হ্যারি সাহেবের রিভার্স-সুইপ

অতনু প্রজ্ঞান বন্দ্যোপাধ্যায়

ভোর চারটে বাজল।
পূর্বাচল পল্লীর চোদ্দ নম্বর বাড়িটায় প্রাত্যহিক অ্যালার্ম বেজে উঠল যথারীতি । ও বাড়ির বৃদ্ধ পিসিমা এসময় পূজোয় বসেন। খস্‌খসে পায়ের শব্দ শোনা গেল এপাড়ার ছিমছাম বাড়িগুলোকে দুপাশে সরিয়ে রেখে টলটলে নদীর মত চলে যাওয়া কালো পিচরাস্তায়। দৈনিক রুটিন মেনে রাতের চাপ চাপ অন্ধকার আর স্তূপীকৃত কুয়াশা ঝাঁট দিতে দিতে ভোরের ছবি ফুটিয়ে তুলতে চাইল ঘুমচোখের ঝাড়ুদারটি।
...ঠিক এসময়ে পিচরাস্তা শেষ-প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্টেডিয়ামটির মেইন-গেটের পাশে ঘুমিয়ে থাকা দোকানটিতে ঝাঁপ উঠল প্রভাতি নিস্তব্ধতা ভেঙে। দোকানের অন্ধকার গহ্বরের মুখোমুখি দাঁড়াল দোকানি রমাপদ। কাঠের বেঞ্চিটাকে লোকে করে বাইরে নিয়ে এল। তারপর অন্ধকারের হাতড়ে হাতড়ে ‘খুট’ করে সুইচ জ্বালাল সে। হলদে আলোয় ভরে গেল ছোট্ট দোকানটি। সদ্য জেগে ওঠা বয়ামগুলোর ছায়া পড়ল সামনের বেঞ্চিতে। মুখে চোখে জল দিয়ে উনুনটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল রমাপদ। থপথপে উনুনটা রমাপদর কড়া পরা রুক্ষ হাতে গোটা কয় ঘুঁটে আর কয়লার টুকরো পেটে গুঁজে প্রাতঃরাশ সেরে নিল খানেক। আর তারপর আগুনখেকো মুখে আয়েস করে আগুন ধরিয়ে চোখ-জ্বালানি ধোঁয়ার টান ছড়িয়ে দিল সাতসকালের গুড়ি গুড়ি কুয়াশায়। বুড়ির পাকা চুলের মত সে ধোঁয়া উড়তে উড়তেও আঠার মত লেগে রইল উনুনটার ঠোঁটে। রমাপদ বেঞ্চিতে খানিক বসল। এই কাজগুলো রমাপদের নিত্য নৈমত্তিক। এই যেমন, এবার ও ঝাঁট দিয়ে দোকানটা খানিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে চায়ের জল চাপাবে। দোকানে টাঙানো ঠাকুরদেবতাদের খানিক ধূপ দেবে,খানিক গুরুমন্তরও জপে নেবে। প্রাত্যহিক এই কাজ গুলো করতে বেশি ভাবতে হয়না রমাপদকে। ধাঁধসেই হয়ে যায়। অভ্যেস। এসব করে টিনের ক্যাশবাক্সের পাশে নেতিয়ে থাকা লাল গামছাটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল ও। তারপর টিনের ঝাঁপের কপালের ওপরে বড় বড় করে লেখা অক্ষরগুলোয় ওই গামছাটা আদর করে বুলিয়ে দিল বার-কয়েক। সারারাতের জমে থাকা কুয়াশার স্যাঁতস্যাঁতেপনাকে আলতো করে মুছতে মুছতেই জ্বলজ্বল করে জেগে উঠল সাদা রঙে লেখা ‘রমাপদর চায়ের দোকান। লেখাটা দেখে তৃপ্তিতে ভরে উঠল মাঝবয়েসি রমাপদর মুখ। ভুলে যেতে চাইল হঠাৎ করেই অনেক-দিন পরে আবার শুরু হওয়া ফুটপাথিয়া দোকান উচ্ছেদের পুলিশি