থার্ড আম্পায়ার

ইশরাত তানিয়া

বন্ধ চোখের ওপর নরম পাতা ঝরছে। চালতা গাছের চিরলবিরল পাতার আড়ালে টুনটুনি। ডাকছে টুইট টুইট। কয়েকটি পালক ছড়িয়ে পড়ছে ঘাসের ভাঁজে। বন্ধ চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। ভীষণ ভারী দুটো পাতা টেনে মেলতে পারি না। ঝরা পাতায় পুরু হয়ে ঢেকে আছে চোখ। না তো। এ হলো বৃষ্টির ছাট। বেশ হিম নেমেছে সাথে বৃষ্টিও। বিছানা ঠাণ্ডা, কাঠ-কাঠ। একটু ওমের আশায় আমি লেপ্টে থাকি বেডশিটের সাথে। ঠান্ডা বেড়েছে আরও। বুক থেকে গলা অব্দি কুঁকড়ে থাকে। ক্লান্ত হাতে কাঁথাখানি টেনে নিতে পারি না। আবার ঘুমে তলিয়ে যাওয়া। টুনটুনি নেই। গোলাগুলির শব্দ নেই। একাকী নৈঃশব্দ্য ঝরছে ঘুমের রাজ্যে।
জ্ঞান ফিরতেই মনে পড়ল হাসপাতালে আছি। কেউ কাঁদছে ডুকরে। বৃষ্টির শব্দ একটু জিরিয়ে নিচ্ছে এ অবসরে। চোখ বুজেই দেখতে পাই। পাশের বেড খালি। রক্তে ভেজা বিছানা। মেয়েটি মরে গেল। কচি রুক্ষ নীলাভ মুখ চাদরে ঢাকা। অন্তসত্ত্বা ছিল। ছটফটিয়ে মরেছে। কাঁদিনি একটুকুও। শেষ কবে কেঁদেছি মনেও পড়ে না। আমি, নয়না ব্যানার্জী, জ্বলন্ত চিতা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। আমি এক প্রকার মৃত। মৃতের বেঁচে থাকতে নেই। পুনর্জাগরণে নিজেকে জিইয়ে রেখেছি আমি কোন্‌ আক্রোশে, যেন বা ভুল করে, জানি না। উনিশ বছরের রক্ত মাংসের দেহ ধারণ করেছি শুধু হেরে যাব না বলেই। মাথা কেমন কাদা গোলা জলের মতো ঘোলাটে। চিতা থেকে স্ফুলিঙ্গ বাতাসে ওড়ে। এক কনা আগুন আমি হৃৎপিন্ডে গুঁজে রাখি আর ক্ষত বিক্ষত দেহ টেনে ঘন কুয়াশায় হাঁটি গত জন্মের ধুলোপথে।
পথের রেখা মিলেছে নীলক্ষেত পেরিয়ে নিউমার্কেটে। সকাল সকাল মায়ের সাথে ঘুরে ঘুরে কিনছি তেল, সাবান, বিস্কিট, মোমবাতি, আর বস্তা ভরা চাল। কলেজ বন্ধ। রেডিওতে কী এক ঘোষণা দিয়েছে, দলে দলে লোক বেরিয়ে পড়ছে অফিস, আদালত, ক্লাস থেকে। মিছিলের পর মিছিল চলছে রমনা রেসের মাঠে। উৎকণ্ঠায়, আগ্রহে বাবাও বেরিয়েছেন। সে ধুলোপথেই সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ লোক আসছে শেখের বক্তৃতা শুনবে। উত্তাল শহরে ছড়িয়ে পড়ছে দাবানল। এ আগুন থেকে ফিনিক্স জন্মাবে, উড়ে যাবে স্বর্গের দিকে, সে ফিনিক্স বড়ো আপন আমাদের। আমরা রেসকোর্স মাঠে যাব না। মা, আমি আর ছোট বোন অয়না রেডিও নিয়ে খাটে শুয়ে। রেডিও চুপ। মার্শাল ল অথরিটি বক্তৃতা রিলে করতে দিল না। বাবা ফিরে উত্তেজিত গলায় জানাল, এবার আর স্বাধিকার নয়, শুরু হবে স্বাধীনতার সংগ্রাম। মুক্তির সবুজ সতেজ ঘাস ঠোঁটে নিয়ে উড়বে অগ্নিজাত পৌরাণিক ফিনিক্স। আগুন স্পষ্টত আমার অনুভবে ধিকি ধিকি জ্বলছে। সে তাপ অনভুতির আত্মপ্রত্যয়ে। বিকেলে টিক্কা খান ঢাকা এসেছে গভর্নর হিসেবে। ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো বৈঠক করছে। কোনো সমাধান হচ্ছে না। বার বার ব্যর্থ। পাকিস্তান কখনই খন্ডিত হবে না এদিকে খবরের কাগজে স্বাধীন বাংলা পতাকার ছবি।
