তিনজনা

রুমা মোদক

তবে কী এই নাগপাশ বন্ধনেরই হবে জিত, হার হবে তোমার সৃষ্টি ঐ আনন্দলোকের? ওরে মেজো বউ ভয় নেই তোর, তোর মেজো বউ এর খোলস ছিন্ন হতে এক মুহুর্ত লাগে না- মৃণালের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় যেনো প্রতিস্থাপিত হই নিজেই, মহড়াকক্ষে ছড়িয়ে পড়া বানীগুলোতে কেবল কন্ঠ নয় হৃদয়ও বেজে উঠে এক লয়-তালে। পাশ থেকে কোরাসে সুর উঠে ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ঐ আকাশে........... পুরো মহড়াকক্ষের পিন পতন স্তব্ধতায় গানের সুরের ভেসে বেড়ানো তরঙ্গে মুগ্ধতার আবেশ তৃপ্তি নিয়ে স্পর্শ করে আমাকে। দুচোখ বন্ধ করে ডিরেক্টারের মাপা ছকে এন্ট্রি নিতে নিতে ভাবি, প্রথার খোলস ছিঁড়ে বাইরে আসার এই আকাঙ্ক্ষা অনুভূতির চোরাগলি দিয়ে ঢুকে সব মানুষকেই কি ডাকে আলোর দিকে? যে আলোর আকাঙ্ক্ষায় আমি মূহুর্তে মৃণাল হয়ে যেতে পারি সাজঘরের দেয়াল চুরমার করে, আর আমি জানি তা পারি বলেই আমার অভিনয় এমন মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে রাখে চারপাশে! মহড়া শেষ করে নামতেই নিশাত আপা পিঠ চাপড়ে দেন- দুর্দান্ত। অরুনদার অভিব্যক্তিতে সন্তুষ্টি। হাঁফ ছাড়ি। মহড়ায় অরুনদার চেহারায় এই সন্তুষ্টি বিশাল প্রাপ্তি। আমি মুচকি হেসে প্রত্যুত্তর দেই। আধঘন্টার টি ব্র্যাক। ব্যাগ খুলে সাইলেন্ট মুডে থাকা মোবাইলটা হাতে নেই। ও বাবা ৭ টা মিসডকল। পাঁচটা কলি আপার, দুইটা তপনের। এতো গুলো ফোন কলি আপার, প্রয়োজনটা নেহাৎ জরুরী বুঝে নেই। ফোন ব্যাক করি, কলি আপার কন্ঠে রাজ্যের উৎকন্ঠা- কী রে কোথায় তুই? এতো বার ফোন দিচ্ছি! -রিহার্সেলে আপা, কী ব্যাপার জরুরী কিছু? -এই নাটকই তোকে খাবে রে ঋতু; রেজাল্টটা খারাপ হলে দেখিস। -অন্যদের তো কতো কিছু খায় আপা, নেশা, প্রেম, আড্ডা, ফেসবুক, চ্যাটিং, খাওয়ার বাইরে কেউ নেই গো, আমাকে না হয় নাটকই খেলো......... দীর্ঘ হতে যাওয়া খোশগল্পকে সংক্ষিপ্ত করতে চাই আমি, বুঝতে পারি আজ আপার হাতে সময় পর্যাপ্ত, কিন্তু আমার নেই। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে হিসাবের আধঘন্টা বলি- বাদ দাও ফোন কেনো করেছিলে তাই বলো।- শোন না কয়টা দিন বাসায় এসে থাকতে হবে তোর, প্লিজ না করতে পারবি না। শ্যামলী আছে, কিন্তু ইশিতা একদম ওর সাথে এডজাস্ট করে থাকতে পারে না- আকুতি আর অসহায়ত্বে কলি আপার কন্ঠ কেমন কেঁপে উঠে টের পাই। আমিও অসহায়, মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে। মাত্র সাতদিন পর শো, কঠিন রিহার্সেল চলছে। এই মূহুর্তে বাসা থেকে এসে সময়মতো রিহার্সেল এটেন্ড করা কী যে কঠিন হবে, অরুনদার রক্তচক্ষুর কল্পনায় আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়। কলি আপা