নট আউট

বিশ্বদীপ দে

‘যদি না জিততে পারো তো জিতো না, কিন্তু তুমি হেরেও যেও না তা বলে...’
---শয়নযান, ভাস্কর চক্রবর্তী
লোকটা ফিরে আসছে। সমস্ত শরীর জুড়ে ক্লান্তির ট্যাটু। গলার কাছে দলা পাকিয়ে রয়েছে তেতো একটা স্বাদ। ঘাম আর অপমান শরীরের খাঁজে খাঁজে গুঁজে দিয়েছে দুর্গন্ধের চিরকূট। মাথা সামান্য নিচু। কাঁধের থলির মধ্যে জলের বোতল, শূন্য টিফিন বক্স। লোকটার খানিক তেষ্টা পায়। ব্যাগ খুলে দু’ঢোঁক ঢেলে নেয় গলায়। এবার বোতলও খালি। সব কিছু খালি করে বাড়ির পথ ধরেছে লোকটা। নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা এনার্জির সবটুকু এভাবে শেষবিন্দু অবধি বিলিয়ে দিয়ে লোকটা নিজেও ওই বোতল আর টিফিন বক্সের মতো হয়ে গেছে এখন।
পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে অটো। লোকটা দেখেও দেখে না। একেক সময় ইচ্ছে করে অটোতে উঠতে। কিন্তু পাঁচ টাকা বাঁচানোর জেদ তাকে বাধ্য করে এই পথটুকু হেঁটে চলে যেতে। ট্রেনের ভেতর ভিড় ছিল। এখন চারপাশের হাওয়ার মধ্যে হেঁটে যেতে ভালোই লাগছে। কেবল এনার্জিটা আর নেই বলে, মাঝে মাঝে ফোনের ব্যাটারি কমে যাওয়ার মতো একটা যান্ত্রিক সংকেত মগজ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের অন্যত্র। সে শরীরকে বোঝায়, আরে এই তো। আর পাঁচ মিনিট হাঁটো বস। এসে গেছি অলমোস্ট। বলতে বলতে নিজের মনেই হেসে ওঠে লোকটা। নিজেকে নিজেই কনভিন্স করা যে কী কঠিন! একেক সময় মনে হয়, মস্তিষ্ক বুঝতে না চাইলেও পা দুটো নিজের মতো হেঁটে চলেছে। যেন সে বাকি শরীরের কেউ নয়। যেন তার কাজ কেবল পথটুকু পেরিয়ে যাওয়া। এর বাইরে তার আর কোনও ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই।
সে নিজেও তো সারাদিন এই পায়ের মতোই। অবিরাম শ্রমের মধ্যে দিয়ে, লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে কেবল পথটুকু পেরিয়ে যেতে চায়। সকাল থেকে ব্যাংকে ছোটো, সেখান থেকে অফিসে ফেরো। প্রয়োজনে আবারও ছুটতে হবে ব্যাংক। তারপর অফিসে ফিরে কম্পিটারের সামনে রাশি রাশি হিসেব-নিকেশ। হিসেব মেলা-না মেলার মধ্যে দিয়ে দিনটা কেটে যেতে থাকে। সন্ধে নামে। রাত হয়। অবশেষে ফেরা। মাথার মধ্যে তখন কিছুই নেই। একটা ফাঁকা ময়দান। শূন্য মাঠ।
লোকটা স্পষ্ট দেখে। শূন্য স্টেডিয়াম। ফ্লাডলাইট জ্বলে আছে। সবুজ গালিচার মাঝখানে বাইশ গজ খয়েরি জমি। দু’পাশে উইকেট পোঁতা। এলোমেলো ছড়িয়ে রয়েছে ব্যাট, প্যাড, গ্লাভস আর হেলমেট। আজকের মতো খেলা শেষ।
খেলা শেষ। কিন্তু লোকটার ব্যাটিং নয়। কাল আবার তাকে নামতে হবে। এই মাঠেই। তার ইনিংসের পরের অংশ খেলতে। আজকের মতো সে নটআউট। হ্যাঁ, নানা অতর্কিত আক্রমণে টলে গেছে বটে অনেকবার। দুয়েকটা বিষাক্ত বল গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে উঠে বুকের ওপর লাল ছোবল ঢেলে গেছে। বোকার মতো চালিয়ে খেলতে গিয়ে ফসকেছে। পরক্ষণে আবার ফ্রেশ গার্ড চেয়েছে আম্পায়ারের কাছে। ওয়ান লেগ প্লিজ। কিন্তু উইকেট ছেড়ে পালায়নি।
