টুয়েলভথ্ ম্যান

ভাস্বতী গোস্বামী

একটা ঘাসের কথা বলি
নদী বেঁকিয়ে ওখানে ঘুম বানাতে চাইল কেউ...............

আমার কোয়ার্টারের পিছনে ওই ঘাসজমিটার কথা মনে পড়ে তোর? ওই যে রে ------ রান্নাঘরের ব্যালকনি থেকে দেখা যেত যেটা। সকাল বেলায় নাচতে নাচতে চড়ুই শালিখ থেকে অলস পায়ে গরু ষাঁড় সবাই হাজিরা দিত। মিসেস সোবতি-কপুর-ভিকি-রিঙ্কি -রওশন ভাবীরা ওখানে গুচ্ছ গুচ্ছ রুটি ফেলত যে। মঙ্গলবার তো আবার মহাভোজ। “গায় মাতা” দের হাজিরা কনফার্মড বলে ক্যাম্পাসের বাইরে থেকেও হাজির হয়ে যেতেন যত পুরী-সুরী-ভার্মা-শর্মা রা।
কাজ সেরে বা কাজের ফাঁকে গোটা বাড়ীতে ওই বারান্দাটাই ছিল আমার ঠেক্। অবশ্য দুটো পাশাপাশি চেয়ারের চিলতে ঠাঁইটুকুকে কি আর বারান্দার স্ট্যাটাস দেওয়া যায়? ব্যালকনিই সহী। পাখা গজানোর বয়স হলে ওখানেই হয়তো লুকিয়ে.....................না থাক্

এখানে স্টাম্প ভেঙে উড়ে গিয়েছে ময়ূর
তাকিয়ে পা বারান্দাটার..................

এ সময়টা হাওয়ায় হাওয়ায় সোনাঝুরি-শিমূলের। আর জড়ো হওয়া রাজ্যির শুকনো পাতার। কেমন চুরি করে এসেই ছুট্টে পালায় ------- জিষ্ণুর দুষ্টুমি মনে হয়। কতদূরে ছেলেটা আমার। হাওয়াও নেই কাছেপিঠে এখন। গাঢ় তরলে চাঁদচুরি হয়।
---------- কি গো হাওয়া নেই বলে চোখ বুজেছ বুঝি?
দিব্যি ক্যাটক্যাট করে কথা শোনাচ্ছে ঘাসজমিটা। এই সময়টাতেই যা একটু গল্পগাছা আমাদের।
---------- হাওয়া থাকা না থাকায় তোমার কি? এই কলেজ ছুটির সময়টাতে আমি নাহয় ছেলেটাকে একটু ছুঁয়ে রাখতাম
---------- হাঃ হাঃ তা শুধু হাওয়া কেন গো ------ ছোঁওয়া বুঝি হাওয়াতেই বাঁধা পড়ে?
একটি দুটি ক’রে জগার রা এসে পড়ছে। গল্পে ছেদ পড়ে আমাদের। আমাকেও রুটি বানাতে হবে। তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারলে নেক্সট প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্টটা নিয়ে বসব।
ছুঁকর মেরে মন কো............ মোবাইল বাজছে।
---------- বাবা মা’র মেডিক্লেমের যে নতুন পেপার্সগুলো এসেছে সেগুলো স্ক্যান করে দীপাকে মেইল করে দাও।
---------- এক্ষুণি? কাল করলে হয় না?
---------- কাল দেরী হয়ে যাবে। এখনই করো। আর পাঠাবার পর হোয়াটস্যাপে দীপাকে জানিয়ে দিও।
দোল এসে পড়ল। এখনও কৃষ্ণচূড়া ফোটে নি। এদিকে রোদের তেজে শুকিয়ে যাচ্ছে গোলাপের কুঁড়িগুলো। ওদের গোড়াগুলো খুঁড়ে চা পাতা দিতে গিয়ে ঠং ঠং শাবলের ঘা-য়ে চোখ টানল। এবার ঘাসজমিতেই টেণ্ট হবে হোলি মিলনের। শুনছি, কোন্ এক রিয়্যালিটি শো-এর রানার আপ গোছের কেউ আসবে।
সব্জিওয়ালাগুলোর মহা চক্কর। দেশে গ্যাছে সেই হোলিতে। আজ দশ বারোদিন হয়ে গ্যালো কারো পাত্তা নেই। পাঁচ-সাত কেজির বাজার কি আর টেনে আনা পোষায়? তারপর আবার খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওঠো। এদিকে গরমও বাড়ছে চড় চড় করে। রান্নাটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলি। অনেকগুলো অনলাইন ম্যাগাজিন বেরিয়ে গ্যাছে ------- যদি একটু সময় পাই..................
রান্নাঘরের দিকে যেতেই একটা উৎকট গন্ধে গা ঘুলিয়ে এল আমার। নিশ্চয়ই বেড়াল কুকুর মরেছে কোথাও। স্বচ্ছ ভারতের হিড়িকে ঝকঝক করছে ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো। আর যত রাজ্যের রাবিশ রাতের অন্ধকারে এই মাঠটায় ফেলে যাচ্ছে লোকে।