নাছোড় বান্দা। বলি শ্যামলীতো আছে, আমি মাঝে মাঝে দেখে আসবো ইশিতাকে। মানাতে পারি না। কলি আপার বেদনাটা অনুভব করি বলেই কথা বাড়াই না। মেনে নেই, নিতে বাধ্য হই। মাসখানেকও বাকি নেই ইশিতার পরীক্ষার কতোটা বাধ্য হলে এসময় শ্বশুরবাড়ি যেতে হচ্ছে তাকে! অরুনদা তাড়া দেন- তাড়াতাড়ি স্টেজে সবাই.........। ফোনটা পুনরায় সাইলেন্ট করে ব্যাগে ঢুকানোর আগে ভাবি তপনকে ফোন ব্যাক করবো কিনা! দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেই না। না করবো না। শুধু শুধু মুডটা নষ্ট হবে, রিহার্সেলটা মাটি হবে। মুহুর্তেই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে মুক্তির আকাঙক্ষায় প্রতিস্থাপিত করে পুনর্বার, মঞ্চে উঠে পড়ি........।
(২)
আমার যে রূপ আছে একথা ভুলতে তোমাদের সময় লাগে নি, কিন্তু আমার যে বুদ্ধি আছে একথা তোমাদের পদে পদে স্মরণ করতে হয়েছে- বুঝলা আপা, এই জায়গাটায় রেড স্পট লাইট ইউজ করবো, বলেছি অরুনদাকে...... জসিম বকবক করতে করতে সিঁড়ি পর্যন্ত নামতে থাকে আমার সাথে সাথে, সিঁড়ির মুখেই তপন- যাক বাবা বাঁচলাম তপন দা এসে গেছে- স্বভাব সুলভ ধুপধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে পালায় জসিম। রাতে একা একা ফেরার নিরাপত্তা বিবেচনায় সঙ্গী হয় জসীম, গ্রুপের ব্যবস্থাপনা। বেচারা, কষ্ট হয় ওর জন্য। কতোটা পথ যেতে হয়, আবার ফিরতে হয় প্রতিদিন। আমি চুপচাপ হাঁটি তপনের পাশাপাশি, যেনো মোটেই অবাক হইনি ওর আসায়, যেনো এটাই স্বাভাবিক। রাস্তা ক্রস করে ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকে তপন, আমি অনুসরণ করি। মাথার উপরে ঝুলে থাকা হালকা আলো আর চাপপাশ থেকে আকড়ে ধরা যন্ত্রের শীতলতায় কান্ত শরীরটা কেমন এলিয়ে যায়। দু-গ্লাস লাসসির অর্ডার দিয়ে তপন মোবাইল স্ক্রিনে ফেসবুকে লাইক বাটন টাচ্ করে চলে ক্রমাগত। দুজনের কেউ নীরবতা ভাঙি না। বেয়াড়া ছাতাওয়ালা লাসসির গ্লাস সামনে রেখে গেলে তপন স্ট্র ঠিক করতে করতে নীরবতা ভাঙে- কলি আপা ফোন দিয়েছিলো? শরীরের কান্তি, মনের অবসাদ দুটো অগ্রাহ্য করে মোটেই কথা বলার ইচ্ছে হয় না। তবু ভদ্রতার ধার ধারতে হয়। বলি- হ্যাঁ কাল থেক কলি আপার বাসায় থাকতে হবে ক’টা দিন। তো রিহার্সেলের অসুবিধা হবে না- তপনের কন্ঠের শ্লেষটা ঠিক ধরতে পারি আমি, এই আন্দাজ করাটাও নীরবতা না ভাঙার আর একটা কারণ। তবু ভেঙেই যখন ফেলেছি, গায়ে মাখিনা ওর বাঁকা বাকভঙ্গি আবারো ভদ্রতা নিয়েই বলি- রাতে একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে এই যা, অরুনদাকে বলেছি। ওমা সবাইকে ফেলে তুমি তাড়াতাড়ি ফিরবে গ্রুপের ডিসিপ্লিন নষ্ট হবে না- তপন স্বমূর্তিতে বেরিয়ে পড়ে। যেনো আমার মঞ্চে উঠে আওড়ানো ডায়লগের মতো, আমাকে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়াই ছিলো। আমি যতোই ভদ্রতার ধার ধারি, তপন ধারবে না পন করেই এসেছে। আমি উপেক্ষা করি, উত্তর দেয়ার প্রয়োজনই বোধ করি না, মনে মনে বলি মৃনালকে কেবল কন্ঠে নয়, হৃদয়েও ধরেছি তপন। তোমার এসব আক্রমণ মোটেই স্পর্শ করবে না আমাকে। মুক্তির আকাঙক্ষায় ধুয়ে মুছে গেছে আমার সব মনে অপমান বোধ।
