টাই

নীতা বিশ্বাস

শীতে, শুধু শীত-রোদ্দুরের মিঠে মাঠে, যে ডিউস বল ব্যাটের পানে ছুটতো, উঠতো, বন্‌বন্‌ছন্দে ঘুরতো, ব্যাটের দিলখুশ পিটুনি খেয়ে বাউন্ডারি পার করে উধাউ আকাশে উড়তো আর হু হু ঠান্ডাদিন তেতে উঠতো ব্যাট-বলের কথায় অথবা বিজয়গাথায়—হায়! বিশ্বায়নের দুনিয়ায় হিটস্ট্রোক কে কাঁচকলা দেখিয়ে মার্চ-এপ্রিল-মে-জুনের খাসিসেদ্ধ গরমও দিব্যি টাকা হাঁকাচ্ছে, ম্যাচফিক্সিং, গটআপ গেম আর কি যেন বলে, হ্যাঁ, বেটিং। আরেঃ চোখ ছুঁচলো করছেন কেন! আমিতো মাস্টার টাস্টার বলিনি! বলছি ক্রিকেট-বেটিং এর লজ্জাকর কথাকাহিনী। না তাও বলছিনা। বলছি অন্য কথা। #
বলছিলাম, বেশিরভাগ মানুষের জীবনটাই তো মিথ্যা ভাবে সাজানো সাজস’এর গটআপ গেম রে ভাই। সে শীত বসন্ত বৃষ্টি গরম কিচ্ছুই মানেনা। গড়ায় আর পেটায়। আর সেখান থেকেই ‘টাই’। তুমি ১১৫ রান তুলেছো, আম্মো ১১৫। কি সুন্দর বন্ধন রে বস্‌! দুটো হাত, হাজারটা হাত একে অপরের সাথে আনন্দগিঁট বেঁধে, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়/ একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু...’ সুরে একাত্মতার গান গাইতে পারে। পারেনা! Equality in scores, মানে, খেলতে নেমে দুই দলই সমান পয়েন্টে এসে দাঁড়ায়, তাহলে মনে মনে তারা কি দারুণ সমমনোভাবাপন্ন হয়ে যায়!শুধু বাইশ গজের আওতা নয়, সে মিলন পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশ ছুঁয়ে একেবারে আব্বুলিশ হয়ে যায় রে ভাই। যে মনবাউল গাইছিলো ‘মিলন হবে কতদিইইনেএএ’, তার একতারা যে হাজার তারে মিলনগানে বেজে উঠতে পারে! মিলনের এরচাইতে বড় উদাহরণ আর কোথায়! জীবনের বিরাট ময়দানে যেসব ময়দানবেরা প্রোটন ফোটন নিউট্রিনো হয়ে যে রেটে অহরহ নখেদাঁতে বিধিবদ্ধ ভাবে মানুষকে বিঁধিয়ে চলেছে, C.C.T.V র ফুটেজে তার স্কোর ধরতে গেলে, এবলে আমায় দ্যাখ, ওবলে আমায় দ্যাখ। ব্যাটে-বলে এই দেখাদেখি আর ঠোকাঠুকি— সম্মুখসমরে ও জীবনযুদ্ধে এক রান বেশি পাবার জীবনপণের মরিয়া লড়াই, সর্বত্রই সর্বত্রই... কেউ কারোকে আধছটাক জমিও ছাড়তে চায় না, যতক্ষণ না কোমর ভেঙে যায়। কিন্তু হায়! কদাচ কখনো তবু ‘টাই’ হয়ে যায়!

