বেনিফিট অফ ডাউট @ একাকী আম্পায়ার

সুমী সিকানদার

মেয়েটাকে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে ভালো করে শুইয়ে দিলো নীনা। বড় মেয়ে ক্লাস থেকে ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। ইদানিং পারিসার প্রচুর তেজ হয়েছে সামান্যতেই খিট খিট। দশ মিনিটের মধ্যেই আবার কাপড় বদলে বেরিয়ে যাচ্ছে মেয়ে পারিসা।

নীনা দৌড়ে এলো কোথায় যাচ্ছ পারি? খাবেনা?

আমার কোচিং আছে। নিরুত্তাপ গলায় বের হয়ে গেল নিমেষেই।

চোখে হুট করে পানি এসে গেছে নীনার। নীনা এই আউটকামটার উপর নিজেই সটান বিরক্ত। বয়স্কদের মতো অল্পতেই ফোরাত কারবালা । চোখে পানি কাপ্তাই। মেয়েটা এমন হয়েছে কেন? মাঝে মাঝে নিজের ওপর মায়া লাগে নীনার । কোন মেয়েটি তার সুস্থ সে বোঝেনা। সুস্থটা নাকি অসুস্থটা।

ছোটটার অটিজম ধরা পড়ল জন্মের ৪/৫ মাস যেতে না যেতেই । খুব সুন্দর এক কোল-কাড়া বাচ্চা কিন্তু কিছুতেই ঘাড় শক্ত হচ্ছে না। নীনা খেয়াল করেছিল যে তিনমাসের বাচ্চা অথচ হাসেনা । বাচ্চা কেন হাসেনা সেটা উদ্ধার করার সময় হচ্ছেনা মোটেই ।

শিমুলই হঠাৎ একদিন খেয়াল করে চিৎকার করে নীনাকে ডাকলো, '' কোথায় তুমি? আমার মেয়ে তো দেখেনা নীনা । আমার মেয়েতো হাসে না।'

ডাক্তার খুব নরম গলায় জানিয়ে দিলেন তাদের দ্বিতীয় শিশুটি শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার ঘাড় অশক্ত,ভিশন ঠিক নেই,তাই কারো চোখে তার চোখ পড়েনা,ফলে হাসে না ।
এত সব সমস্যা নিয়েও বাচ্চাটি তার বড় সুশ্রী এবং শান্ত হয়েছে । মন ভরে যায় ।সামান্য নড়া চড়া করার ইচ্ছে হলে করে, মাকে ডাকার সময় সুইট করে একটা শব্দ করে । যেন রিনরিন বাজে কিছু পতেঙ্গায় সমুদ্রগামী বাতাসে মিশে। নীনা সব ফেলে ফিডারে দুধ বানাতে বসে। বাছা তার বলতে তো পারেনা,' মা খেতে দাও খাবো।' নয়ন ভর্তি জল মুছতে মুছতে ঘরে চলে আসে নীনা, সারিনা তার নয়নমনি।

নীনার বন্ধু বলতে মিলা। সে মাঝে মাঝে সময় করে আসে গল্প করতে। ভার্সিটি লাইফটা ছিল তাদের তিনবন্ধুর । মিলা ,নীনা এবং শিমুল। ত্রিরত্ন ছিল জানের দোস্ত। গান-বাজনা ,তবলা ,ডিবেট ,পড়াশুনা সব এক সাথে। রিক্সাতেও তিনজন । ''কই যামু মামা, ''
নিরব হোটেলে চলো মামা চাংখারপুল।হাহাহহা.....''. তিন বন্ধু রিকশার তিন তলায় উঠে হাসতে থাকে। আহ স্ফূর্তিময় সময়গুলো লু-হাওয়া হয়ে তপ্ত বালুময়তায় উড়ে গেছে। সময়ের বিজন বাতায়ন এখন নেই। শুধু সম্পর্কগুলো ঝুরঝুরে বালু হয়ে এলিয়ে গেছে। হাতের মুঠোয় আর ধরা দেয় না।

মাষ্টার্সের শেষ দিকে নীনা শিমুল বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় । মিলাও বিয়ে করে মা-বাবার পছন্দে। শিমুলের সাথে গতরাতের ঘটনাটা মিলাকে বলা উচিৎ কিনা বুঝতে পারছেন নীনা। নইলে কাকেই বা বলে ! সারিনার জড়তা ধরা পড়ার থেকেই বদলে যাচ্ছে শিমুল। প্রথমে অনেক উৎসাহ ছিল। ডাক্তারের পর ডাক্তার বদলিয়েছে। কিন্তু যখন আর অবস্থা পরিবর্তন নেই যখন বুঝে গেছে তখন সে সবার আগে নীনাকে ছেড়েছে। সব একা নীনার দোষ হয়ে গেছে। বাসায় যতক্ষণ থাকে মোবাইলে ডুব । ডিনারের সময় টুংটাং শব্দে শুধু চামচেরা কথা বলে। শতাব্দীর বাকহীনতা পেয়ে বসেছে তাদের। জীবন তাদের এরকম মুহুর্তে কখনও দাঁড় করাতে পারে তা নীনা কোনদিন ভাবেনি। কাকে যেন খুব টেক্সট করে শিমুল, সারাক্ষণ।