(৩)
যাকে বাধা মেনে চলতে হবে সে যদি বুদ্ধিকে মেনে চলতে চায়, তবে তো ঠোকর খেয়ে খেয়ে তার কপাল ভাঙবেই- আমার লাস্ট নাইট প্রিপারেশনের পরীক্ষার্থীর মতো স্ক্রিপ্ট ঝালাই এর মাঝেই ডিপ ফ্রিজ ভর্তি মাছ মাংস, নর্মালে রান্না খাবার, রান্নাঘরে চাল-ডাল-তেল-নুন-মরিচ, ওয়ারড্রোবের চাবির গোছা, হাজার পাঁচেক টাকা সর্বোপরি ইশিতার খাবার মেনু আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে কলি আপা গাড়িতে উঠলেন মুরাদ ভাইকে নিয়ে। ঘরে ঢুকতেই কথা বলে উঠলো শ্যামলী,- আমার ভাই এর বাসা, ভাবি কী পারতেন না এইগুলা আমাকে বুঝাইয়া দিতে? কথায় লেগে আছে আঞ্চলিক কূটচালিতার টান, আমি চমকে ফিরে তাকালাম। পোশাকে চেহারায় মুরাদ ভাইএর বোন ভাবতে কোথাও একটু বাধে। নাক মুখ চোখ পোশাক সবই ঠিকঠাক, তবু সবকিছু মিলিয়ে কেমন একটা গ্রাম্যতা, আমাদের অভ্যস্ত নাগরিক পরিমাপের বাইরে। ওর প্রাথমিক কথার ধাক্কাটা সামলে ঠিকমতো সহজ হতে পারলাম না ওর সামনে। আশে পাশে নিশ্চুপ কাজ করে যাচ্ছিলো সে, কলি আপা কী এমনি এমনি বলেছে ইশিতা ওর সাথে এডজাস্ট করতে পারে না। আমিই বা কটা দিন কেমন করে কাটাবো ওর সাথে, ভাবনাটা পীড়া দেয় ভিতরে ভিতরে। কফির কড়া গন্ধে আর ধোঁয়ায় হঠাৎ ছেদ পড়ে ভাবনায়। কফির কাপ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি। শ্যামলী। মুরাদ ভাই এর দূর সম্পর্কের বোন। আপনি নিশ্চয়ই আমার উপর অনেক রাগ করে আছেন- মেয়েটির সহজাত সহজতার সামনে আমার শহুরে স্মার্টনেস কেমন ম্লান হয়ে যায় মুহুর্তে।- না না রাগ করবো কেন? আমি নিজের দুর্বলতা আড়াল করতে প্রাণপনে স্মার্ট হবার চেষ্টা চালাই। -আসলে আপা......... শ্যামলীর গল্প জমানোর চেষ্টা করতেই ইশিতার ইশারা। পড়ার ডিস্টার্ব হচ্ছে ওর। -মাইয়ারে মাইয়া, মা রে দেখস না? কি হবে পইড়া? দুই দন্ড শান্তিতে বসতে পারে? সংসার, চাকরি...... এখন দৌড়াইছে শ্বশুরবাড়ি, এতো বড়ো বিদ্বান যে, কেউ কিছু মাফ দিছে তারে? পড়ালেখা করবো, চাকরি করবো বিদেশি মাইয়ারা, শুনছি রান্ধন লাগে না, বাইচ্চা পালে অন্যরা। ইশিতার চরম বিরক্তি উপেক্ষা করে একনাগাড়ে আঞ্চলিক উচ্চারণে কথাগুলো বলে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে যায় শ্যামলী।
