দুসরা

অদ্বয় চৌধুরী

দু ধারের উঁচু পাঁচিলঘেরা লম্বা গলিটা পড়ে আছে চেরা বুক নিয়ে লাশকাটা ঘরে চিতিয়ে পড়ে থাকা লাশের মতো। প্রাণহীন। কালো। চেরা বুকের দু ধারে বেখেয়ালে আটকানো বড় বড় ফালা সেলাইয়ের মতো কয়েকটা ল্যাম্পপোষ্ট। কোনোদিন জ্বলে না। ভাঙা কাচের খাপের ভিতর থেকে বাল্বগুলো হাওয়া। দুটো কি তিনটে পাউরুটি হয়ে কারুর জ্বলন্ত পেটে সেঁধিয়েছে। এই গলিটা সোজা গিয়ে পড়েছে কয়েকটা লাশঘরের মধ্যে যেখানে খানকতক জ্যান্ত মানুষ লাশ হয়ে জড়াজড়ি করে রাতটুকু কাটিয়ে দেয় আর দিনের বেলা লাশ খাওয়া ডেও পিঁপড়ের মতো গলি বেয়ে উঁকি মারে সামনের চওড়া রাস্তাটায়। তারপর ছড়িয়ে যায় শহরে— সাতের দশকের নকশাল কলকাতায়। গলিটা মুখ বাড়িয়ে উঁকি মারে যে চওড়া রাস্তাটায় সেখানকার ঠাণ্ডা জীবন্ত বাবু মানুষেরা নজর দেয় না এই গলির ভিতরের লাশঘরগুলোর দিকে। নজর দিতে নেই তাদের।

সেদিন, মাঝরাত পেরিয়ে গেলে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। জেগে ছিল শুধু নকশাল বিপ্লবীগুলো এবং খানকতক পুলিস আর কুকুর। ভোরের দিকে, গলিটার মধ্যে জেগে উঠেছিল একজোড়া বুটের আওয়াজ। তারপর অন্ধকার গলিটায় ঢুকেই প্রথম কাচ-ভাঙা ল্যাম্পপোষ্টের নীচে একটা দেশলাই জ্বলে উঠেছিল। দেশলাই নিভে গেলে সিগারেটের লালচে আলোটা অন্ধকারে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করেছিল খানিকক্ষণ। তারপর এগিয়ে গিয়েছিল গলি ধরে ভিতর দিকে। লাশঘরগুলোর আশেপাশে ছাই ফেলেছিল সিগারেটের। তারপর, সিগারেটের সেই লালচে আলোর পিছনে, এক জোরালো লালচে-হলুদ আলো, আরও জোরালো শব্দ সমেত, ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল। সিগারেটটা ছিটকে পড়ে গেছিল রাস্তার ধারে। আর লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে গেছিল রাস্তার মাঝখানে। আর ওঠে নি।

সামনের চওড়া রাস্তাটার পালিশ করা জুতো পড়া মানুষগুলো সেদিন প্রথম ওই গলিটায় ঢুকেছিল। বিরক্তি আর ঘৃণাভরে তাকিয়ে দেখেছিল সেই লাশ যেটা পড়ে ছিল ওই কালো গলিটায়। গলিটাই তার সমস্ত পরিচয় বলে দিচ্ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে অনেক আলোচনাও করেছিল তারা। ওই লাশটা নিশ্চয় নকশাল ছিল। চীনের দালাল। পুলিস মেরে দিয়েছে। ওইসব নোংরা ঘরের লোকেরা এছাড়া আর কি হবে? সমাজের কীট! ওদের পরিণতিও এটাই হওয়া উচিৎ। ভালো হয়েছে। সমাজ বাঁচল। দেশ উদ্ধার হল। আমরা নিশ্চিন্ত হলাম।

সেই দিন রাতে সিগারেটের লাল আলোটা আর জ্বলেনি। কোনো আলোই জ্বলেনি। তবে অন্ধকারে জেগে উঠেছিল লাশঘরগুলো। পরদিন সকালে উঁচু পাঁচিলের দেওয়ালে লাল কালিতে লেখা পোস্টার দেখেছিল সবাইঃ “খোচড়ের সাজা মৃত্যু। সরকারের দালাল আর পুলিসের পা চাটা কুকুরদের নিস্তার নেই। খোচড়ের মতোই সবাই মরবে।” বুট পড়া বাবুরা পরের দিন আবার কালো গলিটায় ঢুকে সেই পোস্টারটা পড়েছিল। কিন্তু সেদিন আর তাদের সিগারেট খাওয়া হয়না। আগুন জ্বালাতে তারা ভয় পেয়েছিল।