হিট উইকেট

কৌশিক দত্ত

মানুষ এখন ব্র্যাডম্যান-সম, যাকে আউট করা যায় না, যতক্ষণ না সে নিজে থেকে আউট হয়। অথচ মানুষ মৃত্যুপ্রিয়। নিজেকে আউট করে দেবার জন্য আধুনিক মানুষের চেষ্টার ত্রুটি নেই। অতএব হিট উইকেট। হে বোলার তুমি ক্ষুদ্র কন্দুক নিক্ষেপ কর এদিক ওদিক যেদিক পার। এই আমি ব্যাট উঁচিয়ে আছি নিজের স্টাম্পে মারব বলে। সবাই জানে, আমরা সবচেয়ে বড় পাথরটা তুলি নিজের পায়ে ফেলব বলে। এই ভেঙে ফেললুম মিডল স্টাম্প! এই কেটে ফেললুম বন-বাদার। এই ছিঁড়ে ফেললাম প্রেম-গ্রন্থি। এই উড়িয়ে দিলাম স্বজন-বন্ধু। হুস...

মানুষের প্রিয় খেলা আত্মহনন। না, ব্যক্তি মানুষের আত্মহত্যাকে হিট উইকেটের আওতায় রাখব না। সেই সব মৃত্যু মর্মান্তিক, প্রায়শ সচেতন স্বেচ্ছা-নির্বাচন নয়। বাঁচতে চেয়েও বাঁচতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ধ্বসে যাওয়া। আস্কিং রেট আকাশের কাছাকাছি দেখে তীব্র-গতি পেসারকে স্টেপ-আউট করে ছয় মারতে গিয়ে উইকেট খোয়ানোর মতো; দেখতে দায়িত্বজ্ঞানহীন, কিন্তু অসহায়তায় নিদারুণ। সতীর্থরা যদি আরেকটু দায়িত্ব নিয়ে খেলত, তাহলে হয়ত এভাবে নিজের উইকেট দিতে হত না তাকে। এমনকি যখন আগের বলটায় এরকমই ভয়ানক কিছু করতে গিয়ে ১৬০ কিলোমিটারের গতিমান বাউনসার সটান লাগল তার হেলমেটহীন মাথায়, সেই রক্তপাতের মুহূর্তেও যদি নন-স্ট্রাইকার এগিয়ে এসে তার কানে কানে বলত, “বন্ধু, এখনো সময় আছে। তোমার উইকেটটা দামি...”, যদি ক্যাপ্টেন তার কাছে একটা উৎসাহের চিট পাঠাত জলবাহকের হাতে! তাহলে হয়ত রোখা যেত একজন ব্যাটসম্যানের অকালমৃত্যু। না, এইসব দিশেহারা ব্যাটসম্যানের মৃত্যু হিট-উইকেট নয়। তার উইকেটে আঘাত করেছে অনেকে মিলে, কেউ প্রত্যক্ষ ভাবে, কেউ অপ্রত্যক্ষ ভাবে। ম্যাচ জেতাতে না পারলে পরের ম্যাচে বাদ দিয়ে দেবার কথা ঘোষণা করেছে যে কোচ (শিক্ষক/বাবা-মা), ব্যাটিং অর্ডারে পিছিয়ে দিয়েছে যে ক্যাপটেন (উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ), স্ট্রাইক রোটেট না করিয়ে অনেকক্ষণ তাকে রান নেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে যে পার্টনার (বন্ধু/সহকর্মী), কমিটমেন্ট নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন তুলে গেছে যে সাংবাদিক (সমাজ-পরিজন), ব্যর্থতার মুহূর্তে ছেড়ে গেছে যে বান্ধবী (প্রিয়জন), তারা সবাই মিলে খুন করেছে তাকে। পরস্মৈপদী হিট-উইকেট।

এমনকি যারা নিজের উইকেটে নিজে ব্যাট দিয়ে আঘাত করেছে ইচ্ছাকৃত ভাবে, তাদের নির্গমনকেও হিট-উইকেট বলে খেলো করার উপায় নেই। চৈনিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে গায়ে দিনে-দুপুরে আগুন দিয়েছিল যে ছেলে-মেয়েরা, তাদের বীভৎস উইকেট ছুঁড়ে দেওয়াও হিট-উইকেট নয়। কারণ স্টাম্প উড়ে গিয়ে সোজা আছড়ে পড়ে বিপক্ষ দলনেতার মাথায়। রোহিত ভেমুলার মৃত্যুও কি হিট-উইকেট? ইরম শর্মিলা চানুর মরতে চাওয়া? এখানে বোধহয় খেলাটা আর ক্রিকেট নয়। এ খেলার বিচার আলাদা।

