ক্রীড়নক

নাহার মনিকা

তার নিজের অবতরণের সঙ্গে একটা দৌড় ছিল।
কিছুটা অতিমানবীয়, আশপাশের বিস্ময়াকুল আত্মীয়-বন্ধুকে বিহ্ববল করে দিয়ে ওভার দ্যা বাউন্ডারী নেমে আসা। বিমানের পেট থেকে ঝুপ করে একেবারে অন্য জনপদ।
তারপর থেকে দৌড়ই তার দিনপঞ্জি।
যদিও আসমানীকে যখন সে দেখছিল, সে স্থাণু হয়েছিল। দিনের বেলায়। ঘন বাঁশগাছের অকিঞ্চিত ছায়াতে যেমন দেখার কথা তেমন ছিল না সে দেখা।
আরো অনেককেই দেখেছে। রকমফেরে উড়তে, দৌড়াতে।
নিজের সময়, ভালো করে বললে ওড়ার সময় নিজেও ঐ গতিটা ঠিক টের পায়নি, সামান্য পলকাভাব বোধ করেছিল সে সেটা ঠিক, তবে এটা সত্যি যে তিমির পেটের মধ্যে স্থির বসে থেকে বাইরের পয়ত্রিশ হাজার মাইলের গতিবেগ বোঝার কথা তার না। শুধু শৈত্যভাব বুঝেছে, আর অনুভব করেছে এই দৌড়ে সে বলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, দৌড়ে দৌড়ে গড়িয়ে যাওয়ার ভবিতব্য।
মূখ্য ভুমিকা বাদ দিলে, শুধু তো বল না, ইনিংস, ব্যাটিং, পোডিয়াম, ফিল্ডিং, উইকেট, মাঠ এমনকি বাইশ গজের পীচ,কতভাবে যে নিজেকে বুঝে, শিখে নিতে হলো! কিন্তু বেয়াল্লিশ রগড়ের বাইরে সে যেতে পারে না। ওর মধ্যেই নিজেকে বিছিয়ে উড়িয়ে বাড়িয়ে আর কাটিয়ে দিতে হয়। ঐ যে মসৃণ না হয়েও গড়িয়ে যাওয়া, আশপাশে ফিল্ডিং এর বেষ্টনী, আরো দ্রুতগামী, আরো কসরৎজানা সব খেলোয়াড়ের ফাঁদ ছাড়িয়ে তাকে পৌঁছতে হবে একদম শেষ লাইনে, দড়িটা স্পর্শ করেও পার হতে হবে একের পর এক সীমানা। এবড়ো, থেবড়ো খানাখন্দ কিছু বাকী রাখা চলবে না, ঘষা খেতে খেতে একটা নিরাপদ ফোঁকরের অপেক্ষা শুধু, যা গলে একবার বেরিয়ে পড়তে পারলে হয় একবার বেঁচে থাকা জুটবে। হ্যা, দিনশেষে কড়ায়-গণ্ডায়, খোলে-করতালে এই বেঁচে থাকা-ই তো আদত পাশ ফেলের মাপ। হয় একদম ডিশমিশ, না হয় জিতের আনন্দ।
অফিসের কনফারেন্সে যেতে ভোর ভোর এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে পৌঁছেও ওই দুপুরটা তার পিছ ছাড়ে না। তার এপার্টমেণ্টের জানালার ফাঁক গলে এক চিলতে শাদা আলো সেই যে তাকে নিয়ে গেলো পৌষমাসের গ্রামের দীঘির তলাকার পানির মত নাতিষীতোষ্ণ এক দুপুরে, নির্জন গ্রামের রাস্তায় বাঁশবাগানের ছায়ার সঙ্গে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার মিছিল ছিল। কিন্তু কোরাস না, তার একটা ঝিঁ ঝিঁ’র আলাদা ডাক শুনতে মন চাইছিল। ঝিঁ ঝিঁ পোকারা কখনো একাকীত্বে ভোগে কিনা – এই প্রশ্ন মনে নিয়ে তার বুক খাঁ খা করে উঠছে। অথচ এয়ারপোর্টে চারপাশে সতের রকম শব্দ, আর সে নিজেও অফিস কলিগের অপেক্ষায়। একসঙ্গে কনফারেন্সের ফ্লাইট ধরবে।
