এক্সট্রা টাইম

তমাল রায়

বোকা হয়ে জন্মান খুব সহজ কথা নয়। এ কথা বলে সে রওয়ানা দিল চালাক(?) পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। এখন যে রাস্তায় সে হেঁটে চলেছে তার দুদিকে ঘন অরণ্য, মাঝখান চিরে বেরিয়ে গেছে পথ। ঘণ্টা ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বড় কোনো চার্চ বেল নয়। ছোটো সত্যনারায়ণ পূজার মত। ছোটো কিন্তু তীক্ষ্ণ, তীব্র। এক নয় অনেক। আওয়াজটা বাড়ছে ক্রমশ। ধূপ, ধুনো সহযোগে তবে কি কোনো... প্রতিটি ঘটনারই দুই বা তার বেশী ব্যাখ্যা হতেই পারে। যেমন এ ঘটনাটিরও। চালাক যে কেউ বলবে ঘণ্টা পোকা। অরণ্যর আদি বাসিন্দা। সে কিন্তু তা ভাবল না মোটেই। ভাবল ঈশ্বরের অবস্থান খুব কাছেই নতুবা নক্ষত্রের হাতছানিই বা কেন। যদিও এখনো সন্ধ্যে নামেনি। সুখ তো প্রকৃত এক মায়া, দুঃখ হল অলংকার। আপাতত সুখ আর দুঃখের দুই বনানীকে দু পাশে রেখে সে চলেছে। প্রদোষকালে এ সমস্ত হয় বলেই ছায়া আর সাধু মিলেমিশে এক হয়ে যায় রাত্রির এ উৎস মুখে। চালাক অথবা ভোগী হলে সেও ভয় পেতো এ যাত্রায়। ভাবতেই পারত লুক্কায়িত হিংস্র শ্বাপদের কথা প্রবল হস্তিসম অস্তিত্বের কথা। আদতে সে ভাবল ধু ধু বালির কথা, যা মুঠো শক্ত করলেও পথ খুঁজে নেয়, এ পৃথিবী ঈশ্বর নির্মিত। প্রকৃত নাস্তিকও তো আসলে বোকা। হাতের কাছে ধরবার জিনিস থাকতে অযথা শূন্যে আস্থা রাখা। তার কাঁধে এক ভারী রুকস্যাক, পায়ে যে কোনো ব্র্যান্ডের একটা স্পোর্টস সু। মাথা উঁচু করে সে হেঁটে চলেছে যেমনটা হেঁটে যায় ক্লাস এইটের ছাত্র। বোকা অথচ উৎসাহী। পেছনে, অনেক পেছনে সে ফেলে এসেছে যা কিছু অমীমাংসিত, শিরস্ত্রাণ অথবা কচ্ছপের খোলস। যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে যে শিশুটি তাকে জড়িয়ে ধরেছিল তার হাতে ছিল ফুল। শিশুটি প্রশ্ন করার আগেই সে তাকে বলেছিল দিগন্ত রেখার কথা, বলেছিল লাল আর কালো ছাড়া তাস সম্বন্ধে, খেলা সম্বন্ধে তার আর কোনো প্রকৃত অভিজ্ঞতাই নেই। সে মিথ্যে বলেনি। আর তাই তার নাম ছিল... নামে কিবা এসে যায়! আসলে সে ছিল এক নিতান্ত বোকা খেলোয়াড় অথবা আবিষ্কারক নইলে দড়ি, কম্পাস আর মানচিত্র কেন’ই বা ছিল সাথে, আর নারকেল নাড়ু, লেবু মেশানো জোয়ান।

আপাতত সে হাঁটছে। এ দৃশ্যমান কক্ষপথে কেউ নেই কোথাও। না স্ত্রী, না সন্তান, না উত্তরের জানলা দিয়ে দেখা একটা চৌখুপ্পী মুখ গোমড়া আকাশ। চালাক লোক এ সময় লক্ষ্যে পরিবর্তন আনে। সে বোকা তাই যা কিছু পরিবর্তন, তা এনেছিল নিজের মধ্যেই। সে হাঁটছিল সোজা যেমন আবিষ্কারকরা হাঁটে। ঘণ্টা ধ্বনির আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছিল। অনুভব করছিল এ যাত্রায় তার সাথেও আছে কেউ অথবা কারা যারা তাকে নজর রাখছে। তার বাম পাশের লোকটির থেকে সে শিখে ছিল যা কিছু ভাল। ডান পাশের লোকটির থেকে সে শিখে নিয়েছিল যা কিছু খারাপ তা কি করে সংশোধন করতে হয়। আবহাওয়া সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল খুব কম। সে জানতো কেবল জলবিষুব রেখা বরাবর হাঁটতে থাকলে কোথাও হয়ত পৌঁছনো যায়। যদিচ এও ছিল তার এক বোকা বিশ্বাস। নইলে সে পথ হারাবে কেন? মাও তো পথ হারিয়েছিল কতবার। তবু মার মুখেও ছিল হাসি। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও মা বলছিল— কষ্ট নেই একফোঁটাও। বরাবরের মত সে তাও বিশ্বাস করেছিল। তারপর এলো অনেক ঝড়, বজ্র-বিদ্যুৎ আর সেও তখন এক আদিগন্ত মাঠের মাঝে এলোপাথাড়ি দৌড়চ্ছে। খুঁজে পাচ্ছেনা সীমানা অথবা গোলপোস্ট।