তাণ্ডব। সরকারের বিচিত্র খেয়ালের কথা। দোকানের এ মাটি কেনার ক্ষমতা নেই রমাপদর। নিজেকে বিক্রি করলেও নয়। কিন্তু মাসোহারা টাকার অঙ্ক বাড়ালে পুলিশি লাঠির কোপ থেকে বাঁচাতে পারে দোকানটাকে। সবাই জানে এসব হুজ্জুত সাময়িক। খবরের কাগজের চোখ ফেরানো হুজুগমাত্র। আর তার ওষুধও জানা। টাকাই খাঁই মেটানো। আবার। বার-বার। সব সমাধান ওই টাকার গন্ধেই! কিন্তু রমাপদর অত টাকা কোথায়? ওর বউ গৌরীর টিবি হয়েছিল গেল বছর। ফতুর হয়ে গিয়েছে রমাপদ। মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে। ছেলেটা পড়তে চায় কলেজে, কিছু একটা হিল্লে করে দিতে হবে। ছোট্ট এই দোকান কতটুকু আর পারে! তাও... যত যাই হোক, বাঁচতে তো হবেই। যেভাবেই হোক, টাকা রোজগার করতে হবেই রমাপদকে।
কিন্তু আজ যেন মানুষটাকে খানিক অন্যমনস্ক লাগছে। প্রতিদিনের কাজ-কম্মো করার মাঝে মাঝেই কব্জি তুলে ঘড়ির কাঁটায় নজর রাখছে সে। যেন কারো প্রতীক্ষা!
ঠিক এই সময়েই হ্যারি সাহেব দোকানে এসে দাঁড়ালেন। এমন নয় আজই শুধু। রোজই এসময় একই রুটিন ওনার।
‘গুড মর্ণিং সাহেব’। বলে উঠল রমাপদ।
‘ভেরি গুড মর্ণিং। পিচ বানিয়ে ফেলেছ?’
হ্যারি সাহেব ফর্সাটুকটুকে-লাল চুলো-বিদিশি সাহেব নয় মোটেই। ষাট পেরোন থলথলে চেহারা। কালো। লম্বাটে। বাপ-পিতেমোর দেওয়া ‘হরিসাধন মিত্র’ নামটা কবে যে ‘হ্যারি মিত্র’ এবং তাও ক্ষয়ে ক্ষয়ে ‘হ্যারি সাহেব’ হয়ে গেছে, মনেও নেই ওনার হয়ত। চাকরি থেকে অবসর নেওয়া মানুষটার কথায় কথায় ক্রিকেট ছলকে পড়ে। প্রতি কথাতেই মনে হয় মাঠেই দাঁড়িয়ে আছেন উনি। সরকারি অফিসার থাকা অবস্থায় অফিস-টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন হ্যারি সাহেব। রমাপদকে বলেছিলেন একদিন। রমাপদর বেশ মজা লাগে মানুষটিকে। উনি এলেই রমাপদ একগাল হেসে ‘গুড মর্ণিং সাহেব' বলে ওঠে। আর তারপর ঝটপট করে পলিথিনের প্যাকেটে গাদা খানেক বিস্কুট ভরে ফেলে। ব্রিটানিয়া থেকে লেড়ো, ক্রিম-ক্র্যাকার থেকে কোকোনাট-বিস্কুট কিছুই বাদ যায় না। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সাহেবের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ছলকে পড়ে গাল জুড়ে। আজও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি এখনও। নিয়ম অনুযায়ী এর পরেই হ্যারি সাহেব ষ্টেডিয়ামে ঢুকে যান মর্ণিং ওয়াকে।