কি হয়ে যায়! ‘টাই’ ‘টাই’। লড়কে লেঙ্গে ‘আপনাস্তান’ মন্ত্রে দুই প্রতিপক্ষ যখন উন্নতশির হয়ে দুর্যধনী ডায়ালগ আউড়ে ছুঁচের ডগায় ওঠা মাটি টুকুও না ছাড়তে চায়,-- কালেভদ্রে তখনো এই ‘টাই’ হয়ে যায়। এইটাই বলতে চাইছি।

দু-দুটি শতকের মাঝখানে কলকাতোলা মাদুর বিছিয়ে বসে আছি। কলকাকলি ভরা দুই শতাব্দি। পোড়খাওয়া বয়স কত যে দেখলো, কত যে শিখলো! লম্বা ইনিংস। আঠেরো মাসে বছরের খেলা। যাচ্ছি-যাবো করছি-করবো, রান তুলছি-তুলবো’র গাভাস্করি চালের আঠেরো মাস। তখন ছিলো নিজের জমিজিরেত, নিজের শষ্যকণা। দিয়ে থুয়ে দিনযাপনের ঢিলে ঢালা। ঔদার্য্য। পাশের গ্রামের পড়শি হাট সেরে বাড়ি ফিরছে পা-গাড়িতে। যেতে যেতে বেলা পার হয়ে যাবে। ঠাকুদ্দা দাওয়ায় বসে, ‘কে যাচ্ছো হে! ফণিভুষণ নাকি! আরে আমার বাড়ি পেরোয়ে যাও দিনি কেমন যেতি পারো! না খুড়োমশাই, যেতে যেতে সন্ধ্যে লেগে যাবেনে। টুক করে একটা পেন্নাম দিয়ে ফণী বলে, তা শরীল গতিক কেমন খুড়োমশাই! খুড়িমা আর ছেলে-বোউমা রা ভালো তো? আরে আমার শরীল কোনোদিন খারাপ হতি দেকেচো ফণি? ছেলেরাই বয়েস হয়েচে, বয়েস হয়েচে করে জমির আঙিনায় আমারে যেতি দ্যায়না। তাই দাওয়ার এই চৌকি খানায় বসে আঠেরো মাসে বচ্ছর কাটাই। না না, বয়েস কোতায় হয়েচে আপনার খুড়োমশাই! আচ্ছা, তা’লে এবার চলি! আরে যাই বল্লেই যাই! একি কতা! দুপুর পড়তে চল্লো, দুটি মাছ-ভাত না খাইয়ে এতোটা পথ তোমায় পাঠাই! কইগো মা জননীরা, আসন খানা পেতে একথালা ভাত বাড়ো দিনি, দেকি ফণী কেমন নাখেয়ে যায়! হ্যাঁ বাবা ফণিভুষন যাও সামনের পুকুরে একটা ডুব দিয়ে দিয়ে এসো। আরে শুনচো, গামছা একটা দিয়ে যাও দিকিনি। বাড়ির একান্নবর্তী পঙ্গপালের সাথে এর’ম ফণি মণি শিবপ্রসাদ কামাখ্যের দুপুরের খাবার উদার ভাতের হাঁড়িতে, মাছেরঝোলের কাঁসিতে, অম্বলের জামবাটিতে বসে সবসময়েই মিটিমিটি হাসে। #
সেই পোড়া চোখই আবার শূণ্য দশকের যতটুকু-ততটুকুর প্রেসারকুকার দেখছে। শূণ্য দশকের শূণ্যহাঁড়ির ঢেঁকুরতোলা আয়েস।
দৌড়ের এই জমানায় আঠেরো মাসের (পাঁচ দিনের) ক্রিকেট সির্ফ নাযায়েজ হি নেহি, না-মুমকিন ভি। টাইমফ্যাক্টর বলে একটা কথা আছে কিনা? বলুন? প্রথমে ক্যারি প্যাকার মহাশয়ের বোধবুদ্ধি থেকে জন্ম নেওয়া ফিফটি-ফিফটি, দৌড়বাজদের মুখে হাসি ফোটালো। যাক্‌! একদিনেই হয়ে যাবে। তো ২০০৭ বললো, আমি ওর চেয়েও চওড়া হাসি হাসাবো রে ভাই। মাঠে এলো টি-টোয়েন্টি। মানে? এবেলা ম্যাচ দেখে ওবেলা বসের পার্টি এ্যাটেন্ড করার সময়টিও পেয়ে যাচ্ছে আউটসোর্সিং এর ছেলেমেয়েরা! দাওয়ায় বসে গামছায় মাছি তাড়িয়ে লোক ডেকে গপ্প করার সে স্বর্ণদিন আর আসবেনিকো।
#
তো কি বলছিলাম! হ্যাঁ টাই। প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই তো ইন্ডিয়া আর পড়শি দেশ পাকিস্তান টাই বেঁধে বসলেন। ভালোই তো! টাই। রাখিবন্ধণ। দুহাত এক হয়ে দুদেশ আবার হেয়ারক্র্যাকবিহীন জুড়ে যাক। আই.এস.আই এসে একগাল হেসে চরগিরি তুলে নিক। হাজার গন্ডা জঙ্গীগুস্টি ভুলে যাক শত্রুতা। নওয়াজ শরিফের মন্ত্রীসভা দামোদর মোদির মন্ত্রীসভার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আনন্দের গণসঙ্গীত ফোটাক। আফ্রিদী আবার বার বার বলুক, সে ইন্ডিয়াতে নিজের দেশের থেকেও বেশি ভালোবাসা পায়। পৃথিবীর যত দেশের খেলদোল সব টাই হোক। নব নব টাইপের বোমা-চক্রান্তের মার্চ করে আসা লাশ ফেলা Gun-সঙ্গীত গুলো ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা, তো সুর বনে হামারা’ হয়ে উঠুক... আহা, এমন দিন কবে আইসবেক গ’? গণধর্ষন গনহত্যার রক্ত খবর কাগজের আর বইতে হবেনা!
