আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে/run out

বৃতি হক

-আচ্ছা তন্ময়, তোমার কি কখনো মনে হয়েছে, যে এ সময় তোমার অন্য কোথাও থাকার কথা ছিল? অন্য কারো সাথে?

কল্লোল রিসোর্টের দোতলার ব্যালকনিতে আর্দ্র বাতাস এসে তাদের চোখেমুখে ঝাপটা মারে। সামনের উইকার তেপয়ে এইমাত্র বানিয়ে আনা দু'কাপ গরম দার্জিলিংচা দ্রুত বাষ্প ওড়াচ্ছে। নীপা চেয়ারে পা তুলে বসে আছে, ধূসর ব্ল্যাঙ্কেটটা গায়ে জড়িয়ে, মাথা হেলিয়ে কান পেতে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনছে, মার্ক ডয়চের বাজানটারের বিষাদছোঁয়া সুরের লহরের সাথে এতো মিল রাতের জলতরঙ্গের ! রাত তিনটে প্রায়। প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ আজকের মত তার যাত্রা অনেকটাই শেষ করে এনেছে। একটা চুমুক দিয়ে কাপটা তেপয়ে নামিয়ে রাখে তন্ময়-- এই পৃথিবীতে সব মানুষ, সব বস্তুর একটি করে নিজস্ব যুদ্ধ আছে। সমুদ্রের ঢেউ, চাঁদ, চা, নীপা, তন্ময়-- কেউ এর বাইরে নয়। স্ব স্ব কাজ ঠিকভাবে ঠিক সময়ে পালন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে সবাই, সবকিছু। তারপরও যেমন, সুনন্দ এই সিরামিক কাপটি তার ভেতরের তরলটুকুতে সর্বোচ্চ চেষ্টাতেও তন্ময়ের চাহিদামাফিক উষ্ণতা বজায় রাখতে পারল না।

নীপার অনুচ্চস্বর, জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে কাপের চা'র মতই একধরণের শীতলতা অনুভব করে তন্ময়। অনেকদিন কোন প্রশ্ন করে না তাকে নীপা। গত এক বছরে চারপাশের দৃশ্যপট খুব দ্রুত বদলালো যেন। সৌম্য বদলে যাচ্ছে, তার মগজের এককোণে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে এক অবাঞ্ছিত কর্কটীয় আকৃতি, কিছুতেই একে সামলানো যাচ্ছে না। নীপাও বদলাচ্ছে দ্রুত, উচ্ছল হাসিটুকু উবে গেছে তার-- সেই হাসিতে গালে টোল পড়ত, আর ঝিকমিকে চোখের সাথে সারা পৃথিবী হেসে উঠতো। বদলে গেছে তন্ময়ের সমগ্র পৃথিবীও। সমুর অসুখের পর থেকে সুখগুলো অকস্মাৎ গুটিয়ে গেছে চারপাশ থেকে। চোরাবালিতে আটকে পড়া দমবন্ধ প্রাণীর মত লাগে নিজেকে তন্ময়ের, শ্বাস নিতে কষ্টও হচ্ছিল একসময়। অফিসের বস কাম বড়ভাই রঞ্জন নিজের তাগিদেই ছুটির বন্দোবস্ত করে টিকেট কেটে দিলেন, দু'দিন হলো তারা রাতের বাসে করে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে এসেছে। সৌম্যের নাজুক এই অবস্থায় নীপা ঢাকা ছাড়তে চায়নি মোটেও, বেশ জোরাজুরি করে নীপাকে রাজি করাতে হয়েছে।

রুমে গিয়ে একবার সমুকে দেখে আসে তন্ময়। ছেলেটা ঘুমাচ্ছে এখন, কিছুক্ষণ আগে বিছানায় এপাশ ওপাশ গড়িয়ে চীৎকার করে কাঁদছিলো। সমুর গালের শুকনো অশ্রুর দাগ এক অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে দেয় তন্ময়ের ভেতর। বড্ড তাড়াতাড়ি তোর যুদ্ধটা শুরু করলি রে, সমু, মাত্র চার বছর বয়সেই নরক দেখে ফেললি যে! শরীর যখন ভালো থাকে, সমুর নিষ্পাপ দেবশিশুর মত মুখাবয়ব, কথা, হাসি তন্ময়ের ভেতরের কোথাও হিম করে দেয়,অবশ করে দেয়। কোনভাবেই সে সাহায্য করতে পারছে না, গলা জড়িয়ে কোলে বসে থাকা এই অবোধ শিশুকে সে আশ্রয় দিতে পারছে না। তন্ময় এক ব্যর্থ বাবার নাম। সমুর মত তন্ময়ও তার মাথাটা দুইহাতে চেপে ধরে, কেউ জানে না-- এক দুরন্ত মৌমাছি আটকে আছে সেখানে, একটানা গুঞ্জন তুলে মাথা ঠুকছে মগজের দেয়ালে দেয়ালে, প্রতি মুহুর্তে ডানা ঝাপটাচ্ছে। নীপা হাসতে ভুলে গেছে। তন্ময় এক ব্যর্থ স্বামীও। নইলে নীপা আজ তাকে এই প্রশ্ন কিভাবে করে?

