ফুলটস

হাসান আওরঙ্গজেব

জীবনটাই মনে হয় একটা ফুলটস বল।
শুধু তাকে আপনি কিভাবে মোকাবিলা করছেন ব্যাপার হল সেটা।

হয়ত ছক্কা
নয়ত অক্কা

আবার দেখা গেল আপনি মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন তাকে, ফুলটসের তীব্র বাণ ধেয়ে আসছে আপনার প্রতি; আর আপনার সকল প্রতিভা ও সামর্থ্যের জোরে তাকে সজোরে পাঠালেন বাউন্ডারির দিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমনভাবে আপনার পিছু নিয়েছে যে একেবারে সীমান্তরেখার ওপরে আপনি ধরাশায়ি হলেন শত্রুর হাতে; কিংবা বলা ভাল, আপনার নিয়তির হাতে।
অদৃষ্টবাদী না হলেও আপনি নিয়তির ছোড়া ফুলটসরুপী তীব্র তূন অস্বীকার করতে পারেন না। জীবন আপনাকে ফুলটস দেবেই। কাজের কথা হল আপনি কতটুকু গ্রহন করতে পারলেন আর কতটুকু ফিরিয়ে দিলেন।
কখনো কখনো ফুলটস আপনাকে অহেতুক করে দেয়, ব্যর্থ করে দেয়।
আবার কখনো কখনো ফুলটস আপনার কপর্দকশূন্য করপুট ভরিয়ে দেবে অকৃপণ!
কখনো কখনো আপনি শুন্যে লাফিয়ে ওঠবেন আনন্দের আতিশয্যে।
আবার কখনো কখনো টলমল পা, সড়াইখানা থেকে ফিরছেন একাকী, মধ্যরাতে। সোডিয়াম লাইটের আলোতে নিজের ছায়াকে মনে হচ্ছে দীর্ঘ, ঢেউবহুল ও খরস্রোতা নদীর মত; নদীতে স্নানের তীব্র আকাংখা পেয়ে বসল আপনাকে আর ওম্নি উন্মাদের মত ঝাপিয়ে পড়লেন। হায়, কী ভীষণ দুর্ভাগ্য আপনার। ওটাতো নদী নয়। পিচঢালা পথ ফিরিয়ে দিয়েছে আপনাকে। রক্তাক্ত। প্রত্যাঘাত সহ।
এভাবে কখনো কখনো ‘ফুটপাথও বদল হয় মধ্যরাতে’
আর আপনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে!’
সেই গ্রাম্য বালকটির কথা মনে পড়ে। এক বোকাসিধা গ্রাম্য বালক। সবে মাত্র কৈশোরে পা দিয়েছে। গলায় ঝুলানো একগাদা তাবিজ ও কবজের ভারে তার মাথাটা সবসময় সামনের দিকে ঝুকে থাকতো। কিছুটা উদাসীন আর সংসারের প্রতি অনীহা ওই বালক বয়সেই আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের মানুষের কাছে তার একটা চরিত্র দাড় করিয়েছিল; আর তা হল কুঁড়েমি ও নেতিবাচকতায় ভরা। একদিন বালকটি তার স্বীয় অগ্রজ সহোদরের সঙ্গে গ্রামের পাশের এক পরিত্যক্ত লেগুনে মাছ ধরতে যায়। বর্ষার শেষে লেগুনের জল শুকিয়ে গেলে সেখানে মাছ ধরার আয়োজন চলে। গ্রামের ছেলেপুলেরা সেখানে মাছ ধরতে নামে। বালকটি- গ্রামজুড়ে যার মাছ ধরতে না পারার বদনাম রয়েছে- জলে নেমে পড়ে ভাইয়ের পিছু পিছু। কিন্তু মাছ ধরার চেয়ে তার বেশী আগ্রহ ছিল জল আর কাদা ছোড়াছুড়ি ও অন্যান্য সমবয়সী বালকদের সঙ্গে বালখিল্যপনায়। এতে করে তার ভাইটি তার ওপর বেশ বিরক্ত। একেতো মাছ ধরার কোনো প্রতিভাই নেই, তার ওপর আবার ভাইয়ের মাছ ধরার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। তাই ভাইটি তার এমন অকর্মণ্য আচরণে যারপরনাই বিরক্ত হয়ে দিল এক ধমক।
জীবনে তো একটা মাছও ধরতে পারলি না
বেকামা কোথাকার!
ভাগ এখান থেকে!
খাওয়ার বেলা তো একেবারে ওস্তাদ।

