সিঙ্গল্‌স্‌

শতাব্দী দাশ


‘অ্যান্ড হি রানস্‌ ফর ওয়ান মোর।’ আরও এক। এক এক করেই গত্তি লাগবে স্কোরের গায়ে। বেশ বেশ। কমেন্ট্রিতে কান পেতে মহীতোষ সুচারু চামচ নাড়ে গেলাসে গেলাসে। দোকানের ভদ্রলোকেরা, গুলতানিবাবুরা, অফিসফেরত-রা তবু ‘মেহ্‌’ ইমোটিকন হয়ে থাকেন। চার-ছয়ে হররা উঠবে, মহীতোষ জানে। অথচ বাবুরা জানেনা, কত সিঙ্গল্‌স্‌ সে সংগ্রহ করে দিনমান, তার এই প্ল্যাটফর্মের চা দোকানে। এই যে কলেজের ছেলে-মেয়ে দুটি, প্রেমিক-প্রেমিকা, গায়ে-গা বসে, তবু ব্যস্ত নিজ নিজ মুঠো-ফোন দুনিয়ায়, এদের এখুনি সংগ্রহে রাখল মহীতোষ। নানা জনকে চা এগিয়ে দিতে সে নানা অচেনা চরে ঘুরে বেড়ায়। ব্যারাকপুরের বউটির চোখের তলার কালি থকে শ্যামবাজারের ছেলেটির অন্যমনে হাসি – ক্রিজ থেকে ক্রিজান্তরে চলে তার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস্‌। আর এইমাত্র দোকানে এল যে মেয়েটি, মহীতোষ জানে সে-ও তারই মতো খুচরো রান-সংগ্রাহক।

‘মহীতোষদা চা...’
‘দিই—’
‘তাড়াতাড়ি দাও। আমার ট্রেন...’
‘এক্ষুণি দিই, ঘন্টাখানেক দাঁড়াও।’
হো হো হেসে ওঠে মেয়ে। মহীতোষের রসবোধকে সে সম্ভ্রম করে। সম্ভ্রমের আরো কিছু কারণ আছে এলোমেলো। যেমন অঞ্চলে কমরেড মহীতোষই একমাত্র দু’এক টাকায় এখনো চা বেচে। তার একটা ভাসা ভাসা সোশ্যালিস্ট কারণও দেখায় সে। দুনিয়ার মেহনতি মানুষের স্বার্থে চায়ের দাম বাড়াতে তার বাধে....এইরকম কিছু। সোশ্যালিজম্‌, যৌথ খামার...এসব অতি বড়সড় ব্যাপার, এসব হল চারশো প্লাস ইনিংস স্কোর। আপাতত কমরেড মহীতোষের টুকরো স্বভাব, আলতো রসিকতা মেয়েটি সযত্নে তুলে রাখে। আর এ’ মেয়ের হো হো হাসিতে যতই ভ্রূ কুঁচকে উঠুক কমেন্ট্রিতে উৎকর্ণ জনতার, সে এখনও হাসবে। এমনকি, ট্রেনে উঠে পড়েও, একটা দুটো স্টেশন পেরিয়েও যে একচিলতে তার ঠোঁটে লেগে থাকবে, সে তার আজকের সংগৃহীত সিঙ্গল্‌স্‌। আরও এক। আরও একফোঁটা আলসের শুখা টবে।

* * *

কবি যেভাবে বলেন—
‘বাড়ি ফিরে দেখি, বারান্দায় টবের গাছে, ছোটো এক / শাদা ফুল ফুটে আছে। এ-ও কি সম্ভব। আমার অবিশ্বাসী / দুই চোখ জলে ভরে যায়।’
- মেয়েটি সেভাবে বলতে পারেনা। তেমন ভাবে অনুভবও করতে পারেনা হয়তো। যে পলিমাটিকে তপ্‌তপে রাখতে হয় অনুভবের সব ছাপ বুক পেতে গ্রহণ করতে, তা শিলায়িত হয় দিনে দিনে। তত্ত্ব, তথ্য আর অভিজ্ঞতায় ন্যুব্জ একটা আত্মার কান্না যখন হেমন্তের শিশির হয়ে ঝরে পড়ে, তখন ভীষণরকম বাঁচিয়ে দেয় মহীতোষদা বা তার মতো আরও কেউ কেউ, বা কিছু কিছু, যাদের বা যা কিছুর সাথে চার-ছয়ের কখনও কোনো সম্পর্ক ছিল না, যা কোনো মহত্তর আগামীর দিকে চালিতও করে না হয়তো, শুধু অস্তিত্বকে করে সহনীয়। আর স্কোরবোর্ডে জমতে থাকে খুচরো মুহূর্তরা। ট্রেনে ফিরতে ফিরতে মাঠজোড়া সূর্যাস্ত দেখে মেয়েটির মনে পড়ে, কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় ঢাকুরিয়া ব্রিজের ওপারে সূর্যকে ডুবে যেতে দেখেছিল। পঞ্চাননতলা বস্তির মাথার আকাশটাও তবে দিনে দুবার আবির মাখে! অসুন্দরের মধ্যেও সুন্দরকে খুঁজে পাওয়া গেলে নিজেকে ভালবাসা সহজ হয় না কি? আর জীবনকেও?