সহজ ভাষায় বলে যাওয়া শ্যামলীর জীবন দর্শনটা হঠাৎ কোথায় ধাক্কা মারে আমার প্রচলিত জীবনাচরণে গড়ে উঠা দর্শনে। একবিন্দু অযৌক্তিক নয় ওর সহজ কথাগুলো। কালই তো কলি আপার গোছগাছ দেখছিলাম, জামদানি টা হাতে নিয়েও রেখে দিলেন- না রে এটা পরা যাবে না বিয়েতে গাঁয়ের মানুষ, জবর জং শাড়ি না পরলে ঠিক পিঁড়ি পেতে সমালোচনা করতে বসে যাবে। টুকটাক এসব মানিয়ে চলা, মেনে নেয়া সংসারের আবশ্যিক কৌশল, তবু কলি আপার এই মেনে নেয়া-মানিয়ে চলাটা কেমন যেনো মানতে পারি না আমি, বিয়ের আগে কী তুখোড়, তেজস্বী মেয়ে ছিলো কলি আপা। গেঞ্জি-প্যান্ট পরে একা সাইকেল চালিয়ে কলেজ করতো কারো কথায় তোয়াক্কা না করে। কলি আপাকে কষ্ট দেবার জন্য নয়, বরং নিজের কষ্টই লাঘব করার জন্য যেনো বলি- কেমন নিজেকে বদলে নিয়েছো কলি আপা। গোছগাছ করতে করতে কান্ত কলি আপার একটা দীর্ঘশ্বাসে কেমন শূন্যতা ঝরে পড়ে সম্পন্ন গার্হস্থ্য। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত থাকার ভান করেন কলি আপা- সে আর বলতে, গত মাসেই না মেয়ের পরীক্ষার জন্য নেদারল্যান্ড ট্যুর মিস করলাম আমি। আমিও আপাকে সান্তনা দেবার ভান করি- ও তোমার কতো আসবে, মেয়ের জন্য স্যাক্রিফাইস করলে আর কী! এবার কলি আপার ভানের মুখোশটা খুলে পড়ে, দেয়ালে পলকা তারকাটায় ঝুলানো ক্যালেন্ডারটার মতো- তবে এখন কেন যেতে হচ্ছে বল ছোট ননদের বিয়েতে? ইশিতার পরীক্ষার তো মাসখানেকও বাকি নেই। আপার ক্ষোভের ভিতর উঁকি মেরে দেখে ফেলা মৃণালের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাটুকু আমার একটুও অচেনা লাগে না।
(৪)
বিন্দুকে আমি দেখেছি, সংসারে মেয়ে মানুষের রূপটা যে কী তা আমি জেনেছি- আর আমার দরকার নেই- কলি আপার বেডরুমে বিশাল ড্রেসিং টেবিলে অরুনদার রক্তচক্ষু মাথায় বাসায় রেখে ফিরে প্রতিদিন এক্সপ্রেশনটা ঝালাই করে নেই, নানা এংগেল থেকে। শ্যামলী এসে পাশে বসে, ওর চোখে ও মুগ্ধতা পাঠ করি আমি- কী সোন্দর কইরা বলো গো আপা!! শ্যামলীর সাথে গল্প জমে উঠে আমার। জানতে চাই- সত্যি শ্যামলী? নিজের আত্মবিশ্বাসটা এই অপ্রশিক্ষিত দর্শকটির কাছেও সামান্য ঝালাই করে নিতে দ্বিধা নেই আমার। শ্যামলী উচ্ছ্বাসিত- একদম আপা, ঐ যে শীতে আমাদের গাঁয়ে যাত্রা পালা করতে আসে শ্রীলেখা অপেরা তাদের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর কইরা বলো তুমি....... বুঝতে পারি আমার দুর্বলতম অনুভূতি স্পর্শ করে করে ও কেমন জায়গা করে নিচ্ছে আমার ভিতরে। ওর ব্যক্তিজীবনের একান্ত গল্পগুলো শুনতে মোটেই বিরক্ত লাগে না আমার। আসগরের গেঁয়ো ন্যাকামীগুলো মোটেই বাড়াবাড়ি ঠেকে না। কী ভীষণ ভালোবাসতো তাকে আসগর। কাজ থেকে ফিরে দেখতে চাইতো সেজেগুজে অপেক্ষা করছে ও। সংসারের সব কাজে হাত লাগাতো, ঘুরঘুর করতো পিছু পিছু, খুব পরিচিত কাঁচা প্রেমের গল্প, তবু শুনতে শুনতে আমি একটা দুরুমের