ইনিংসের মাঝামাঝি এসে এক অহেতুক তাড়াহুড়োর প্রবণতা দেখা যেত। প্যাডি আপটন ধরনের কোনও নামের লোক তখন কোনও ক্রিকেট টিমের সাথেই থাকত না। আমাদের দলের সাথেও ছিল না তেমন কেউ। তবু টিমটা ঠিকঠাকই ব্যাট করছিল। এসময় আমার বন্ধু, যে দলের উইকেট রক্ষক ও, প্যাড গ্লাভস অন্যকে চালান করে খানিক কোমর এদিক সেদিক বেঁকিয়ে বল করতে রওনা হল। জিভ সড়সড় করে ওঠা স্বত্তেও কোনও দুষ্ট ভাষা প্রয়োগ করতে পারলাম না পাবলিক ব্যারাকিং-র ভয়ে। তবে বুঝতে পারলাম সামান্য অসামান্য ফলাফল দিল এটা। উইকেট কিপার বোলার হয়ে গেল। আমার কলেজ যে এবার ঝটপট রান তুলে নেবে সেটা আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম। আর সেটা প্রথম বলেই আমাদের অধিনায়ক একটি পরিষ্কার স্ট্রেট ড্রাইভ চার মেরে বুঝিয়ে দিল। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বলে একটি ছয়। প্রথম ওভারেই দশ রানের ব্যবধান কমিয়ে দিয়ে গেল আমার বন্ধু। আমার ক্রিকেট বোধ বলল এটাই ওর প্রথম ও শেষ ওভার ছিল। কিন্তু আমাকে ভুল প্রতিপন্ন করে ও থার্ডম্যানে চলে গেল ফিল্ডিং করতে এবং পরের ওভার সেখান থেকে বল করতে চলে এল। ইমরান খান All Round View তে এটাও বলেছিলেন, ...in the field everything is down to the captain. Where possible, the right bowlers have to be brought on to face particular batsman. Conditions have to be assessed; সেই পরিস্থিতি বিচার ক্ষমতা যে আগের রাতের পানীয়ের প্রভাবে কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় পরিণত হয়েছে সেটা ওর নিজের দ্বিতীয় বার বল করতে আসা দেখেই বুঝতে পারলাম এবং আমাদের জয়কে ও এভাবে তরান্বিত করতে চাইছে দেখে খারাপই লাগল। এতক্ষণে প্রথম বার ওর জন্য মন খারাপ হল আমার। যতই হোক আমার বন্ধু তো ও- এভাবে আত্মসমর্পণ করলে খারাপ লাগে।

তেমন কিছু ওর ওই ওভারে ঘটল না। ও স্রেফ হাত ঘুরিয়ে দুটো উইকেট তুলে নিল ওই ওভারে। আর খেলার মোড় ঘুরে গেল। ও আবার উইকেটের পেছনে ফিরে গেল কিন্তু ওর বোলাররা জোশ পেয়ে গেল। আমার কলেজ জেতা ম্যাচ মাঠে রেখে বের হয়েছিল সেদিন।

খেলা শেষ। হতোদ্যম বসে দেখলাম সেই লেগ আম্পায়ারের ওপর চোটপাট করছে আমার বন্ধু হাত ছুঁড়ে এবং শ কার ব কারের বন্যা বইয়ে। তারপর তার সাথেই মাঠ থেকে বেরিয়ে আমার দিকে রওনা দিল ও।
দাঁড়া স্কুটার নিয়ে আসি। এই বলেই স্কুটার আনতে ছুটল। লেগ আম্পায়ার দাদাটি লজ্জা লজ্জা মুখে এসে আমাকে বললেন, আরে তখন তুই ও ভাবে গাল দিচ্ছিলি তোর কলেজের ছেলেদেরই ব্যাট করতে অসুবিধা হচ্ছিল তো। আমি সেজন্যই বললাম। বলে তিনি লাজুক হেসে আমার পিঠে একটি চাপড় মেরে চলে গেলেন।

সেই ইঙ্গিতবাহী লাজুক হাসিতে তিনি আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিলেন। আমি আমার বন্ধুর পরিচিতিতেই এতক্ষণ দাপিয়ে দর্শকগিরি করছিলাম। আমি সমর্থক ছিলাম এক দলের কিন্তু সবাই আমায় অন্য দলের সমর্থক ভেবে নিয়েছিল। ওর জন্যই কেউ সেভাবে কিছু আমাকে বলে নি। মাথায় যেন ঝঙ্কার দিলেন শিব কুমার শর্মা তাঁর গত সন্ধ্যার অনবদ্য পাহাড়ি বিন্যাসে। বেকুবের মতো মাঠের ঘাসের দিকে চোখ চলে গেল আমার। ঝাপসা ঘাস দেখে বুঝলাম চোখে জল চলে এসেছে। সেটা ঠিক দুঃখ বা আনন্দে নয়। অকারণ অশ্রু। অশ্রুপাত ততক্ষণ যতক্ষণ না বন্ধু স্কুটার নিয়ে পাশে এসে চ বলল...

ক্রিকেট বলতে আমার দ্বিতীয়ত মনে পড়ে এই অকারণ অশ্রুই। যে অশ্রু সুখ দুঃখ ব্যতিত এক তৃতীয় অনুভুতি, সম্ভবত বন্ধুতা, সম্ভবত অবিমৃষ্যকারী আচরণের মূঢ়তার অনুধাবন, সম্ভবত নিজের সমর্থনের প্রতি নিজেরই অনাস্থা সেই অশ্রু...

প্রথম ও দ্বিতীয় সেই মনে হওয়াগুলি থেকে আজ বহু সময়ের অন্তরে বসবাস করি। রাস্তার ধারে ফিল্ডিং করতে দাঁড়িয়ে মাঠে বসা চড়ুই দেখার সেইসব দিন দ্রুত ধাবমান লাল সেই গোল অহংকারের মতোই পেরিয়ে গিয়েছি। এখন টিভির পর্দায় সময় কাটানোর উপাদান হিসেবে ক্রিকেট। ক্রিকেট বলতে এইই আমার তৃতীয়ত মনে আসে, যে খেলাটি জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে পরম বন্ধুর মতো এসে পাশে দাঁড়াত এক সময়ে আর এখন যার অন্য নাম কেবল সস্তা বিনোদন...