সম্ভবত অলস বসে থাকার কারণে ঐ দুপুর তার পিছু ছাড়ে না। একটা সংহত রাগী ব্যাটের আঘাতে বাইরে ঠেলে দিয়ে সে নিজেই তখন আক্ষেপ করে, দুপুরটাকে ডাকে। দু’চারজনের পাশ কাটিয়ে, একজনে পায়ের ফাঁক দিয়ে, অন্যজনের প্রায় নুয়ে শুয়ে পড়া বাড়ানো আঙ্গুলের থেকে ঠিক দু’ইঞ্চির ব্যবধানে ছুটতে ছুটতে বাসের হাতলটা ধরে ফেলে। তারপর গিয়ে নামে ঠিক বাঁশগাছের জটলার অল্প দূরে। অন্তত সেদিনকার মত যেখানে আসমানীকে দেখেছিল। ওটা কি ওর বাড়ি ছিল? বাড়ি, শব্দটা তাকে স্কুলের পাঠ্য বইয়ে ফেরত নিয়ে যায়। এ আসমানী “বাড়ি তো নয় পাখির বাসা, ভেন্না পাতার ছানি”র আসমানী না। আর ওখানে ওর বাড়ি ফাঁড়ি ছিল না। একতাল ঝড়ো ঘূর্ণিহাওয়ার মধ্যে পরে পাকেচক্রে যেমন করে মানুষ বাড়ি নয় এমন অচেনা ঠ্যাকে গিয়ে পৌঁছায়, তেমন ছিল।
সে শুধু জানতো, অথবা ভাবতে পেরেছিল যে আসমানী মোড়ের দোকান থেকে সদাইপাতি কিনতে আসে। ওড়নায় যে ঘরকন্নার দাগ, সেটি তার নিজের না সেতো জানা কথা। তবু আসমানী মনকাড়া মেয়ে, একঢাল চুলের গোছপাকানো হাত খোঁপা। দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে পা তুলে বেয়াড়া কথাবার্তা বলে।
-‘কী যে কন, আমি তো ডেলিই ছক্কা মারি, আমার চে’ বেশী ছক্কা আমাগো বস্তিতে কেউ পারে না’।
-‘কিভাবে মারিস ছক্কা’
আসমানী চনমনিয়ে হাসে, ‘আমাগো খেলা ভিন্ন, অন্যরকম’।
কারা কারা এই মেয়েটিকে মনে মনে কামনা করে, আর আসমানী যে এদের কাউকে চায় সে কথা ওর সঙ্গে যে অবস্থায় দেখা হয়েছিল তাতে জানতে চাওয়া যায় না। তবু জানা হয়ে গেল, যে ছেলেটার সঙ্গে ভাব ভালোবাসা ছিল ওর, সে তাকে রেখে কুয়েত না কাতার কোথাও গিয়েছিল, গিয়ে তাকে ভুলেছিল। এই ফাঁকে বাপ তাকে বিয়ে দিতে চাইলে না করেনি আসমানী। কেন করবে? কার ভরসায়? তবে বিয়েটা শাপে বর হলো না।
-‘ভাতারের মাইর খাওনের দিন শ্যাষ। একদিন থাপ্পড় দিছে একটা, আমি দিছি দুইটা, তারপরে আইসা পড়ছি’।
ঘটনাক্রমে তার ভালোবাসার ছেলেটিও ফিরে এসেছে। আসমানী বলে, ‘এইবার আমি ছক্কা মারতে চাইছি’।
ঈগলের মত দুই ডানা ছড়িয়ে চারদিকে স্থির চক্ষু মেলে পাহারা দিয়েছে। যেন তেন প্রকারে না। রীতিমত হুমকি ধামকি দিয়ে, ‘আর আমারে ছাইড়া দূরে যাইবা?’ বলে বাহুতে কামড়ে উল্কি এঁকে দিয়েছে।
-‘এমন করলে কেউ তোর সঙ্গে থাকবে’?
