শান্তু সাহা স্টাম্প আউট

সরোজ দরবার

‘স্টাম্প ছেড়ে খেলছেন দাদা, যে কেউ আউট করে দিয়ে বেরিয়ে যাবে যে,’ চোখ পিটপিট করে কথাগুলো বলছিল কানু। আর শুনে শান্তু সাহার সে কি অট্টহাসি! যেন এমন মজার কোথা জীবনে শোনেননি। বললেন, কী বললি বল, বল আর একবার, স্টাম্প আউট...হা হা হা। ছোট্ট পার্টি অফিস গমগম করছে তাঁর গলার আওয়াজে। আগে এ অফিস বড় ছিল। নতুন দল ক্ষমতায় এসেই প্রথমে সেটা ভেঙে দিয়েছিল। কোমর ভাঙা হয়ে অনেকদিন থেবড়ে পড়েই ছিল অফিসটা। তারপর সারিয়ে সুরিয়ে ছোটখাটো এই আকারটা নিয়েছে। সেই জৌলুস আর নেই। ছেলেপুলেও তেমন কেউ আসে না। সব তো গত কয়েক বছরে নতুন দলে নাম লিখিয়েছে। শুধু শান্তু সাহাই এখনও পুরনো চাল ভাতে বাড়ার আশা নিয়ে বসে আছেন। এদিকে সামনেই ভোট। ইতিহাস ধুয়ে তো আর জল খাওয়া যাবে না। কিছু একটা করতে হবে। কানু তাই এসেছিল। বরাবর সে দালালি গোছের একরকমের মাল্টিপার্টিসেবা করে এসেছে। মানে এ পার্টির হয়ে অন্য পার্টির দেওয়াল মুছে দিয়েছে রাতবিরেতে। এর কুৎসা গেয়ে লিফলেট ছাপিয়ে এনেছে ওর চোখ এড়িয়ে। তারপর সে সব ঢুকিয়ে দিয়েছে খবরের কাগজের ভিতরে। সকাল সকাল তা চালান হয়ে গিয়েছে ঘরে ঘরে। পার্টির ছেলেরা যে কাজ চোখে পড়ার ভয়ে করতে চায় না, দালাল কানু তাই করে দেয়। দুই পার্টিই জানে সে হারামি, খিস্তি দেয়, আবার কাজও দেয়।
তো এই কানু শান্তু সাহাকে বলতে এসেছিল, এখন বাজার তো খুব খারাপ। জোট-ফোট করে টিভিতে নেতারা যতই ফুটেজ খাক, তাদের মফস্বলে ওসব প্রভাব পড়বে না। নতুন দলের সংগঠন শক্তিশালী। ক্যাণ্ডিডেটও জোরালো। ডাউন করতে গেলে কিছু নোংরামো করতে হবে। শান্তু সাহা চোখের চশমাটা খুলে প্রশ্ন করেছিলেন, কী করবি? হাতের ব্যাগ থেকে গোটাকয়েক ছবি বের করে কানু দেখিয়েছিল। একটা লোক প্রায় জামাকাপড় না পরা স্বাস্থ্যবতী মেয়েকে নিয়ে ফস্টিনস্টি করছে। শহরের কোনও বারের ছবি। চেকনাই আলো। কোন ছবিতে লোকটার হাত মেয়েটার ঈষৎ থলথলে পেটের উপর। কোনওটায় বা আবার ঘাড়ে। একটা ছবিতে মেয়েটা ঝুঁকে পড়েছে, আর লোকটা হাতে টাকা নিয়ে মেয়েটার বুকের দিকে তাকিয়ে। এ ছবির সঙ্গে ভোটের কী সম্পর্ক শান্তু সাহা বুঝলেন না। কানু তাঁকে বুঝিয়ে দিল। প্রস্তাবটা এরকম, ওই ছবিতে ছেলেটার মুখের জায়গায় নতুন দলের ক্যাণ্ডিডেটের মুখ বসিয়ে দেওয়া হবে। শহরে একজনের সঙ্গে কানুর জানাশোনা আছে। সে কমপিউটারে এ কাজ করে দেবে। তারপর লিফলেটে এ ছবি ছাপিয়ে কাগজে কাগজে ঢুকিয়ে বিলি করে দিলেই হল। পাড়ায় ওসব জোট, দুর্নীতি, ঘুষ, কেলেংকারি দিয়ে কাজ হয় না। কিন্তু যদি পাব্লিক দেখে প্রার্থী একজন বারের মহিলার সঙ্গে লটঘট করছে, টাকা ওড়াচ্ছে, তাহলে কাজ হবে। হাজার হলেও পাড়ার ছেলের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আর তার বাক্সে ভোট পড়বে না।