বালকটি হতাশ হল। ভাইয়ের ধমকের প্রতিক্রিয়া তাকে ভীষণভাবে তুচ্ছ করে দিল। কিন্তু সে ভাইয়ের এমন নিদারুণ বিদ্রুপ মেনে নিতে চাইল না। একটা মোক্ষম জবাবের সুযোগের আশায় ভাইয়ের আশেপাশে মর্মাহত হয়ে ঘুরতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষন পর বালকটি নিজেকে ফিরে পেল। জলের ভেতর আগাছার মধ্যে হাতাতে গিয়ে বড়সড় রকমের একটা টাকিমাছ ধরতে পারল। ভেতরে ভেতরে সে আনন্দে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। নিজেকে বীরবাহাদুর ভাবতে ইচ্ছে করল। এবার সে ভাইয়ের বিদ্রূপ আর গ্রামবাসীর নিষ্ঠুর অপবাদের বিরুদ্ধে একটা মোক্ষম জবাব দিতে পারবে। এই ভাবনা তাকে সুখী করে তুলল। দুই হাতের মুঠোয় টাকিমাছের মাথাটাকে শক্ত করে ধরে ভাইয়ের সামনে এসে লেজটাকে নাড়াতে লাগল। মুখে কোনো কথাই সে বললোনা।
তারপর সে বাড়ির দিকে হাটতে লাগল। ভাইটি তার দিকে করুণ ও বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অকর্মণ্য ভাইয়ের হঠাত এমন পারফরম্যান্স তাকে হতচকিত করে ফেলল। কিছুটা লজ্জাও পেল। সে চাইছিল ভাইটি যেন মাছটি তার পাতিলের মধ্যে রেখে পুনরায় মাছ ধরাতে মনোনিবেশ করে। কিন্তু আমাদের বালক মৎস্য শিকারি সেই কাজ না করে মাছ ধরতে ব্যস্ত গ্রামের সকল মানুষের দিকে দুইহাত উঁচু করে ধরে মাছের লেজটি নাড়াতে নাড়াতে বাড়ির দিকে চলল। গ্রামের লোকেরা তাকে দুয়ো দিতে লাগল। “বেশ ব্যাটা বাঘের বাচ্চা। এতদিনে ধরেছিস মাছ একখানা। সাবাশ ব্যাটা”। কেউ একজন বলল, “ধরেছিসতো ব্যাটা টাকিমাছ, তাতেই এত”! আরেকজন তাকে পাশ কাটিয়ে চিৎকার করে বলল, “এবার টাকি ধরেছিস তাতে কি হয়েছে! সামনে নিশ্চয়ই একটা শোল ধরতে পারবি নির্ঘাত! এগিয়ে যা ব্যাটা”।
বালক বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
বহুদিন পর গ্রামের সকল লোকের ঠাট্রা, বিদ্রূপ ও সমালোচনার জবাব যে এভাবে দিতে পারবে বালকটি নিজেও ভাবেনি। বিশেষ করে তার আপন ভাইয়ের কাছ থেকে যে লাঞ্ছনা সে পেয়েছে তা মেনে নেয়ার মত নয়। মাছ ধরতে না পারার অপবাদ যে কতটা নির্মম হতে পারে তা তার চেয়ে আর কে বেশী জানে!
বাড়ির পাশে মসজিদ। মসজিদের কাছে পুকুর। পুকুরে শান বাঁধানো পাকা ঘাট। ঘাটের কাছে এসে বালকের মনে হল শরীরে তো অনেক প্যাঁক-কাদা জমে আছে। মাছতো ধরেছি। বাড়ি গিয়ে মাকে চমকে দেব। তার আগে ঘাটে নেমে একটা ডুব দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেলে মন্দ হয় না।
বালক দড়াম করে নেমে পড়ল ঘাটে। বামহাতে শক্ত করে মাছটাকে ধরে ডুব দিয়ে আবার ভুশ করে উঠল। ডানহাতে বুকের-পিঠের-পায়ের-গলার কাদাগুলো ধুয়ে সরিয়ে দিল। তারপর আবার ডুব দিল আবার উঠল। আনন্দের আতিশয্যে আবার ডুবল আবার উঠল। ডুবতে লাগল আর উঠতে থাকল। উঠতে থাকল আর ডুবতে লাগল।
আচমকা ফুড়ুৎ করে লাফ দিয়ে মাছটি পুকুরের অথৈ জলে হারিয়ে গেল।
বালক আমাদের হতভম্ব। নিঃস্ব রিক্ত বেদনাসিক্ত। বসে থাকে শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটে একাকী। হাতে বাঁশের চিকণ কঞ্চি নিয়ে মুহুর্মুহু ক্রোধে, হতাশায়, বেদনায় জলে আঘাত হানে আর ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
জীবন তাকে যতটুকু দিয়েছে
তার চেয়ে ঢের বেশী আজ
নিয়েছে কেড়ে। হায়!