-‘থাকলে ভালো, না থাকলে নাই। এইটাই আমি, আমার ভালোবাসায় কামড় আছে। না থাকলে কি আমি বইসা বইসা কান্দুম? আমাগো খেলায় কান্দনের দিন শেষ’, আসমানী বড় একরোখা।
-‘ আমি ঠিক করছি বাসাবাড়ির কাম বাদ দিয়া মডেলিং করমু’।
-‘মডেলিং’?
-‘হু, ঐ যে ছয়তালা বিল্ডিং এর কোনার বাসা। ঐখানে আঞ্জুম আফা থাকে,সিনামার এক্সটা। হ্যায় আমারে মডেল বানাইবো কইছে। হ্যারা চাইর বইন ঐখানে থাকে’।
- ‘ওরা মনে হয় লোক ভালো না। আর তুই মডেলিং এর কি জানিস? তোকে ব্যবহার করবে!’
- ‘ভালো না হইলে নাই। আমি খারাপ হইলে আমারে বাইন্ধা রাখার কেউ নাই’।
-‘আসমানী তুই বুঝতে পারছিস না, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। তুই খুন টুনও হইয়ে যেতে পারিস, এসব সঙ্গ ভালো না, ভালো হয় না’।
-‘ ভালো কারে কয় কন দেহি? খায় না মাথার নিচে দিয়া ঘুমায়?’ সে ছয়তলার কোনার ফ্ল্যাট দেখতে চোখের কোনা চোখা করে থাকে। -‘হ্যাহ, খুন, হইলে হমু। এইটা আর এমুন বেশী কি? মরণ আইলে মরুম’।
আসমানী মারকুটে খেলোয়াড়। মাথা নুইয়ে ঘাড় বেকিয়ে একপেশে অদৃশ্য গোয়ার্তুমি দিয়ে ভরা ওর শরীর বাঁশগাছের ছায়ার সে শরীর অবিন্যস্ত শুয়ে থাকে। ঝিঁঝি পোকার কোরাস তখন সখেদ আওয়াজ ছাড়িয়ে দূরে কোথাও বেজে ওঠা রেডিওর সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। রেডিও’র আওয়াজ অর্কেষ্ট্রার মধ্যে আলাদা কোন বাদ্যযন্ত্রের মত লাগছিল, খাপছাড়া। বাড়িভিটাবিহীন আসমানী ওখানে ছড়িয়ে বিছিয়ে পড়েছিল। আর ঐ বাঁশগাছ তলায় তখন শূন্য রানে আউট হওয়া খেলোয়াড় দলবেঁধে মাঠ ছেড়ে যাচ্ছিল।
বাঁশগাছের ছায়ায় আসমানীর ছড়ানো শরীর ভীড়ের মধ্য থেকে সে দেখেছিল। এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পায়। আসলেই কি সে জায়গায় বাঁশগাছের ছায়া ছিল, না কি লোকারন্যের রাজপথ? আসমানীকে কার কার সঙ্গে যেন গুলিয়ে ফেলে সে।
যে কলিগের জন্য এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে অপেক্ষা করছে তার আসমানীর মত কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েটিও মডেলিং করতে চাইছিল। একই রকম অস্থির চোখের তারা, বয়সন্ধির কিছু অহংকার ঘিরে থাকা শরীর, যা কিনা ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট এর ফ্যাশন মডেল হওয়ার জন্য প্রাণান্ত হচ্ছে। চুলের রং বদলে ফেলে, ডায়েট বদলে, মেইক-আপ টিউটোরিয়াল দেখে, এমনকি কি করে বুকের সাইজ বাগে আনবে তা নিয়ে রীতিমত প্রশিক্ষণ নিয়ে শরীর চর্চা করছিল। ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট- আরেক জটিল পীচ, ও ওর মা’কে বলে –‘এদের লিঞ্জেরি নিয়ে জনসমক্ষে খেলতে হলে এর মুড বুঝতে হয়’। কেন এই কোম্পানির প্রোডাক্টস এর মডেল হতে মেয়েরা মুখিয়ে থাকে, দু’হাতে উড্ডীন বলটি ধরে ফেলার জন্য, কোন সুদর্শন খেলোয়াড় বোল্ড আউট করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে দৌঁড়ায় কে জানে!