#
মিলনসুর বুকে নিয়ে গ্যারেজ খুলে টাইমমেশিনের এ্যাক্সিলেটারে পা রেখে ফিউচারের ‘নব্‌’ টি দাবালাম। ২০২০... আহা কি হেরিলাম নয়ন মেলে....!!! পুরো পৃথিবী নামক গ্রহে কোনো সীমান্ত বেড়া নেই! নেই কোনো নোম্যানস ল্যান্ড! না মানচিত্রে। না মানুষের মনে। যুদ্ধক্লান্ত সারা বিশ্বের যুদ্ধসৈনিকেরা শেষ যুদ্ধে লাশ-সংখ্যা সমান প্রমাণ করে শান্তির ‘টাই’ ঘোষনা করেছে। সৈন্যপোষাক ছেড়ে, জঙ্গীমনপ্রাণহোকউধাউ সুরে ওরা অনুশোচণার চোখজলে শত্রুতা ধুয়ে ফেলছে। মানুষ বুঝে ফেলেছে, কিছু লোকের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ওরা ব্যাবহৃত হয়ে চলেছে দীর্ঘ দিনরাত্রি...। তাবৎ মানুষ বুঝতে পেরেছে শক্তির উৎস বন্দুকের নল আর বোমাবাজীর চুড়ান্ত হতে পারে, কিন্তু শান্তির উৎস বিদ্বেষবিষনাশ এর মন্ত্র। এই মন্ত্রে টাই-আপ এর মিলনরাখি একে অপরের হাতে বেঁধে মনবিক বন্ধণের চিরস্থায়ী সুখ আনন্দ পেতে মানুষের বানানো মানচিত্রের নোংরাচিত্র গুলো ছিঁড়ে উড়িয়ে দিয়ে, বেড়া ভাঙার গানে সবাই গলা মিলিয়েছে। কোনো দিকে আর কোনো সংকীর্ণতা নেই। নেই নেই নেই...
আরো বুঝি কিছু দেখার বাকি ছিল! টাইমমেশিন, এ তুমি কি দেখালে! এ কি সত্য! এ কি মায়া! না মায়াসভ্যতা নয়, সে আমাকে দেখালো এক অনণ্য ল্যাবরেটারির অন্দরমহল। কিছু সাইনটিস্ট বিদ্বেষ নামের বিষ এর এ্যান্টিভাইরাস আবিষ্কার করে ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা বিশ্বে, সমস্ত মানুষের শ্বাসে প্রশ্বাসে। ধ্বংসের জপমালার রুদ্রাক্ষ নিউক্লিয়ার শক্তি কে নষ্ট করে বিশ্বচরাচরকে একটিমাত্র সম্প্রীতির সুতোয় বাঁধতে আরো বেশি শক্তিশালী সুস্থ ভাইরাস আবিষ্কারের নিমগ্ন চিন্তাকারিগরিতে মগ্ন সেই বিজ্ঞানীঈশ্বর দের দেখতে দেখতে আমি ‘টাই’ এর কাছে নতজানু হই...