প্রস্তাব দিয়ে আত্মতৃপ্তিতে গোল গোল চোখে করে তাকিয়ে ছিল কানু। এ পার্টি থেকে বড় দাঁও মারার আশা ছিল তার। কিন্তু শিকে ছিঁড়ল না। শান্তু সাহা রিজেক্ট করে দিলেন। তাঁর সাফ কথা, লড়াই হলে হবে রাজনৈতিক ভাবে। ফাউলের মধ্যে তিনি নেই। তখনই চোখ পিটপিট করে কানু বলেছিল, ‘স্টাম্প ছেড়ে খেলছেন দাদা...।’ আর শুনে তো শান্তু সাহা হেসে খুন। বলেন, বলিস কী করে, দুধুভাতুদের মতো ক্রিকেট খেলব। ও তো আমার নাতি খেলে রে...। খেলা বলতে ফুটবল। সেখানে ফাউল চলে না।
বস্তুত শান্তু সাহা ক্রিকেটকে খেলা বলে গণ্যই করেন না। সেই কোন হাফপ্যান্ট পরা বেলা থেকে শশ্মানের মাঠে ফুটবল খেলে এসেছেন। এক শটে মাঠ পের করার কেরামতিতেই বোঝা যেত, কে কতখানি বড় হচ্ছে। সেই মাঠে-ঘামে, ধুলোয়, পায়ে চোট খেয়ে, চুন হলুদের গন্ধ মেখে বড় হয়ে ওঠা নিজের রাজনৈতিক জীবনেও অটুট রেখেছেন শান্তু সাহা। পার্টি যখন ফেরেব্বাজদের খপ্পরে পড়ে ভাঙতে শুরু করল, তখন কত বুঝিয়েছেন, ওরে ফাউল করে ম্যাচ জেতা যায় না।ঘাম ঝরাতে হয়। কিন্তু কে শোনে কার কোথা। সবাই ক্রিকেট খেলার মতো বাবু হয়ে থাকবে। কেউ পিছনে মাটি লাগাবে না। নতুন দল আসার পরও, ছেলেদের বুঝিয়ে বলেছিলেন, ওরে ইতিহাস মানে তেত্রিস বা চৌত্রিস বছর নয়। ইতিহাস মানে কয়েকশো বছর ধরে কত মানুষের লড়াই, কত ঘাম, কত কালো মানুষের পিঠে চাবুকের কালসিটে দাগ- সে সব ভাব। বলা বাহুল্য, কেউ ভাবেনি।
তাই বলে তিনি তো না ভেবে পারেন না। তাই আজও তিনি ফাউল খেলেন না। তাই বলে কি তাঁর পার্টিতে নোংরামি হয় না! হয়েছে, হচ্ছে, হয়ে চলেছে। কিন্তু শান্তু সাহা জানেন, ওভাবে কিছু হয় না। আগে বলতেন, কেউ শুনতেন না, তারপর তো পার্টি হুমড়ি খেয়ে পড়ল। এখন ঘটা করে গঙ্গাজল ছড়িয়ে শুদ্ধিকরণ চলছে। যাকগে এ সব আর ভেবে কী লাভ! হাসি থামিয়ে কানুকে ডাকলেন তিনি। সে ব্যাটা ততোক্ষণ মোবাইলে খুটখুট করছিল। শান্তু সাহা গলা ছেড়ে ডাকলেন, কই রে এদিকে আয়। মোবাইলটা টেবিলের উপর রেখে হাতব্যাগটা নিয়ে শান্তুর দিকে এগিয়ে গেল সে। শান্তু বললেন, নে নে এবার খোল। কানুর হাতব্যাগের দিকে আঙুল দেখালেন তিনি। চেনের ফাঁক থেকে ছবিগুলো উঁকি মারছিল। সেগুলোকে দেখিয়ে শান্তু বললেন, ওই যেগুলো উঁকি দিচ্ছে, ওগুলো আমার চাই যে রে। শান্তু জানেন, একবার নিয়ে নিলে আর দ্বিতীয়বার ছাপানোর খরচ করবে না কানু। কিন্তু সফট কপিতে যে সবকিছু থেকে যায়, জানেন না শান্তু সাহা। কানু আমতা আমতা করে বলল, এগুলো দিয়ে আপনার কী হবে? শান্তু শান্তস্বরে বললেন, দে না। তারপর ফের হেসে বললেন, এসব আমি বুকে বাঁধিয়ে রেখে দেব, বুইলি...।
কানু ছবিগুলো বের করে দিল। তারপর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে।
২)