আবার কেউ হয়ত প্রতিবাদে নেই। স্রেফ আর পারছে না ঠা-ঠা রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে। জীবন তাকে ক্রিকেটের ক্রিজে নামিয়ে দিয়েছে ব্যাট-প্যাড-গ্লাভস ছাড়াই। গোলা এসে লাগছে তার মাথায়-বুকে-তলপেটে, কিন্তু আম্পায়ার আউট দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে সে চায় নিজের স্টাম্প উপড়ে ফেলতে। একে কি বলবেন? হিট-উইকেট? বোঝা গেল না? আচ্ছা, উদাহরণ দিই। মনে করুন অরুণা শনবাগ, যিনি চলচ্ছক্তিরহিত দাঁড়িয়ে আছেন চাঁদমারি হয়ে, আর তাঁর ব্যাট-প্যাড কেড়ে নেওয়া ধর্ষক গ্যালারিতে বসে প্রতি বলে তাঁরচোট পাওয়া দেখছে! অথবা সেই রোগী, যিনি জানেন যে আর কোনোদিন উঠে বসতে পারবেন না, ব্যথায় কাতর হবেন, কিন্তু ভেন্টিলেটর তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে বছরের পর বছর! এঁদের আউট হতে চাওয়াকে কী বলে? ‘হিট-উইকেট’ নয় অবশ্যই।

কিন্তু মানুষের সবচেয়ে প্রিয় আমোদ হিট-উইকেট, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ব্যক্তি মানুষের কথা নয়, বলছি মানুষ প্রজাতির কথা। ক্রিজের যথাসম্ভব ভেতরবাগে দাঁড়িয়ে পুরো বাইশ গজের সুবিধা নিয়ে জীবনের পেস বোলিং সামলাবে ভেবে একেবারে উইকেটের মাথায় চড়ে বসেছি। ব্যাট তুলতেই বেল পড়ে গেল। কখনো বা অতিরিক্ত আগ্রাসী হতে গিয়ে ব্যাট ঘুরিয়েছি আমরা এমন জোরে, পুরো এক পাক মেরে সেই ব্যাট আছড়ে পড়ল স্টাম্পের ওপর। আউট। নিজেদের লোভ, সুবিধাবাদ আর আগ্রাসনের হাতে মানুষের উইকেট যেতে বসেছে। এই প্রজাতি সম্ভবত আগামী দু’শ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই গ্রহ থেকে। স্কোরবোর্ডে মানুষের নামের পাশের লেখা থাকবে, “হিট উইকেট”।

সভ্য হতে হতে, সফল হতে হতে, পরিপার্শ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বাড়াতে বাড়াতে, ক্রমশ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মানুষ। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, ক্রমশ নিজেদের রচিত উৎপাদন প্রক্রিয়াটি থেকেও বিচ্ছিন্ন, এক কিম্ভুত বাজারু হাঁসজারুতে পরিণত হয়েছি আমরা। সবকিছুই ক্রয় বা বিক্রয়যোগ্য। যা ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য নয়, তার কোনো স্থান নেই এই বাজার সভ্যতায়। সবকিছু মাপার একমাত্র ‘কারেন্সি’ হল ‘অর্থ’... না, ‘meaning’ নয়, ‘money’ অর্থে (অন্)অর্থ। সুতরাং যা কিছু অর্থমূল্যে পরিমাপযোগ্য নয়, তা সাফল্য বা সুখের সূচক হতেই পারে না। এই কথাটা জোর করে সকলের মাথায় ঢুকিয়ে দেবার জন্য বহুবর্ণ তাত্বিক ডিস্কোর্সের রাজসূয় আয়োজন। তাই স্মার্ট-ফোনে সুখ আছে, সন্ধ্যার বাতাসে নেই। অর্থের বিনিময়ে পরের সন্তানকে লালন করার মধ্যে সার্থকতা আছে, কিন্তু বিনে পয়সায় নিজের সন্তানকে বুকে ধরার মধ্যে তা থাকতেই পারে না। ধীরে ধীরে সমস্ত মানুষ, সমগ্র প্রতিবেশ, সকল অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, বিনোদন থেকে রোদন... সবকিছুর জন্যক্রয়যোগ্য সামগ্রীর উপর নির্ভরশীল হওয়া এবং বাজারের ক্রীতদাসে পরিণত হওয়া... এইভাবেই নিজেদের ইনিংস সাজিয়েছি আমরা। এই অসামান্য প্রচেষ্টাকেই এক কথায় বলে ‘হিট-উইকেট’।
সভ্যতার সংকট শুধু মানুষের আভ্যন্তরীণ (intra-specific) টানাপোড়েনে সীমাবদ্ধ হলে তাও নাহয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অন্য মানুষকে ‘অপর’ বানিয়ে উন্নাসিকতার ভরসায় নিজস্ব জীবনযাত্রা বজায় রাখা যেত। কিন্তু ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-জাত-স ঘ-সমাজকে হাতিয়ার করে দুর্বলতর মানুষকে দাবিয়ে রাখা যতটা সোজা, প্রকৃতির উপর নিরন্তর অত্যাচার চালিয়ে যাওয়া ততটা সহজ নয়। অরণ্যের দিকে, পাহাড়ের দিকে, নদীর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া তীর বুমেরাং-এর মতো ফিরে এসে আছড়ে পড়ে সাজানো বৈঠকখানায়। হিট উইকেট।