এ অরণ্য যাত্রার মাঝপথে এখন সে এক গাছঘরের নীচে। এ কোনো বৃক্ষ প্রাসাদ নয় যেমনটা হয় বন বিভাগের গাছবাড়ী। এ নিতান্তই এক সাময়িক আস্তানা শিবির। প্রভূত ঘণ্টা ধ্বনির মাঝে এক নিরেট অন্ধকারকে সাক্ষী রেখে সে উঠে গেল গাছঘরে। এ সেই আস্তানা যেখান থেকে বোকা লোকেরা ক্যানেস্তারা বাজায়, পটকা ফাটায় শঙ্কাজনক শ্বাপদ, চতুষ্পদ কে সুখের ফসল থেকে বিতাড়িত করতে। চালাক পশু অবশ্য এসবে বিচলিত হয় না। সে তার কাজ করে। মাড়িয়ে যায় শস্য ক্ষেত, ভাঙ্গে ঘর। যেমনটা করত তার স্বপক্ষ বা বিপক্ষের সহ খেলোয়াড় অথবা অফিসের কলিগরা। উড়ে আসত তাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ, কখনো জামার পেছনে টিকিট-পকেটমার, কখনো চেয়ারের তলায় মার্বেল গুলি। আর চেয়ার দৌড়চ্ছে, সে পিছলে পড়ছে নিয়তিসম স্লাইডিং ট্যাকলে। আর সে ছুঁড়ে চলেছে গোলা-গুলি-ডিটোনেটর। আসলে সে ছুঁড়বে ভাবত, বোকা লোকেরা যেমনটা ভাবে। আপাতত সে গাছঘরে। তার সামনে ততটাই পথ যতটা ফেলে এসেছে পেছনে। আর সাথে আরও জোরালো ঘণ্টা ধ্বনি।

এবার সে নেমে আসছে ধীর পায়ে। গন্তব্য জানা থাকলে স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ যেমন করে। সে ফেলে এসেছে কিছু অমীমাংসিত সম্পর্ক, পৌঁছতেও তো হবে কোনো এক সম্পর্কের দ্বারপ্রান্তে। সে তা জানে এসব, তবু... অন্ধ এ অরণ্যের মাঝখান চিরে যে পথ, সে পথে এগিয়ে যেতে হবে, পথ চলাও তো এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ। আর সে হয়ত বা সেনাপতি। পিঠের ব্যাগটি আসলে পোশাক-আশাকে ভরা কোনো ব্যাগ নয়, তাতে রয়েছে গোলা-গুলি-ম্যাগাজিন-ডি টোনেটর। এ অরণ্যে কোথাও আর কোনো আলো জেগে নেই একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ছাড়া। ও বুঝিবা প্রদ্যোৎ স্যার, প্রথম জীবনের কোচ। আর জেগে সে আর শুধু সেই পথ। যে পথে সে হেঁটে চলেছে। জেগে আছে দুটি কান যে সামান্য কোনো শুকনো পাতার ওপর আওয়াজ অথবা আড়াল, আবডাল থেকে ভেসে আসা যা কিছু বিপজ্জনক দেখলেই রেড অ্যালার্ট পৌঁছে দেয় মস্তিষ্কে আর নিমেষে শুরু হয়ে যাবে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যার মধ্যেই তার কেটেছিল এতগুলো বছর। আপাতত যাত্রা শুরু। যার আগে সে নিয়েছে রেজলিউশন। যদি সে রেজলিউশন এক বছরের হয়— সে রোপণ করবে বীজ, যদি দশ বছরের— সে রোপণ করবে বৃক্ষ, আর তা যদি হয় আগামী একশ বছরের— সে রোপণ করবে জ্ঞান। প্রতিটি অমীমাংসিত সম্পর্কের পর পরে থাকা যে যাত্রা পথ তা আসলে এক যুদ্ধ ক্ষেত্র। আর সে পথে কখনও বা নিঃশব্দে হেঁটে যায় কোনো এক ধর্ম যাজক। যার দৃষ্টি বিস্তৃত, অপলাতক কে যিনি পৌঁছে দেন যুদ্ধের খুঁটি-নাটি তথ্য, আর সম্ভাব্য সতর্ক বাণী। কিছু অস্ফুট রেজলিউশন।