কিন্তু আজ বেনিয়ম হল। হ্যারি সাহেব বলে উঠলেন, ‘একটা স্পেশাল চা বানাও তো, চিনি ছাড়া। পরিমল নেই বলে চা জোটেনি। একা একা ক্রিজে নামতে ইচ্ছে করে না আর।’ রমাপদ যেন অস্থির হয়ে ওঠে! কিন্তু মুখে বলে ওঠে, ‘দিচ্ছি সাহেব’। যদিও হ্যারি সাহেবের রুটিনের আজই যে একমাত্র ব্যতিক্রম হল তা নয়। মাঝে মাঝে হয়। কালে ভদ্রে। কিন্তু আজই হতে হল! রমাপদ যেন খানিক অন্যমনস্ক আজ। হ্যারী সাহেব গল্প শুরু করলেন। পূর্তভবনে কাজের সূত্রে সারা বাংলা চষা ওনার। গল্প উড়ে চলে ভূগোলের মানচিত্রে। রমাপদ জানে, কন্ট্র্যাকটরের সাথে ঝুট ঝামেলা, ইউনিয়নের হুজ্জুতি সামলানো এসব কলার ওঁচানো পর্ব শেষ হলে এখান সাহেব ঢুকে পড়বেন খেলার মাঠে! গাভাসকারের অন্ধ ভক্ত। হ্যারি সাহেব বলেন, ‘ক্ল্যাসিক্যাল খেলোয়ার যদি কেউ থাকে তাহলে সে ওই একজনই।’
‘কি যে বলেন! শ্রীকান্ত, বেঙ্গসরকার?... শচীন... সৌরভ?’ রমাপদ চায়ের গ্লাসে চিনি ঢালতে ঢালতে মৃদু প্রতিবাদ করে ওঠে।
‘আরে এরা তো সেদিনের ছেলে। গাভাসকার হল ক্রিকেটের রাজা। এক একটা শট যেন গ্রামার বই থেকে তোলা। দেখলেই মনে হয় শেক্সপীয়ার পড়ছি। যাতা রগরগে থ্রিলার নয়।’
রমাপদ আর তর্কে যায় না। হ্যারি সাহেবের মুখে মুখে ম্যাচের বিবরন উড়ে বেড়ায়। কে পাল্লা দিতে পারবে! তবে দেখেছে, পরিমল মাঝে মাঝে এঁড়ে তর্ক করে। খেলা দেখতে এলে হ্যারি সাহেবের সাথে পরিমল আসেই।
‘কিন্তু কাকা, টি-টোয়েন্টির যুগে অত ক্ল্যাসিক্যাল শট চলে না। প্রথম থেকেই তাড়ুয়া না চালালে হয়?’ পরিমলের কথাকে মাছি ওড়ানোর ভঙ্গীতে উড়িয়ে হ্যারি সাহেব বলে ওঠে, ‘যে মানুষটা ব্যাট ধরতে জানে সে যে কোন পিচেই কাঁপিয়ে দেবে। তাড়ুয়া নয়, ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাটসম্যানকেই লোকে মনে রাখে রে ছোকরা। গুচকে দেখ.. গ্যাটিংকে দেখ পা ভাঁজ করে ব্যাট উলটো চালিয়ে রিভার্স সুইপ মেরে দিত। কি আলাদা অথচ কি নিখুঁত ক্রিকেটিয় শট বলত! গ্রামারে কোন ভুল নেই অথচ হুড়হুড় করে রান তুলে দিচ্ছে। এইই দরকার। স্পিনার যখন লুজ বল দিয়ে লোভ দেখাচ্ছে তুলে মারার, গুচ তখন বোলারকেই বোকা বানিয়ে অফে চার ছক্কা চালাচ্ছে! ভাবা যায়। এইসব হল জাত ব্যাটসম্যানের রক্ত।’
আজ সামান্য খানিক গল্প-স্বল্পের পরই আড্ডায় যতি পড়ল হ্যারি সাহেবের। চোখ সরু সরু করে ঘড়ি দেখলেন। ‘নাহ, এবার ওঠা যাক বুঝলে!’ সাহেবের কথায় যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রমাপদ।
‘বিস্কুটগুলো তাজা তো? ভালো না হলে আমার টিম ফেলে দেবে কিন্তু।'
হাসে রমাপদ। বলে ওঠে,’ও নিয়ে ভাববেন না। এতদিন হয়ে গেল তো। একদিনও এমন হয়েছে কি?'