বেরনোর মুখে নন্তু সাহার সঙ্গে দেখা হল কানুর। শান্তুর ছেলে, কিন্তু তিলেঢ্যামনা মাল। পার্টিটাকে এরাই লাটে তুলেছে। এবার ভোটে দাঁড়িয়েওছে। নতুন দলকে লেঙ্গি দিতে এই প্ল্যানটা ওরই ছিল। নিজের মুখে বাপকে বলতে পারছিল না, তাই কানুই ভরসা। ফিসফিসিয়ে নন্তু জানতে চাইল, কাজ হল? দু’দিকে ঘাড় নাড়ল কানু। বলল, ছবিগুলো চেয়ে নিজের কাছে রেখে দিলেন। দাঁত কিড়মিড় করে উঠল নন্তু। সে জানে, বাপই এখনও এ তল্লাটে তার পার্টির হয়ে শেষ কথা বলবে। মনে মনে সে বলল, শালা উপর-নীচে এই বুড়োগুলোর জন্য জিনা হারাম হয়ে গেল। কিন্তু চোখ না বোজা অবধি পদ ছাড়বে না। এরপর হয়ত শুয়োরের বাচ্চাই বলত, কিন্তু কোনওক্রমে সামলে নিয়ে পিতামহকে এ যাত্রা ছাড় দিল নন্তু।
কানু এবারও একটা কথা না বলে নিজের রাস্তা ধরল।
৩)
মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের একটা অডিও রেকর্ডিং। কিন্তু তাতেই গোটা তল্লাটে ঢি ঢি পড়ে গিয়েছে। অমন শ্রদ্ধার মানুষটার কিনা শেষে এমন অধঃপতন। একটা হাঁটুর বয়সী মেয়ের সঙ্গে...ছি ছি। ছেলেদের মোবাইল থেকে নিয়ে বুড়োরা শুনছে আর ঘেন্নায় মুখ কুঁচকোচ্ছে। রেকর্ডিংটা শুরু হচ্ছে একটা দিলদার আমুদে হাসির আওয়াজ দিয়ে। তারপর কথোপকথন এরকম-
পুরুষ-কই রে এদিকে আয়?
অল্পবয়সী মহিলা কন্ঠস্বরে ভয়ে ভয়ে উত্তর এল, না প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দিন। প্লিজজ
পু- নে নে এবার খোল।
না- প্লিজ এমন ক্ষতি করবেন না। ছেড়ে দিন।
পু-ওই যেগুলো উঁকি দিচ্ছে, ওগুলো আমার চাই যে রে।
ভয় পেয়ে এখন প্রায় আর্তনাদ করছে মেয়েটি।
পু- দে দে এসব আমি বুকে বাঁধিয়ে রেখে দেব...বুইলি।
পুরুষ গলা নিঃসন্দেহে শান্তু সাহার। মেয়েটিকে কেউ চিনতে পারছে না। নিশ্চয়ই শান্তু কোনও খারাপ পাড়ায় গিয়েছিল। অথবা কারও মেয়েকে ধরে সর্বনাশ করেছে। নতুন দলের ছেলেরা তক্কে তক্কে পেয়ে রেকর্ড করে নিয়েছে। এখন একেবারে পর্দাফাঁস। বুড়োর হাঁড়ি হাটে ভাঙল।
মফস্বলে আর কিছু না হোক, স্মার্টফোন আছে বহাল তবিয়তে। সব ফোনে ইন্টারনেট আছে। নিমেষের মধ্যে কেলেংকারি ছড়িয়ে পড়ল ঘরে, ঘরে। এমনকী নন্তু সাহার মোবাইলেও কে যেন পাঠিয়ে দিল।
৪)
পার্টি অফিসে আসতে না আসতেই শান্তু দেখলেন, যে কটা ছেলে এখনও আসে, সব জড়ো হয়ে আছে। ব্যাপার কী! হঠাৎ এত নিষ্ঠা! একটু পরেই সব খোলসা হল। একজন তাঁকে রেকর্ডিংটা শোনাতেই বুঝে গেলেন কী হয়েছে। কাগজে কাগজে কুৎসা বা ছবি ছাপা, হাতে লেখা চিরকুট ছড়িয়ে যাওয়া থেকে ব্যাপারটাকে কোন জায়গায় নিয়ে গিয়েছে হারাওমাজাদারা। নিজের এই চরম অসম্মানের দিনেও হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি। এভাবে কি পোক্ত খেলোয়াড়কে ফেলা যায়? এ তো ল্যাং মারা রে ভাই, তাতে কি আর গোল আটকানো যায়? গোল তো হয় স্কিলে। বরং বেমক্কা ফাউল করলেই লাল কার্ড। একজন ছেলে উত্তেজিত হয়ে বলছে, ডক্টরড অডিও। নন্তুদা তো বলল, কানুই এসব রেকর্ড করেছে। নাহলে এমন বদবুদ্ধি আর কার হবে। শান্তু সাহা খেয়েল করে দেখলেন, হ্যাঁ ঠিকই তার বলা কথাগুলো কানুকেই বলেছিলেন বটা। উত্তরে কানুর বদলে মেয়েটার গলা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল নন্তুর কথা। মাথাগরম ছেলেটা কানুকে পেলে তো আস্ত রাখবে না। ছেলেদের জিজ্ঞেস
