ডেড বল

তুষ্টি ভট্টাচার্য

মৃত্যুর পরে আর কিছু নেই বুঝি! একবার মরে গেলে, আর বাঁচার সুযোগ পাওয়া যায় এক জীবনে? মৃত্যু মানে কি চিতায় পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বা কবরের ভিতরে শুয়ে মাটি হয়ে যাওয়া? একটা থ্রো ফলস্‌ হয়ে গেল, ফস্‌কে গেল, আম্পায়ার দু হাত নীচের দিকে নেড়ে ঘোষণা করে দিল যে এটি একটি ডেড বল। ওই বলটির আর কোন মূল্য রইল না, জাস্ট ভ্যানিস হয়ে গেল স্কোর বোর্ড থেকে। মৃত্যু মানে কি তেমনই? একটা ডেড বল মাত্র? যে বলটা মরে গেছে বলে আমরা জেনে গেছি, সেই বলটার শুরু হওয়ার জন্মের কাহিনী জানে একমাত্র সেই বোলার, যার হাত থেকে বল ফসকে গিয়েছিল বাই চান্স। তাহলে মৃত্যু কি এমনই কোন বাই চান্স ঘটে যাওয়ার কাহিনী? একটা অসতর্কতা মাত্র!
এরকমই এক অসতর্ক মুহূর্তে পচার পা ফসকে গেছিল। আর এক ঝটকায় ও পড়ে গেছিল পাঁচতলা হাইটের বাঁশের মই থেকে। ওই পড়ে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণের জন্য শূন্যতায় ভেসে থাকা তার সেই সময়ের আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান এলো, সে নিজেকে নট নড়ন চড়ন গোছের একটা রক্তমাংসের ড্যালা হিসেবে আবিষ্কার করল! মৃত্যু তাকে নেয় নি, কিন্তু স্থবির করে দিয়ে গেছে এক মুহূর্তে। মরার বাড়া তার এই বেঁচে থাকা। বউয়ের বোঝা হয়ে সারা জীবন কাটানো...
জীবন মানে তো আর একটা টি টোয়েন্টির ধামাকা নয়। তবে জীবনে টি টোয়েন্টির ধামাকার মত স্বল্পকালীন উত্তেজনা থাকে। আর মৃত্যু সেই উত্তেজনাকে পাশ কাটিয়ে সরে পড়ে। সেই ডেড বল ততক্ষণে ভ্যানিস হয়ে গেছে স্কোরবোর্ড থেকে। আর বোলার অবসরে ভাবতে থাকে সেই বলটার কথা। ওই বলটা কি সত্যি সত্যি তার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে? নাকি এ তার ইচ্ছাকৃত? অথচ অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে সে তো কাটিয়ে দিল বলটাকে। মুছে দিল একরকম। যে দৃশ্যমান ডাস্টার মুছল, সে কিন্তু এত কিছু ভাবল না। তার মোছার কাজ, সে করে গেল যথাযথ। যেন কোন ফাঁসুড়ে! ফাঁসিতে ঝোলাতে গেলে ফাঁসুড়ের কি অপরাধবোধ কাজ করে? করলেও করতে পারে, আবার নাও পারে। কিন্তু ওই ডেড বলটাকে মুছে দিতে ডাস্টারের কোন অপরাধবোধ ছিল না, এটা নিশ্চিত। কিন্তু বোলার জানত বলটার মরে যাওয়ার আসল কাহিনী।
পচার বউ চাঁপা পাড়ার মুদি দোকানে গেল ১০০তেল আনতে। সেটাও ধারের খাতায়। ওই খাতার ধার কবে আর কীভাবে শোধ হবে সে ব্যাপারে মুদির ঘোর সন্দেহ আছে। চাঁপা তেল চাইতেই মুদি ওর না খেতে পাওয়া শরীরেও কী করে এত যৌবন আসে, সেটা নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর তেল দিয়ে বলল, রাতে আসিস একবার। কত তেল চাই, নিয়ে যাস। চাঁপা বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিল, এখনও কেন আমি বেঁচে আছি ভগবান!