আর কথা না বাড়িয়ে গেট দিয়ে ষ্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েন হ্যারি সাহেব।
সেদিকে তাকিয়ে থাকে রমাপদ। ঘড়ি বলছে সাড়ে চারটে। এখনও কেউ ঢোকেনি মর্ণিং ওয়াক কিংবা খেলাধূলা করতে। পকেটে রাখা সস্তার কালো ফোনটায় কয়েকটা নম্বর ডায়াল করতে থাকে রমাপদ... ।

এসময়টায় সারারাত্তিরের পাহারাদারির পরে গেটের মুখে খাঁকি পোশাকের রক্ষীরা এলিয়ে পড়ে চেয়ারেই। খানিক বিশ্রামের সময় ওদের। পূর্তভবনের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক হ্যারি সাহেব হাঁটতে থাকেন একা একাই। আধো অন্ধকারে।
ঠিক এই সময়টা ‘ওদের' কাছেও পরিচিত। ঘড়ি ছাড়াই ওরা টের পেয়ে যায় হ্যারি সাহেবের পায়ের শব্দ। আজও পেল। কান খাড়া করে উঠে বসল ওরা। চারপায়ের হাড্ডিতে খর্‌ খর্‌ শব্দ তুলে ধুলো উড়িয়ে দৌড়ে এল যথারীতি। ভোউউউউ। ভোউউউউ। ওদের আদুরে ডাকে আধো-অন্ধকার প্রাক-ভোরের নৈশব্দ্য আকৃতিহীন ভাবে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
হ্যারি সাহেব এগোলেন দুলকি চালে। পেছনে এগোলো বেওয়ারিশ কুকুরদের মিছিল। হ্যারি সাহেব পলিথিনের প্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে বিস্কুট বের করতে করতে মুখ দিয়ে শব্দ ছুঁড়ে দিতে লাগলেন... ‘আয়... ‘আয়’। হাত থেকে গোটাকয় বিস্কুট উড়িয়ে দিলেন আকাশে। একবার ... দুবার... বার বার। এক পরিচিত প্র্যাত্যাহিক অভ্যাস। যতবারই বিস্কুট ছুঁড়ে দেন আকাশে, ততবারই পেছনের দু পায়ে ভরদিয়ে শরীরটাকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে বাতাসের সাথে কুস্তি লড়ে বেওয়ারিশের দল। ওদের ধারালো দাঁতে আটকে যায় লালাসিক্ত বিস্কুটের টুকরোগুলো। হ্যারি সাহেব এগোতে থাকেন হরির লুটের মত বিস্কুট ছড়িয়ে,সারাটা পথে। আজ এই পর্ব খানিক তাড়াতাড়িই সারতে হল হ্যারি সাহেবকে। রমাপদর সাথে গল্প করতে গিয়ে খানিক দেরিই হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটার একচুল এদিক ওদিক ওনাকে বিব্রত করে। পরের কাজগুলোর কোনরকম এদিক ওদিক মেনে নেওয়া যাবে না। আরেকবার ঘড়ি দেখলেন উনি। এই শেষ পাক। এটা শেষ হলেই গেট দিয়ে ষ্টেডিয়ামের বাইরে বেরিয়ে যাবে্ন উনি।
ঠিক এই সময়েই একটি গাড়ি ঢুকল ষ্টেডিয়ামের গেট দিয়ে। ঢিলেঢালা সুরক্ষার সুরঙ্গ দিয়ে এগোল ষ্টেডিয়ামের বৃত্তাকার পথে,যে পথে খানিক আগেই এগিয়ে গিয়েছেন হ্যারি সাহেব। এ গাড়িতে দেখা গেল পুরু ঠোঁটের একটি লোক লাল চোখ ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। পাশের লোকটির মুখ গায়ের চাদরে ঢাকা। চাদর খানিক সরলেই দেখা গেল পরিমলকে । হ্যারি সাহেবের একমাত্র ‘বাড়ির লোক'। নিঃসন্তান হ্যারি সাহেব মাঝবয়েসেই সুন্দরী স্ত্রীকে ক্যানসারে হারিয়ে যখন বেঁচে থাকার মানে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, পরিমলের তখন কতই বা বয়েস? দশ কি বারো হবে! বাপ-মা মরা ছেলেটা বাংলাদেশ থেকে কাঁটাতার পেরিয়ে চলে এসেছিল মামার হাত ধরে। মামাবাড়িতে অবশ্য আর ঠাঁই হয়নি। অফিসের সামনে চায়ের দোকানে ছেলেটার মায়াভরা মুখ দেখে মনে ধরেছিল হ্যারি সাহেবের। ছেলেটা আশ্রয় পেয়েছিল হ্যারি সাহেবের বিরাট বাড়িটার ফাঁকা একটা