আনমনে আইফোনে মেসেজ চেক করে তন্ময়। রঞ্জনভাই জানতে চেয়েছেন সবকিছু ঠিকভাবে চলছে কিনা। পাঁচদিনের ছুটি যেন উপভোগ করে তারা, কোন অসুবিধে হলে তৎক্ষণাৎ জানাতে বলেছেন। রঞ্জনভাই কিছুটা ছেলেমানুষও। ফেসবুকের প্রোফাইলের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে লিখে রেখেছেন, ইট'স কমপ্লিকেটেড। একজন পেশাদার কর্পোরেট পার্সোনেল এইকথা নিজের সম্পর্কে লিখে রাখবে, ভাবেনি তন্ময়। আগ বাড়িয়ে কৌতূহল দেখানো তন্ময়ের স্বভাব নয়, বরাবরই শ্রোতাশ্রেণীর মানুষ সে। রঞ্জনভাই যতটুকু বলেন, তাই চুপচাপ শোনে সে। কান্তা ভাবীর কথা উঠতে রঞ্জনভাইয়ের ফর্সা মুখটা লাল টকটকে হয়ে উঠেছিল একদিন। কোন কারণ ছাড়াই টেবিলে ঘুষি মেরে মেরে কথা বলেছিলেন। নোট নেয়ার অবসরে রঞ্জন ভাইয়ের ফুলে ফুলে ওঠা নাকের পাতা, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত, মুখে জেগে ওঠা কিছু বিন্দু বিন্দু ঘাম একবার নির্বিকার চোখে তাকিয়ে দেখে নেয় তন্ময় । কাউকে উপদেশ বা পরামর্শ দেয়া তার স্বভাব নয়, কর্মও নয়। নইলে অন্যদের মত এসময় অনেক কথা বলতে পারতো সে রঞ্জন ভাইকে। উপদেশ আর পরামর্শ কোন কাজে লাগে না-- বছরখানেক ধরে যাবতীয় উপদেশ আর পরামর্শ মনে আর মেনে নিয়েও সমুর স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে। গুলশানের ত্রিশতলা উঁচু টাওয়ারের অফিসের শীতল হাওয়ায় ততোধিক শীতল অভিব্যক্তি, অথবা ঘরে ফেরার সময় রাস্তায় থকথকে মানুষের ভিড়ে ঘামে ভেজা মুখগুলো আজকাল আনমনে দেখে সে, তারপর নিশ্চিত হয়, কোন না কোনভাবে সব মানুষ একরকম। হারুপার্টি। We all are losers-- somehow, in some ways.

দুপুরের খাবারশেষে রুম থেকে অনেক বলে কয়ে নীপাকে বের করতে হলো। অনেক কিছুতে আগ্রহ হারিয়েছে নীপা। দোতলা থেকে স্ট্রলারে সমুকে নিয়ে এলিভেটরে নামতে গিয়ে চারদিক বুড়ি ছুঁয়ে তাকায় তন্ময়। কল্লোল রিসোর্টটা বেশ রুচিশীলভাবে গোছানো। বিশাল টানা রিশেপসনের দেয়ালে বিখ্যাত পেইন্টিংসের কপি, পলিশ করা ডার্ক ব্রাউন কাঠের মেঝে, নান্দনিক ফ্লাওয়ারভেইসে তাজা ফুল। হেঁটে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে তারা। হোটেল ক্লার্ক মি. শিবলী তাকে গোঁয়ার টাইপ অভদ্রলোক ভেবেছে নিশ্চয়ই? ভাবুক। পাশের হানিমুন স্যুইটের উচ্ছল নবদম্পতি তাদেরকে অসুখী কাপল ভেবেছে কি? ব্যালকনিতে ছেলেটা আজ তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কায়দা করে চুমু দিচ্ছিলো খুব বউয়ের ঠোঁটে, গলায়। মৃদু হাসি ফোটে তন্ময়ের মুখে। অথবা যে ভিখারীকে সে আজ চুপচাপ দুটো পাঁচশো টাকার নোট দিলো, সে তন্ময়কে বোকা নাকি পাগল ভাবলো? তার চাউনি দেখে ঠিক ঠাহর করতে পারেনি অবশ্য। বিচে কিছু নুলিয়া কিশোর বালিয়াড়িতে কাঠি পুঁতে ক্রিকেট খেলছিল, তারা তন্ময়কে নিশ্চয়ই ছেলেমানুষ ভেবেছে? তাকে খেলতে নেবে কিনা বলাতে? যার যেরকম ইচ্ছে ভেবে নিক তন্ময়কে। থোড়াই কেয়ার করে সে।

