টেল এন্ডার @ অশেষ

রাজর্ষি মজুমদার

১.
বৃষ্টি দিয়ে কি তুমি একটা আগুন নেভানোর কথা ভাবছ? এরকম প্রশ্নের কাছে আমরা কমবেশী চুপ হয়ে থাকি। সেই শুরুর দিনগুলোয় যেখানে আমাদের একাকীত্ব , বালকবেলার শুরু - তাকে রেখে দিই স্বপ্নে - কল্পনার আরামে।

তুমি কি কখনো জানতে? স্কুল থেকে ফেরার পথে, বাবা আমাকে একলা দাঁড় করিয়ে মাঝে মাঝে ঢুকে যেতেন অফিসে - সেই অল্প সময়টুকু আমি নদীর দিকে তাকাতাম। কোনো কোনো ফিরে আসা লঞ্চ - কোনো কোনো পাতা উড়ে যাওয়ার মাঝে নিজেকে একলা মনে হলে গুটি গুটি পায়ে অফিসে ঢুকে যেতাম। বকুলগাছটার নীচে পৌঁছলেই দেখতে পেতাম বাবা হয়ত আমার দিকেই আসছে - অথবা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে গুছিয়ে নিচ্ছে ব্যাগটা - অন্য কাকুরা আমাকে দেখতে পেলই ডাকতো - আমি লজ্জা পেয়ে আবার ছুট্টে চলে যেতাম সেই সিঁড়িটার মুখে। নদী আমার কাছে অনেকদূর যাওয়ার একটা নাম হয়ে উঠত।
তোমাকে এসব না জানালে তুমি কি জানতে পারতে ? আমার কিন্তু মনে হয় আমি তোমার ছোটোবেলার কথা জানি। আমাদের ছোটোবেলাগুলো নদী, আকাশ বা গাছেরা অনেকসময় এক করে দেয় - স্বপ্নের মধ্যে, অই বয়সের মধ্যে জমা থেকে যায় একথাকার সেই সুর।

মিরর ফিল্মটা তৈরীর পর তারকোভস্কিকে অনেকেই দোষী করেছিল যে সেটি নাকি ভীষণ ব্যক্তিগত - জনসাধারণের কথা তাতে নেই। পরে তারকোভস্কি একটা চিঠি পান - কোনো এক সাধারণ মহিলার চিঠি - বয়ান অনেকটা এরকম -
" তুমি কিকরে জানলে আমার ছোটোবেলার কথাগুলো - ঠিক সেই হাওয়া - এরকমই তো আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম মায়ের জন্য - তেলের অভাবে বাতি এভাবেই নিভে যেত - আর সত্যিই আমাদের পোষা বেড়ালটা একদিন দুধের গ্লাস উল্টে দিয়েছিল। ...আর আমার সেই অন্ধকার সিনেমা হলে বসে নিজেকে আর একা মনে হচ্ছিলনা। "

২.
আজ শুধুই দাঁত মাজছিলনা গুণ। মন দিয়ে চিনতে চেষ্টা করছিল শব্দগুলো - না না মিছিল বা বিস্ফোরণ জাতীয় কিছু নয় - রোজ দিনের শব্দদেরই তো আমাদের শোনা হয়না ঠিক করে - তাই গুণ বৃহস্পতিবার শব্দ শুনতে চেষ্টা করে।
গানটা এতো দূর থেকে আসছে যে কথা প্রায় মুছে যাচ্ছে - সুর টুকুই রয়ে গেছে - আছড়ে পড়ছে ওর খোলা বারান্দায়। কাকগুলো নিয়মমাফিক ডাকছে , রান্নার নিজস্ব শব্দরা চারদিকে আর ওর ব্রাশ করার শব্দে ভরে যাচ্ছে কান।
আজ অফিসে ঢুঁ মারা বাধ্যতামূলক - আজ শুধু ঘরে বসে থাকার দিন নয় - আজ দার্জিলিংয়ে বরফ পড়ার পর প্রিয় হাওয়াদের ফিরে আসার দিন। সে বুঝছিল অল্প কাজ থাকলেও তার কাছে মাঝে মাঝে অফিস বিরক্তিকর ... অথচ অফিস না গিয়ে কি করলে যে তার ভালো লাগতে পারে সেটাও জানেনা আপাতত। এরম দিনে সে একটা চিঠি চেয়েছিল - এ পাড়ায় পোষ্টম্যানদের সে বহুদিন দেখেনি বোধহয় - অথচ চাকরির চিঠি বা মানি অর্ডার জাতীয় কিছু তো আসার কথা। তাহলে সে কি দেখছেনা চোখ ভরে? গুণ ভাবছিল একটা দিন দেখার জন্য বরাদ্দ করলে কেমন হয়?