থমথমে মেঘের কালো ছায়া জাতির ভাগ্যাকাশে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রামে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ এসে ভিড়েছে। প্লেনে করে সাদা পোশাকে আসছে সৈন্য। পথে পথে বিক্ষুব্ধ মানুষ। সামরিক আইন প্রত্যাহার করো, পাকিস্তানী সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও। শুনে বুক কেঁপে ওঠে। বেনী গাঁথতে গাঁথতে মাঝ পথে হাত থেমে যায়। চুলের গোছা হাতে বসে থাকি। মা তাড়া দিলে ফিতা বাঁধি। রেডিও অফ করে চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় বসি। গাছের আধ ফোটা গোলাপ আদুরে চোখে চেয়ে আছে, বিকেল নেমে আসছে চালতার ডালে। সন্ধ্যা আর রাত এসে দাঁড়াল ঘুমন্ত জাফরানি রঙ শিউলিবোঁটায়। বুকের ওপর থেকে লম্বা বিনুনী তুলে পিঠের ওপর ছেড়ে দিই। বিনয় দা কাল কিছুক্ষণ দু’হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছিল বুকের কাছে। তলপেটে কথারা গুড়গুড় করে গলা পর্যন্ত চলে আসে। ইশ! আর বলতে পারি না। আনমনে হাসি আর আঁচল দাঁতে কামড়ে ধরি। সব বলা যায় না।
জরি পাড়ের বেগুনী রঙা শাড়িটা খুব ভালবাসে বিনয় দা আর জারুল ফুলও। অর্থনীতিতে পড়ে, ফাইনাল ইয়ার। সুদর্শন, সুঠাম। ভাসা ভাসা চোখ অথচ কী লাজুক। ক্রিকেট খেলে ইউনিভার্সিটির টীমে। লিখছে দারুণ সব কবিতা, গল্প। লেখক হবার ইচ্ছে খুব। সবার সামনে আমার সাথে তেমন কথাই বলে না। ওর ছোট বোন, অনিমা পড়ে আমার সাথে। প্রায়ই বলে- দাদা ভালোবাসে তোকে, জানিস? অমনি লাল টকটকে গাল দুটো গরম ভাপ ছড়ায়। ঘেমে নেয়ে অস্থির। আঁচলের প্রান্ত চেপে কপাল আর নাকের ডগা মোছা।
লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা খুব উড়ছে ঘরে ঘরে আর হামানদিস্তায় মাল-মশলা পিষছে বিনয় দা, রুমী ভাই, রাকিব ভাই, আজাদ, শ্যামলের মতো তরুণরা। বাড়িতে তৈরি করছে বোম, মলোটভ ককটেল। ২৫ মার্চ, সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, অয়নাকে নিয়ে অনিমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। বিনয় দা মিটিং থেকে ফিরেছে। দেখেই অবশ আমি। গাল ভরা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, কথায় কথায় বড় চুল খামচে ধরছে সে। গুজবে বাতাস ভারি। বাড়ি ফিরে আসি দুপুরে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কাউকে না জানিয়ে প্লেনে করাচী চলে গেছে। উদ্বেগের পারদ চড়ছে। ফিসফিস, বাক-বিতন্ডা রক্তস্রোত বইবে দেশ জুড়ে।
রাতে মা বললেন, ঠাকুরের নাম নিয়ে ঘুমাস। সেই ঘুম ভাঙল ভারী বোমার আওয়াজ আর মেশিন গানের শব্দে। সবাই জেগে উঠেছে। ট্রেজার হাউই আকাশ থেকে ফুলকির মতো নেমে আসছে। সে আলোয় ঘর ভেসে যাচ্ছে। ছাদ থেকে নেমে এলেন বাবা। আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে গেছে। দূরে দূরে জ্বলছে আগুনের শিখা। লোকজনের কান্না, চিৎকার শোনা যাচ্ছে। গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দ তখনও চলছে। মা কাঁদছে, সাথে আমরাও। সন্ধ্যের মুখে শুনেছিলাম রাস্তায় আর্মি নেমেছে। কিন্তু আর্মি কেন? কি হবে এখন? আমার গা বমি করতে থাকে।