করতে তারা বলল, নন্তু বেরিয়েছে কানু দালালকে খুঁজতেই।
৫)
কানু আক্ষরিকই দালাল। এ পার্টিতে ছিপ ফেলে যে কিছু হবে না সে ভালই বুঝতে পেরেছিল। বুড়োর কথাগুলো এমনিই রেকর্ড করে নিয়েছিল। ভেবেছিল, নন্তুকে শুনিয়ে বাপ-ছেলেয় ঝগড়া বাধাবে। কিন্তু কথাগুলো শুনেই দেখেছিল, দিব্যি ঘুষ দেওয়ার মতো শোনাচ্ছে। সে সোজা হাজির হয়েছিল নতুন পার্টির দোতালা অফিসে। নতুন দাদাকে সব খুলে বলল। নতুন দাদা তো তাকে প্রায় রাজভোগ খাওয়ায় আর কী! বলল, রেকর্ডিংটা থাক, বাকিটা যা করার আমি করে নিচ্ছি। কানু টাকা বুঝে নিয়ে ফিরে গিয়েছে। ঘুষ যে মেয়েবাজি হয়ে গিয়েছে সে ঘুণাক্ষরেও জানে না। নতুন দল আরও একটু খরচ করে, একটা মেয়েকে দিয়ে কথাগুলো রেকর্ড করে যে জিনিসটি বানিয়ে বাজারে ছেড়েছে, কানু তা জানলে অবাকই হত। কিন্তু তা বোধহয় আর তা শোনা হবে না। কেননা তার আগেই নন্তু আর তার দলবল চড়াও হবে তার উপর।
৬)
এক কর্মীর বাইকের পিছনে বসে শান্তু সাহা চলেছেন কানুর বাড়ির দিকে। গাঁক গাঁক করে বাইক চলছে, তবু তাঁর মনে হচ্ছে যেন অনন্ত সময় লাগছে। বোধহয় এতক্ষণে কানুর ধড়টা নামিয়ে দিয়েছে নন্তুর খুনেরা। ছেলেকে তিনি ভালই চেনেন। এই খুনেদের হাতে পার্টি গিয়েছে। কানুর যেতে কতক্ষণ! আহা বেচারি কানু। পার্টির কত কাজ এককালে করেছে। চুপিচুপি। তাঁদের দলের মাথারাই কানুকে দিয়ে কত নোংরামি করিয়েছে! শান্তু জানেন, কানু তাঁকে ফাঁসাতে যত না চেয়েছে, তার থেকেও বেশি চেয়েছে টাকা। সে তো কত রাঘব-বোয়াল এর জোরে এদিক ওদিক হয়ে গেল।
যে করে হোক তাকে বাঁচাতেই হবে। আর কানু বাঁচলে তবে তিনি দুনিয়াকে বোঝাতে পারবেন, তিনি নির্দোষ। নয়ত পুরো ফায়দাটাই নতুন দলের। কিন্তু মাথামোটা ছেলেটা কী তা বুঝবে!
কর্মীটিকে তিনি তাড়া দিলেন, তাড়াতাড়ি চল রে বাপু...
শান্তু সাহা যে কলঙ্কমোচনের একমাত্র রাস্তায় চলেছেন, কর্মীটি তা বুঝল না। সে স্বাভাবিক ভাবেই বাইক চালাতে লাগল। আর প্রতি পলে শান্তু সাহার মনে হল, তিনি যেন কিছুতেই সময়ে পৌঁছতে পারবেন তো? তার আগেই ওদিকে যা হওয়ার হয়ে যাবে না তো!
শান্তু সাহার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওই যে ক্রিকেটে না পৌঁছতে পারলে কী যেন একটা হয়...আউট। কী আউট যেন...মনে করতে পারেন না তিনি। আর সেই ভরদুপুরে, বাইকের আওয়াজের মধ্যেই কে যেন তাঁর কানের কাছে বলে উঠল,‘ স্টাম্প ছেড়ে খেলছেন দাদা, যে কেউ আউট করে দিয়ে বেরিয়ে যাবে যে’।
চমকে ওঠেন শান্তু সাহা। ক্রিকেটকে তিনি খেলার মধ্যেই ধরেন না। আর সেই খেলার মতোই কিনা শেষমেশ, তিনিও...