৩.
- " কথা বলতে বলতে প্রায় রোজই তুমি ঘুমিয়ে পড়ছ।"
- " সেটা কি ইচ্ছে করে? "
- " তুমিই বলতে পারবে... "
- " এতে অসুবিধের কি আছে? "
- " অসুবিধের কি মানে? কথা শেষ করবেনা? "
- " কিন্তু আমি তো জানতাম কথারা কখনো শেষ হয়না। "
- " আরে ! আমি বলছি তখন যা নিয়ে কথা বলছিলাম সেটা অন্তত শেষ করে, 'রাখছি' বলে তো ঘুমোনো যেত। "
- " আমার কিছুই মনে ছিলনা। কি নিয়ে কথা বলছিলাম যেন? "

৪.
" আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।। "

আমাদের বাড়িতে প্রথম যখন টিভি আসে তাতে বোধ হয় বাইশটা চ্যানেল ছিল। তখনো আমরা নদীর ধারের রাস্তার ওই ভাড়া বাড়িতেই থাকতাম। এখনো সেই দিনটা মনে আছে যেদিন আমাদের বাড়ির বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল, বাড়িওয়ালা বেশ কয়েকমাস বিল জমা না দেওয়ায়। বাংলোর পুকুর থেকে স্নান করে ছুটতে ছুটতে এসেছিলাম। বাবা আমাকে দেখ হেসেছিল শুধু - পরের দিনই কীভাবে যেন কারেন্ট এসেগেছিল আবার।
ছোটবেলার ম্যাজিকগুলো এভাবেই কোথায় কোথায় রয়ে গেছে যেন - প্রথমবারের সেইসব বিস্ময়। খালি একটা থলির থেকে পর পর লজেন্স , মায় বুল্টি যখন বলল ক্ষিদে পেয়েছে তখন মুঠো মুঠো মুড়ি , আস্ত একটা চপ। চোখ গোল গোল করে অবাক হওয়া ছাড়া আর কি ছিল তখন?

কে একবার ক্লাসে এসে জানিয়েছিল - তার ভাই হবে। হবে মানে? কোন অজানা থেকে নেমে আসবে তার ভাই?
আর একবার প্রায় গোটা স্কুল মাঠে বেরিয়ে এসেছিলাম প্যারাসুট আকাশে উড়তে দেখে - এ কি সত্যিই নেমে আসবে? কাকে কাকে নিয়ে যাবে আমাদের?

আমাদের বাড়িতে কোনো পোষা কুকুর বিড়াল ছিলনা - ছিল বারান্দায় টিনের চাল - বৃষ্টি এলে তা বেজে উঠত ঝমঝমিয়ে। সেই সময়গুলোয় আমার নদীর দিকে তাকাতে ভয় করত - মনে হত ভেসে যাব বুঝি - সেই টিনের চাল , বারান্দার শিকগুলোর কাছে আমি ভরসা পেতাম। বুঝতে শিখতাম বৃষ্টিও একসময় শেষ হয়ে যায় - পুটু দিদি এসে বলত - " ভাই খেয়ে নাও। মা বাবা এক্ষুণি চলে আসবে হয়ত।"