বাবুদের বাড়িতে হাত পাখাকে টানা পাখায় পরিণত করা অব্দি ছিল অপর মানুষের ঘামের জলে স্নান করে শীতল হবার মনুষ্যত্ব। ক্রমে বৈদ্যতিক পাখার হাত ধরে এল প্রকৃতির শক্তিতে মানবিক আরাম। সাথে এল মানুষকে শোষণ না করেও সুখী হতে পারার বাস্তবতা এবং সেই বাস্তবতায় ভর করে সাম্যের মহান স্বপ্ন। কিন্তু উন্নততর “মোড অব প্রোডাকশন” স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে সরল মনে সরল-রেখায় আসে না। বিদ্যুৎ পাখার পিছু পিছু আসে উন্নততর গ্রীষ্ম। কংক্রিটের শহরে পাখায় আর কাজ হয় না। প্রয়োজন পড়ে এয়ার কন্ডিশনরের। ঘরের গরম ছড়িয়ে পড়ে বাইরে। আকাশ হয়ে ওঠে ধূসর, বাতাস হয়ে ওঠে অসহনীয়। পৃথিবী ক্রমশ পুড়ে যেতে থাকে, আর আমরা অধিকতর উত্তেজনার খোঁজে টি-টোয়েন্টি খেলি। নগরের বুকে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নতুন পথের উড়াল, আর আমরা সভ্যতার তলায় চাপা পড়া মানুষের কাছে না গিয়ে ফেসবুকে ভাঙা-সেতুর মরমী কবিতা লিখে তারিফ কুড়োই। আমাদের উদ্ধত ব্যাট সপাটে চড় মারে মিডল স্টাম্পে। তিনশ’ বিয়াল্লিশটা লাইক সমেত সব বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক কবি ‘আউট’ ঘোষিত হন... ‘হিট-উইকেট’।

বুমেরাং-এর ধর্মই হল ফিরে আসা। অবহেলা ফিরে আসে। অপরের মৃত্যু নিজের হয়ে ফিরে আসে। আজ যাঁরা নিজেদের নাম তুললেন ‘মার্কড সেফ’ তালিকায়, কাল তাঁরা অন্য কোনো উড়াল পুলের নীচ দিয়ে বা উপর দিয়ে যাবেন। সারারাত ধরে তাঁদের উদ্ধত শহরের ইমারতের ভিত খুঁটে খাবে ইঁদুর; ফুটপাথবাসী পরিবারের প্রতিবেশী মূষিককুল। দরিদ্র মানুষকে স্বল্পমূল্যে পরিশ্রম করিয়ে নির্দ্বিধায় অর্ধনগ্ন শুইয়ে রাখা যায় শীতরাতে নাগরিক ফুটপাথে। তাদের বুমেরাং হওয়া ঠেকাতে আইন আছে, যা ইমারতের স্বার্থরক্ষায় একান্তভাবে রচিত। কিন্তু ইঁদুরের দাঁত থেকে বাঁচবে না সাধের সৌধসমুদয়। মানুষের বিষ আছে, বুবি-ট্র্যাপ আছে, কিন্তু শহরখেকোদের সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সমগ্র গর্ভ জুড়ে। ইঁদুরের রূপকেএই সদাবুবুক্ষু অক্ষয় দন্তরাজি সভ্যতার নিজস্ব সৃষ্টি। ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের দৈত্য হৈ হৈ তেড়ে আসছে, বল নয়, ব্যাট উঁচিয়ে। বল ছুঁড়ে মারলে তা ঠেকানোর উপায় জানেন বিরাট কোহলি। ততদিন ম্যাচ জেতাবেন তিনি, যতদিন বিপক্ষ শুধু বল ছুঁড়বে উইকেট লক্ষ্য করে। কিন্তু স্টাম্পের মাথায় সটান নেমে আসে ব্যাট ঠেকানোর টেকনিক ক্রিকেটের ইস্কুলে শেখায়নি।