মিলা শিমুলের দিকে চুপকরে তাকিয়ে আছে,
'' তুই কেন সব ঘোলা করছিস। বিয়ের সিদ্ধান্ত তোদেরই ছিলো।তুই নীনাকে প্রপোজ করেছিলি। এখন ভাণ করছিস কিছু জানিস না। ''
শিমুল কিছু বলেনা। আস্তে করে মিলার গায়ের ওপর থেকে সরে যায়। উঠে সিগারেট ধরায় । মিলা একটান দিয়ে শিমুলের হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে দেয়। শিমুল প্রবল ঝড়ে মিলাকে ফের জাপ্টে ধরে। দ্রুত আলগা করতে থাকে অভ্যস্ত হাতে। সরিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় যাবতীয় আবরণ।ঘাড়ে গলায় পাগলের মত আদর করতে থাকে। মিলার ক্ষমতা নেই ,সে গলতে থাকে শিমুলের বর্নাঢ্য রক্তিমে। কোন দিন শিমুলকে এড়াতে পারেনি আজো পারেনা। এড়াতে চায় না সম্ভবতঃ । নিজেকে নিজেই সন্দেহ করে। নীনার সন্দেহে সে পড়েনি এই সুবিধা তাকে নিশ্চিন্তে গ্রাস করে। অব্যক্ত ঘোর চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তাকে। শিমুল কি কি যেন অস্ফূট বলতেই থাকে। শব্দগুলো পরিষ্কার বোঝা যায় না।

নীনা পাস্তা বানিয়েছে বেশী করে সব্জি দিয়ে। চায়ের পানি বসিয়েছে। মিলা আসবে বিকেলে। শিমুল কাল আচমকা চড় বসিয়েছে। গালে কালচে ছোপ পড়ে গেছে। নীনা শিমুলকে শুধু ছুঁয়েছিলো,শুধু জিজ্ঞেস করেছিল তাদের ইন্টারন্যাল রিলেশন কি শেষ? তাতেই এই চড় থাপ্পড়। ফেস পাউডার বেশী করে দিয়ে দাগ ঢাকার চেষ্টা করলো নীনা। দাগ আরো দাঁত বের করে রম্য হাসি হাসতে লাগল।

খাবার টেবিল সাজাতে সাজাতে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ পড়ে । বাংলাদেশের খেলা আজ পাকিস্তানের সাথে । ভেবেছিল ইডেন গার্ডেন আজ আরেকটা মীরপুর হবে।অবাক হলো সে। মনে হচ্ছে খেলা হচ্ছে লাহোরে। সাব্বিরকে স্ট্যাম্পিং এর আবেদন থার্ড আম্পায়ার রিভিউ করছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না যে স্ট্যাম্পিং এর সময় সাব্বিরের পা শূন্যে ছিল কি না ..

নীনা প্লেটে পাস্তা সাজাতে সাজাতে নিরাপদ বোধ করল যাক বেনিফিট অব ডাউটটা সাব্বিরের পক্ষে যাবে । কলিং বেলের শব্দ বেজে ওঠা আর টেলিভিশনের পর্দায় আউট ভেসে ওঠাটা এক সাথে হলো ।
বুকটা মুচড়ে উঠল,গালে চড়ের বিষখাই জ্বলুনিটাও ..

মিলা এসেই সারিনার ঘরে গেছে,সাত বছরের মেয়েকে সাত মাসের শিশুর মত কোলে নিয়েছে। গালে মাথায় আদর দিচ্ছে। সারিনা দেখেনা কিছুই। মিলা তাকে অনেক ধৈর্য ধরে খাইয়ে দিলো। নীনার দুই মেয়েকেই সে অনেক আদর করে।

চা-পর্ব শেষে যাবার আগে আগে মিলাকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে নীনা।
: সাবধানে থাকিস। শিমুল কন্ট্রাসেপ্টিভ নিতে চায়না। তুই প্রিকওশন নিস। শিমুলকে বলিস আমার মেয়ের অটিজম আছে,আমার নেই। আমি তোর বন্ধু বলেই সাবধান করলাম। তোকে অনেক ভালোবাসি মিলা।
জানালা গলে পাড়ার চিৎকার এলো আবার কানে। টেলিভিশনের পর্দায় সাকিবের বিমূঢ় মুখ,খানিকটা মিলার মতোই স্থানু ।

হা খোদা সাকিবের দিকে আঙ্গুল তুলে আছে ভাবলেষহীন নিষ্ঠুর আম্পায়ার । নীনা অবাক দেখল আম্পায়ারটা দেখতে অবিকল নিজের মতো ।