টিনশেডের বাসায় হারিয়ে যাই, ছোট্ট একটা কেরোসিন কাঠের নকশা করা খাট একপাশে, তাতে দুই শালিকের মতো পাশাপাশি দুখানা বালিশ, পাশেই কেয়া স্নো আর তিব্বত পাউডারে সাজানো ড্রেসিং টেবিল। সেখানে বসে গাল-মুখ ঘষতে ঘষতে রাঙা হয়ে উঠছে শ্যামলী পিছন থেকে জড়িয়ে ধরা আসগরের আদিমতায়- বলতে বলতে কেমন সুদূরে হারিয়ে যায় শ্যামলীর বিষাদময় দৃষ্টি। আহা বেচারী, মাত্র তিনদিনের জ্বরে জামাইটা মরে গেলো ওর। একটা সন্তানের হাহাকার ভিতর ছাপিয়ে ওর চোখ মুখে ফুটে উঠে। স্পষ্ট পড়া যায়। পড়ার পোকা ইশিতা বই থেকে মুখ তুলে হঠাৎ এসে ছেদ ঘটায় আমাদের মগ্ন আলাপচারিতায়- যাও তো ফুফু আমার ঘরটা গুছিয়ে দিয়ে এসো। আদেশটা যে শ্যামলীকে এখান থেকে সরিয়ে দেবার ফন্দি বুঝিনি প্রথমটায়। শ্যামলী চলে যেতেই ইশিতা চাপা গলায় ক্ষেপে উঠে- সারাদিন পাগলটার সাথে কী বকবক করো খালা? পুরো মেন্টাল একটা। আমি সত্য মিথ্যে বিবেচনা করি না, ধমকে দেই ইশিতাকে- ছিঃ বড়দের এভাবে বলে না ইশিতা। মনে মনে প্রজন্মের কথা ভাবি, ওরা এমনই, আমাদের “কানাকে কানা বলিও না”, “খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না” জাতীয় মূল্যবোধ থোরাই কেয়ার করে। নির্দ্ধিধায় কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলে যায়। কী বললো শ্যামলীর কথা? পাগল?? কেনো বলল??? ভাবনার গভীরে তলিয়ে যাবার আগেই শ্যামলী আসে, টুকটাক হাতের কাজগুলো সারতে সারতে বলে-ইশিতা তোমাকে বলেছে আমি পাগল না? একটু হকচকিয়ে যাই, ও কি শুনে ফেললো? আমার মনের অনুচ্চারিত ভাষা যেনো যাদুমন্ত্রে পাঠ করে ফেলে ও- না আপা শুনি নাই, ওরা সবসময় তাই বলে। আমি জানি। কাজ থামিয়ে শ্যামলী সাক্ষী করে আমাকে- বলোতো আপা, কদিন যে আমাকে দেখছো পাগল মনে হয়েছে তোমার? কী বলবো ভেবে পাইনা। আসলে তো এ কয়দিনে ওর কোন পাগলামি আচরণ চোখে পড়েনি আমার ইশিতা তবে এমন করে বললো কেন? কেমন যেন অপরাধী লাগে নিজেকেই, অর্থনৈতিক অবস্থান বুঝি দরিদ্রকে যা ইচ্ছে বলার সার্টিফিকেট দেয়, তা সে যতোই আত্মীয় হোক।
(৫)
আমি বিধাতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ পৃথিবীতে যা সবচেয়ে তুচ্ছ তাই সবচেয়ে কঠিন কেন? কেন আমি এক মুহুর্তের জন্য অন্দরমহলের চৌকাঠ পেরোতে পারি না, কত তুচ্ছ আমার এই প্রতিদিনের জীবন যাত্রা, এর বাধা অভ্যেস........ ঘড়িতে চারটা বাজে। পাঁচটায় রিহার্সেল। বেরোবার আগে স্ক্রিপ্টটা ঝালাই করি বারবার। ডোর বেলটা বেজে উঠে ঠিক তখন। দরজা খুলে চমকে যাই, ও মা তপন! কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমুতে চুমুতে বিপর্যস্ত করে দেয় আমার পরিপাটি সাজ-পোশাক। আত্ম সমর্পন করতে করতেও সামলে নেই নিজেকে, ঘরে শ্যামলী রয়েছে, ইশিতাও। তুমি হঠাৎ অসময়ে- আমার মাঝে উদ্বেগ কাজ করে কিছুটা। সোফার কুশন কোলে নিয়ে বসতে বসতে মুচকি হাসে তপন- খালি বাসায় সুযোগ নিতে এলাম। আন্দাজ করি হয়তো তাই। ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে, কথা বাড়াবার সুযোগ নেই আমার, বলি- যাও দুষ্টুমী করোনা, এখনই বেরুবো, চলো পৌঁছে দেবে আমাকে। আমার কথায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না তপন, উল্টো আদেশের সুরে বলে- আজ রিহার্সেলে যাবে না। মানে- আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়-এখনো ঘরের বউ হইনি, তাতেই এই! গলার স্বরটা কেমন স্বতস্ফূর্ত কড়া হয়ে উঠে- না, যেতে হবে। তিন দিন পর শো। কন্ঠ নরম করে তপন, বুঝি এবার আবেগে দুর্বল করার প্রয়াস তার- এতো দূর থেকে এতো কষ্ট করে এলাম। -একটা ফোন দিয়ে আসতে পারতে। যেনো এইটুকু অজুহাতের সুযোগেই ছিলো তপন। সুযোগ টুযোগ নেয়া নয়, আমাকে দু কথা শুনিয়ে একেবারে ঘায়েল করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই আসা ওর। ও, তোমার কাছে আসতে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে আসতে হবে- তপনের ক্রুব্ধ চেহারাটা অচেনা লাগে আমার, প্রেমময় অভিমানী চেহারার সাথে একদমই মিলে না। ক্রুব্ধ বর্তমানের এ চেহারাটার কোথাও প্রেম খুঁজে পাই না আমি। আমাদের কথার পিঠে কথা তর্কে চলে যেতে থাকে ঘড়ির কাঁটা উপেক্ষা করে। তর্কে তর্কে দূরত্বটাও স্পষ্ট হয়ে যেতে থাকে ক্রমশ, যে দূরত্বটা আমি প্রথম টের পেয়েছিলাম এ বছর তপনের জন্মদিনে। জন্মদিনে তপন বন্ধুদের ডেকেছিলো বসুন্ধরার ফুড কোর্টে। রিহার্সেলের কারণে সবাইকে ফেলে উঠে চলে এসেছিলাম আমি। আমার এই চলে আসাটা মানতে পারেনি ও। মঞ্চের জন্য আমার ভালোবাসা ত্যাগ দুর্বলতা দায়বদ্ধতা সব জেনেও বন্ধুদের দোহাই দিয়ে বারবার আঘাত করে যাচ্ছে আমাকে এর পর থেকে। বন্ধুদের কাছে ও ভীষণ ছোট হয়ে গেছে। বন্ধুরা ঠাট্টা করেছে-তোর থেকে নাটক বড়, দেখ ওখানে কোনো নাগর আছে বোধ হয়। অশালীন শব্দটা বলতে একটুও বাধেনি তপনের। বন্ধুরা না জানুক, ও ঠিক জানে কী পবিত্র আমাদের ভালোবাসার মঞ্চ। সব জেনেও ও কথাগুলো বলে আমাকে আঘাতে আহত করার জন্য, তপনের এটুকু মনস্তত্ব আমার না বুঝার কথা নয়। তপন চায় আহত আমি সব ছেড়েছুড়ে আত্মসমর্পন করি ওর কাছে। ওর ভালোবাসায় কাছে। হ্যাঁ ভালোই যদি বাসে আমাকে, তবে তো আমার সবটুকু নিয়েই ভালোবাসবে সে। ভালোবাসার জন্য আমার সব ভালোলাগা ত্যাগ করে দিলে আমি কী আর আমি থাকি? একটা রক্তমাংসের পিন্ড ছাড়া? চা আর নিমকি ভাজার প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকে শ্যামলী। আমরা চুপ করে যাই। চায়ের কাপ উপেক্ষা করে, মুখে কালবোশেখীর ঈশান কোণের মেঘ নিয়ে উঠে পড়ে তপন। ওকে আর কক্ষনো ডাকবো না, সিদ্ধান্তে স্থিত হয়ে আমিও মাথা থেকে সব ঝেরেঝুরে রিহার্সেলে যাবার জন্য ব্যাগটা হাতে নেই। দরজার ছিটকিনিটা লাগাতে লাগাতে শ্যামলী বলে- বিয়ে করো আপা, বিয়ে করো। বরের মতো কেউ এতো আপন না, কেউ এতো আদরও করবো না।