ঢাকা নিরাপদ নয়। আমরা এক কাপড়ে গ্রামে পালিয়ে এসেছি কিন্তু বাঁচতে কি পেরেছি? একমাত্র স্কুলে পাকিস্তানী আর্মি ক্যাম্প। টেনে হিঁচড়ে এনে আমাকে ক্যাম্পে রেখেছে। বারান্দা জুড়ে বালির বস্তা আর নানান অস্ত্র, গোলা-বারুদ, গ্রেনেড আর রাজাকারের আনাগোনা- আইয়ে, আইয়ে, স্যার, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পাশেই দশ বাই বার-এর এক খোঁয়াড়। কাঁচহীন ছোট জানালা। গাদাগাদি করে দশ পনের জন মেয়ের সহাবস্থান। কলেমা জেনেও তারা রক্ষা পায়নি। অন্ধকার কুঠুরীতে নারকীয় তাণ্ডব বার বার। মৃত্যুর স্বরূপ দেখছি সাপের বেষ্টনে। হাড়গোড় গুঁড়িয়ে যায় কিন্তু গিলে খায় না সাপ। গলার ভেতর নিয়ে উগড়ে দেয়। আবার গেলা, পাঁজর ভাঙার শব্দে বধির হয়ে যাই। জল চাইলে কখনও মুখ ভরে গেছে প্রস্রাবে। পেটে বাচ্চা এলে নির্বিচারে হত্যা। বেয়নেট খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। চোখ তুলে পেট চিরে ফেলা। আমাদের পরনে শাড়ি নেই। ক্যাম্পে কোন্‌ মেয়ে শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে তাই শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ। নোংরা, ছেঁড়া-ফাড়া। হুক নেই। হাঁ করে খোলা। তেল চিটচিটে কাঁথা, তোবড়ানো টিনের থালা-জগে দীর্ঘশ্বাস আর ফোঁপানির বেগুনী নীল বাষ্প।
বাতাস থেকে নীরবতা ঝরে পড়ে। অবশ্য ওই খুপরির ভেতরটায় কাঁচহীন জানালা গলে কোনো বাতাস যদি ঢুকতে চায় আর কি। আচ্ছন্নতা আরও গাঢ় হয়ে চোখ থেকে হৃদয়ে কুয়াশা নেমে এলে ভাবি, কোথায় তুমি বিনয় দা? ঢাকা ছাড়ার আগে শুনেছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ভারত চলে গেছো। আগরতলা হয়ে কোলকাতা। বেঁচে আছো কি? কে জানে? কী হবে ভেবে? মানুষ যা ভাবে তা আর হয় কই? ম্যান প্রোপোজেস গড ডিসপোসেজ... মস্তিষ্ক স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়েছে। আমি কিছুটা স্মৃতিভ্রষ্ট। দিনক্ষণের হিসেব নেই। জনা চারেক মেয়ে পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। বিরক্ত হয়েছিলাম। না বিরক্তও নয়। নির্লিপ্ততাই হবে, অনুভূতিশূন্য। চল্লিশ ওয়াটের বাল্বে হলদেটে অপ্রতুল আলো লেগে ছিল। প্রথম দিন কতজন আমার নিস্তেজ শরীরে ঢুকেছিল গুনে রাখতে পারিনি। চেতনাহীন ছিলাম না কোনোদিন তবে অচেতন তখন। বাড়ির চালতা গাছকে মুখস্ত আবৃত্তি করে শোনাতাম ‘এবার ফিরাও মোরে’। টুনটুনি ছিল বন্ধু। মা কিছু বলত না ন্যাবা খ্যাপা মেয়েকে। মনমরা দিনে এলো খোঁপা। রোদ্দুরের দিনে টেনে কাজল পরতাম চোখে আর দুটো চোখে ভাসত মাঘের নীলাকাশ। আমি আর বিনয় দা তখন দুটো গাঙশালিক হয়ে উড়ে যেতাম। দক্ষিণ সাগরের দিকে। অথচ আশ্চর্য, সাগর আমি কখনও দেখিনি।