মেয়েটা চুলে ছলছলে চোখের আধখানা ঢেকে ফিস ফিস করে গায়- ‘আই ক্যান্ট কিপ মাই হ্যান্ডস টু মাইসেলফ’। ওর দুনো হাত ছুটে যায়, বাহুমূল থেকে প্রায় খুলে উড়ে যায়, দুই আঁজলা একটি লাগসই বোল্ড আউট করার আক্ষেপ নিয়ে বড়ো থেকে বিশালাকার হতে থাকে।
সিম্পল জ্বর আর গলা ব্যথা। লাঞ্চের স্যান্ডুইচ, ইয়োগার্ট মায় ড্রিঙ্ক অব্দি সাজিয়ে টেবিলে দিয়ে অফিস এলেও মেয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় অফিসে মা’কে ফোন করে। আর তার প্রশ্ন-‘ আমি ব্যাটিং করছি কিন্তু রান তুলতে পারছি না। দৌড় শুরু না হতেই বল এসে উইকেট ছুঁয়ে ফেলছে। আমাকে কেন শেখাওনি কি করে বলটাকে বাউণ্ডারীর বাইরে নিয়ে ফেলতে হয়’, এক ঘ্যানঘ্যান শুনতে হয়। কিছু কি বলা যায়? মেয়ের চোখের কোনে কালি।
মডেলিং এর অডিশনে যেতে হবে না শুনলে রেগে যায় মেয়ে- ‘ মা, তুমি চাও আমি পিছিয়ে থাকি?’
পিছিয়ে থাকতে কে চায়! ঝাড়বাতির মত ঝকঝকে আগামীকাল ওর সামনে দাঁড়িয়ে। ছুঁয়ে দেখতে চাইলে গতিটা বাড়িয়ে দিতে হবে শুধু। কিন্তু বাড়ির সামনে দণ্ডায়মান এম্বুলেন্স সে এড়াবে কি করে? বিশেষত ডাক্তার যখন অনেকগুলো টেষ্ট করিয়ে তখন তখনই হাতে শমন ধরিয়ে দিলো। ওভারিয়ান ক্যান্সার। ঐটুক মেয়ের! হ্যা, আর এই ভবিতব্যের কাছে হেরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না সে। দ্রুত অপারেশন করে কিমোথেরাপি শুরু করতে হবে।
কলিগের অফিস আর তখন অফিস থাকে না। কেমন বাড়ি বাড়ি হয়ে আসে। বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি তখন বাড়ি তো নয় রোগের আখড়া যমে টানাটানি।
হাসপাতালে বসে বসে মেয়েটি অনলাইনে পরচুলার খোঁজ করে। মা তাকে চুলে রং করতে দেয় না, এবার সে বাগে পেয়েছে। চুল পড়ে গেলে তার পছন্দের চুলের বাহার হবে, হলই না হয় নকল। জিজ্ঞেস করলে বলে –‘একদিন একদিন করে বাঁচি, একেকটা দিন ধরে জীবন হিসেব করি। আজকের দিনটাই ঠিক’।
- ‘জানো মা, সেদিন যে স্কুলে গ্রেড সেভেনের ওরিয়েণ্টেশন ছিল। আমি দেখছিলাম। আরেকটা নাইন গ্রেডের ছেলেও দেখছিল, ও খেলে, খুব ভালো বোলার। হি লুকট এট মি, আই লুকট এট হিম আন্ড উই হ্যাড দিস মিচ্যুয়াল আণ্ডারষ্ট্যান্ডিং দ্যাট উই আর ওল্ড’।
- ‘আচ্ছা! এখনই!’