ঘরে। পরিমলকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেও ওর মন ছিল না পড়ার। গ্র্যাজুয়েট হবার আগেই লেখা পড়ায় ইতি জানিয়ে দিল ছেলেটা। হ্যারি সাহেব হাবেভাবে পরিমলের এই সিদ্ধান্ত তীব্র ভাবে না-পসন্দ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘যে প্লেয়ার না স্পিন বলে হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়ে সে কোনদিন প্লেয়ার ছিলোই না’! কিন্তু তাও, শেষ অব্দি এই নন-গ্র্যাজুয়েট পরিমলই হয়ে উঠল হ্যারি সাহেবের খাস লোক। গাড়ি পোঁছা থেকে বাজার করা, পোষ্ট অফিস থেকে ইলেক্ট্রিক বিল, পরিমলই যেন একমাত্র উত্তর। সবকিছু করলেও হিসেবে বড্ড কাঁচা ছেলেটা। টাকা-পয়সার হিসেবে গোলমাল করে ফেলে। হ্যারি সাহেবের বেজায় বিরক্তি তাই। বার বারই বলেন,‘ওরে রানরেট হিসেব না রাখলে চলে? ছোটমাঠে খেলা হলে অপোনেন্ট গো-হারা হারাবে তো!’। পরিমল শুনলে তো!নিজের খেয়ালেই চলা একটা মানুষ যেন। দিনগুলোতে তখনও সোজাসাপটার গন্ধটা লেগেই ছিল। কিন্তু মানুষ তো, স্বাভাবিক ছকগুলোকে হাতের কাছে পেয়ে গেলে উল্টে পাল্টে দেখতে চায় স্বভাববশেই!
বেওয়ারিশ পরিমলের মনে স্বার্থের লোভ উথলে উঠল একসময়। হারি সাহেবের মৃত্যুর পরে এই বিশাল সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারার খুঁটিনাটি নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিল অল্পপড়ুয়া পরিমল। কে না জানে, হ্যারি সাহেবের কৈফিয়ত নেবার কস্মিনকালেও কেউ নেই, কাছের মানুষেরা হয় পরপারে নয় দেশান্তরী। কাজেই ভিটেতে ঘুঘু না চরিয়ে প্রোমোটারের হাতে ধরিয়ে দেওয়াই পরিমলের কাছে অনেক বুদ্ধিমত্তা মনে হল। অবশ্য পরিমল কি একাবুদ্ধির মানুষ? ওই যে ঠাকুরনগরের জেলে পাড়ার মেয়েটা? দোলন; ওর বুদ্ধি না হলে পরিমল এসব ভাবতে পারত? প্রেমে পড়লে মানুষ শুধু অন্ধ নয়, স্মৃতিহীনও হয়ে যায় পরিমলকে না দেখলে কে বলত! কত সহজেই ছেলেটা হ্যারি সাহেবের সাথে কাটানো সময়গুলো বেমালুম ভুলে দোলনের ঠ্যাঙারে দাদা ছোটকুর হাতে নিজের লোভকে সঁপে দিল অচিরেই। প্রোমোটারের পোষা গুন্ডা এই ছোটকু। দলিল টলিল জাল করা যার বাঁয়ে হাতের খেল। আর ডান হাতের খেল...বলাই বাহুল্য।
কাক-ভোরে ওদের দুজনকেই দেখা যাচ্ছিল গাড়ির জানলার কাঁচ পেরিয়ে। দেখা গেল, পরিমল চাদরের ফাঁক দিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে সন্ধানী দৃষ্টি।
আর ছোটকু পরিমলের পাশে বসে রিভলবরটা বের করে মন দিয়ে দেখছে আর ভাবছে, এই ছোট্ট মেশিনটা একটা ম্যাজিশিয়ান। এক মুহুর্তের জাদুতেই অনেককিছু পাল্টে দিতে পারে অবলীলায়! চা-দোকানের রমাপদ ঠিক সময়েই খবর দিয়েছিল। সবকিছুর টাইমিং এক্কেবারে ঠিকঠাক এখনও অব্দি। আসল কাজটা নেমে গেলেই হয় এখন। কিন্তু এই কাজটা সেরে ফেললে রমাপদকেও বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না। আজ না হয় অল্প কটা টাকাতেই মুখ বন্ধ রাখছে। কিন্তু কাল? যদি আরো বেশি চেয়ে বসে? রিস্ক নিয়ে কাজ নেই। পরিমলকে যদিও শুধু দাবার ঘুঁটি হিসেবেই ভেবে এসেছে ছোটকু। বুড়োর বাড়িটা বোনের নামে করে নিলেই কেল্লা ফতে। বেশ খানিকটা টাকাও এল আবার এই এলাকায় এত বড় একখান বাড়িও এল। ভাবা যায়! সত্যি তারিফ করতে হয় মেয়েটাকে। সরেস একটা পার্টি ধরেছে বটে!