ট্রেনে এর ওর মুখে তখনও ফিরছে ক্রিকেট। নেটে চট্‌জলদি রান চেক করে নিচ্ছে কেউ। খেলাটা আদতে বড়ই রাজকীয়, ভাবে মেয়ে। আদতে স্বতন্ত্র আলোচনার দাবিদার হয়তো হতে পারে দুরন্ত সব ব্যাটিং-ঔদ্ধত্য, উড়ন্ত সব বোলিং আক্রমন। স্টেপ আউট করে ব্যাট্‌স্‌ম্যান সজোরে ঘোরালো ব্যাট। ঘূর্ণির বেগে ধেয়ে এল বোলারের জবাব। হাত বাড়িয়ে আগুনগোলা মুঠোয় পুরল ফিল্ডার। সব – সবই তো শৌর্যের, সক্ষমতার, বলিষ্ঠতার উদ্‌যাপন। তার মধ্যে সিঙ্গল্‌স্‌-এর মূল্য ক্রিকেটীয় নান্দনিকতার নিরিখে, হয়তো কানাকড়ি। তবে কি না মহাশয়, অ-নান্দনিক যৎকিঞ্চিৎ একরকম যাপনও হয়। মহতী সব আয়োজনের মাঝে সে দু’ এক পয়সার যাপনেরা ঘাপটি মেরে থাকে, অ্যাক্রোপলিস্‌ মলের পেছনে বস্তির মতো, বিপ্লবীর গোপন একাকীত্বের মতো। সেই সব খুচরো হিসেব-নিকেশে তুড়ি মেরে ফ্রন্টফুটে চার-ছয় হাঁকানোর প্রচলিত, সমাজস্বীকৃত নাম ‘পুরুষকার’। সে তুলনায় এক একটি খুচরো জমিয়ে মাটির ভান্ড ভরানো কাজটি এতই ‘মেয়েলি’, যে তা নিয়ে মহাকাব্য লেখা চলেনা। অথচ তা-ও হতেই পারত এক অন্যতর জীবনদর্শন। এই পর্যন্ত ভেবে মেয়েটি থমকায়। এই জীবনদর্শন কি চার-ছয় মারার ব্যর্থতা থেকে আসে, না আসে মুহূর্মুহূ আঘাতে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জেদ থেকে? জীবন স্পিন ডেলিভারিতে তোমার চোখ ধাঁধাবে, ফাস্ট বোলিং-এ পেড়ে ফেলবে, গুগ্‌লিতে বোকা বানাতে চাইবে। তাও তুমি নানা উপায়ে ‘ব্যাটে-বলে’ ঘটিয়ে ছাড়বে, ছুটে বেড়াবে, সংগ্রহ করবে রাণ – এ’ এক যতিহীন অ-নান্দনিক লড়াই, যা তোমার মন-মগজ-অঙ্গপ্রত্যঙ্গক সচল রাখছে, বেঁচে থাকাটা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। এ’ খুব কম হলো কি?