রমরমিয়ে চলছে প্রজাতিসকলের ষষ্ঠ মহামৃত্যু মিছিল, ‘sixth mass extinction’ বা ‘holocene extinction’ নামে যা এই মুহূর্তে বহুল আলোচিত। এর আগে পাঁচটি ‘মাস এক্সটিংশন’ হয়েছে, যার শেষটি ঘটেছে আজ থেকে ছয় কোটি ষাট লক্ষ বছর আগে (Cretaceous-Paleogene extinction), যাতে শেষ হয়েছে ডাইনোসরের মতো মহারথীরা। প্রতিটি মহামৃত্যুকালে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আবার তা ঘটতে শুরু করেছে। এবারে এই হোলোসিন ধ্বংসকালকে, বিশেষত বিংশ শতকের শেষার্ধ থেকে ভয়াবহ হয়ে ওঠা ধ্বংসযজ্ঞকে ‘anthropocene extinction’-ও বলা হয়, কারণ এই প্রলয়ের মহারাক্ষস ‘টার্মিনেটর’ হল মানুষ। এই ধ্বংস শুর হয়েছে সম্ভবত প্রায় দশ-বারো হাজার বছর আগে, কিন্তু সম্প্রতি তার গতি বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। সরকারি খাতা যদিও নিশ্চিত ভাবে আটশ’ পঁচাত্তরটি প্রজাতিকে বিলুপ্ত বলে চিহ্নিত করতে পেরেছে গত পাঁচশ বছরে, বাস্তবের সামান্য প্রতিফলনও এই খেরোর খাতায় নেই। ‘স্পিসিস এরিয়া থিয়োরি’ প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে লয়ের উর্ধ্বসীমা অনুমান (upper bound estimation) করে দেখা যাচ্ছে ইদানিং সম্ভবত এক লক্ষ চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি সংখ্যক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে প্রতেক বছর। শিকারী মানুষ, কৃষিজীবি মানুষ... সকলেই ছিল এই ধ্বংসের কারিগর। শিল্পায়ন, বিশ্বায়ন, বাণিজ্যেরআয়ন বায়ু কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকছে থরের হাতুড়ি দিয়ে।

