শুকতারা মা- গো আমার সন্ধ্যাতারা মা

মেঘ অদিতি

বহুদূর অপেক্ষা, দিগন্তে চোখ

রাত্রি গভীর হলো এই-

ঘুমিয়ে পড়ার আগে ধর আমি স্পর্শ করলাম এমন এক আলোকবিন্দু নিঃশব্দে যেখান থেকে সঞ্চারিত হয় ভালবাসা। স্পর্শ করলাম ধর ছায়া, যে ছায়া থেকে দেখা মিলল অপেক্ষা উদ্বিগ্ন চোখের, সন্ধ্যায় সে ছায়াকে চিনলাম সন্ধ্যাতারা নামে ভোর রাতে সে আলোকবিন্দু দেখা দিল শুকতারা হয়ে।

এই আলো, ওই ছায়া যেভাবেই ভাবো সে আমার শেষতম আশ্রয়স্থল- আমার মা।

মহাকাল তুমি জানো, সরোবরে আমি ছিলাম সন্তরণশীল সেই মীন নির্বিঘ্নে যে দিনমান খেলা করত অফুরান জলে। এক দীর্ঘ নাভিরজ্জু ধরে ধরে দিগন্তে চোখে রেখে বহুদূর আলো আর কিছু অন্ধকারে সেখানে অদেখা আমার জন্য অপেক্ষা করত আমার পৃথিবী। তারপর যেদিন ঝড় উঠল খুব, কালো হয়ে এল চারপাশ, নিরেট দেয়ালে কাঁপা কাঁপা ছায়া ফেলে দীর্ঘ হল লন্ঠনের আলো, সেদিন ঝড়ের মুখে চারপাশে হু হু জল ভেঙেচুরে ভাসিয়ে নিল সব আর খাবি খেতে খেতে আমি; সেই মীন হাত পা ছুঁড়ে চলেছি সেদিন কোন সে অন্ধকারে। জল কমছে আবার। কেঁপে কেঁপে উঠছে শিখা, দেয়ালে ছায়া আরও দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। অশান্ত অতল সুরের টানে কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে যখন সে ভাঙতে শুরু করেছে পুরো ঠিক তখনই ব্ল্যাকবোর্ডে দাগ পড়ল চকখড়ির;

কাউন্টডাউন শুরু-
টেন, নাইন, এইট, সেভেন.. সিক্স.. আর ততক্ষণে আঁকুপাঁকু আমি টানেলগামী ডাউনওয়ার্ড।


নির্জনের এক আকাশ মা

বসন্তকে চেনা হয়েছিল হারানো গানের দিনে বসন্তবৌরির ডাকে। বর্ষা চেনা হল অঝোর বৃষ্টির মাঝে খয়েরি ডানার পাপিয়াকে দেখে। শীত ঋতু, উঠোনের রোদ, কমলা লেবু, বই বই বই, উঠোনে আরাম চেয়ার এবং আমরা ক’জন। আমাদের শরীরে ডানার ওম ছড়াতে ডানে তাকালে যে, বামে তাকালেও সে।

গ্রীষ্মকে এভাবেই কি চিনিনি? চিনেছি কালবৈশাখি, স্বরবর্ণের সকাল থেকে ব্যঞ্জনবর্ণের দীর্ঘ দুপুর। এভাবেই তো চিনে গেলাম মাথার ওপর যে মস্ত আকাশ, সে আসলে আমার মা।

বিকেলের পিছলে পড়া আলোয় নীল শাড়ির সাথে ছিল ট্যাসেলের সখ্যতা। বিকেলে গা ধুয়ে চায়ের কাপে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ালে কাপ হয়ে যেত ধবধবে রাজহাঁস, বাতাসে ভেসে বেড়াত হেজলিন ল্যাভেন্ডার সুরভি। আর বুকের ওপর এসে পড়া ওই ট্যাসেলের আশ্চর্য বেণী, চোখ বুজলে আজও সেই বেণীর ঝলক দেখি। সুর শুনি গুনগুন। বেণী কখনো খোঁপা হয়ে গেলে তাতে কী করে জায়গা পেত যেন ঝুল লাগানো এক একটা রূপোর কাঁটা। ওই অপরূপার কাছে সব সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যেত।

আরও আশ্চর্য ঠোঁট চাপা এক হাসি নিয়ে নরম আলো গোল্লাছুটের বিকেল মন্থর চলত যেই সন্ধের দিকে, নীলাম্বরী ততক্ষণে হয়ে উঠত ভুবনেশ্বরী..