অথচ এই ‘ব্যাটে-বলে’ হওয়ানোর বিষয়টিতে গুরুত্বপূর্ণ যে টাইমিং, জীবনের গুলি-ডান্ডায়, মেয়েটি দেখেছে, তা টাইমিং নিজের হাতে থাকেনা সবসময়। আরও দক্ষ কোনো অদৃশ্য খেলোয়াড় তার দায় নিয়ে থাকেন। যেমন মহীতোষদা তাকে মনে পড়িয়ে দেয় আরেকজনের কথা। টোরি স্টেশনের আর এক চা-দোকানি। ঝাড়খন্ডের ছোট্ট স্টেশনটতে কখনও, কোনোদিনও গিয়ে পড়ার কথাই ছিল না তার। নেহাৎ সেদিন রাজনৈতিক গোলযোগের জেরে মিছিল বেরিয়েছিল রাজ্যজুড়ে। বাস-পরিষেবা বন্ধ। ডালটনগঞ্জ পৌঁছে ট্রেনে ওঠা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তাই ট্রাকে চড়ে, ট্রেকারে ঝুলে পৌঁছোনো গিয়েছিল পরের হল্টে। টোরি। সে এক এমন স্টেশন যা ট্রেনের শব্দে আড় ভেঙে উঠে বসে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে। একটিই চায়ের ঠেক। বাঙালি ভদ্রলোকটি স্বভাষী আগন্তুক পেয়ে আতিথেয়তায় ভরিয়ে দেন। যাদবপুরের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলতে বলতে সন্ধে ঘনায় টোরির চা-ওয়ালা শিবদাস মজুমদারের চোখে। তাঁর কলোনি জীবন, তাঁর বাড়ি পালানোর দাস্তানে টোরির নিঝুম প্ল্যাটফর্ম সেদিন মুখর হয়। স্টেশনের পেছনেই তাঁর বাড়ি। সেখানে নেমতন্ন হয়। বৌদির জন্যে শাড়ি, সকলের জন্যে মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার কথা দেওয়া হয়। যদিও আর কখনো যাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু ট্রেনে উঠেই টের পাওয়া যায়, ব্যাটে-বলে হয়েছে। জমা হয়েছে আরো কিছু কাঠ-খড়।

অথবা যেমন পূর্ব-সিকিমের সেই কবি-শিক্ষিকার সাথে দেখা হয়ে যাওয়া। বারমিক গ্রামে প্রায় পাতালের কাছাকাছি এক ঝর্ণা দেখে সে পাহাড় ভেঙে উঠে আসছিল। আর তিনি ইস্কুল সেরে আসছিলেন নেমে। তাঁর একাকী ঘরে পাশাপাশি রাখা পালিতা কন্যার ছবি আর বুদ্ধমূর্তি – মোমের আলোয় আর বাকার্ডির নেশায় দুজনকেই ভারি স্বর্গীয় দেখাচ্ছিল। সে মেয়ে গেছে অনেক দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে। একলা মাতৃত্বের টুকিটাকি শুনতে শুনতে রাত নামে। তাঁর কবিতা শুনে শেখা হয়, রডোডেনড্রনের নাম আসলে ‘গুরাস’। অথচ এক মুহূর্ত এদিক-ওদিক হলে দেখা না হতেই পারত, ব্যাটে-বলে না হতেও পারত - এই ভেবে অচেনা, অজানা কারো কাছে সে নতজানু হয়।

‘স্ট্রাইক-রোটেশন ইজ এসেনশিয়াল’ – বলেছিলেন রং-রুট ট্র্যাভেলার সেই রিটায়ার্ড ব্যাঙ্ক ম্যানেজার, উড়িষ্যার এক জঙ্গলে যাঁর সাথে আলাপ। সেদিন একদিকে রেডিওতে চলছিল ক্রিকেট ম্যাচ, অন্যদিকে গল্প-গুজব, প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা গোল গোল চোখে বর্ণনা করছিলেন, কিভাবে বিয়ের দুমাস পরে হঠাৎ একদিন আজকের প্রৌঢ় বিহারগামী এক ট্রাকে তুলে দিয়েছিলেন বউকে, আর চড়ে বসেছিলেন নিজেও, কারণ রিজার্ভেশন ছিল না। সে ষাত্রার সোহাগ আজও প্রৌঢ়ের মুচকি হাসিতে ধরা পড়ে যায়। স্মৃতি হয়ে ঝরে পড়ে শালপাতা। সন্ধে আর প্রেম গাঢ় হয়ে নামে জঙ্গলে।

আবার প্রেমের কথাই যদি ওঠে, তবে ভোটের ডিউটি সেরে ফেরার পথে, ভেসেলের সেই খুড়ো-খুড়িকেও মেয়ের মনে পড়ে যায়। খুড়োর সেই একের পর এক বিড়ি ধরানো, আর বিজ্ঞ মন্তব্য – “এ টেপা-কল সে ছাপ-ভোটের মতো ‘শেঙ্গুইন’ নয়”। “এত বিড়ি খাও খুড়ো, খুড়ি বকে না?” ফোক্লা মাড়িতে বুড়ো খিকখিকিয়ে ওঠে – “খুড়ি তো আমার চে’ বেশি খায় গো। তোমাদের সামনে খেতি পারচে না”। খুড়ির লজ্জামাখা লোলচর্ম মুখ তখন নবারূঢ়াসম। স্কোরবোর্ডে যোগ হল কি কিছু? প্রেম থাকলে কি অমোঘ রোদ পড়ে মানুষের গায়ে! সে রোদের আঁচ তৃতীয়জনও পোহাতে পারে অনায়াস।

