ব্যাট-বল

ঊষসী কাজলী

লিখতে বসলে অধিকাংশ সময় পেছনে তাকাতে হয়। যুতসই ছবি তুলে এনে সেঁটে দিই জোড়াতালি। লিখতে বসে অপু দুর্গার নিশ্চিন্দিপুর হয়ে উঠে আসে আমাদের খালি পা, আমাদের সাদা-কালো টিভির দিন। সচিন তখন পর পর ম্যাচে সেঞ্চুরি করে যেত। সেঞ্চুরি শব্দের অর্থ তখন কে বুঝিয়ে দেবে আমায়! কল্পনা আর চিন্তার যৌথ সাপোর্টে অর্থ একটা বের হয়েছিল। মাটির দেয়াল, মাটির ছাদের দিকে চেয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ভাবতাম। সেঞ্চুরি আসলে সেন্ট চুরি। এ বাবা, সচিন সেন্ট চুরি করে? ব্যাট খেলতে নেমে চুরি চামারি! মন সায় দিত না। তবু সেন্ট চুরির ধারনাটা কেমন ব্যক্তিগত হয়ে রয়ে গেছিল। যেমন রয়ে গেছিল ওয়ান থেকে টুতে ওঠার অদ্ভুত কনসেপ্ট। মনে হত ওয়ান মানে একতলার ক্লাস। টু তে উঠলে তার উপরের তলা। আমি যখন টুতে পড়ি তখন সৌরভ গাঙ্গুলিও সেঞ্চুরি করছেন। এত অবাক লাগত। সেন্ট চুরিতে সবাই হাত তালি দেয় কেন! ক্রিকেট তখনও আমাকে টানেনি।
কী আশ্চর্য ভাবে পারিপার্শ্বিকের বিষয়গুলো কানে আসত আর কল্পনায় আমার জগতে সেসব নাড়া দিত। একবার হয়েছিল কী, ভারতের সাথে কোনো কঠিন দলের খেলা চলছে। সাত জন আউট হয়ে গেছে। আট নম্বরে প্রসাদ এসেই আউট। টিভির সামনে বসে থাকা ধুতি লুঙ্গির হাটুরে চাষা লোকগুলোর মুষড়ে পড়া দেখে আমি ভাবছি, এত্তো বড় দেশ ভারত। আট জন আউট হয়েছে তো কী এমন হয়েছে! ভারতের কত লোক পড়ে আছে। জলজ্যান্ত চোখের সামনে বসে থাকা লোকগুলো? তাছাড়া বাবা, যে কিনা বিচার করে বলে দিচ্ছে কোনটা বাজে আউট কোনটা দুর্দান্ত! তা বাবাকে নামিয়ে দিলেই তো...
পরে পরে জেনেছি এগার জন আর বাইশ গজের নিয়ম কানুন। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানের পায়ে লেগে বল উইকেটে ঢুকতে না পারলেই চ্যাঁচাতে হবে। কারণ ওকে বলে এল বি ডাবলু। আমাদের বাঁশের ব্যাট তৈরি করে দিয়েছিল ঘরামি নিমাই কাকা। বালতি উপুড় করা উইকেট। রঙ বেরঙের প্লাস্টিক বল। আমাদের ক্রিকেটের ডাকনাম ব্যাট বল। আমরা ব্যাট বল খেলতাম। উঠোনে খেলতাম। ধান কাটা হয়ে গেলে সেই উঁচু নিচু মাঠে খেলতাম। সুযোগ পেলে ঘুমের ভিতর আউট দ্যাট! ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা আমার মধ্যেও চাগাড় দিয়েছিল। খেলাটা তখন আর খেলা নয়। মরন বাঁচন । বাবা, মা, দাদার সাথে সেই উত্তেজনায় আমিও। ৩১৪ রান তাড়া করে হেরে যাওয়ার পর সে যে কী বিষাদ। যেন গলা বুজে আসে। মা তো খেতই না। আহা রে, ভারত হেরে গেল!
কাম অন ইন্ডিয়া স্লোগানে জোর বাড়তে লাগল। খেলার দুনিয়ার পাতা দিয়ে অংক বই ইংরাজি বই আরও যত যত বই সব মলাট দেয়া হত। দাদা নামের মহারাজ। দেয়ালে পোস্টারে তাঁর আত্মবিশ্বাসী চাহনি। ম্যাচের দিন মনে মনে ঠাকুর কে সেকী ডাকাডাকি! দাদার সেঞ্চুরিটা! গরমের ছুটি মানে তখন এল কাঠের তক্তার ব্যাট আর ক্যাম্বিসের বল। বড় মাঠে মেয়েদের খেলতে নেয় না। খুব হাসে। অবজ্ঞা থেকে রাগ আসে। দুঃখে সব ছুঁড়ে দিয়ে মন চায়। তবু উঠোন তো রইলই। সম বয়সও এসে জোটে। ধূলি ধুসর হাফ সেঞ্চুরি মনে মনে উৎসর্গ করেছি দাদাকে। খুব জোর সাইকেল চালানোর নেশা তখন ব্যাট বলের সাথে পাল্লা দেয়। ডুব সাঁতার চিত সাঁতারে এপার ওপার। বিকেলের ম্যাচে গ্লেন ম্যাগ্রা, ম্যাথু হেডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ভারত পারবে তো? পারুক না পারুক টিভির সামনে আমাওর তখন বসা বারণ। ক্লাস টেন, সামনেই টেস্ট।
তারপর এসেছে বড়বেলা। আরও পরে কলকাতা যাপন। নতুন চিন্তা , নতুন জগত। ক্রিকেট এর মধ্যে তার রঙ পালটেছে। ফ্রি হিট, টি টুয়েন্টি। এসে গেছে আই পি এল। অহর্নিশ ব্যাট বলের টেলি শো থেকে ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছি। হয়ত সবই আছে, দেখার চোখ পালটে নিয়েছে তার চাকা। আছে বলতে কেবল মনে পড়া। ছেলেবেলাকার জ্যামিতি বক্সের উপর এখনও টিম ইন্ডিয়ার মলিন স্টিকার দেখে হাসি আর মনে পড়ে প্রথম লেখা কবিতার নাম দিয়েছিলাম সৌরভ।