- ‘হ্যা মা, আমরা তো ওল্ড। এখন আমাদের জুনিয়ররা আছে স্কুলে’।
স্থান ছেড়ে দেবার তরিবত। এসেছে নতুন শিশু তাকে পথ করে দিতে হবে।
আহ, সেই কিউট বোলার খেলোয়াড়। হাতের মুঠোর কমলালেবুর মত গোল পৃথিবী নিয়ে দৌড়ে আসে, লম্বা পীচে। পীচ না, ওটা আসলে এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহের সংযোগ গ্রন্থি।

তার কলিগ বলে-‘ আমার মেয়ে একজন ঈশ্বর চায়, স্কুলের ওই খেলোয়াড়টির মত। আমার মেয়েটিকে মডেলিং এর উপযুক্ত করে দেবে, সে আবার আগের মত নিজস্ব চুলে নিজের হাসিটি হাসবে। আচ্ছা, যদি, ধরা যাক ও যদি ঐ খেলোয়াড়ের দেখা কস্মিন কালে না পায়, তুমিই কেন আমাদের ঈশ্বর হও না? আমার আর আমার মেয়ের’।
পরিবেশবিদদেরে সম্মেলনে তার মতো কর্পোরেট লোককে ডাকা হয় শোভাবর্ধনের জন্য। কে না জানে ফসলের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর দাপটের কাছে গ্রামের দরিদ্র চাষীর আত্মহত্যা যেমন ঈশ্বরের কাজ, সে জানে যে সে হতে চাইলে তেমন ধরনের এক ঈশ্বর হবে। তার আওতায় শতশত কৃষকের মরে যাওয়া ছাড়া ব্যত্যয় নেই।
প্রত্যাখানের বদলে তবু প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলে – ‘চল, তোমাদের নিয়ে একদিন নয়নাভিরাম কোন শহরে বেড়াতে যাবো। চকচকে দিনের আলোয় গান শুনতে শুনতে যাবো, গাইবেন জ্ঞানপ্রসাদ গোস্বামী, কালোয়াতি ভঙ্গীতে নজরুলের গান। ‘শূণ্য এ বুকে’ এমন বাঁজখাই চড়া স্বরে গাইতে আর কাউকে শুনিনি। তার কন্ঠস্বর যেন মৃত্যুকে একহাত দেখে নিতে চায়। আর তার গান থামিয়ে দেয়াও অদ্ভুত, যেন ত্যক্ত মেজাজী কেউ বলছে- বেরিয়ে যা¸ দূর হ চোখের সামনে থেকে। যখন গায় ‘ব’লো না ভুলিতে’ যেন অনুরোধ না, হুকুম। আর সে হুকুম তামিল না করে সাধ্যি কার! তারপর একসময়, যখন আমরা কোন পাহাড় সারির ভেতর দিয়ে স্থির বনানী পার হবো, সূর্যের আলো নত হতে হতে দীর্ঘ করুণ হয়ে আসবে, তখন খুব নরম করে শুরু করবেন – ‘যাহা যা কিছু মম, আছে প্রিয়তম সকলি নিও হে স্বামী’, কিন্তু অন্তরায় পৌঁছার আগেই ফিরে আসবে তার দার্ঢ্য গলা। মসৃণ রাস্তা আর প্রখর রৌদ্রজ্জলের সঙ্গে যুৎসই প্রতিপক্ষের মত এই গান শুনতে শুনতে মনে হবে এইবার কোন সমুদ্রের প্রান্তে গেলে হয়! মন্দ্রমথিত তার কন্ঠস্বর প্রায় যবনিকাটানা বিকেলের আলো চারদিকে নির্দ্বিধায় ছড়িয়ে দিয়ে বলতে পারে- ‘বিমল আনন্দে জাগো রে’। আর ফেরার পথে খুব বৃষ্টি হবে। ওরে বৃষ্টি ওরে বৃষ্টি! আমাদের তিনজনের মন চাইবে একটু বৃষ্টিতে ভিজি, কিন্তু ভয় পাবো, মনে হবে জ্ঞানপ্রকাশ বুঝি ধমকাবেন।
তার কলিগ মহিলাটি ছলছলে চোখের চারপাশে কুঞ্চিত ত্বকে লালচে আভা এনে অনেকদিন পরে হেসে ফ্যালে।