এখন দিন ও রাতের সঙ্গম মুহূর্ত। ৬২/এইচ/৪ অবিনাশ দত্ত বাই লেনের গলিতে ঢুকে প্রথম তিনটে বাড়ীকে পেছনে ফেলে চতুর্থ বাড়ীর দোতলায় দশ বাই বারো ঘরটিতে এখন কিছু সম্পর্কের ভীড় একটি নিতান্তই সাধারণ খাটকে ঘিরে। যেখানে শুয়ে রয়েছেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। খ্যাতনামা মিড-ফিল্ডার। সারাটা মাঠ জুড়ে যিনি কেবল খেলোয়াড়ে খেলোয়াড়ে সেতু বন্ধন করতেন একটি নির্দিষ্ট গোলে পৌঁছে দিতে এক উদভ্রান্ত সময় কে। খেলার সূত্রেই তিনি ছিলেন সরকারী চাকুরে। পেনিট্রেটিভ জোনে তার থেকে বড় সাহসী মানুষ খুব কমই ছিল। লোকে এখনো বলে ‘কলজের জোর ছিলো বটে’। নিজে আর কটাই বা গোল করেছেন, অন্য কে দিয়ে গোল করানোতেই তিনি পেতেন প্রভূত আনন্দ। ফলে ফাউল আফটার ফাউল আর তার রেগে ওঠা, আর কেবলই অফসাইডের বাঁশি তাকে ক্লান্তও করেছিল খুব। রেফারী কি আর সব বড় খেলোয়াড়ের মর্যাদা বোঝে! আর ট্যাকল্। প্রতিপক্ষ না স্বপক্ষ জানা নেই তবে একাধিক হার্ড ট্যাকল শেষে আজ তিনি শয্যাশায়ী বিগত এগারো মাস। এখন তার মস্তিষ্ক জুড়ে এক বিস্তীর্ণ অরণ্য। তিনি জঙ্গলে একা যেতে কখনোই ভালবাসতেন না। জঙ্গল সাফারি করেছিলেন তিনি মোট তিনবার। প্রথম মধ্যপ্রদেশের কানহা যেখানে নাকি শ্বাপদ প্রাণীর সংখ্যা প্রবল। দ্বিতীয় ওড়িশার ভিতরকণিকা যেখানে জীব জন্তুর অপেক্ষা মশক জাতের সংখ্যা অধিক। আর জলদাপাড়া। এক শৃঙ্গ গণ্ডার দেখা যায়। যদিও জঙ্গল ছিল সারাটা জীবন তার চার পাশেই। এ সমস্ত সফরে তার সাথে থাকতেন তার সুন্দরী স্ত্রী শিখা, যিনি তার স্পোর্টসম্যানশিপে মুগ্ধ হয়ে সেধে প্রেম এবং বিয়ে, একমাত্র পুত্র দশ বছরের অংশু আর বন্ধু বিকাশ। যে নিজেও খেলার জন্যই বিখ্যাত! তার ঘাড়ের নীচ থেকে শরীরের বাকি অংশ গত এগারো মাস ধরেই অচেতন। অথচ এ কমাসে অন্তত এগারো হাজার একশ এগারো বার বলেছেন তার অরণ্য যাত্রার কথা। প্রথম দিকে তার অমীমাংসিত স্ত্রী গুছিয়ে দিতেন তার কিটস্। জামা কাপড়, জুতো, জল, ওআরএস, টুথব্রাশ। সে যখন মই বেয়ে গাছবাড়ীর ওপরে উঠে যেতো অমীমাংসিত পুত্র অংশু ধরে থাকতো মই। বন্ধু বিকাশ হাত চেপে ধরে বলত— সাবধানে যাস। আজ এই প্রথমবার তিনি নিজেই গুছোচ্ছেন নিজের কিটস্। কারণ অরণ্য যাত্রা বা যুদ্ধ যাত্রার প্রস্তুতি উভয়তই এক চরম গোপন একক অভিসার। সামনে লম্বা পথ। ধকল অনেক। আর তাই বুঝি তার মুখের ওপর ঝুঁকে রয়েছে অনেকগুলো করুণ মুখ। যা দেখে তার সার্কাসের ক্লাউন মনে হওয়ায় তিনি হেসে ফেললেনে প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তেও। দূর থেকে কানে ভেসে আসছে একটা চেনা ব্যালাডের সুর। যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে তিনি বলে যেতে চান কিছু। হিটলার যেমন তার চলে যাওয়ার আগে সমস্ত যুদ্ধের দায় চাপিয়ে ছিলেন ইহুদীদের ওপর তেমনটা নয়। প্রকৃত উইনারের মতই তিনিও তার ভাবী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলে যেতে চান— এ রিয়েল উইনার নেভার রিগ্রেটস্।

এখন অবিনাশ দত্ত বাই লেনে রাত পায়চারী করছে কিঞ্চিত বিভ্রান্তিতে। আর অমীমাংসিত বোকা মিডফিল্ডার সুদীপ চট্টোপাধ্যায় এক্স থেকে এক্সট্রা, টাইম থেকে ইনফিনিটির পথে... কেবল দুবার বিড় বিড় করলেন— ভিকট্রি বিলংস টু দা মোস্ট পারসিভিয়ারিং। কেন কে জানে?