লু হাওয়া, ম্লান সেপিয়া

গিটার কি হারমনিয়ম সবেতেই তখন প্রাণ। চিত্রাঙ্গদা থেকে শাপমোচন, সর্বত্র খোলা জানলা- আলো হাওয়ার অবাধ যাতায়াত। সকাল থেকে মান্না দে। সকাল থেকে হেমন্ত। প্রজাপতি ডানায় ডানায় উঁকি দিচ্ছে জিনিয়ার সকাল, আর ভৈরবে ত্রিতাল লেগে ধুম কফির মাগ থেকে ধোঁওয়া হচ্ছে ক্রমে উর্দ্ধমুখী। আর ওই যে ছোট্ট ফুল কসমস সে একটু একটু করে পাপড়ি মেলে ধরতে শুরু করেছে তখন।
বাড়তে বাড়তেই সে কখন আলোর সাথে গানের ভেলায় ভাসতে শিখছে। ভৈরব থেকে সুর ছিটকে নামছে ধীরে মল্লার ছুঁয়ে রাতের দ্বিতীয় প্রহরে আর কেবল রাগ রাগেশ্রী তো নয়, সেসব তখন নব্য সাহসিকার অভিযান পর্বের রাতও। চোরা চাউনির ফাঁক দিয়ে আরও বেলা বাড়ছে, আলো আরও ঢলে ঢলে পড়ছে.. বেলা যেভাবে বাড়ে, সেভাবেই ভেতর ভেতর জমতে শুরু করেছে অজস্র গোপন অনুভব।
মির্চা এলিয়াদে তখন মন বসেছে। আর ছুটি ছুটি বলে একটু উষ্ণতার জন্য মন আলুথালু। যে দেখে, সে দেখেই। এ হাওয়া বদল তাই তার অন্তত চোখ এড়ায় না। ফলে লু হাওয়ায় মাথা কান ঢেকে পথ চলার চেষ্টা করে চলি যতই কিন্তু বই আর তাতে লুকিয়ে থাকা নীল খাম লুকাব কোথায়.. সে তো তখন সাহেববাজার থেকে পাড়ার দাদার হাত ধরে আমার কাছে হরদম পৌঁছোচ্ছে, আর এভাবেই এক বিকেল বই আর চিঠিসমেত হাত বন্দী হলো তার হাতে।
শীতল সে চোখ দুটো চেয়ে আছে, চেয়েই আছে আমার দিকে.. আমি কী করি যে, শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে হিমশীতল স্রোত .. কোথায় পালাব?
চোখ নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে, ডাউনওয়ার্ড.. ডাউনওয়ার্ড..
হে ধরণী দ্বিধা হও..

রোদতাপ, পুরু লেন্স- রূপালি পালক

বেলা পড়ে গেলে আলো যখন খুব কমে আসে- অবরোহণের রাস্তাগুলো তখন ধীরে হয়ে ওঠে আউট অব ফোকাস।
সরে যাওয়া দৃশ্যে তখন উঠে আসে জাফরির বিষণ্ণ বিকেল। অমন নীলাম্বরী মাকে খুঁজতে কে যেন খুঁজতে থাকে উৎসের সেই সরোবরটিকে। রঙ উস্কে দেয় ঝরোকার আভা। কে যেন বলে - চল এবার জলের কাছাকাছি।
আবার জল!
জল ধুতে পারে- সময়ের আঁকিবুকি?
জল জানে, সিন্ধুর সভ্যতার মত মাথা উঁচু করে থাকা মা-র চশমার ওই পাশে কেন ঘোলাটে চোখের ছায়া?
জানে জল, ভরা সংসারে দাপিয়ে বেড়ানো মানুষ কেন শেষ বেলা অত একলা হয়ে যায়?
অত হিজিবিজি ধূসরতা থেকে জল পারে আবার তার হীরক স্বচ্ছতার দ্যুতি এনে, বাবা নামের সঙ্গীসমেত পূর্ণ সংসার ফিরিয়ে দিতে?

পারো যদি- ও জল,
আবার মীন হব আমি, আবার সাঁতরে যাব নীল সরোবর,
ঠাঁই নেব সে মাতৃজঠরে আবার ..