হ্যারি সাহেব হাঁটতে হাঁটতে তৃপ্তিতে ভরে উঠছিলেন। রোজই ওঠেন আজকের মতোই। এসময় নানান চিন্তা পাক খেয়ে ঘুরে বেড়ায় মনে। এলোমেলো আঁকিবুঁকির মত গিজগিজ করে নানা সম্ভাবনা। এক এক করে তাদের মুখোমুখি হয়ে উত্তর খোঁজেন উনি। এই তাঁর তৃপ্তি যেন। ভাবতে থাকেন আর ঠিক কত বছর এমন সকাল দেখার সৌভাগ্য হবে? অতিরিক্ত ব্লাড-সুগার শরীরে ছোবল মেরেছে এরই মধ্যে। রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা ছাড়িয়েছে। হৃদযন্ত্রও মাঝে মাঝেই চিড়িক দিয়ে যন্ত্রণা শানিয়ে ওঠে। কোন এক মুহুর্তেই আউট হয়ে যাবেন পিচ থেকে। অবশ্য এমনই তো ভালো। অনেক দিন ব্যাট করছেন। এবার প্যাভিলিয়নে ফেরাই ভালো। কিন্তু এমন কিছু একটা করতে ইচ্ছে করে যেটা গড়পড়তা নয়। হটকে কিছু। কেউ ভাবতেই পারবেনা এমন কিছু। হুট করে মরে গেলে কে মনে রাখবে এখন! কিন্তু এ বয়েসে কিই বা করতে পারেন হ্যারি সাহেব। সারা জীবন নিয়ম-মাফিক চলে এসেছেন। এভাবেই একদিন চলেও যাবেন হয়ত। কিন্তু মরে গেলে আমার টিমের কি হবে? বিড়বিড়ে ভাবনা হ্যারি সাহেবের মন জুড়ে। এই কুকুরের দল তো নেহাত রাস্তার কুকুর নয় ওনার কাছে। আস্ত একটা ক্রিকেট টিম। ষ্টেডিয়ামের গোল চক্করে ঘুরতে ঘুরতে হ্যারি সাহেব কল্পনা করেই নিজের টিমের সাথেই ঘুরছেন উনি! ওদের সাথে সুখ-দুঃখের কথা বলেন উনি। যেসব কথা শোনার কেউ তেমন নেই এ জীবনে সে কথা বলতে বলতে বিস্কুট ছুঁড়ে দেন উনি। এ সময়টা খুব আনন্দে থাকেন উনি। টগবগ করেন উত্তেজনায়। কিন্তু উনি চলে গেলে রোজ সকালে এমন আদর করে কে খাওয়াবে ওদের? টিমটা ভেঙে যাবে! মন খারাপ হয়ে যায় হ্যারি সাহেবের। তাছাড়া ওই উজবুজটারি বা কি হবে? এখনো যেন বড় হল না পরিমলটা। বেটাচ্ছেলে সোজা হিসেবটাও বোঝে না! বোকা কোথাকার। টাকাপয়সার হিসেব গুলিয়ে বসে। কথায় কথায় হিসেব ভুলে যায় আর দাঁত বার করে বোকার মত হাসে। কে যে দেখবে ওকে!এত সরল ছেলে। এমন বিশ্বাসী ছেলে সত্যিই বিরল। কিন্তু না বোলিং, না ব্যাটিং, না ফিল্ডিং কোত্থাও কিস্যু করতে পারল না ও ব্যাটা। আজকাল আবার বাবুর যাত্রা দেখার নেশা হয়েছে। কাল রাত থেকেই তো উধাও। তারুলিয়া না কোথায় নাকি যাত্রা হচ্ছে। মেলায়। সেসব দেখে ফিরবেন বাবু সকাল হলে। বোকা হলে কি হবে, শখ ষোলআনা! ভাবতে ভাবতে মুখে হাসি ছড়ায় হ্যারি সাহেবের মনে। কিন্তু পরমুহুর্তেই ওনার মনে পড়ে পরিমলের বিরক্তি ভরা কথাগুলোও। মাঝে মাঝেই ও বলে ওঠে, ‘সাতসকালে উঠে কুকুরগুলোকে খাইয়ে কি পুণ্য হচ্ছে তোমার? তাও যদি ভালো একটা পুষতে ঘরে,পাহারা দিত। তা না, যত সব রাস্তার কুত্তা। বিস্কুট দিচ্ছ বলে তোমার পেছনে লেজ নাড়াচ্ছে। কাল না দিলে কামড়ে দেবে। অন্য কেউ ভালো বিস্কুট দিলে লেজ নাড়িয়ে দৌড়বে’।