আলাদা করে চিনতে পারি না ধর্ষিতাকে
এবার আগেই পুড়িয়ে দেব দগদগে ডালিম..................

---------- আণ্টি প্লীজ বল দে দো
ওয়াশিং মেশিনের পায়ে আটকে পড়া টুকটুকে ডালিম উড়িয়ে দিই আমার গ্যালারী থেকে। মেঘ সরে যায়। আলো দুলতে দুলতে বলে ওঠে
----------- এবার হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে বল করতে আসছেন........................
নতুন ক্লাসে ওঠা.........নতুন বই এ মলাট.........শীতের কমলালেবু............গন্ধ হয় না এখন আর? কাশ্মিরী ওয়ালনাট কাঠের ব্যাট এসেছে দাদার, আমার পঞ্চু। পিংক আর ইয়েলোয়।
---------আমায় একদিন খেলতে দিবি? শুধু পাঁচটা রান মারবো
সব্বাই হেসে ওঠে। শুধু দাদা অনড়।
---------নিয়ে নে নিয়ে নে ভালো দৌড়োয় ও
--------ঠিক আছে, পাড়ায় যাদের যাদের বাড়ী বল পড়বে সব কুড়িয়ে আনবি........ড্রেনে বল পড়লে মা’কে নালিশ করবি না........রোজ খেলার আগে বণিকদের দেয়ালে কয়লা দিয়ে স্টাম্প এঁকে রাখবি..........
এত করেও খেলা হয় না আমার। তুলতেই পারি না অতবড় ব্যাট।
----------কি গো বর বুঝি আবার বাইরে?
----------তাতে তোমার কি?
----------না, জানলা দরজা সব হাট তো.....তা—ই মনে হল। ওহ্ ভালো কথা, আমি এবার সুইমিং পুল হবো।
----------সে কিইইইইই
আর্তনাদ শুনি স্বকণ্ঠের।
----------কিঁউ? জিন্দেগী কি হর মোড় পে নয়া আন্দাজ হোনা চাহিয়ে ইয়া নহীঁ? আরে ছোড়ো ইয়ার...... তুম্ ভি কুছ্ নয়া সোচো
নতুন কাকে বলে? মানিয়ে চলো, মেনে চলো। ফর্ম ও ফর্ম্যাটে সেঁটে যাও। টি টোয়েন্টি, ওয়ান ডে বা টেস্ট ক্রিকেট। প্যাড পরে বসে আছি। খেলতেও পারি না, খুলতেও শিখি নি।
ন্যাড়া পিচ্ আর স্টাম্পের ক্ষত বুকে নিয়ে সুইমিং পুল হয়ে যাবে ঘাসজমিটা। এবার উঠতে হবে আমাকেও। উঠতে উঠতে ভাবি

*খাটের তলায় জমে যাচ্ছে রোদ
এবার বেচে দেব কিছুটা করে...............................


(*কবিতা : এবার বেচে দেব / আমার আজান / রঞ্জন মৈত্র)