ধরা গেল, বোলার যখন ছুটছে, থ্রো করার আগের মুহূর্তে তার মনোযোগ শুধুই পাখির চোখ দেখছে। পিচের ঠিক কোন জায়গায় বল ফেললে বলটা কোনদিকে ঘুরবে বা কতটা স্পিন করবে এসব হিসেব ততক্ষণে কিন্তু তার করা হয়ে গেছে। একটা ছকে ফেলা হিসেবী জীবনের মত তার জীবন্ত বলটা একে একে টার্গেট কমপ্লিট করে উইকেটের দিকে এগিয়ে যাবে, এই আশা তার বুকে। আশা পূর্ণ হতে পারে, যদি তার হিসেব ঠিক থাকে। আর এ কথা কে না জানে, হিসেব ঠিক রাখতে গেলে চাই কঠর অনুশীলনের। ধরা গেল, সে খুব নিয়মমাফিক ট্রেনিং নিয়েছে, তার বল একহাত করে কাটছে বা ঘুরছে। এবার সে যখন বল করতে এলো, থ্রো-এর ঠিক মুহূর্তে অলক্ষ্যে কোথাও কিছু একটা ঘটে গেল আর তার বলটা পিচে গড়িয়ে গড়িয়ে এগোতে থাকল। এরকমটা যে হতে পারে তার কাছে ছিল কল্পনার অতীত। শুধু তার কাছে নয়, দর্শক হিসেবে যারা রয়েছে, এই আমরাও অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে পিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। বলটা গড়াচ্ছে... আর একটা হঠাৎ স্তব্ধতা নেমে এসেছে মাঠের ওপর। আমরা, আম্পায়াররা আর সেই বোলার – সবাই যেন তখন ফ্রিজ শট্‌। অথচ বলটা তখনও স্লো মোসনে গড়িয়ে যাচ্ছে। বলটা কতদূরে যাবে? আমরা কেউ জানি না বোধহয় সেটা। এমনকি বলটাও জানে না তার দৌড় কত টুকু। বলটা যেখানে গড়িয়ে গড়িয়ে থামবে, সেই স্টেশনের নাম মৃত্যু। ফ্রিজ শট নড়ে উঠল আম্পায়ারের নিশানায়। তার দু হাত তখন নাকচ করতে ব্যস্ত।
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল পচার। দেখল পাশে চাঁপা অকাতরে ঘুমোচ্ছে। এখনো ওর শরীরে এত লাবণ্য! অথচ ও আজ বউকে ছুঁতেও পারে না, কোন সুখ দিতে পারে না। এক ইঞ্চি দূরে যে শুয়ে আছে সে ওর বউ হয়েও যেন অধরা। এসবের মধ্যে কোন যাদুবলে পচার শরীর জেগে উঠল। চাঁপাকে ডেকে তুলে বিপরীত বিহারে শান্ত এবং শ্রান্ত হল দুজনেই, আজ বহুদিন পরে। আজ বহুদিন পরে ওরা দুজনেই ভাবছে, এখনও তো মরি নি। বেঁচে আছি। হয়ত মেঘ কেটে যাবে ...... আবার সুদিন আসবে।
সেই বোলার যখন অবসরে তার ডেড বলটির কথা ভাবে, একমাত্র সেই কিন্তু ওই ডেড বলটিকে মনে রেখেছে এটা ধরে নেওয়া যায়। এই পৃথিবীতে আর কারুর মনে সেই বলটির কথা লেখা নেই। কোন স্কোর বোর্ডেও নেই। তবু বোলারের মনে রয়েছে, অন্তত কয়েকদিন থাকবে। সেই বলটি করার পেছনে তার যে পরিকল্পনা ছিল, সেটা নষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরের বলটা করার সময়ে সে ওই পরিকল্পনা আরও সাবধানে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে। আসলে ওই ডেড বলটি নষ্ট হয় নি, বরং ফিরে এসেছে তার পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে। ওই যে ফসকে যাওয়াটি, ওই যে অসতর্কতা, দৈবাৎ দুর্ঘটনা মৃত্যু হতে পারে না কোন মতেই। বরং মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে, তার রূপ প্রত্যক্ষ করে, ভীষণ ভাবে জীবনে ফিরে আসার ঘটনা এটি। একটি ডেড বল মানে যেমন একটি সুযোগ নষ্ট, তেমনি আরও একটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করার উপায়। এখন যে ব্যবহার করবে, তার ওপর নির্ভর করবে যে, সে পরবর্তী সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে নাকি পারবে না।
পরের দিন সকালে আবার যে কে সেই। পচা আর চাঁপা দুজনেই ভুলে গেল রাতের কথা। আবার শুরু হল তাদের অচল দিনটাকে ঠেলেঠেলে চলা এবং না-চলা।
ওই ডেড বলটি হয়ত হারিয়ে যাবে বোলারের মন থেকে। সত্যিকারের মৃতরা স্মৃতি হয়ে থাকে কিছুদিন, তারপরে স্মৃতিও নিশ্চিহ্ন হয়। যদি না সেই স্মৃতি ইতিহাস হওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইতিহাস হয়ে গেলে ওই ডেড বলটি কিন্তু বেঁচে গেল এ যাত্রা। চিরকালের মত থেকে গেল বইয়ের পাতায়, মিউজিয়ামের কাচের বাক্সে। কিন্তু বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই মুছে যাওয়াই নিয়ম কালের সাথে সাথে।
ওই একটি রাতের কথা কিন্তু সত্যি সত্যিই ওরা ভুলে যায় নি। রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ওরা মনে মনে সেই রাতের কথা ভাবে। আর আশায় থাকে... আবার আসবে এমন কোন রাত, আবার আসবে এর চেয়েও মধুর কোন দিন।
আমাদের ডেড বল কিন্তু দিব্যি বেঁচে থাকে আমাদের সাথে সাথে। আমাদের প্রত্যেকটা অনিচ্ছাকৃত ভুলের সাথে। আমরা কিছুতেই ওই ডেড বলটাকে মুছতে পারি না, আমাদের হাতে কোন দৃশ্যমান ডাস্টার নেই যে! আর সে বেঁচে গিয়ে আমাদের প্রতি মুহূর্তে মুখ ভ্যাঙচায়, দাঁত কিড়মিড় করে। এড়িয়ে যেতে চাইলে ও এসে আমাদের পথে পাথরের মত দাঁড়িয়ে পড়ে আমাদের হোঁচট খেতে বাধ্য করায়। আমরা গলা ছেড়ে ডাক দিই... হে প্রভু রক্ষা কর, বাঁচাও এর হাত থেকে, আর কখনও এমন ডেড বল আমাদের হাত ফসকে আর বেরোবে না... এই কথা দিলাম। কিন্তু শোনার মত কান নিয়ে কোন প্রভু কোথাও থাকে না। তখন এক অদৃশ্য আম্পায়ার এসে দু হাত নীচের দিকে কাটাকুটি করতে করতে আমাদের সিগনাল দেয়। আবারও একটা ডেড বল হয়ে গেছে, বুঝতে পেরে আবার আমরা ঘাড় নাড়তে নাড়তে ক্রিজের দিকে পিছন ফিরে এগিয়ে চলি। এগিয়ে চলি আমাদের মার্কড্‌ জোন-এ। যেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমরা পরের বল করব আবার। এই পরের বলটাই আমাদের পরীক্ষা। হয় হারব, নাহয় জিতব। তবে হারি কিম্বা জিতি, ওই ডেড বলের হাত থেকে আমাদের পরিত্রাণ নেই। জীবন আমাদের ডেড বলের কাছে গচ্ছিত রেখেছে। যখন ইচ্ছে জীবনবাবু ঝোলা খুলে আমাদের ডেড বলটা দেখিয়ে দেখিয়ে ব্যাঙ্গের হাসি হাসে। আর আমাদের মুখটা তখন বিচ্ছিরিরকম ভাবে ঝুলে যায়... যেন আমরাই ওই ডেড বলের একেকটি প্রতিচ্ছবি।