সমু স্ট্রলারে বসে হাততালি দিচ্ছিল। বালিয়াড়ির পিচের ওপর ছুটে রান তুলতে তুলতে ছেলেবেলায় ফিরে গিয়েছিল যেন তন্ময়! ছুটছে সে ব্যাট হাতে। রান আউট !!! সম্মিলিত চীৎকারে পেছন ফিরে দেখে উইকেটের কাঠিগুলো বলের আঘাতে পড়ে আছে। পড়িমরি করে ফিরতে গিয়েও লাভ হল না ! এক উদীয়মান তারকার আকস্মিক পতনে অনেকদিন পর মন খুলে হাসলো নীপা । ঠিক দেড় বছর আগেকার নীপার মতন। ব্যাট ছুঁড়ে ফেলে তন্ময় সম্মোহিত হয়-- গালে টোল, ঝিকমিকে চোখ। সারা পৃথিবী হাসছে এখন। সমুও।

রিসোর্টে ফেরার পর চোখে পড়ে এলোমেলো করে রেখে যাওয়া ঘর নিপুণভাবে গোছানো। ঈজিপশিয়ান শাদা কটনের সৌখিন বেডশীট নিপাট করে বিছানার চারপাশে আটকানো। উলটে থাকা স্যুটকেস থেকে অগোছালো জামাকাপড় ক্লজেটে গুছিয়ে রাখা। ফুলের মৌ মৌ গন্ধ। কফিমেকারে সদ্য দেয়া কফি ব্রু হচ্ছে, পাশে সল্টিন আর কুকির সাথে চীজ। রুম সার্ভিসের মেয়েটা গুছিয়ে দিয়ে গেছে সবকিছু।

সৌম্য স্ট্রলারে ঘুমিয়ে পড়েছে। জানালা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের এক কমলা আলো অনবধানে ঢুকে পড়ে। নীপাকে কাছে টানে তন্ময়,
-নীপা, তোমার কাছে আমার কিছু চাওয়ার আছে, দেবে?
বুকের কাছে নীপার উষ্ণ ঘন মুখ। কিছুটা অবাক হয়ে তন্ময়ের দিকে তাকায় সে,
-সমুর জন্য একজন সাথী চাই। বোন বা ভাই।
ক্লান্ত বিশাল চোখদুটো জলে ভরে ওঠে,
-সমুর ঠিকমত যত্ন হবে না।
-সমু অনেক খুশি হবে, তুমি দেখো! আমাদের সবারই খুব ভালো লাগবে। মনে আছে? আগে মাঝেমাঝে বলতে, তিনটে ছেলেমেয়ে তোমার চাই, বলতে না? মা ক'দিন আগে বলছিলেন, আমাদের সাথে এসে থাকবেন। ময়নাও তো আছে। সবাই মিলে নাহয় ম্যানেজ করে নেবো।
নীপা চুপ করে থাকে।
-তোমার কাল রাতের প্রশ্নটার উত্তর আমি এখন দিচ্ছি। না, আমার কখনও মনে হয়নি, বা মনে হয়না, এসময় আমার অন্য কোথাও, অন্য কারো সাথে থাকার কথা ছিল। জানো নীপা? আজ সকালে ব্যালকনিতে বসে মনে হলো, ঢাকায় কতদিন সূর্য ওঠা দেখিনি! কতদিন তোমার কন্ঠে গান শুনি না! অনেকদিন হলো আমরা একসাথে খেতে বসছি না, একসাথে টিভি দেখছি না, বেড়াতে যাচ্ছি না। আমাদের জীবনটা কেউ যেন চুরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাকে আমরা কিছুতেই আটকাতে পারছি না।

তন্ময় নীপার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, চোখের জল মুছে দেয়।

-সৌম্যের জন্য হলেও আমাদেরকে ভাল থাকতে হবে। আমি যতটুকু বুঝি, প্রতিদিনকার যুদ্ধের নামই জীবন। তোমাকে পাশে রেখে এই যুদ্ধটা করতে চাই, আজীবন। একটাই জীবন, নীপা। হেল্প মি, প্লীজ!

একজন থার্ড আম্পায়ার অলক্ষ্যে তাদের কথা শোনেন, হাত তুলে রান আউটের সাইন দেখাবেন কিনা ভাবতে থাকেন।