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের গানের ভেতরকার হুংকার এসে তাকে স্পর্শ করে যায়। ওই রকম একটা হুংকার যদি সংবৎসর সঙ্গী হয়? মাটির দলার কাছে হুংকার কোন কাজে আসে? আসে হয় তো। মাটির দলাও ভিজে আলগা হতে চায়। তার ইচ্ছে করে বাঁশগাছের ছায়ায় গিয়ে হুংকার দিতে, ভীড় পাতলা হয়ে বাতাসে শান্তি শান্তি ভাব তৈয়ার হবে, আর আসমানী অতিপ্রাকৃত কর্মকান্ডের মত নড়ে চড়ে উঠবে।
কলিগের মেয়েটি একদিন চিঠি পেল, ইপ্সিত সে পত্র। ছাপার অক্ষরে ফরমাল আমন্ত্রণ। কার কাছ থেকে? স্বয়ং সিলেকশন বোর্ডের ডিরেক্টরের কাছ থেকে। মা’কে লুকিয়ে নিজে নিজে দরখাস্ত পাঠিয়েছিল। ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট এর বিশেষ মডেল নির্বাচিত হয়েছে সে। তার জন্য ওরা একটা বিশেষ গোলাপী পরচুলা রেখে দিয়েছে। কারণ ইতোমধ্যে মেয়েটির সিল্কি চুলগুলি কেমোথেরাপির সাইড এফেক্ট হিসেবে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হিসেবে ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট তাকে তাদের নতুন অন্তর্বাস পড়তে আহ্ববান জানিয়েছে। আহ! জীবন কি সুন্দর! কতগুলি ছক্কা আর চারে পরিপূর্ণ। শুধু কখনো কখনো তুমুল করতালি দেয়া লোকের অভাব।
কলিগের মেয়ে গোলাপী চুলের ছবি দিয়ে ফেসবুকে লেখে “আমার ভেতরের কথাটা কি? কোন কিছু বলক দিয়ে ওঠে না যে! কেমন নিশ্চুপ একটা খামচি কামড় দিয়ে রাখা হৃদপিন্ড নিয়ে দিন কাটাই। দিকচক্রবালে সহাস্য সূর্য ডুবে যায়। ছায়াময় ঘরের ভেতর থেকে বাইরের আলোর নরম বয়ে যাওয়া দেখি। নড়তে ভালো লাগে না আমার। বিরামহীন দৈনন্দিনে আটকে থাকতে গিয়ে বেশী কিছু না তো, শুধু চাই ভেতরেও ওই রকম নরম আলো আসুক... খুব হৈ হৈ হেসে উঠতে ইচ্ছে করে”।
কনফারেন্স শেষ করে ফেরার পথে কলিগ জরুরী ফোন পায়, তার কন্যাকে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আশংকাজনক অবস্থা। প্লেনে পাশের সীটে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদে সে, সেলফোনে মেয়ের ফটো বের করে দেখে। হাফ ছবি, ফুল ছবি, ঠোঁট জড়ো করে বিশ্বকে চুমু দিতে চাওয়া ছবি। তার মেয়েটি দ্রুতই কেবলি ছবি হয়ে ওঠার অপেক্ষার মুহূর্ত গুনছে।
অনিবার্য গতিময় হাইওয়েতে প্রতিবেশী গাড়ির জানালায় চকিত দেখা চালকের মুখের মত আসমানীর মুখ নড়ে চড়ে আবার স্থির হয়ে যায়। এই মেয়েটির সঙ্গে কী ভীষণ মিল!
তার কলিগ হঠাৎ সোজা হয়ে বসে, চোখ মুখ মুছে সুস্থির হবার চেষ্টা দেখায়। তারপর দুহাত তুলে আস্ফালন করার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে-‘ ঈশ্বর না, ঈশ্বর টিশ্বর না। আমাদের একজন আম্পায়ার চাই। আমাদের আর ঈশ্বরের মধ্যেকার খেলার আম্পায়ার। একজন দৃশ্যমান আম্পায়ার না থাকলে কি খেলা হয়?’