একবারও ভাবিনি জীবন কতদূর অনিশ্চিত। জীবিত না’কি মৃত আমি? তা-ই জানি না। হয়তো জীবন্মৃত। বুটের তলায় থেঁতলে যায় নীল অপরাজিতা। মৃত্যু উড়ে আসে শকুনের মতো। আকাশে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। আরেকটু পরই ঠুকরে ঠুকরে খাবে। শার্দুলের জ্বলজ্বলে চোখ, হিংস্র নখ আঁচড়ে কামড়ে শরীর ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলে। ক্ষত বিক্ষত শরীরের কাটাচেরায় নুন ঢুকে পড়ে। আমার উঠোন জুড়ে কিলবিলে কামার্ত সরীসৃপ। পালাক্রমে গা বেয়ে উঠে আসে। বুকের ওপর লালা ঝরায়। প্রতিটি ছোবলে সমস্ত শরীরের রোম কূপ ঘেন্নায় শিউরে ওঠে আর রক্তে মিশে যায় বিষ। উন্মত্ত দাঁতের কামড়ে সারা গায়ে কালশিটে। প্রতিটি ইঞ্চিতে স্তুপ স্তুপ ব্যথা। কেউ স্পিরিট ঢেলে দেয় ভেতরে। পেটের নিচে জ্বলতে থাকে পুড়ে যাওয়া মাটি। ধোঁয়া আর ধোঁয়া। তীব্র অন্ধকার। পৈশাচিক বিভীষিকায় জ্ঞান হারাই বার বার। ঘৃণা আর ভয় কী প্রচণ্ড চাপে গলা টিপে ধরে। মাথার ওপর ঘুরছে সাদা ফ্যান। তিনটি পাখাসহ মুখের ভেতর ঢুকে কাটতে কাটতে রক্তে ভিজে বেরিয়ে যায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার আগেই লকলকে জিভ সবটুকু আলো চেটে খেয়ে নেয়।
ঈশ্বর আর ভগবান হয়তো বাংলা ভাষা বোঝে না। অত যে ডাকলাম, সাড়া দিল না। হাত ধরাধরি করে গিয়েছে কোথাও রোদস্নানে আর সে সুযোগে টুনটুনি ঢুকে গেল মাথার ভেতর। টুনটুনি টুইট টুইট বলে না। বলে- ‘জয় বাংলা’। সেই সময় দাঁতে দাঁত চেপে আমারও শুকনো নীলাভ কষাটে ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে আসে দুটি শব্দের অমোঘ মন্ত্র- ‘জয় বাংলা’। খুনে উন্মাদ শুনে ফেললে তক্ষুনি অমানুষিক বিকৃত অত্যাচার শরীরে। হঠাৎ জ্ঞান ফিরে এলে দূর থেকে কানে ভেসে আসে রেডিওর শব্দ। আকাশবাণী। রয়টার, কখনও বিবিসি।
বাতি জ্বললে চোখে সয় না। হঠাৎ হঠাৎ হলুদ বুদবুদ ভেসে ওঠে সামনে। অন্ধই হয়ে গেছি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পাক খেয়ে ওড়ে শকুন, মাটিতে বুক ঘষটে চলে আসে সরীসৃপ, যখন তখন। আমি মৃত্যুর অপেক্ষায়। খুবলে খাওয়া গায়ে ঘা, চামড়ায় ফুসকুড়ি, চুলে ধুলোবালি আর জট। একদিন গায়ের শতছিন্ন ময়লা কাপড় টেনে হেঁচড়ে খুলে নিয়ে গেল। সম্পুর্ন নগ্ন আমরা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারি না। তবু নিয়ম মতো সকাল হয় আর সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি সেদিন। হঠাৎ জীপের শব্দ। স্টেনগান হাতে ঘরে ঢুকে খাকী পোশাকে কয়েকজন ভারতীয় সৈনিক আর মুক্তিযোদ্ধারা। দুহাতে মুখ ঢেকে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি। চারিদিক শুনশান, কোনো মিলিটারী নেই। সব পালিয়েছে। ওরা জোরাল