নিস্তব্ধতার সুর

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

মধ্যবর্তী ঘুম ও অনিদ্রা যখন আমার স্বপ্ন—তখনও উড্ডীন আঙুলের সকাল চোখের পাতা জুড়ে নাচে। এ আমার ভিতরের চোখ, তার প্রার্থনার ভাষায় কথা বলে। আমি পেছন দিকে অগ্রসর না হয়ে অনেক স্মৃতির পাড় ধরে আমার কল্পনার রঙে হাত রাঙাই। আমার মনে পড়ে, একদিন কেউ রেডিয়ামে আঁকা ছবির নিচে একটা কবিতা লিখেছিলো আমার চোখ নিয়ে, সে ভেবেছিলো্আমার চোখ আসলে জুনিপোকা মানে জোনাকি—যা অন্ধকারে লুসিফেরিন আগুনে জ্বলে জ্বলে উড়ে বেড়ায় হেলেঞ্চা, ঘেটুফুল, ঢোলকলমি আর বেতবনে, পাল্টে দিতে চায় জীবনের রং। কিন্তু জীবন মানে তো ঝিঁঝিঁ—আমার ছোটোবেলার রাত্রিজাগার সখীদল—ঝিঁঝিঁ ঝিঁঝি ডাকে যারা ভুলিয়ে দিতো আমার নৈঃসঙ্গের ধূসর প্রহরগুলি।

একটি ঘুঘু তার উষ্ণতার পাশে শীতে জমে যায়। আর সব কাকলিও আছে, আমার সীমানা ছিল না, যতক্ষণ না একটি চতুর পালক হাওয়াকে ফাঁকি দিয়ে আমার আঙুলের ভাঁজে লুকিয়ে পড়লো।

একদিন মনে হলো জীবন মানে খেলা। এগারো জনে খেলে। আমাদের ঘরে একটা উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আমাদের মনে হলো জীবন মানে ঝিঁঝিঁ পোকার দল—কেবলই রাত জেগে ডেকে ডেকে ক্ষয় করে রাত, আরো আরো গাঢ় করে দেয় রাতের নিস্তব্ধতা। সত্যি, সে ঝরে যাওয়ার পর আমাদের ঘর আরো নীরব হয়ে গেলো।

নিষিক্ত শব্দতীরে ঘুমিয়ে পড়া রাতের করতল। হয়ে ওঠা উন্মত্ত কুসুম। কার কাছে ঘুম? আমরা তো এখনো নিমের পাতা ছুঁয়ে সবুজ। এখনো কাদাগন্ধে নিঝুম। আমি করতলে ঝিঁঝি ও জোনাকির মৃত্যু দেখি। কখনো আলোকে হত্যা করে সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়েছি একা। কারো সঙ্গে দেখা নেই, সমস্ত নিঝুম—মদালস শব্দতীরে জাগছে কুসুম।

অদ্ভুত এক পালাক্রমে দৌড়ে চলেছি চলেছি আমাদের জীবনে। পায়ের নিচে ঘাসের ব্লেড। বুকে ভিতর অর্কেস্ট্রা বাজে। বাবা বলতেন জীবন মানে সংগ্রাম। সংগ্রাম মানে আসলে দৌড়। দৌড়ের ওপর থাকতে না পারলে রানআউট। তারপর শাদা কাগজের মতো শূন্য, নিঃশব্দ এবং গাছ ও গুল্মের মধ্যে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে আলো। বাতাসে সপ্রতিভ সরীসৃপ সকল। সামান্য এক চিত্রাভ নক্ষত্র প্রতিটি আকাশের খাঁজে নীরব হয়ে থাকে। সেখানে সবচেয়ে সুন্দর জ্যামিতি তৈরি হয়, মধ্যে সমান্তরাল। একটা অনেকটা উপপাদ্যের মতো দৃশ্যমান হতে চায়।

কারা কবে দেখতে চেয়েছে শান্তচিল রোদমূর্তি? তাদের চোখে ঝলসে আছে আলোকিত দিনের খরা। খরাতে প্রথমবাদল এলে শীততপ্ত শরীর ফুরোবে ভেবে যারা গুটিয়ে নিয়েছিলো সনখ হাতের দঙ্গল—তাদের হাতের তালুতে ধাতবপাথর হয়েছে শরীর বিশীর্ণ বনের একটি প্রান্ত সাক্ষি রেখে। ওইপ্রান্তে বুঝি তারা এবং তাহারা মিশে যাবে। সত্যিকার চিল আর খরামৃত ঝিলের কান্নার জলে।

বেতফল ছড়িয়ে থাকে কাঠবিড়ালির সোমত্তসুরে। এইবনে কুয়াশা আঁধার নেমে এলে ঝিঁঝিঁরা উড়ে। ঝিঁঝিঁফুল ফোটে ফোটে শব্দের সংসার; ওইঘরে দুজনের বেতফল দেহের আকার। দেহগন্ধরোদ ডুবে গেলে গোধূলি আলোয়—আলো সব কালো হয়ে পথে পথে শোয়। শুয়ে শুয়ে ডানা হয় বেতবনে কাঁটা, ওইবনে একা একা আমাদের ঘুরে ঘুরে হাঁটা।


আমি যখন চারবছর বয়স, আমাকে বিশ্বাস করার জন্য এক সে ঈশ্বর ছিল। আর সকাল আমার চোখের পাতা জুড়ে নাচতো। ভাবতাম, ছায়াপাহাড়ের পায়ে কারা এতো কথা বলে সারাক্ষণ?

ঘুম ভেঙে যায় তন্দ্রা বিবশ চোখের। ঝিঁঝিঁ শব্দের উৎস সন্ধান করি। কারো পরিচয় নতুন শিলালিপি খুঁড়ে দেখি। সূর্যমন্দির তার ভাস্কর্যের বুক খুলে জিব দেখায়। তারপরও তারা স্তব্ধ হয় না; কথা বলে। বানানো কথাই তবে লিপিবদ্ধ হয়? পাহাড় দেখতে এসেছি, ছায়াপাহাড়। পাহড়ের ছায়ায় এক মিনিট ঘুমোতে চাই।

সে ঝরে গেলো বলে আমরা জীবন মানে ঝিঁঝিঁপোকা বুঝি, খেলা বুঝি না আর।