লোকটা জানে মারের খেলা তার জন্য নয়। দুমাদুম চালিয়ে খেলে বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি মেরে হেলমেট খুলে দর্শকের অভিবাদন পেতে সবারই ভালো লাগে। কিন্তু সবার সেই ক্ষমতা থাকে না। মাঝে মাঝে অবশ্য ভ্রম হয়। পরক্ষণেই নিজেকে বোঝায় লোকটা। অত প্রতিভা যার নেই, তাকে ফাঁক খুঁজতে হবে। হালকা একটা দুটো পুশ। সিঙ্গলস। একটু দূরে গেলে কোনও মতে দৌড়ে দু-রান। ব্যাস। এতেই খুশি থাকো ভাই। কখনও সখনও অবশ্য ব্যাটের কানায় লেগে কোনও মতে একটা দুটো বল থার্ডম্যান কিংবা ফাইন লেগ দিয়ে সীমানা পেরিয়ে যায়। কিন্তু খুব বেশি হাততালি পড়ে না। দর্শকেরা বোঝে এটা খুব নিখুঁত শট নয়। লোকটা এখনও পুরোপুরি সেট হতে পারেনি। কিন্তু তবু ভদ্রতাবশত সামান্য হাততালি পড়ে। লোকটা এতেই খুশি। ভালো মার এরপরেও হবে। তা বলে হাততালির লোভে চালিয়ে খেলা যাবে না। আউট হয়ে গেলে তো ইনিংসটাই শেষ। তার চেয়ে টিকে থাকা জরুরি। মারার বল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। যত ভালো বলই হোক, যতই ক্ষিপ্র হোক প্রতিপক্ষের ফিল্ডিং, সে উইকেট বিলিয়ে দেবে না। হিম্মত থাকে তো ওরা আউট করে দেখাক।
অফিসে তার পরিস্থিতিটা ঠিক কেমন, সে বুঝতে পারে না। তার যারা বস, বড়, মেজো বা সেজো... সময় বিশেষে প্রত্যেকেই তার পিঠ চাপড়ায়। তবু সে এখনও পার্মানেন্ট স্টাফ হতে পারেনি। তার কোনও পিএফ নেই। মাঝেমাঝেই রেগে গেলে বসেরা গালি দেয়। ঠিক বাপ-মা তোলা গালি নয়, কিন্তু তাচ্ছিল্য, বিরক্তি আর প্রচ্ছন্ন হুমকি মেশানো এমন সব কথা যার গায়ে বিষ মেশানো থাকে। তখন মনে হয়, সত্যি একদিন চাকরিটা আর থাকবে না। কেন যে এমন সব ভুল হয়ে যায়! চোখ আর মন একসঙ্গে থাকে না।
আসলে না চাইতেও কত কথা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কেটে ওঠে সময়ে অসময়ে। লোকটা আনমনে বাড়ির কথা ভাবে। রিটায়ার্ড বাবা, রুগ্ন মা আর বদমেজাজি ভাইয়ের কথা। ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকা কিংবা পাশের বাড়ির নতুন বউটার ছাদে কাপড় মেলার কথা। সে না চাইতেও এমন সব দৃশ্য তার চোখে ভেসে থাকে। কখনও সখনও চোখ চলে যায় জানলায়। দেখে বিকেল। চনমনে রোদ্দুরে গা ভাসিয়ে খুশি খুশি একটা হাওয়া জানলার বাইরে পাক খেয়ে চলে যাচ্ছে। এ হাওয়া তার কাছে আসে না। এসির মিথ্যে সান্ত্বনার ঠান্ডা হাওয়ায় একটা ভয়ের মতো শিরশিরানি। প্রবল খেলার কিশোরবেলা লোকটা অনেক দূরে ফেলে এসেছে। যখন খেলার শেষে চোখের সামনে আচমকা ফুরিয়ে যেত আলো। সন্ধে নামত নিজের মনে।
লোকটা বহুদিন বিকেল দেখে না। সপ্তাহের সবেধন একমাত্র ছুটির দিনে সুযোগ পেলেই বিছানায় গড়িয়ে পড়তে মন চায়। ওসব ছেলেমানুষি রোমান্টিকতার দিন নেই আর। এখন দাঁতে দাঁত চেপে ক্রিজে টিকে থাকা। ভালো বলগুলো সামলিয়ে খারাপ বলে খামচা মেরে কুড়িয়ে নেওয়া এক রান আর দু’রান।
হাঁটতে হাঁটতে পা এলোমেলো হয়ে যায় লোকটার। বাড়ি এবার সত্যিই সামনে। যেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে মায়ের তৈরি সামান্য পদের অসামান্য রান্না। পরিবারের সকলের সঙ্গে এই সময়টা বড় ভালো কাটে লোকটার। দিনের শেষে এই সময়টুকু তার বড় আপন। তার নিজের।
এরপর ঘুম। ঘুমের কথায় লোকটার মনে পড়ে সেই বুড়োটার কথা। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সেই বুড়ো। সমুদ্র থেকে খালি হাতে ফিরে এসে লোকটা যখন স্বপ্ন দেখল তখনও সেই স্বপ্নের মধ্যে সিংহরা হেঁটে বেড়াচ্ছিল। বুড়োটা হার মানেনি। ব্যর্থ হয়েও সে আবার সমুদ্রে ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখেছিল। কারণ সে জানত মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু হেরে যেতে পারে না।
লোকটা ফিরে আসছে। কাল আবার নতুন দিন। একজন নটআউট ব্যাটসম্যান কাল আবার ফিরে যাবে ক্রিজে। যে জিততে পারেনি এখনও। কিন্তু হারেওনি তা বলে।
তার ইনিংস এখনও শেষ হয়নি। তার খেলা এখনও অনেক বাকি।