গলায় বলে- জয় বাংলা! গায়ের শার্ট খুলে আর বাইরে থেকে কিছু লুঙ্গি এনে আমাদের ঢেকে দিল। আমি হাঁটতে পারছিলাম না ভালো করে। আমার পায়ে লেগে উলটে গেল টিনের জগ। হড়হড় করে বমি করে দিলাম। পাশে কেউ চিৎকার করে কাঁদছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা মাথায় হাত রেখে বলল- কেঁদো না, মা। জীপে কিছুদূর যাবার পর ট্রাকে উঠিয়ে দিল আমাদের। নগ্ন, অর্ধনগ্ন, অর্ধমৃত, অচেতন মেয়েদের নিয়ে ট্রাক ঢাকামুখী। গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
দূরে আলোর বিন্দু দেখে বোঝা যায় টানেলের শেষ প্রান্ত কাছেই। সে বিন্দু ধীরে ধীরে বৃত্ত হয়ে ওঠার কথা অথচ জ্বলে আর নেভে জোনাকি হয়ে। না’কি আমি দেখেও দেখতে পাই না। এক বিভ্রম, একটি ক্লান্তিকর ব্যথাতুর দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার অপেক্ষা মাত্র। ঘুমের অতলে যেন শুনতে পেলাম বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমার স্বপ্নের ফিনিক্স দাউদাউ শিখা থেকে উড়াল দিল। আহ! কতদিন পর আমি চোখ মেললাম। কাঁদলাম। বুক ভাসালাম। ফিনিক্স এর নরম পালকে হাত ডুবিয়ে জীবন স্পন্দন শুনলাম। মুক্তাঞ্চলে দাঁড়িয়ে এক মুঠো মাটি কপালে ছোঁয়াতে ভীষণ ইচ্ছে করে। সে তো হাসপাতালে সম্ভব নয়।
জীবনের অনিশ্চয়তাসূচক দোলাচলে ভেসে ভেসে কতদূর চলে এলাম। দূরতম দ্বীপ থেকে ক্লান্ত চোখে দেখি জাহাজের মাস্তুল। কেউ তুলে নেয় না। ঢেউয়ের ওপর ঠিকরে পড়া সূর্যরশ্মি চোখে প্রতিফলিত হয়। ঝলসে অন্ধ করে দেয়। ঠিকানা দিয়েছিলাম। বাড়ির কেউ আসেনি। খোঁজ নেয়নি। মা, বাবা, অয়না হারিয়েছি সবই। শেকড় উপড়ে গেছে তবু যতটুকু মাটি লেগে আছে সেটুকু কেঁপে কেঁপে ওঠে ব্যথায়। আলো নেই একফোঁটাও। অন্ধ আমি হাতড়ে হাতড়ে বেড়াই কিশোরী বেলা। খুঁজি সঞ্চয়িতার পাতা, মায়ের হাতে ভাতমাখা। সারাদিনই ঘুরে ফিরে চলে যাই অবধারিত চালতা গাছের কাছে, ফুল বিছানো শিউলিতলায়। পাঁজর ভাঙা টুকরোগুলো হাজার হাজার টুনটুনি আর গাঙশালিক হয়ে উড়ে যায়। আমি চাল ছিটিয়ে বসে থাকি। একটি পাখিও কাছে আসে না। কোথাও কি শিউলি ফুটেছে? গন্ধ আর রঙরূপের স্মৃতি এক অসম্ভব অতীতের গল্প শোনায়। আলো আঁধারের ছায়াময় স্ন্যাপ শট দেহের পরিসীমায় বেঁচে থাকার তীব্র যন্ত্রণা হয়ে বিঁধে থাকে।
ঢাকা মেডিকেলেই এক সিস্টার জানাল- মাতৃভূমির জন্য যারা সতীত্ব দিয়েছে সে নারীরা বীরাঙ্গনা নামে ভূষিত। দৈনিক ইত্তেফাকে খবর বেরিয়েছে। আমি তবে মানুষ, গভীর ঝাপসা অধ্যায়গুলো পেরিয়ে নিজেকে আজ মানুষ বলেই মনে হলো- আমি বীরাঙ্গনা, বীর মুক্তিযোদ্ধা! বারোয়ারি বাথরুমের ঘোলা আয়না। ঘষা কাঁচে আলো মাখামাখি। নিজের মুখ দেখি- চোখ, গাল, ঠোঁট ছুঁয়ে ছুঁয়ে। আমার হয়ে কে দাঁড়িয়ে? অস্ফুট গলায় ডাকি- নয়না, নয়না! ফিনাইলের ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে উবে যায় সে ডাক।