‘চুপ কর হারামজাদা’ বিরক্ত হন হ্যারি সাহেব। ভাবেন কি বোকা পরিমলটা! কুকুরগুলোর মনটা যদি দেখতে পেত ছেলেটা! এই বিস্কুটগুলো ওদের কাছে শুধু খাবার যে নয় কে বোঝাবে ছেলেটাকে। কি করে বোঝাবে ওদের চোখ দেখলেই বোঝা যায় কতখানি ভরসা আর আদর পেতে হ্যারি সাহেবের কাছে দৌড়ে আসে সাতসকালে। বোঝার ক্ষমতাও ওদের ফিলিংসগুলো। খেলাধূলা না পারলে যা হয় আর কি! এক ফোঁটা স্পোর্টস্ম্যান স্পিরিট নেই এদিকে আজেবাজে যত ভাবনা। এসব ভাবতে ভাবতে হ্যারি সাহেবের ভারি চিন্তা হয় ছেলেটাকে নিয়ে। উনি চলে গেলে সত্যিই ছেলেটার কি হবে? ছেলেটার নামে টাকা পয়সা তো অনেকটাই লিখে রেখে যাবেন,কিন্তু ও কি পারবে এসব সামলাতে? অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে বাড়িটাকে মিশনকে দান করে দেন। আচার্য্য-মিশনের সাধুদের সাথে কথাও বলে রেখেছেন। আইনি লেখাপড়াটাই যা বাকি। পরিমলের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে মিশনকে বলেই। একটা চাকরী বাকরি পেয়ে গেলে নিশ্চিন্ত। মনে মনে আউড়ে চললেন হ্যারি সাহেব। ওদিকে তাঁর পেছন পেছন ঘুরতে থাকে কুকুরের দল, বিস্কুটের স্বাদ জিভে নিয়ে।
ঠিক এই সময়েই মৈত্রসাহেবের চোখে পড়ল অনতিদূরে থাকা নিরীহ গাড়িটা। এগিয়ে আসছে গড়িয়ে গড়িয়ে। চালক নতুন শিখছে বোধ হয়! উনি এগোতে থাকেন। গাড়ির সাথে দূরত্ব কমতে থাকে। কমতে কমতে শেষ বিন্দুতে এসে শুনতে পাওয়া যায় চাপা কয়েকটা শব্দ ঠপ্...ঠপ্‌...ঠপ্ !
...কুকুরগুলো থমকে দাঁড়ায় হঠাৎই। দেখতে পায় লুটিয়ে পড়ছে বড় সড় মানুষটা। ছিটকে যাচ্ছে হাতে ধরা বিস্কুটের প্যাকেট, মোটাফ্রেমের চশমা। ওদিকে গাড়ির ভেতর লাল চোখ দুটোতে তৃপ্তির আভাস। চাদরঢাকা পরিমলের মুখটা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ঘামে ভিজে গেছে। সাইলেন্সর লাগানো রিভলবরটিকে ব্যাগে ভরে রাখে ছোটকু। ড্রাইভারকে কর্কশ গলায় গাড়ির বেগ তুলতে আদেশ দেয়। থমকে যাওয়া দৃশ্যটির সাথে খানিক ধাতস্থ হয়ে নিতে যেটুকু সময় লাগে সেই মুহুর্তটুকু পেরিয়ে গেলেই দেখা যায় কুকুরগুলো দৌড়তে শুরু করেছে গাড়িটার পেছন পেছন।
‘আরে ছোটকুদা , কুত্তাগুলো দৌড়ে আসছে তো?'ড্রাইভার বলে ওঠে।
‘আবে শালা, কুত্তাকে ভয় পাচ্ছিস? চালা জোরে।'ছোটকু বলে ওঠে।
‘জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে যদি লাফ মেরে?'