(৬)
“তোমাদের কানাগলিকে আমি আর ভয় করি না। আমার সামনে আজ নীল সমুদ্র...........” আলো নিভে গেলে, দর্শকদের মুর্হুমুর্হু করতালিতে মঞ্চ ছেড়ে নীচে আসি। ইশিতাকে নিয়ে নাটক দেখতে এসেছে আজ কলি আপা। সে বার ফেরার পর আর দেখা নেই ওদের সাথে। কস্টিউম ছেড়ে অরুনদার কাছে ছুটি চেয়ে ওদের নিয়ে বসি ক্যান্টিনে। -কি রে কেমন হলো তোর পরীক্ষা? আমার প্রশ্নের উত্তরে হাতের ট্যাব থেকে চোখ তুলে না ইশিতা- খুব ভালো খালামনি। কলি আপা উচ্ছ্বাসিত- আসলে কী দুর্দান্ত পারফরমেন্স রে তোর! নাটক করিস বলে বিরক্ত হই ঠিক, কিন্তু বল মঞ্চে তোকে দেখে গর্বে বুকটা ভরে যায়, কটা মেয়ের এমন প্রতিভা আছে রে? অতি প্রশংসায় বিব্রত লাগে সামনা সামনি। এ কথায় ও কথায় শ্যামলীকে মনে পড়ে। রিহার্সেল, শো, কাস, আড্ডা.......... ওকে তো ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়। মনেই পরে নি আর। আর বিশেষ করে মনে পড়ারই বা কী আছে। কী এমন নতুনত্ব ওর জীবনে? বৈধব্য তো সমাজের প্রাচীনতম ট্রাজেডী। কটা দিন একসাথে ছিলাম, সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে, হৃদয়ের অতলে কোথায় একটুখানি সমবেদনা মৃদু ঢেউ তুলে বর্ষা পেরিয়ে আসা শুকিয়ে যেতে থাকা নদীর মতো, বলি- আপা তোমার ননদটাতো দেখতে বেশ সুন্দরী। ওকে আবার বিয়ে দাও না কেনো? কলি আপা কফির কাপটা মুখ থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখতে রাখতে বিস্ময়ের দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয় আমার দিকে- কার কথা বলছিস? শ্যামলী? হ্যাঁ, তোমার একটা ননদকেই তো আমি চিনি-আমার জবাবে হেসে ফেলে কলি আপা। ও আচ্ছা এ গল্প সে তোকেও দিয়েছে? ওর তো বিয়েই হয়নি কখনো! আবার দেবো কী? কলি আপা হাসতে থাকে, অভ্যাসের হাসি। আমার বিস্ময় ছুটে যায় বাধভাঙা বন্যার মতো কয়েকদিন কাটানো গল্প, স্মৃতি, বেদনা সব উপচে ভাসিয়ে নিয়ে। মানে, আসগর নামে একটা লোকে প্রেমে পড়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিল শ্যামলী। লোকটি পালিয়ে যাবার পর, হাসপাতালে বাচ্চা খালাস করে এসে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে পড়েছিলো। হেমায়েতপুরে রাখতে হয়েছে বছর তিনেক। এখনো মাঝে মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলে, এই পাগলকে কে বিয়ে করবে বল!! বিস্ময়ের অতল স্রোতে ডুবে যাওয়া স্তব্ধ নির্বাক আমাকে কলি আপা ধাক্কা দেয়- কী রে কী হলো? আমি জানি না। সত্যি আমি জানি না আমার কী হলো।