আবার প্রেম গেলেও কিছু রোদ ফেলে যায়। ছায়াটুকুর পাশ কাটিয়ে তার কাছে যদি পৌঁছনো যায়, স্মৃতির আপত্তি থাকে না রোদ মাখামাখিতে একদিন পাইন-সিডারের বনে হঠাৎ আঁধার নেমেছিল, আর নিশ্চুপে পাশাপাশি হেঁটেছিল দুজন মানুষ। অনেক পরে একজন বলেছিল – “বুদ্ধদেব গুহ বলেছেন, ‘সবুজ অন্ধকার’। অন্যজন বলেছিল – “আর কীট্স্-Verduous gloom” আবার সব চুপচাপ হয়ে গেছিল। সবুজ অন্ধকার একসাথে আবিস্কার করে তারা প্রকৃতই হতবাক হয়েছিল। এরপর এদের দুজনের মাঝেও আঁধার নামবে, নামতেই পারে। আর সে আঁধার সবুজও নয়, নিকষ কালো। কিন্তু মুহূর্তদের বেছে তুলে রাখতে হবে, রাখবে মেয়েটি। তারাও ঝলমল করবে স্কোরবোর্ডে – জ্বলবে, নিভবে।

* * *

শ্রুতকীর্তি হবার জন্যে জন্ম নয় আসলে, অন্ততঃ সকলের। বাউন্ডারি ওভার-বাউন্ডারি যে মারা হয়ে যায় না কখনও-সখনও আশ্চর্য সমাপতনে, তা নয়। আকাশ ফুঁড়ে বল যখন আরও দূরে পাড়ি দেয়, তাকে তো আর যাত্রা বলে না, তাকে বলা চলে অভিযান। স্কোয়ার ড্রাইভে মাঠ পেরিয়ে বল সীমান্ত ছুঁলে, সে হল ঘুরে দাঁড়ানো, জানান দেওয়া, সদর্পে। কিন্তু বাউন্ডারি ওভার-বাউন্ডারির বাইরে যে বহতা জীবন, সেখানে সত্যি স্ট্রাইক-রোটেশনটাই আসল। টিকে থাকা, ক্রিজ আঁকড়ে পড়ে থাকা শুধু নয়, দৌড়ঝাঁপ করে ‘মানে’ খুঁজে ফেরা। নাহলে জীবন আর মৃত্যু নামক দুটি স্থানিক বিন্দুর মাঝে একরৈখিক হেঁটে যাওয়া তো আদতে একঘেয়ে, অর্থহীন। অর্থ ন্যস্ত করার দায়িত্ব, ফলত, যাত্রীরই। বিন্যাসহীন একটা যেমন-তেমন, যা-খুশির উপর মানে, তাৎপর্য, গুরুত্ব ইত্যাদি আরোপ করতেই তো যাবতীয় রানিং বিটুইন, যাবতীয় কসরৎ। বন্ধ্যা মেইডেন ওভার আর লে-ছক্কা-বাজির ঠিক মাঝামাঝি কোথাও মানে খোঁজার এই অস্তিত্ববাদী চেষ্টাটা চালাতে থাকে মেয়েটি বা মহীতোষদা, বা আরও কেউ কেউ। সিসিফাসের মতো পাথর ঠেলে তুলছি পাহাড় চূড়ায়, যা আবার গড়িয়ে পড়বে খাদে, আবার তুলব, আবার পতন – পুরো উদ্যমটাই আসলে যাচ্ছে জলে, এমনটা না-ই বা ভাবল তারা। কামু-ও তো শেষ বেলায় বলেছিলেন “The struggle itself…is enough to fill a man’s heart. One must imagine Sisyphus happy ।” তারাও নিজেদের না হয় ভেবে নিল সুখী। একটা দুটো গল্প, একটা দুটো চরিত্র, একটা দুটো সিঙ্গল্স্ ক্রমে খুঁটে নিল মহাকালের আঁচল থেকে। তার মধ্যেই লুকিয়ে-চুরিয়ে থাকতে পারে কোনো ব্রাহ্মমুহূর্ত, কোনো এপিফ্যানি, যা আমূল বদলে দেবে খেলা। কিন্তু এপিফ্যানি তারা খোঁজে না। তারা শুধু বেকেটের ভ্লাদিমির আর এস্ট্রাগনের মতো, নভেন্দুবাবুর নয়ন আর কবীরের মতো ছুটোছুটি হুটোপুটি করে, আর খুচরো রান কুড়িয়ে বেড়ায়। খেলেধুলে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে, স্কোরবোর্ডকে ফ্রিজ হতে না দিয়ে একটা লম্বা টেস্ট ম্যাচ কাটিয়ে দেওয়াটাও কম কথা নয়।