বেশ তো! মরুক গে সব। অপরের চিতার পাশে, অন্যের কফিনের ওপর বসে শবের রোস্ট সহযোগে মদ্যপান করব আমরা। সেটাই তো সভ্যতা। সমস্যা হল, প্রকৃতি সর্বংসহা নয়। প্রকৃতি পাল্টা মারে। শুধুমাত্র নিজে মরে যাবার মধ্য দিয়েই আমাদের মেরে ফেলার মন্ত্র সে জানে। ‘হিট উইকেট’। এই ধরুণ, আমাদের রাজ্যে কয়েকশ’ প্রজাতির ধান ছিল, যার অনেকগুলোই খরা-বন্যার তোয়াক্কা না করে অযত্নে বেড়ে উঠতে জানত। আজ আমাদের আছে হাতে গোনা কয়েকটি শৌখিন বা উচ্চফলনশীল প্রজাতি। বাণিজ্যের হিসেবে বেশ। কিন্তু একবার মাঝমাঠে অবরোধ হলে পাশ কাটানোর মতো উইং প্লে নামক বিকল্প রইল না আর। অথবা মহান মনস্যান্টো। কেবল নিহত তুলো চাষির লাশ নয়, কাপাস-শিমুলের লাশেও লাল হয়ে আছে তার মাঠ। তুলো না হয় বাদ গেল, উলঙ্গ থাকাটুকু শিখে নিলে নেহাত মন্দ হয় না, বিশেষত গরমের দেশে। কিন্তু মনস্যান্টোর নাম উঠলেই মনে পড়ে মৌমাছির কথাও। মৌমাছি যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়? যদি বিলুপ্ত হয় প্রজাপতি? শুধু শিশুর সরল আনন্দ, পৃথিবীর বর্ণিল উৎসব বা মধুময় মাধুর্য ইতিহাস হয়ে যাবে না, দুনিয়া জুড়ে থেমে যাবে পরাগ-মিলন। বন্ধ্যা হবে হরেক জমিন। অনাহারে মৃত্যু হবে কোটি কোটি মানুষের। তখন আর কেউ ‘ঐহিক’ পত্রিকার পারত্রিক প্রবন্ধ পড়বে না। বুদ্ধিজীবি সুশীল সমাজ আর টেলিভিশনে বাগবৈদগ্ধ প্রদর্শন করার সময় পাবে না। পেটের দায়ে নরমাংসভুক হয়ে উঠতে সময় নেবেন যাঁরা, তাঁরা তাঁদের সুশীলতা সমেত বিলুপ্ত হবেন সবার আগে। যাঁরা এখন সমাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষের রক্ত-মাংস খান, আর তখন আক্ষরিক অর্থে খেতে শুরু করবেন, তাঁরা দু-এক বছর বাড়তি বাঁচলেও বাঁচতে পারেন। কিন্তু তাঁদেরও যেতে হবে। বস্তুত, তাঁদের লোভের আগুনেই পুড়ে মরতে হবে সব মানুষ আর না-মানুষকে।

নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এক গন্ডার প্রজাতি। কয়েক বছর আগে শেষ হয়েছে মেক্সিকোর গ্রিজলি ভালুক। ডোডো পাখির বন্ধু তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিদিন। এই এপ্রিলে আমরা করে ফেলেছি রেকর্ড। সমগ্র উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা স্বাভাবিক সর্বোচ্চ ছাড়িয়ে দুই ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড উপরে তুলেছে মাথা। ছাড়িয়ে গেছে ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট। সুমেরুর বরফ গলছে হুড়মুড়িয়ে। আগামী কোনো গ্রীষ্মে এভারেস্টের মাথায় চড়তে আর বরফে পা পিছলাবে না অভিযাত্রীর। অবশ্য সেই নিরাপদ অভিযানের জন্য পাওয়া যাবে সামান্য কয়েকটি গ্রীষ্ম। আর হয়ত দুশ’ বছর। তার মধ্যে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছাবে হোলোসিন প্রলয়। সেই মৃত্যুযজ্ঞে বিলুপ্ত হবে অন্তত পঁচাত্তর শতাংশ জীব প্রজাতি। তার মধ্যে একটির নাম হোমো সেপিয়েনস সেপিয়েনস। জীব বিবর্তন পিছিয়ে যাবে বহু লক্ষ বছর। কিন্তু সুখবর এই, যে অপসারিত হবে সর্বগ্রাসী হিংস্রতম প্রাণী মানুষ।

তাতে কী? অত দূরের কথা আমরা ভাবতে পারি না। আমাদের এই মুহূর্ত আছে। বিধানসভা নির্বাচন আছে। চিট ফান্ডের পয়সা আছে। বিলিতি গাড়ি আছে। নববর্ষের পার্টি আছে। আমাদের নাতি-নাতনি না হয় তিলে তিলে ভয়ানক মরবে। তাতে আমাদের কী? মানুষের মৃত্যু আমাদের আর স্পর্শ করে না; এমনকি সন্তানের মৃত্যুও না। অতএব আসুন টি-টোয়েন্টি দেখি। বিশ্বকাপ শেষ, তাতে কী? আই-পি-এল তো আছে। পৃথিবীর শেষতম জলবিন্দুটি ঢেলে, সমস্ত বিদুৎ খরচা করে করে চলুক আমাদের উৎসব। আমরা স্থির হব না। দু-পা পিছিয়ে আসব না। প্রগতি আর উন্নয়নকে অন্যভাবে ভাবার চেষ্টা করব না। আমাদের ক্ষুধা দুর্নিবার। আমাদের দাঁত বেড়ে চলে ইঁদুরের চেয়েও দ্রুত। নিরন্তর জীবনের ভিত কামড়াতে থাকব আমরা। আর ব্যাট ঘোরাতে থাকব আগ্রাসী।
যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ বিন্দাস।