সূর্যাস্তের ছড়িয়ে পড়া অনাবিল রঙের ফিতেয় বিনুনী গাঁথি। বেগুনী শাড়ি জড়িয়ে ধুলোপথে হেঁটে যাই। ঘাস বিচালি পায়ের আঙুল আঁকড়ে ধরে। ধুলোর পথেই আবার মুখ থুবড়ে পড়ি। ডাক্তার জানিয়েছে মা হতে যাচ্ছি। পাথর হয়ে বসে থাকি। কার কাছে যাব? কেউ তো মাথায় হাত রাখেনি। কুয়াশায় আর ধুলোবালিতে বোধ আরও ধোঁয়াশা, আরও দুর্বোধ্য। ধর্ষিত, অস্পৃশ্যর কোথাও কেউ নেই। খুব কষ্ট হয়। দশ দিন পর চলে যাব পুনর্বাসন কেন্দ্রে। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলের আকাশ দেখি। নির্মেঘ, শান্ত, লালচে আভা মিশে আছে নীলে। আকাশের গভীরতা মনে করিয়ে দেয় একজন লেখকের সন্তানের মা হতে চেয়েছিলাম। সে কত কাল পেরিয়ে কত জন্ম আগের কথা! ক্লান্ত পায়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। পিতৃপরিচয়হীন গর্ভস্থের সিদ্ধান্ত নিই। তারপর গর্ভপাত।
কেউ সূর্য লেখে তাই চুপিসারে ওপাশে ফিরে যায় রাত আর যুদ্ধফেরত রাকিব ভাই আসে। ধানমন্ডির পুনর্বাসন কেন্দ্রে। তার কাছেই শুনলাম, ঢাকায় সেপ্টেম্বরের অপারেশানে বিনয় দা আর রুমী ভাই ধরা পড়েছিল। জীপে উঠিয়ে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তাদের। নিঃসঙ্গতার পুরাতত্ত্ব খুঁড়ে রাকিব ভাই আমাকে খোঁজে। ধুসরতার জীবনে রাকিব ভাই কৃষ্ণচূড়া ঢেলে বলেছিল- তোমাকে অভিবাদন, নয়না, হে বীরাঙ্গনা। সে ছিল বড়ো বসন্তের রাত, বড়ো বিস্ময়ের। আমার এতো জল ছিল সে তো জানতাম না। জোয়ারে ভাসলো কৃষ্ণচূড়া, পারুল, জারুল যেখানে যা ফুটেছিল। তবু দূরে দূরেই থাকি। হিন্দু-মুসলমান। এ হয় না। বীরাঙ্গনা শব্দের সামাজিক ব্যাখ্যা আমি জেনে গেছি ততদিনে। কিছুই হবার নয়। কিন্তু, যদি, কেন- এসবের খাতা বন্ধ করে দিয়েছি। একেবারেই কি সব মিলিয়ে যায়? হয়তো না। ক্যাম্পের দুঃস্বপ্নগুলো আমি ফেলে দিয়েছি ইঁদারার ঠাণ্ডা গহীন জলে। তবু যেন উঠে আসে ভয়ের হিমজল মেখে। গায়ে পিচ্ছিল আঠালো শ্যাওলা জড়িয়ে।
হঠাৎ শুনি টুইট টুইট! কেমন আছিস রে, টুনটুনি? বাসা বুনছি- টুইটুই করে টুনটুনি। এবার লেবু গাছে বুঝি? আনমনে তাকাই ওর জলপাই রঙের পাখা আর মাথার উজ্জ্বল লাল আভার দিকে। বাবা বাগানের যত্ন নেয় আগের মতো? মায়ের হাতের শাঁখা-পলা কি তেমনি বাজে? অয়না? চুরি করে আচার খায়? বরফ গলে নদীর জল ছোটে চোখে। বাড়ি জুড়ে থাকা উনিশ বছরের একটি মেয়েকে কেউ কি মনে রেখেছে? জল মুছি না। উঠিয়ে রাখি গোপন কাঁচের শিশিতে। টুনটুনি চুপচাপ।
বল্‌তো টুনটুনি ওকে কী নাম দিই? টুই টুই, লেজ কাঁপিয়ে টুনটুনি বলে- জয়া!
তেতে পুড়ে রাকিব এলো- কার সঙ্গে অত কথা হচ্ছে? আমি বলি- জয়ার সাথে। বুক ভরে শ্বাস নিল সে। মিষ্টি দুধদুধ গন্ধ ফোলা গাল দুটোয়। এক চিলতে সুখ কোলে নিয়ে কপালে চুমু খেল।
আমাদের মেয়ের নাম রেখেছি ‘জয়া’।

ঋণঃ
১। আমি বীরাঙ্গনা বলছি- নীলিমা ইব্রাহীম
২। একাত্তরের দিনগুলি- জাহানারা ইমাম