‘আরে বিস্কুট আছে তো? জানলা দিয়ে ছেটা।'
‘বিস্কুট তো নেই। লাড্ডু এনেছি। দেব?'
‘আরে যা আছে ছেটা। শালা বেওয়ারিশ কুত্তা। খাবার পেলে সব ভুলে যাবে।' তাচ্ছিল্য দেখা যায় ছোটকুর চোখ মুখে।
কুকুরগুলো দেখতে পায় হলুদ হলুদ টুকরোগুলো উড়ে উড়ে আসছে গাড়িটা থেকে। মুহুর্তের জন্য থেমে যায় ওরা। জিভে মিষ্টি স্বাদ। পরিমলের চোখদুটো চকচক করছে উটকো বিপত্তিটাকে এড়িয়ে। ড্রাইভার বলে ওঠে, ‘ওরা থেমে গেছে’। ছোটকু ড্রাইভারকে বলল, ‘টেনে চালা এবার; গেট কেউ আটকালেও থামবিনা। রমাপদ সামলে নেবে’। পরিমলের মনটা উত্তেজনায় ভরে ওঠে। আর কেউ ধরতে পারবেনা ওকে। কেউ জানতেও পারবেনা কিছু!
...কিন্তু পরিমল ভুলে যায় হিসেব মেলাতে কোনোদিনই সে পারেনি। আজও পারেনা। তীব্র ঘেউ ঘেউ কোলাহলে পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে কুকুরের মিছিল ধেয়ে আসছে গাড়িটার দিকে।
‘ছোটকুদা, ওই দ্যাখো’ কাঁদো কাঁদো মুখে বলে ওঠে পরিমল। এদিকে ড্রাইভার সামনে তাকিয়ে দেখে গেটের সামনে জটলাভরা কালো কালো মাথা। পরিমল দেখতে থাকে গাড়ির পেছনে বেওয়ারিশ মিছিলের দূরত্ব কমে আসছে আরও। ঘেউ ঘেউ শব্দে আক্রোশ ঝরে পড়ছে। খেয়াল করলে শোনা যাবে তীব্র প্রতিহিংসাও। মিছিলটা কি আছড়ে পড়বে গাড়িটার ওপরে? নাকি সামনের ভিড়টাকে উড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে গাড়িটা?
কিছু ভাবার আগেই দেখতে পাওয়া যায় গাড়িটা ধড়াস্‌ করে ধাক্কা মেরেছে রমাপদর চায়ের দোকানে। মুখ থুবড়ে রমাপদ লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। ওর কব্জির ঘড়িটার কাঁচে রক্তের ছিটে। আশপাশের মানুষ আর গেটের রক্ষীরা দৌড়ে আসছে দুর্ঘটনাস্থলে। পরিমলের স্মৃতিগুলো যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে এই মুহুর্তে। আবছা চোখে দেখছে উলটে যাওয়া গাড়িটার অন্ধকারে পাচ্ছে দুটো নিথর শরীর থেকে দলা দলা রক্ত গড়িয়ে আসছে।

এসব থেকে খানিক দূরেই দেখা যায় হ্যারি সাহেবের শরীরটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। জামার পকেট থেকে গড়িয়ে পরা রক্ত পিচরাস্তায় গলে গলে পড়ছে। আর সেখানে গাল পেতে শুয়ে আছে যে কুকুরটি,তার চোখ জলে ভরে উঠেছে যেন। হ্যারি সাহেবের দেখতেও পেল না ওনার টিম কি দুর্দান্ত একটা ম্যাচ হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছে এই মুহুর্তে। শেষ ওভারে ধূর্ত স্পীনারের চালাকিতে ছুঁড়ে দেওয়া বলটায় লোভ না দেখিয়ে রিভার্স সুইপ মেরে দিয়েছে সবাইকে বোকা বানিয়ে।

হ্যারি সাহেব বেঁচে থাকলে ভাবত,পরিমলটা কি বোকা,এসব বুঝতেই পারল না কোনদিন!